প্রিয় তুই পর্ব -১৪

#প্রিয়_তুই
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্ব_১৪

-”তার নাম নাহিদ হাসান।”
-”সত্যি মেরেছিস?”
-”হুম, আর সেটা স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে ।”
-”কেন? ”
-”কারণ সে ভোর চৌধুরীর অনাবৃত দেহখানা দেখে খায়েশ মিটাতে চেয়েছিল।”

স্বাভাবিকভাবে কথাটা বলে তিতাস গ্লাস থেকে পানি খেলো। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো ঠিক করে পেছনে ঘুরতেই ভোর তার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। তিতাস প্রচন্ড অবাক হয়ে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে। মারের কারণ অজানা তার। তাছাড়া ভুল কিছু বলেও নি সে। ভোর যতটুকু জানতে
চেয়েছে তাই বলেছে, তাহলে? মারবে ভালো কথা, তাই বলে এত জোরে? ইস, গালটা জ্বলে যাচ্ছে। তিতাস করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই আরো একটা থাপ্পড় তার বাম গালে। অতঃপর বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া নড়লোও না। যদি আবার মারে! ভোর এবার ওর দিকে তেড়ে চুল ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,

-”ওই বে/য়া/দ/ব তোকে একটা করে প্রশ্ন করব, তারপর তুই বলবি? তোর হুশে নেই, কেউ কিছু জানতে চায়লে তাকে পুরো কথা জানাতে হয়। তোর পুরো কথা শুনতে সারাজীবন এখানে দাঁড়িয়ে থাকব আমি? বল, তাড়াতাড়ি বলবি তুই। নয়তো দেখ তোর কী করি।”

-”আমার ভুল হয়েচে, আমাকে ক্ষমা করে দেন।”

কথাটা বলে তিতাস হো হো হেসে উঠল। ভোর আরো জোরে চুল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে শুনতে পেলো তিতাসের মায়ের গলা। উনি নিচে থেকে কান্নারত কন্ঠে তিতাসকে ডাকছেন।বোধহয় কিছু হয়েছে। নয়তো এভাবে তো উনি ডাকেন না।তিতাস চট করে উঠে টি-শার্ট নিয়ে পরতে পরতে দৌড়ে নিচে গেল।ভোর
তার পিছনে ছুটল। তিতাসের আম্মু কেঁদে কেঁদে ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলছেন। চাচী এবং রোজা তৈরি কোথাও যাওয়ার জন্য। ভোর ওর শাশুড়ীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল, পিয়াসের বন্ধু মারা গেছে। উনারা ওখানেই যাচ্ছেন।
পিয়াস মা/রা/ যাওয়ার পর ওর কোনো বন্ধু আর আসত না। একদিন হঠাৎ এই ছেলেটা এসে উনাকে জড়িয়ে ধরে প্রচন্ড কেঁদেছিল। কারণ পিয়াসকে সে খুব ভালোবাসত। একসঙ্গে ওরা বড় হয়েছে, পিয়াসের স্কুল লাইফের বন্ধু সে। কতবার ছেলেটাকে নিজের হাতে রান্না করে খাইয়েছেন। কতবার সে
ঈদে এসে সেলামী নিয়ে গেছে। উনি মা, উনি বোঝেন সন্তান হারানোর ব্যথা। উনি কাঁদতে কাঁদতে এসব বলে ভোরকেও তৈরি হয়ে নিতে বললেন। তারও যাওয়া উচিত। ভোর সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে তিতাসের দিকে তাকিয়ে রুমে গেল।তবে তিতাস আজ আর কিছু বলল না। বরং নিজে ঝটপট তৈরি হয়ে সবার আগেই নিচে নামল। ওর বাবা অফিসের মিটিংয়ে ব্যস্ত। ফোনটাও সাইলেন্ট বোধহয়। এজন্য সে মেসেজ করে জানিয়ে দিলো।

তারপর সকলেই গাড়িতে উঠে কুমিল্লার পথে রওনা দিলো। কারণ ছেলেটার বাসা কুমিল্লা। তিতাস গাড়ি চালাচ্ছে ভোর তার পাশের সিটে। পেছনে মা, চাচী এবং রোজা বসে আছে।
সকলের মন ভার। তিতাসের মা একটু বেশিই আবেগী। উনি
নীরবে কাঁদছেন। পিয়াস নেই, ওর বন্ধুদের দেখলে উনি আর কষ্ট চেপে রাখতে পারেন না। কেঁদে কেঁদে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এজন্য তিতাস উনাদের বাসায় আসতে নিষেধ করেছে।আর পিয়াসের বন্ধুরাও বুঝে স্বাভাবিকভাবে সেটা মেনে নিয়েছে।
কারণ উনারাও ব্যাপারটা স্বচক্ষে দেখেছিল।সঙ্গে বুঝে ছিল, একজন মায়ের কষ্ট।

তিতাস একহাতে ড্রাইভ করে অন্য হাত ভোরের হাতের উপর রাখল। ভোর তখন নিজ ভাবনায় মগ্ন। খুব আফসোস হচ্ছে ওর। আর একটুর জন্য তিতাস পিছলে গেল, নয়তো পুরো ঘটনা তখন জেনেই ছাড়ত।হোক জোর দেখিয়ে অথবা অন্য কোনো উপায়ে। কিন্তু হলো কই!

তখন কারো স্পর্শে সে পাশ ফিরে তাকাল। তিতাসের হাতের মুঠোয় তার হাতখানা বন্দি। শক্তভাবে ধরে আছে তার হাত।
অথচ তার ভাবখানা এমন যেন সে কিচ্ছু জানে না, অতীবও ভদ্র ছেলে। ভোর তিতাসের মুখভঙ্গি দেখে হাতটা ছাড়ানোর বৃর্থা চেষ্টা করল না। কারণ সে অবগত, শক্তি প্রয়োগ করেও লাভ নেই। তিতাস কিছুতেই তার হাত ছাড়বে না। সে ভালো করে পরখ করেছে, তিতাস নিজে থেকে যে কাজ ধরে সেটা সম্পূর্ণ করে তবেই ছাড়ে। হোক সেটা হাত ধরা, জড়িয়ে ধরা, অথবা ওদের বিয়ে। এই তিন কাজই সে মর্জিমতো করেছে।
না কারো বারণ শুনেছে আর না মর্জি বদলিয়েছে। বরং যে বারণ করবে তার সন্মানের দফারফা করে ছেড়েছে। রের্কড করা হিসাব এসব। এরচেয়ে চুপ থাকায় শ্রেয়। তাছাড়া হাত ধরেছে ধুরুক, ভেঙ্গে বা কেটে তো নিয়ে যাচ্ছে না। সে নিজে মনে মনে এসব ভেবে বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।দুরন্ত গতিতে পেছনে ফেলা আসা গাছগুলোকেও দেখল। বুনো ফুলের রং গুনলো। স্বচ্ছ আকাশে পাখিদের উড়াউড়ি দেখে মৃদু হাসল।
আর ওকে দেখে তিতাস হাসল। শব্দহীন অদৃশ্য সেই হাসি।

বেলা গড়িয়ে তখন দুপুর দু’টো বেজে সাতচল্লিশ। আজকে দুপুরে কারো খাওয়া হয় নি। খাওয়ার আগেই দুঃসংবাদটা শুনে বেরিয়ে পড়েছে। এজন্য তিতাস ভালো মানের একটা রেস্তোরার সামনে গাড়িটা দাঁড় করাল। এখানে সে আগেও এসেছে, খেয়েছেও ।খাবার মোটামুটি ভালোই। তাছাড়া ওর
মাথা ব্যথা করছে কিছু খেয়ে ওষুধ খাওয়া দরকার। নয়তো
দাঁড়িয়ে থাকাও দুষ্কর হয়ে যাবে। তারপর সে নিজে পেটপুরে খেয়ে বাকিদেরও খেতে বাধ্য করল। আপনজনদের মৃ/ত্যু/র খবর শুনে গলা দিয়ে খাবার নামবে না। তবুও সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে এনার্জির প্রয়োজন। নয়তো এত জার্নি করে গিয়ে ওরাই অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাছাড়া ওর মা কয়েক দিন হলো হসপিটাল থেকে ফিরেছে। আর এখনই অনিয়ম করা ঠিক হবে না। ছোট্ট রোজাও খুধা সহ্য করতে পারে না।
লজ্জায় মুখে কিছু না বললেও কেঁদে দিবো। এটা ওর পুরনো অভ্যাস। তারপর তিতাস সবাইকে গাড়িতে বসিয়ে ওর ওষুধ খেয়ে, কিছু শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে নিলো। গাড়ির দরজা খুলে বসতে গিয়ে দেখে ড্রাইভিং সিটে ভোর বসে আছে। ওর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি মেলে বিপরীতে পাশে গিয়ে বসল। তারপর শরীরটা এলিয়ে মাথা ঠেকিয়ে দিলো সিটে। ওর চোখজোড়া খুলে রাখা দায় হয়ে যাচ্ছি। এখন দশ মিনিট চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম করলে ঠিক হয়ে যাবে। ভোর আপনমনে গাড়ি ড্রাইভ করছে। তবে মনে তার নানান ভাবনা। চোখে একরাশ কৌতুহল।

এরপর যথাসময়ে ওরা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাল।একটু গ্রামের
ভেতরে বাড়িটা। এজন্যই জিজ্ঞাসা করতে আসতে আসতেই সময় লেগে গেছে। বাড়িভর্তি মানুষ, চারিদিকে আপনজনের কান্নার আহাজারি। তিতাসের মা চাচী ভেতরে ঢুকে গেলেন। ভোর আর তিতাস গাড়িটা পার্ক করে বড় উঠানে দাঁড়িয়েছে। এখানে পুলিশও দেখা যাচ্ছে। হয়তো কেবল আসল। গ্রামের মানুষজন পুলিশকে দেখে একটু দূরে গিয়েই দাঁড়াল। তখন দু’জন পুলিশ একটা ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।
পাশের পুলিশটা সেগুলো লিখতে লাগলেন। হয়তো তদন্তের স্বার্থে। ভোর যখন এক পা বাড়াবে তখন পুলিশ ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করে বসল,

-”ছেলেটার নাম কি?”
-”নাহিদ হাসান।”
-”আপনি নাহিদের কে হন?”
-”চাচা।”
-”নাহিদের কী স্বাভাবিক মৃত্যু?”
-” না, কেউ তার ক/লি/জা বের করে নিয়েছে।”

সঙ্গে সঙ্গে ভোরের পাজোড়া থেমে গেল। সে ঘাড়টা ঘুরিয়ে
বিষ্ফোরিত দৃষ্টিতে তিতাসের দিকে তাকাল। তিতাসের দৃষ্টি তখন তার দিকেই নিবদ্ধ, ঠোঁটে কুটিল হাসি। সে যেন জানত ভোর বিষ্মিত দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকাবে। ভোরকে তাকাতে দেখে তিতাস শার্টের কলার কিঞ্চিৎ পেছনে ঠেলে দিলো। সে
অদ্ভুত চাহনিতে তাকিয়ে এখনো হেসেই যাচ্ছে। আর সেই চাহনি যেন ভোরকে চিৎকার করে বলছে,

-”ইয়েস, আই এম।”

To be continue………..!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here