প্রিয় তুই পর্ব -২০

#প্রিয়_তুই
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
#পর্ব_২০

সারা নিজের কথা সম্পূর্ণ করে ছলছল চোখে মুখভর্তি হাসি নিয়ে সবার দিকে তাকাল। এতদিন যাদের চোখে ঘৃণার রেশ দেখেছিল, আজ তাদের চোখে বিষ্ময় খেলা করছে। হয়তো মনে মনে উনারা আফসোসে ডুবে মরছে, তড়পাচ্ছে। মেধাবী নম্র ভদ্র মেয়েটার জীবনের মোড়টা বি/শ্রী/ভাবে ঘুরে গেছে।
সেও রঙিন কিছু স্বপ্ন দেখেছিল আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের
মতো সুখ ধরতে চেয়েছিল। স্বামী সোহাগী হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চেয়েছিল। আফসোস, তা আর হলো কই! ওর জীবন ওকে নিয়ে ইচ্ছে মতো খেলেছে এবং খেলছে। নয়তো বিয়ের আগে তো কখনো ভাবেনি, তার জীবনে তিক্ত অতীত যুক্ত হবে। আর সেই বিষেভরা অতীতটা তাকে জ্ব/লিয়ে, পু/ড়ি/য়ে, নিঃস্ব করে দিবে। ওর বিষভর্তি অতীতের এত জ্বালা এত তীব্রতা যে না পারে সইতে আর না পারে সব ছেড়ে ছুঁড়ে পালিয়ে যেতে। আর পালিয়ে আর যাবে কোথায়? যাওয়ার জায়গা থাকলে তো? সে তো এখন সকলের চেনা মুখ। যাকে সবাই একনামে চিনে, ‘রাতপরী’। আর এই রাতপরীর কাছেই
রাতে এসে ভিড় জমায় চেনা -অচেনা পুরুষ।স্বেচ্ছায় আসার
কারণে সেও অনায়াসে বিলিয়ে দেয় তার দে/হ/খানা।খায়েশ
মিটিয়ে রোগের ভাগ নিয়ে টাকা দিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায় সেই পুরুষরা। তখন সে তাদের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যে হেসে বিরবির করে,

দিবাতে হও সুপুরুষ
রাত্রিতে তুমি কাপুরুষ।
কপটতার হায়েনা তুমি
নারীদেহে হও সন্তোষ।

জীবনে এত রঙের মানুষ দেখেছে যে, বাবা ভাই ছাড়া পুরুষ বলতে নিকৃষ্ট প্রাণীকে বোঝে। বিশেষ করে যারা তার কাছে সুখ খুঁজতে আসে। মনের নয়, দেহের সুখ। যে সুখের কারণে পাপ পূর্ণ্যের ধার ধারে না। কারণ তারা টাকার রাজা। টাকায় পায় সুখের দেখা। সুখ যে তাদের মুঠোয় পুরা।

এমনও পুরুষকে সে দেখেছে ওর শরীরে হাত বিচরণ করেও বউ বাচ্চার কাছে খুলে বসেছে মিথ্যাের ঝুলি। বউকে শপথ করে বলেছে, সে ছাড়া কোনো নারীতেই তার আসক্তি নেই।”
বাচ্চাকে উপদেশ দিয়েছে, ভালো একজন মানুষ হওয়ার।অথচ সেই পুরুষই কিছুক্ষণ আগেও তার গ্রীবাদেশে অধর ছোঁয়াতে মত্ত ছিল। এমনকি তার চিবুকে চুম্বন করেই কথা গুলো আওড়াচ্ছিল। এসব দেখে দেখে তারও আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। বাঁচবে আর কি! সে তো এখন জীবন্ত লা/শ। জুবায়ের ওকে সেদিনই মে/রে/ ফেলেছে, যেদিন ওকে অন্য
পুরুষের কাছে পাঠিয়েছে। ভুল পথে পা বাড়িয়েও সে ভাবত, এখনো ভাবে ওর সুখপূর্ণ পরিবারের কথা। বিয়ের আগের জীবনের কথা। রশিক বাবা, আদুরে মা, কলিজার টুকরো দু’টো ভাইয়ের সন্মানের কথা। তার জন্যই উনারা কতভাবে অপমানিত হয়েছে, হচ্ছে। তার কারণেই তাদের চোখে অশ্রু ঝরে। এই অশ্রু দাম সে কখনো মিটাতে পারবে না, কখনোই না। এই সাধ্যও তার নেই।

সারার এসব ভাবনার ছেদ ঘটল ওর মায়ের আহাজারিতে।
মেয়ের অতীত শুনে উনি কান্নায় ফেটে পড়েছেন। ওর বাবাও নীরবে অশ্রু ঝরাচ্ছেন। তিতাস ভোরের থেকে রিপোর্ট দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার এখনো কিছু বিশ্বাস হচ্ছে না।
সবটা ক্ষণিকের স্বপ্ন মনে হচ্ছে। ওকে এত স্থির দেখে সারা আরো কিছু রিপোর্ট তাকে দেখাল। দেশের বাইরে গিয়েও সে চিকিৎসা করিয়েছে, লাভ হয় নি। এখন মৃ/ত্যু নিয়ে মুক্তির
অপেক্ষায়। অদূরে শাহিনাকে ছলছল নেত্রে তাকিয়ে থাকতে
দেখে সারা ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

-”তোমাকে আমি বহুবার বলেছিলাম জীবন যার মর্জি তার। এ কথাটার মর্ম তুমি ধরতে পারো নি। চাচ্চু ঠিকই বলত তুমি একটা বোকা পাখি। যে সবকিছু সহজভাবে নিতে গিয়ে ধরা খায়। বাকিরাও তোমার সরলতা ফায়দা উঠায়। জানো তো, মানব জীবনে ঠকারও প্রয়োজন আছে। নয়তো মানুষ উঠে দাঁড়ানোর সাহস জোগাতে পারত না।”

শাহিনার কাছে সারার কথাগুলো কেন জানি ভালো লাগল না। তার মনে হচ্ছে, সারা ভালো সাজার অভিনয়টা আজকে একটু বেশিই করছে। তাছাড়া সে কচি বাচ্চা নয়, সবই বুঝে। শাওন ঠিকই বলেছে এরা এক একটা স্বার্থপর। এটা পারেই শুধু তার ক্ষতি করতে। তবে সারার পুরো কথা শুনে উপস্থিত সকলে নির্বাক। তখন সারা ভোরের উদ্দেশ্য করে বলল,

-” ভোর, আমি সত্যিই অনুতপ্ত আমার সেদিনের ব্যবহারের জন্য। আসলে আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তুমি কেমন। আর তা বুঝেও গেছি। সত্যি বলতে, কেন জানি পিয়াসের মৃ/ত্যু/র পর তোমার উপর একটা চাপা রাগ ছিল। বারবার মনে হতো এর পেছনে তুমি দায়ী। যদিও আমি এখনো জানি না আমার ভাই কেন ওই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এখন মনে হয় হয়তো আমারই কারণে। যায় হোক, বড় মিয়া তো এখন নেই। তবে ছোট মিয়াকে সামলে রেখো। সে কিন্তু বাঁধনহারা মুক্ত পাখি। তার পায়ে দ্রুত শেকল বেঁধে নিও। নয়তো দেখতে সে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবে। আর হ্যাঁ, যদি উড়েও যায়, তবে তার ডানা ভাঙ্গতে ভুলো না কিন্তু।”

এ কথাগুলো বলে সে সকলের দিকে একবার তাকিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে পড়ল। না ওকে কেউ পিছু ডাকল, আর না সে কারো ডাকের আশায় পিছু ফিরল।
___________________

পরেরদিন সকালে তিতাস না খেয়েই রেডি হচ্ছে। আজ তার পরীক্ষা। গতকালকে সারার কথাগুলো জানার পর থেকে সে থম মেরে গেছে। রাতেও পড়ে নি অথচ এখন যাচ্ছে পরীক্ষা দিতে।ভোর তড়িঘড়ি করে খাবার হাতে রুমে ঢুকে তিতাসকে
ডাকল। তিতাস না তাকিয়ে জানাল, এখন খাবে না সে। পরে কিছু খেয়ে নিবে। ভোর বাক্য ব্যয় না করে তিতাসের হাত টা টেনে চেয়ারে বসাল। অতঃপর নিজেও বসল তার কোলের উপর। যেন উঠে যেতে না পারে। তিতাস ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলল,

-”এসে কোলে নিবো, এখন সরুন।”
-”হা কর।”
-”খেতে ইচ্ছে করছে না, বমি পাচ্ছে।”
-”রাতেও খাই নি, আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে। আজকে তোর এঁটো খাবার খাবো আমি। সিনিয়র বউরা এঁটো খেলে নাকি জুনিয়র বরদের দ্রুত বুদ্ধি বাড়ে। তাই আমি চাই তোর বুদ্ধি বাড়ুক, কিছুটা সুবুদ্ধি হোক। ওদিকে রাজ্যকেও তো পৃথিবী দেখাতে হবে।”

তিতাসের লাগামহীন জবাব শোনার আগেই ভোর তার মুখে খাবার পুরে দিলো। শেষ হতেই পুনরায় দিলো। তাকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না। তারপর পুরো খাবার খাইয়ে হাত
ধুয়ে ভোর পছন্দ মতোন শার্ট বের করে পরতে ইশারা করল।
তিতাসের পরনের শার্ট টা তার পছন্দ হচ্ছে না। এরচেয়ে এই মেরুনটাতে ওকে বেশ মানাবে। কিন্তু তিতাস পরোটার শেষ অংশটুকু ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে এখনো বসে আছে। ওর দৃষ্টি ভোরের দিকেই। না খাচ্ছে আর না ফেলছে। ভোর তার দুষ্টু
মতিগতি বুঝে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে পরোটাটুকু মুখে নিলো। তখন তিতাসের ঠোঁটে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি। ওকে হাসতে দেখে ভোরও হাসল। তিতাস পানি খেয়ে এঁটো পানি ভোরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

-”পরীক্ষা শেষ করেই প্রস্তুতি নিবো।”
-”কিসের?”
-”রাজ্যকে পৃথিবীতে আনার।”
-”আসার সময় আমার জন্য রজনীগন্ধ ফুল আনবি।”
-”আর কিছু?”
-”না। পরীক্ষা যেন ভালো হয়, নয়তো।”
-”নয়তো কি?”
-”আয়মানকে বিয়ে করে নিবো, হা হা হা।”
-” তাহলে পরীক্ষা টরীক্ষা সব বাদ। আজকে সারাদিন আমি বাসরদিন পালন করব।”
-”আগে বড় হোন হবু ডাক্তার।”
-”বড় হয়েছি কিনা এখনই প্রমাণ দিচ্ছি, চলুন।”
-”থাক লাগবে না।”

ভোর ঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে পার্স থেকে কিছু টাকা নিয়ে তিতাসকে দিলো। তিতাস মুখ বেজার করে বলল,

-”মাত্র এক হাজার টাকা?”
-”বেশি হয়ে গেলো? তাহলে পাঁচশ ফেরত দে?”
-”না থাক, ধন্যবাদ।”
-”সাবধানে যাবি।”
-”আচ্ছা।”

একথা বলে পা বাড়াতেই হঠাৎ শার্টে টান খেলো। ভোর তার কাঁধের শার্ট আঁকড়ে ধরেছে। তিতাস থেমে গিয়ে পিছু ফিরে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই, কপালে পেলো ভোরের উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া।

To be continue…….!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here