প্রীতিকাহন পর্ব ১৩+১৪

#প্রীতিকাহন❤
#লেখনীতে_কথা_চৌধুরী❤
#পর্ব_১৩

❌কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ❌

বাস থেকে নেমেও নবাব লক্ষ্য করছে মিষ্টি কিছু বলার জন্য অস্থির হয়ে উঠছে কিন্তু মুখ ফুটে কিচ্ছু বলছে না। হোটেলের রিসিপশনে এখন অনেক ভিড়। তাই রিসিপশনের পাশের এককোণে অপেক্ষা করছে মিষ্টি আর নবাব। মোটামুটি ধরনের একটা হোটেলেই থাকার ব্যবস্থা করেছে নবাব৷ সবকিছু আগে থেকে ঠিক করা হলেও কিছু কাজ এখন সম্পন্ন করতে হবে অন্যথায় হোটেলের রুমে প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে না।

“মিষ্টি, কিছু বলবে?” ফোন স্ক্রোল করার ফাঁকে আদুরে গলায় জানতে চাইলো নবাব।

মিষ্টি অস্থিরতা নিয়ে হোটেলের আশে-পাশে নজর করে দেখছিল। তাই হঠাৎ নবাবের প্রশ্নে কিঞ্চিৎ আঁতকে উঠলো। মুখ ফিরে তাকিয়ে খানিকটা ইতস্তত করলেও ছোট্ট করে জবাব দিলো, “হুম।”

“তো বলো।” স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নবাব।

মিনমিন করে বললো, “তুমি তো বলেছিলে বিছানাকান্দি যাবে কিন্তু সিলেটে কেন নিয়ে এলে?” মিষ্টির কথা শুনে নবাব শব্দহীন হাসলো কিন্তু মাস্কের জন্য তার হাসিটা মিষ্টির দৃষ্টিগোচর হলো।

“বিছানাকান্দি এখান থেকে কেবল ২৫ কিলোমিটার দূরে। তাছাড়া শুনেছি নিরাপত্তার জন্য সিলেটে থাকাই ভালো, বুঝলে?”

“হুম।”

নরম কন্ঠ আর নিদ্রাহীন ক্লান্ত চোখে নবাব বললো, “বিশ্বাস রাখতে পারো৷ আমাকে দিয়ে অথবা আমি পাশে থাকলে একটা প্রজাপতিও তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।” নবাবের কথায় মিষ্টির মনে মৃদু সমীরণ বয়ে গেল। এটা কোনও হিমায়িত সমীরণ নয়, স্বস্তির সমীরণ, প্রিয়জনের কাছ থেকে ভরসা পাওয়ার আনন্দময়ী সমীরণ।

.

রিসিপশনের সকল কাজ সমাধা করে রুমে প্রবেশ করলো মিষ্টি আর নবাব৷ কিন্তু রুম দেখে মিষ্টির মেজাজ গিয়ে পর্বতের চূড়ায় উঠলো, “তোমার মতলবটা কি জানতে পারি?”

রুমে দরজা লাগিয়েছে নবাব কিছু পাঁচ মিনিটও হয়নি। এর মধ্যে মিষ্টির এমন ত্যাড়া প্রশ্নে চমকালো সে, “মানে?”

“কোন বুদ্ধিতে তুমি একটা রুম ভাড়া নিলে? আমি কোথায় থাকবো?” কাঠকাঠ গলায় আবারও প্রশ্ন করে হাত ভাঁজ করলো মিষ্টি।

ব্যাগ রেখে বিছানায় পা ঝুলিয়ে শুয়ে পড়লো নবাব। কালকে রাতে ঠিক করে তার ঘুম হয়নি। জীবনের প্রথম একসাথে এত কিছু সামলে তার শরীরে যেন এক তোলাও শক্তি নেই। নবাবকে চুপচাপ বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে রাগে হাত ভাঁজ করেই কয়েক কদম সামনে এলো মিষ্টি। নবাবে দিকে খানিকটা ঝুঁকে জানতে চাইলো, “চুপ করে আছো কেন?”

তড়াক করে নবাব উঠে বসতে কিঞ্চিৎ চমকালো মিষ্টি। মাথার ক্যাপ আর মুখে মাস্ক খোলার ফাঁকে বললো, “তোমার মাঝে বোধশক্তি বলে কিছু আছে? হোটেলের কাগজে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে আলাদা ঘর নিয়ে আমি কি লোককে জানাবো, তোমায় তুলে এনে বিয়ে করেছি?… এতটা পথ জার্নি করে এসে ঘন্টাখানেক কি চুপ থাকা যায় না? বোরকা পরেই শুরু করে দিয়েছো।… বাহ! মানে জীবনে আরও কত কী দেখবো?”

“তুমি ইচ্ছে করে একটা ঘর নিয়ে আমার সাথে নাটক করছো। আমি থাকবো না এখানে। এক্ষুণি বাসায় যাবো।” হঠাৎ-ই এসব বলে উঠে মিষ্টি নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করলো, তার বোধশক্তি হয়ত অতি অল্প আছে এখন। এদিকে মিষ্টির মুখে বাসার নাম শুনতেই নবাবের রাগটা দ্বিগুণ হলো।

বসা থেকে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “নাটক করছি আমি? হুম?… বাসায় যাওয়ার কথা আসছে কেন আবার? তোমার মাথায় পিস্তল রাখার সাহস যখন হয়েছে, তখন ওটা চালাতেও কষ্ট হবে না।” একটু থেমে হঠাৎ হাত ছুঁড়াছুঁড়ি করে পিছনে ঘুরে নবাব চেঁচাতে লাগলো, “হ্যাঁ, আমি ইচ্ছে করেই একটা রুম নিয়েছি। এখন তোমার যা ইচ্ছে ভাবতে পারো। আমাকে অনেক কিছু ভেবে সামনে পা ফেলতে হচ্ছে। এখন তুমি যদি আমাকে ভুল বুঝো আই ডোন্ট কেয়ার মিষ্টি।” এবার মিষ্টির দিকে ফিরে তাকিয়ে বললো, “কিন্তু এখন একটা টুঁশব্দও যেন আমার কানে না আসে। ব্যাগে কাপড়-চোপড় আছে। হয় বদল করো নয় এভাবেই সটান দাঁড়িয়ে থাকো।” হাতের ইশারায় ব্যাগ দেখিয়ে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লো নবাব উপুড় হয়ে।

মিষ্টি ঠাঁই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো মন আকাশে ঘনায়মান মেঘ আঁকড়ে। নত মাথায় সে নবাবের কথা চুপটি করে শুনেছে, প্রতিবাদ করেনি। কারণ নবাব যে নিরূপায় সেটা মিষ্টি অনুভব করতে পারে তবুও কোথায় যেন একটা বাঁধার সৃষ্টি হয় বিধায় মিষ্টি মাঝেমধ্যে উল্টোপাল্টা চিন্তা করে।

কান্নার ঝড় কাটিয়ে উঠে মিষ্টি মাথা তুলে সিলিং-এ দৃষ্টি দিলো। নিশ্চুপ পাখায় একবার তাকিয়ে ঘুমন্ত নবাবের ওপর চোখ রাখলো। ওপাশে নবাবের মুখ ফেরানো আবার কপাল এবং চোখ জুড়ে পড়ে আছে অগোছালো চুল তবুও মায়া নামক সুতায় টান পড়তে মিষ্টি আনমনে বললো, “ফণা তুললেই কি সাপে কামড়ায়? মাথায় পিস্তল ঠেকালেও যে এর থেকে বুলেট বের হবে না, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানবে?”

নাক টেনে ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে মুখের হিজাব খুলে দিলো মিষ্টি। ব্যাগ নাড়াচাড়া করে সুন্দর একখানা থ্রি-পিস হাতে নিয়ে চমকে উঠলো, “কবে থেকে এসব পরিকল্পনা করেছে ও? আমার জামার মাপে থ্রি-পিসও সংগ্রহ করা আছে আবার প্রিয় রঙের থ্রি-পিস। আমার তো মাথায় কিছুই ঢুকছে না।”

.

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে তার কোনও হিসাব নেই নবাবের। কারণ মিষ্টির সাথে কথা কাটাকাটি করে হঠাৎ বালিশ আঁকড়ে চোখ বুজে দিয়েছিল সে। বিছানায় শুতে আসবার আগে পাখা বন্ধ ছিল কিন্তু এখন সেটা মাথার উপর তীব্র গতিতে ঘুরছে। মিষ্টি পাখা ছেড়েছে এমন ভাবনায় মৃদু হাসলো নবাব, “ঝগড়া করেও আমার খেয়াল রাখতে ভুলে না। হয়ত এই ছোটোখাটো যত্নেই আমি ওর প্রতি দূর্বল হয়েছি নয়ত অন্য কারণ, যার সন্ধান এখনও আমার অজানা।”

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি অথচ সকালেও রোদের তীব্রতায় চোখ ধাঁধাচ্ছিল। উষ্ণ পৃথিবীকে মূহুর্তেই শীতল চাদরে ঢেকে দিলো অমোঘ বর্ষা। এমন হিম হিম আবহাওয়ায় পাখার নিচে ঘুমিয়ে জমে যাচ্ছিলো যেন নবাব আর সেজন্যই তার ঘুম ভেঙে গেল। এখনও উপুড় হয়ে শুয়েই সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে জল্পনা করছে সে। হাই তুলে এবার সোজা হয়ে বসলো বিছানায় পা ঝুলিয়ে। পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখে নিলো, দুপুর তিনটা। ঘুমানোর সময়টা ঠিকঠাক মনে করতে না পারলেও সে বুঝতে পারছে, অনেকটা সময়ই ঘুমিয়ে পার হয়ে গেছে।

মুখের পানির ঝাপটা দিয়ে বের হলো নবাব ওয়াশরুম থেকে। মাঝারি আকারে এই ঘরে ওয়াশরুম ছাড়া ছোট্ট একটা বেলকনি আছে অবশ্য সেটাকে পুরোপুরি বেলকনি বলা যায় না। রুমের সাথে লাগনো ছোট্ট একটা জায়গাকে বেলকনির আকার যদিও বা দিয়েছে কিন্তু গ্রিলের পরিবর্তে বড় আকারের কাঁচের জানালা লাগানো। ওয়াশরুম থেকে সেই জায়গাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানে বসার জন্য দুইটা বেতের চেয়ারও রাখা আছে। পায়ে পায়ে সেই বেলকনিতে চলে এলো নবাব। পাশাপাশি চারজন মানুষ দাঁড়াতে পারবে না এতটাই সরু।

বেলকনির এককোণে হাঁটু ভাঁজ করে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে মিষ্টি। নজর তার নিবদ্ধ জানালা পেরিয়ে ঐ রিমঝিম বৃষ্টিতে। উজ্জ্বল শ্যামলা মুখে বিষাদের ছাপ প্রখর হয়ে আছে। চিন্তায় চোখের তলায় কালি কাজল কালো হচ্ছে। মসৃণ ত্বকে ব্রণেরা বাসা বাঁধছে। মোদ্দা কথা ঐ চেহারায় সৌন্দর্য বলতে এখন তেমন কিছুই নজরে পড়ছে না তবে মায়া বাড়ছে খুব। নবাবের হৃদয় ব্যথিত হচ্ছে মিষ্টির এমন চেহারা দেখে।

“মিষ্টি?” ধীর গলায় নবাব মিষ্টিকে ডাকতে সে নড়েচড়ে বসলো। একঝলক নবাবকে দেখে চোখ নামিয়ে নিলো।

“এখানে কী করছো?” নবাবের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে মিষ্টির ছোট্ট জবাব, “কিছু না।”

“দুপুর তো হয়ে গেল। খাবে না?”

“নাহ।” চেহারায় রাগ না ভাসলেও মিষ্টির এই ক্ষুদ্র জবাবে নবাব রাগের আভাস পেল। ভেজা মুখে হাত চালিয়ে অতিরিক্ত পানি ঝেড়ে ফেলে নবাব জানতে চাইলো, “রাগ করেছো?”

পূর্বের স্বরেই মিষ্টি জবাব দিলো, “নাহ।”

পা ভাঁজ করে মিষ্টির পাশে বসে পড়লো নবাব। এতে মিষ্টির মাঝে কোনও ভাবান্তর হলো না, সে আগের মতোই বসে আছে বাইরে তাকিয়ে। মেঝেতে বসেই নবাবের চোখ পড়লো মিষ্টির পায়ে। ওর পায়ে শোভা পাচ্ছে নবাবেরই দেওয়া নূপুর। হঠাৎ লক্ষ্য করলো মিষ্টির বাম পায়ের নুপুরটা উল্টে আছে। আলতো নুপুর ঠিক করলো নবাব এরপর অহেতুক নাড়াচাড়া করতে লাগলো নত মাথায়। এতেও মিষ্টির মাঝে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না।

“তোমার মিথ্যা কথাগুলো তোমার নামের মতোই মিষ্টি।” নবাবের নরম কন্ঠ শুনে মিষ্টির মেজাজ গরম হলো। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে সে দেখলো নবাবকে, “কিন্তু আমি তো করলার চেয়েও তেঁতো, মরিচের চেয়েও ঝাল আর সমুদ্রের পানির মতো লবনাক্ত।”

মাথা তুললো না নবাব। নুপুর নিয়ে ব্যস্ত থেকেই বলে উঠলো, “যত ইচ্ছে ঝগড়া করো কিছু বলবো না, অভিমানের পাহাড় দাঁড়া করাও তবুও আপত্তি করবো না কিন্তু রাগের চুরিতে আমার হৃদয় আহত করো না।… তোমার জন্য আমি আজ সব ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। একটু তো আমাকে বুঝতে চেষ্টা করো।”

কাঠ গলায় প্রশ্ন করলো মিষ্টি, “আমাকে কী করতে বলছো তুমি?”

নবাব চোখ তুলে তাকালো। সর্বদা খুশিতে চকচক করা চোখে এই মূহুর্তে শত কষ্ট এসে যে ভিড় করছে। ও চোখে তাকিয়ে মিষ্টির হৃদয় নিশ্চুপ হলো ক্ষণিকের জন্য। স্থির দৃষ্টিতে কেবল মুখ নাড়ালো নবাব, “শুধু বিশ্বাস করো আমায়– এখন কেবল এটাই চাই।” অতি সামান্য এই বাক্যে মিষ্টির থমকে যাওয়া হৃদয়ে ঝড় উঠলো। তীব্র এই ঝড়ের হদিস নবাব পেল না অথচ মিষ্টিকে দুমড়ে মুচড়ে দিলো নিমিষেই।

মুখ ফিরিয়ে মিষ্টি বললো, “হয়ত এটা পাবার আশাই আমার মুখ থেকে কবুল শব্দ বের হয়েছে।”

“তোমাকে আশাহত করবো না কখনও শুধু রাগ মুখ আমাকে দেখিও না।”

চকিতে তাকিয়ে মিষ্টি জিজ্ঞেস করলো, “আমরা মেয়েরাই কেন সব সহ্য করবো বলতে পারো?… আমি এখন ভাবতে পারছি না তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি মানতেই পারছি না আমি পরিবার ফেলে তোমার সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছি।”

“ভুল বললে মিষ্টি। আমরা ঘুরছি না, পালিয়ে বেড়াচ্ছি।”

“কতদিন এভাবে বেঁচে থাকা যাবে? কতদিন আমায় এসব সহ্য করতে হবে?”

“জানি না।”

হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলো মিষ্টি। মুখ চেপে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “কেন করলে এমন নবাব? কেন আমাকে আমার মতো ছেড়ে দিলে না? কেন আমার জন্য নিজের সুন্দর ভবিষ্যৎ তুমি ধ্বংস করলে?”

“আমার অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ তো তুমি। ছাড়তে পারবো না আমি তোমায়।”

কান্না এবার রাগের রূপ নিতে খেঁকিয়ে উঠলো মিষ্টি, “এসব জাদুকরী কথা আমাকে শোনানো বন্ধ করো। এসব মনভোলানো কথায় জীবন চলে না।”

“তাহলে যেভাবে চলছে, সেভাবে না হয় চলতে দাও।”

“নবাব, আমি বিধবা হলে আমার কোনও আপত্তি নেই কারণ আমার ভাগ্যে এটাই লেখা আছে। কিন্তু তোমার কিছু হলে…” কথা সম্পূর্ণ করবার আগেই হাঁটুতে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মিষ্টি।

“আমার কিছু হলে কী?”

কান্না মিশ্রিত কন্ঠে জবাব দিলো, “জানি না। তুমি এখান থেকে যাও নবাব। আমাকে একা থাকতে দাও।”

“আর কত এমন করে কাঁদবে তুমি? এই চার-পাঁচ বছরে অনেক কাঁদতে দেখেছি তোমায়। আর চাই না আমি তোমায় এমন দেখতে।”

মাথা তুলে মিষ্টি বললো, “তাহলে আমাকে মেরে ফেলো। পারছি না আমি এমন পঙ্গু জীবন পার করতে। তোমাকেও খেয়ে ফেলবো আমি। জানো, নিজেকে রাক্ষসী মনে হচ্ছে আমার।”

কপট রাগ নিয়ে বললো, “কীসব যা তা বলছো তুমি মিষ্টি?”

“যা তা নয়, সত্যিই বলছি।”

“তোমাকে কেউ বলেনি এসব বলতে। এখন কথা না বাড়িয়ে চোখে-মুখে পানি দিয়ে এসো। এরপর চুপচাপ দুপুরের খাবার খাবে। আমি সব ব্যবস্থা করছি।”

মিষ্টি দোমনা করবে এমন ভাব চোখে-মুখে ফুটে উঠতেই নবাব বললো, “তোমাকে জোর করে খাওয়ানোর অভ্যাস কিন্তু আমার আছে।” মিষ্টি চোখ নামিয়ে নাক টানলো আর নবাব একটু ঝুঁকে এসে বললো, “দরকার পড়লে হাত-পা বেঁধে খাওয়াবো।”
#প্রীতিকাহন❤
#লেখনীতে_কথা_চৌধুরী❤
#পর্ব_১৪

❌কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ❌

রাতের খাওয়া-দাওয়া চুকে গেছে নবাব আর মিষ্টির। নৈশভোজে অতি সাধারণ খাবারের সমারোহ ছিল; ভাত, মুরগির মাংস, সবজি আর ডাল। কিন্তু তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে নবাব বলেছিল, “শেষ পাতে মিষ্টিমুখ করলে ভালো হতো।” তখন লবণের ছোট্ট কৌটা এগিয়ে মিষ্টি বলেছিল, “নোনতা দিয়ে কাজ চালাও।”

হা-হুতাশ করে নবাব বলে উঠেছিল, “হায়! জীবন বোধহয় ঝাল নোনতার স্বাদেই পার হবে।” মিষ্টি কেবল আঁড়চোখে তাকিয়ে ছিল আর নবাব সেটা উপেক্ষা করে মৃদু হেসে এক চিমটি নুন জিহ্বায় রেখেছিল।

“দাঁড়িয়ে আছো কেন?” ফোন স্ক্রোল করার এক ফাঁকে মিষ্টিকে দেখে প্রশ্ন করলো নবাব।

কাঠ গলায় মিষ্টি জবাব দিলো, “কারণটা কি খাতা কলমে বুঝাতে হবে?”

বিছানার ওপর পা ভাঁজ করে বসে আছে নবাব আর তার উপর মিষ্টির স্থির দৃষ্টি। কিন্তু এতে ভ্রুক্ষেপহীন জবাব দিলো নবাব, “ওহ…।” এরপর কিছু মূহুর্ত নিরবে পার হলো। মিষ্টি বিছানার পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।

“তুমি বিছানায় ঘুমাও আমি চেয়ারে ঘুমাচ্ছি।” মিষ্টি কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু ওর ভাবনার মাঝে নবাব বলে উঠলো। নবাবের কথা শুনে মিষ্টির কিছুটা স্বস্তি হলো মূলত এমন একটা বাক্য শোনবার জন্যই মিষ্টি আকুল হয়ে আছে। মিষ্টির চেহারায় স্পষ্টত প্রতীয়মান হচ্ছে কৃতজ্ঞতা আর সেটা টের পেয়ে নবাব আবার বললো, “এই চলচ্চিত্রের সংলাপ আশা করছিলে আমার কাছ থেকে?”

“মানে?” বুঝতে না পেরে কপাল কুঁচকে এলো মিষ্টির।

“তোমাকে তো আগেই বলেছি বিয়েটা নাটকীয়ভাবে হলেও বিয়ের পরবর্তী জীবনকে নাটকের রূপ দিবো না। তাই বিছানা ব্যতীত অন্য কোথাও আমি ঘুমাচ্ছি না। দরকার পড়লে তুমি চেয়ারে শুতে পারো কিংবা মেঝেতে, আই ডোন্ট মাইন্ড।”

অতিরিক্ত বিস্ময়ে মিষ্টি মুখ থেকে ইংরেজি শব্দ নিসৃত হলো, “হোয়াট?”

“হুম।” বলে নবাব মাথা নাড়ালো সামনে পিছনে।

“তোমার কি মাথা ঠিক আছে নবাব?”

“আপাতত তো ঠিকই আছে, কিন্তু খারাপ করে না দিলে হয়ত ভালো হবে।… চুপচাপ বালিশ নিয়ে বিছানার এককোণে শুয়ে পড়ো। রাত-বিরেতে তর্ক করার মতো শক্তি আমার নেই।”

“অসহ্য, কে বলে তোমায় ঝগড়া করতে? ঘুমাবো না আমি। সারারাত জেগে থেকে বাঁদর নাচ দেখবো।” মিষ্টির মাঝে রাগ ভাসলেও নবাব এতে কোনও তাল দিচ্ছে না। নির্লিপ্ত গলায় সে বললো, “তোমার ইচ্ছে।”

আরাম করে বালিশে হেলান দিয়ে ফোনে মগ্ন হলো নবাব। সেই দৃশ্য অবলোকন করে মিষ্টি দাঁত কিড়মিড় করে তাকালো। নবাবের প্রতি আসা রাগের প্রকাশ করলো মিষ্টি মেঝেতে জোরে জোরে পা ফেলে হাঁটতে গিয়ে। নুপুরে শব্দ তুলে মিষ্টি বেলকনিতে এসে ধপাস করে বসে পড়লো। এদিকে মিষ্টির এহেন কাণ্ডে নবাব শব্দহীন দুষ্ট হাসিতে মত্ত হয়ে আওড়াল, “পাগল একটা।”

গোমড়া মুখে বেলকনিতে বসে বারংবার মিষ্টি বিড়বিড় করে উঠছে, “এই উনার আমার প্রতি যত্ন করবার নমুনা? আমাকে এমন ঝড়-বৃষ্টির রাতে বেলকনিতে আসতে দেখেও কিচ্ছু বললো না। নিজে দিব্যি কাঁথা বালিশ নিয়ে বসে আছে যেন ডিমে তা দিচ্ছে। আর একটু বাদে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবে। হুহ।” মিষ্টির ভাবনার মাঝে আচমকা মেঘ গর্জে উঠলো মৃদু শব্দে। বিদ্যুৎ চমকানি স্পষ্ট দেখতে পেয়ে ভেতরে ভয় চেপে বসলো মিষ্টির।

ভয় জড়ানো চোখে বাইরে তাকিয়ে রাতের রিমঝিম বৃষ্টি দেখতে পেল সে। আর হঠাৎ তার মনে পড়লো একটা গান,

“এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না
বৃষ্টির ছন্দে বকুলের গন্ধে
আমায় তুমি ফেলে যেও না
এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না
এই বৃষ্টি ভেজা রাতে তুমি চলে যেও না।” এই গানটা মিষ্টির ছোট চাচার মেয়ে, লামিয়া প্রায়শই গেয়ে বেড়াতো। কোনো এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে মিষ্টির রুমে একা বসে লামিয়া গুনগুন করছিল বিধায় মিষ্টি জিজ্ঞেস করেছিল, “লামিয়া, কী হয়েছে তোর? ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে অথচ গান গেয়ে চলেছিস রোমান্টিক ভাব নিয়ে।”

মিষ্টির চেয়ে ছয় বছরের ছোট লামিয়া তার পাতলা গড়নের ফর্সা মুখে ভাসমান ভয়ের কালো মেঘ সরিয়ে জবাব দিয়েছিল, “আপু, তুমি তো আমাকে একা ফেলে পানি আনতে গেলে। এদিকে ঘরে মোমবাতির টিমটিম আলো আর বাইরে মেঘ ডাকছে ভয়ংকর গলায়। তো এখন বাচ্চাদের মতো ভয়ে চিল্লাচিল্লি করলে এটা কেমন দেখায় না? তাই গান গেয়ে মেঘকে বুঝাচ্ছি আমি একটুও ভয় পাচ্ছি না।”

“এক মিনিট, পুঁচকে ছেমড়ি। তুই ক্লাস ফাইভে পড়ে বড় হয়ে গিয়েছিস? বাচ্চাদের মতো মানে কী? তুই তো বাচ্চাই আছিস।”

“উফ আপু, তুমি আমাকে বাচ্চা বলো না তো।” বিরক্ত হয়েছিল লামিয়া।

“এই ছেমড়ি, তাহলে কী বলবো তোকে?” মিষ্টি প্রায়শই লামিয়াকে ছেমড়ি সম্বোধন করে আর এতে লামিয়া কখনও আপত্তি করে না।

“লামিয়া বলবে নয়ত ছেমড়ি, বুঝলে? আর কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে না আমি তোমার ছয় বছরের ছোট পারলে ছয় বছরের বড় বলবে।” লামিয়া সর্বদা নিজেকে বড় সাজাতে ব্যস্ত এমনকি বয়স্ক মানুষদের সাথে সখ্যতা গড়তে সে খুব পছন্দ করে। মানুষ জাতি বড়ই অদ্ভুত। যখন ছোট থাকে, তখন বড় হতে চায়। আর যখন বড় হয়, তখন কঠিন বাস্তবতায় ছুরিকাহত হলে ছোট হওয়ার বাসনা মনে পুষে।

“কিহ!” খুব অবাক হয়েছিল মিষ্টি।

“হুম।… আচ্ছা আপু, জাহিদকে তোমার কেমন লাগে?” লামিয়ার প্রশ্ন শুনে মিষ্টি যখন চমকে গিয়েছিল, তখন আকাশে বিদ্যুৎ চমকে উঠেছিল। এতদিন পর আজকেও এই ভাবনার মাঝে সিলেটের আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো খুব জোরালোভাবে। এতে মাত্রাতিরিক্ত ভয়ে কেঁপে উঠলো মিষ্টি। ওর এই মূহুর্তে অহেতুক ভয়ে মনে হচ্ছে বেলকনির ঐ জানালা ভেঙে বজ্রপাত পড়বে তার উপর। সাত-পাঁচ না ভেবে একপ্রকার দৌড়ে রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল নবাব ঠোঁট টিপে হাসছে। নবাব এখনও ফোন নিয়ে পড়ে আছে কিন্তু মুখের হাসি স্পষ্ট বলছে, সে মিষ্টির উপর হাসছে।

“হাসছো কেন এভাবে?” কপট রাগ নিয়ে মিষ্টি জানতে চাইলো।

“হাসার জন্যই কি কারণ লাগে না-কি?”

“দেখো, আমার মোটেও এখন ঝগড়া করার ইচ্ছে নেই।”

ফোন রেখে বালিশে মাথা রাখলো নবাব। বাম দিকে ঘাড় কাত করে শান্ত গলায় বললো, “বিছানা বেশ বড়। বাম পাশে শুয়ে পড়ো। ঘুমের মাঝে নড়াচড়া করার অভ্যাস আমার নেই সেটা তো জানোই।”

মিষ্টি ভেবেছিল নবাব তর্ক করবে কিন্তু এমন সব কথা শুনে সে অবাক হলো পাশাপাশি অপ্রস্তুত হওয়ার কারণে তার চোখ চঞ্চল হলো। মিষ্টি চুপ করে থাকলেও নবাব অনর্গল বলে গেল, “সারারাত জেগে থেকে বেলকনি পাহারা দেওয়ার মতো শক্তি আমার নেই। তার চেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো দুইজনের জন্যই উত্তম হবে।” এই বলে নবাব মিষ্টির দিকে পিঠ দিয়ে ঘুমের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলো।

“আমি বেলকনিতে ছিলাম বলে তুমি এতক্ষণ ফোন নিয়ে বসে ছিলে?” আনমনে নবাবকে প্রশ্ন করলো মিষ্টি। কিন্তু প্রশ্ন নবাবের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো তাই প্রশ্ন উত্তর বিহীন রয়ে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে এটা-সেটা চিন্তা করলো মিষ্টি। শেষে অন্য উপায় না পেয়ে হালকা আলোর একটা বাতি জ্বালিয়ে নবাবের বিপরীতে এসে গা এলিয়ে দিলো। গায়ে কাঁথা টেনে দিলেও নিজের মাঝে জড়তা-সংকোচ অনুভব করছে মিষ্টি। কত-শত চিন্তা আর সংকোচ নিয়ে ক্লান্ত চোখের পাতা সে বুজে দিলো দু’টো জলের মুক্তা বিসর্জন দিয়ে।

.

সদ্য হোটেলের বাইরে পা রাখলো মিষ্টি আর নবাব। হুট করে কোথা থেকে একটা কালো রঙের জিপ এসে দাঁড়ালো ওদের সামনে। শক্ত-পোক্ত দেহের অধিকারী কয়েকজন লোক এসে ঘিরে ফেললো তাদের। ঝাঁকড়া চুল আর দামী পোশাকে আবৃত একটা দেহ এসে দাঁড়ালো মিষ্টির সামনে। এতেই ভয়ে চুপসে গিয়ে সে কাঁপতে শুরু করলো। লোকটা পিস্তল বের করে নবাবের মাথায় রেখে দাঁতে দাঁত চাপলো, “পালায়ে কই যাইবা জাদু? ভাবছো সিলেটে আইলে তোমাদের হদিস পামু না?”

মিষ্টি ভয়ে কাঁপছে তবুও নবাবের মাথায় পিস্তল রাখতে দেখে সে রাগী কন্ঠে বললো, “ওকে ছেড়ে দিন।”

“ছাইড়া দিমু? ক্যান? আমার হবু বউরে নিয়া সারা বাংলাদেশে টই-টই কইরা ঘুরবে আর আমি হজম করমু?” এবার নবাবের উদ্দেশ্যে বললো, “এই শালা, তোর এতো সাহস ক্যান? আমার হবু বউয়ের দিকে যে নজর দিছোস, দিলে কি তোর ভয়ডর নাই?”

তাচ্ছিল্যের সুরে নবাব বললো, “ভয় পেলে কি আর তোর হবু বউকে নিজের বউ করতাম?” নবাবের এমন প্রশ্নের লোকটা শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগলো আর নিস্তব্ধ হোটেল হঠাৎ গুলির শব্দে আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

…চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here