প্রেমাসক্তি পর্ব ১৩

#প্রেমাসক্তি
#পর্ব__১৩
#অদ্রিতা_জান্নাত

ইশিতা বেলকনিতে গিয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ ৷ ওপাশে ইশান কিছুই বলল না চুপ করে রইল ৷ ইশিতা একটা দম নিয়ে বলতে লাগলো,,,,,,,,,,

ইশিতা : কি দরকারি কথা ইশান?

ইশান ইশিতার কথার উত্তরে বললো,,,,,,,,

ইশান : দেখা করতে পারবে প্লিজ?

ইশিতা : দেখো ইশান বাপি আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে দিবে না ৷ কিভাবে বের হবো আমি? আবার বাড়ির চারপাশ ঘিরে বাপি গার্ড রেখেছে যাতে আমি বাড়ির বাইরে যেতে না পারি, পালাতে না পারি ৷ এরকম অবস্থায় আমি কি করে দেখা করবো তুমিই বলো? ইশান কি বলবে বলো প্লিজ ৷ আমি দেখা করতে পারবো না ৷ আমার পক্ষে সম্ভব না ৷

ইশান : ইশিতা ফোনে বলাও আমার পক্ষে সম্ভব না ৷ সরাসরি কথা বলা জরুরি ৷ একটু কষ্ট করে ম্যানেজ করে নাও প্লিজ ৷

ইশিতা : আচ্ছা দেখছি ৷

ইশান : বিকাল ০৪ টায় তোমার বাড়ির পিছনে অপেক্ষা করবো আমি ৷ আসবা কিন্তু ৷

ইশিতা : হুম ৷

ইশান : আর শোনো তুমি কি জানো তোমার বাবা আর আমার বাবা দুজন দুজনকে চিনে কি করে?

ইশিতা : নাহ ৷

ইশান : জিজ্ঞেস করে দেখো ৷

ইশিতা : আমাকে কখনোই বলবে না ৷

ইশান : তোমার বাবার কোনো বোন আছে?

ইশিতা : হুম কেন?

ইশান : তাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো ৷ আর আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো আসবা কিন্তু ৷

ইশিতা : আচ্ছা দেখা যাবে ৷

ইশান : দেখা যাবে না আসতে হবে ৷ তুমি না আসলে ওখানেই সারা রাত থাকবো আমি ৷

ইশিতা : দেখি চেষ্টা করবো ৷ বাট আমি না গেলে চলে যেও প্লিজ নাহলে তুমি অসুস্থ হয়ে পরবে ৷

ইশান : আমার কথা চিন্তা করে হলেও এসো ৷ রাখছি এখন ৷

ইশিতা : এই ওয়েট তুমি খেয়েছো?

ইশান : খেয়ে নিবো ৷ চিন্তা করো না ৷ তুমি খেয়েছো?

ইশিতা : হুম তুমি খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি প্লিজ ৷

ইশান : আচ্ছা রাখছি ৷

কল কেটে রুম থেকে বের হতেই আম্মুর সামনে পরলাম ৷ আমাকে বের হতে দেখে বলতে লাগলো,,,,,,,,,,

—- কোথায় যাচ্ছিস? খেয়েছিস তুই?

ইশিতা : হ্যাঁ ৷ আম্মু একটা কথা বলবে?

—- কি? (ভ্রু কুচকে)

ইশিতা : ইশানকে চিনো তুমি? ওদের ফ্যামিলীর সাথে আমাদের কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে?

—- ইশিতা কি বলছিস তুই?

ইশিতা : ইশানের বাবার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে যে সে বাপিকে চিনে ৷ তোমাদের চিনে ৷ তোমরা চিনো না?

—- কে ইশানের বাবা?

ইশিতা : ওর বাবার নাম রিফাত খান ৷

আম্মু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে ৷ সেটা দেখে বললাম,,,,,,,

ইশিতা : আম্মু চিনো তুমি? বাপি কি চিনে?

—- ননা আমি চিনি না ৷ তোর এসব নিয়ে চচিন্তা করতে হবে না ৷ রুমে যা ৷ বের হবি না রুম থেকে ৷

ইশিতা : আরে আম্মু…

—- আর শোন এসব কথা আমায় বলেছিস ঠিক আছে বাট আর কাউকে বলবিনা একদম ৷

ইশিতা : কিন্তু কেন?

—- সেটা তোর না জানলেও চলবে ৷ রুমে যা ৷

ইশিতা : আরে?

বলেই আমাকে রুমের ভিতরে ঢুকিয়ে বাহির থেকে লক করে আম্মু চলে গেলো ৷ আম্মু হঠাৎ এরকম করলো কেন? সেটাই বুঝতে পারছি না ৷ কিছু একটা লুকাচ্ছে কিন্তু কেন? আমাকে ফুপ্পির কাছে যেতে হবে ৷ সে- ই বলতে পারবে ৷ কিন্তু যাবো কি করে?

৩ টা বেজে গেছে অলরেডি জানিনা ইশানের সঙ্গে দেখা করবো কীভাবে? এখনো রুমে কেউ এলো না যে বলবো ৷ মোবাইল হাতে নিয়ে আপুকে ফোন দিতে যাবো তখনি রুমে আপু এলো ৷ আমার পাশে এসে বলতে লাগলো,,,,,,,,

ইতি : চল নিচে চল ৷ বাপি ডাকছে ৷

ইশিতা : আপুই আমাকে না ইশানের সাথে দেখা করতে হবে ৷ আমি কি করবো বল তো? বাহিরে যাবো কি করে?

ইতি : কয়টার সময়?

ইশিতা : ০৪ টা ৷

ইতি : আগে বলবি না গাধা একটা ৷

ইশিতা : কীভাবে বলবো? কেউ এসেছিস?

ইতি : আচ্ছা তুই চল আমি দেখছি কি করা যায় ৷ নিচে আয় ৷

আপুর সঙ্গে নিচে চলে গেলাম ৷ গিয়ে দেখি ডাইনিং টেবিলে গম্ভীর মুখে বাপি বসে আছে ৷ আমাকে দেখে বসতে বললো ৷ আমি সামনে একটা চেয়ার টেনে বসলাম ৷ বাপির কথা অনুযায়ী আম্মু প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে খেতে বললো ৷ আমি মাথা নিচু করে প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করতে লাগলাম ৷ একটুপর বাপি বলতে লাগলো,,,,,,,

—- ফাইনাল এক্সামটা দিয়ে নাও তারপর তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করছি ৷

ইশিতা ছলছল চোখে ওর বাবার দিকে তাকালো ৷ ওর বাবা সেটা দেখলো না ৷ সে আবার বলতে লাগলো,,,,,,,,,

—- সময় দিচ্ছি কয়েকদিন নিজেকে তৈরি করে নাও ৷ তোমার এক্সামের আর তিন মাস বাকি ৷ তারপর ছেলে দেখবো আমি ৷ না শব্দটা শুনতে চাই না ৷

বাম হাত দিয়ে চোখের পানি পরার আগেই মুছে নিলাম ৷ মাথা নিচু করে চুপচাপ শুনতে লাগলাম ৷ বাপি আবার বলতে লাগলো,,,,,,,

—- কাল শুক্রবার পরশুদিন থেকে ভার্সিটি যাবে ৷ শুভ তোমাকে দিয়ে আসবে ৷ সঙ্গে করে প্রতিদিন নিয়েও আসবে ৷ অন্য কোনো দিকে যাবে না ৷ সোজা ক্লাসে যাবে ৷ ক্লাস শেষ হলে সোজা বাড়িতে আসবে ৷ বুঝেছো?

আমি মাথা নাড়ালাম ৷ বাপি আবার বলতে লাগলো,,,,,,,,

—- ওই ছেলেটার সঙ্গে যেন তোমায় যোগাযোগ করতে না দেখি ৷ দেখলে তার ফল ভালো হবে না ৷ যা বলার বলেছি ৷ সব কিছু শুনে চলবে ৷ পড়তে দিয়েছি দেখে এতো খুশি হবারও কিছু নেই ৷

বলেই তিনি হাত ধুয়ে উপরে চলে গেলেন ৷ ইশিতার চোখ থেকে পানি পরতে লাগলো এখন ৷ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সামনে থাকা খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ঠাস করে ফেলে দিল ৷ পুরো বাড়ি ঝনঝনিয়ে কেঁপে উঠলো ৷ টেবিলের উপর থেকে সব প্লেট গ্লাস ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল ৷ বাড়ির সব সার্ভেন্টরা ভয়ে একদিকে জড়োসড়ো হয়ে আছে ৷ এদিকে ইশিতার মা, ইতি কেউ আগাচ্ছে না ওর দিকে ৷ তাড়া মুখে হাত কেঁদে যাচ্ছে ৷ একে একে হাতের কাছে যেটা পাচ্ছে সেটাই ভাঙ্গতে লাগলো ৷ ফ্লোরে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো ৷ কিন্তু সেই চিৎকারে ওর বাবার পাষান মন গললো না ৷ সে তার মতো আছে ৷

রিফা নিজের রুম থেকে ছুটে চলে এলো ৷ সারা ঘরের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেল ৷ মেয়েটাকে চিৎকার করে কাঁদতে দেখে দৌঁড়ে গেল ইশিতার কাছে ৷ ইতি আর ইশিতার মা ইশিতাকে নিয়ে এসে সোফায় বসালো ৷ ও ক্রমশ কেঁদেই যাচ্ছে ৷ রিফা এসে ওর পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো,,,,,,,

—- কি হয়েছে মা? কাঁদছিস কেন?

রিফার কোলে মাথা রাখলো ইশিতা ৷ ওর দুই হাত দিয়ে রিফার হাত ধরে বলতে লাগলো,,,,,,,

ইশিতা : কেউ ভালোবাসে না আমাকে ফুপ্পি ৷ কেউ না ৷

ফুপ্পি আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলতে লাগলো,,,,,,,,,

—- কে বলেছে হুম? আমরা কি তোকে কষ্ট দেই? তোর কি চাই বল? তুই তো আমাদের সব ৷

ইশিতা : সেটা বাপি কেন বোঝে না ফুপ্পি? কেন এরকম করছে বলো না?

রিফা বলতে লাগলো,,,,,,,,

—- ভাবি তোমরা যাও ৷ আমি দেখছি ওকে ৷ ইতি ওকে একটু আমার রুমে নিয়ে চল তো ৷

আমাকে ফুপ্পি রুমে নিয়ে এসে বিছানায় বসিয়ে আমার গালে হাত দিয়ে বলতে লাগলো,,,,,,,,,

—- কাঁদিস না তো ৷ আর টেনশানও নিস না সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস ৷ এখন এভাবে ভেঙ্গে পরলে হবে বল?

ইশিতা : এই বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার ৷

—- তো চলে যা ইশানের সাথে ৷ অনেক দূরে চলে যা ৷

ইশিতা : আমাকে একটা হেল্প করতে পারবে?

—- কি? বল?

ইশিতা : ইশান বলেছে ওর সাথে আজ দেখা করতে ৷ কীভাবে যাবো আমি?

—- শুধু দেখা করতে বলেছে?

ইশিতা : হুম ৷

—- আচ্ছা চিন্তা করিস না ৷ হয়ে যাবে ৷ কখন যাবি?

ইশিতা : ০৪ টার সময় বাড়ির সামনে আসবে বলেছে ৷

—- আচ্ছা তুই থাক এখানে আমি একটু আসছি ৷

ইশিতা : কোথায় যাচ্ছো?

—- কোনো রাস্তা পাই নাকি সেটা দেখতে ৷ তুই থাক চিন্তা করিস না ৷ সব হয়ে যাবে ৷

আমি মাথা নাড়ালাম ৷ ফুপ্পি বাহিরে চলে গেল ৷ রুমের চারপাশে হালকা চোখ বুলিয়ে শুয়ে চোখ বুজে রইলাম৷

________________

রাত ০৭ টা বাজে ৷ ফুপ্পির সঙ্গে আস্তে আস্তে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম ৷ ফুপ্পি আমাকে যেতে বলে নিজে বাড়ির ভিতরে চলে গেল ৷ গায়ের চাদরটা দিয়ে ভালোভাবে নিজেকে ঢেকে নিলাম ৷ নিজেকে এখন চোর মনে হচ্ছে ৷ কারো সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্য এতো কিছু করতে হবে জানা ছিল না ৷ আশেপাশে কোনো গার্ড দেখতে পেলাম না ৷ জিজু তাদেরকে আগেই সরিয়ে দিয়েছে ৷

ফুপ্পির কথায় জিজু আমাকে হেল্প করেছে ঠিকই কিন্তু এর পরিবর্তে সে ফুপ্পির থেকে টাকা নিয়েছে ৷ চারপাশটা অনেক অন্ধকার হয়ে এসেছে ৷ একা একা ভয় লাগছে প্রচুর ৷ কত দেরি হয়ে গেল বের হতে ৷ না জানি ইশান কি করছে ৷ কিছুটা পথ হাঁটতেই রাস্তার কাছে চলে এলাম ৷ কিন্তু এখানে কেউ নেই পুরো রাস্তা ফাঁকা ৷ সঙ্গে জায়গাটাও নির্জন ৷ মাথার থেকে চাদর নামিয়ে আশেপাশে উঁকি দিলাম ৷

কাউকে দেখতে পাচ্ছি না ৷ ইশানকে ফোন দিলাম বাট ফোন অফ ৷ উফ গেলো কোথায়? আশেপাশে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম ৷ সামনে এগোচ্ছি আর আমার মনে হচ্ছে কেউ আমার পেছনে পেছনে আসছে ৷ পাশের ঝোপঝাড় থেকে খসখস আওয়াজও আসছে ৷ ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ৷ ধুর বাবা এ কোন বিপদে পরলাম ৷
হঠাৎ করে পিছনে ঘুরতেই ভয়ে জোরে করে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো ইশিতা ৷

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here