প্রেম_প্রাঙ্গণ পর্ব ৩+৪

‘প্রেম প্রাঙ্গণ’🍂
পর্ব-০৩
লেখাঃসুনেহরা শামস
.
.
পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় প্রেম।মাথা ব্যাথা করছে ভীষণ,চোখ মেলে তাকাতেও কষ্ট হচ্ছে তার।এই বুঝি চোখগুলো টুপ করে হাতে চলে আসবে।ঝাপস ঝাপসা দেখছিল এতক্ষন সবকিছু কিন্ত এখন পুরোপুরি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।সবকিছু স্পষ্ট চোখে ধরা দেওয়ার সাথে সাথে ভীষণ রকমের অবাক হয় প্রেম।এ কোথায় সে?জায়গাটা একদম অপরিচিত তার কাছে।আগে যেখানে তাকে বেধে রাখা হয়েছিল তার থেকে একদম বিপরীত এই জায়গাটি।একদম আলোকিত ঘর,সাদা দেয়াল চারপাশে,সাদা রঙের পাতলা পর্দা ঝুলছে যার বিপরীত পাশে বিশাল থাই,ঘরে বেতের সোফা,টি-টেবিল আর একটা বেড।সবচেয়ে অবাক হয় প্রেম যখন নিজেকে মুক্ত আবিষ্কার করে।আজকে তাকে এভাবে কেন রেখে গেছে বুঝতে পারল না সে।উঠে দাঁড়ায় প্রেম!উদ্দেশ্য জালালাটি!যদি ভাগ্য ভালো খোলা থাকে তাহলে এদিক থেকে আজকেই পালাবে সে।কিন্তু যখনই যেতে নিবে সামনে ওমনি দরজা খুলে কেউ ঘরে ঢুকে।প্রেম তৎক্ষণাত দাঁড়িয়ে যায় যেদিকে সে ছিল।

–সো মিস প্রেম,খুদা লেগেছে নাকি আপনার?

আওয়াজটা একদম চেনা প্রেমের,সাহিল!ঘুরে তাকায় সাহিলের দিকে।নীল রঙের জ্যাকেট,হাতে প্যাকেট,চোখে সানগ্লাস!নাহ,ভালোই লাগছে দেখতে। তবে এতে প্রেমের কি যায় আসে?প্রেম গলাটা ঝেরে নেয়,এগিয়ে যায় সাহিলের দিকে।উদ্দেশ্যের অনেকগুলো কথা শুনিয়ে দেওয়া।এই সাহিল আর সেই ছেলেটা পেয়েছে কি তার থেকে।যখন যেখানে খুশি বেধে রাখে,যখন ইচ্ছা তখন অন্য জায়গায় নিয়ে যায়।এগিয়ে যায় সাহিলের দিকে কিছু বলবে তার আগেই সাহিল প্যাকেট থেকে কিছু বের করে মুখে ঢুকিয়ে দেয়।প্রেম এবার না পারছে বলতে না পারছে গিলতে।ধাম করে বসে পরে বেডে,চিবাতে থাকে।টেস্ট বুঝে!এতো পিজ্জা!এতোদিন পর মুখে ভালো কোনো খাবার আসাতে এই পিজ্জাকেই এখন প্রেমের অমৃত মনে হচ্ছে।নাহলে এই দুদিন তো তাকে শুধু খিচুরি খেতে দেওয়া হয়েছিল।

–ধন্যবাদ দিতে হবে না মিস প্রেম,আই নো আমি আজকে আপনার অনেক বড় উপকার করেছি।

গর্বের সাথে সাহিলের বলা কথাগুলো প্রেমের কাছে কিছুই মনে হলো না।সে ভাবে এই ছেলে কথায় কথায় নিজেকে নিয়ে এতো গর্ববোধ করে কেন?প্রেম সাহিলের হাত থেকে প্যাকেটটা ছো মেরে নিয়ে নেয়।খেতে খেতে জবাব দেয়

–এত উড়তে হবে না আপনাকে।এমনেই আমাকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন এখন সেবাযত্ন করা তো আপনারই দায়িত্ব তাই না?

সাহিল ভাবে!আসলেই তো!তাদেরই তো উচিত প্রেমের সেবা-যত্ন করা কিন্তু প্রাঙ্গণের কথাও ভাবে সে।প্রাঙ্গণ কি আর এভাবে যত্ন নিবে তাও আবার একটি মেয়েকে,তার সবচেয়ে অপ্রিয়কর মেয়ে জাতিকে?আরেকটা কথাও মাথায় আসে সাহিলের।যাকে কিডন্যাপ করে আনা হয় তাদেরকে কি আবার যত্নে রাখে নাকি?সাহিলের মাসুম মস্তিষ্ক এই ব্যাপারগুলো নিতে পারছে না।তাই জিজ্ঞেস করতে প্রেমের দিকে তাকায় কিন্তু সামনে প্রেমকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয় সে,পাশে পিজ্জার খালি বাক্সটি পড়ে আছে।নজর যায় প্রেমের চেহারায়!নাহ,ঘুমন্ত প্রেমকে সুন্দর লাগছে ভীষণ!একদম মায়াময়ী!

~~
অন্ধকারে আচ্ছন্ন রুমের একপাশের দেয়ালের বড় ফ্রেমের ছবিটি আলোকিত হয়ে আছে।ছবির মানুষগুলো সুন্দর ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।একজন পুরুষ মানুষ,তিনজন মহিলা আর দুটো ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে।ফ্রেমের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্রাঙ্গণে।মানুষগুলো তার বড্ড চেনা কিন্তু আজ তাদের থেকেই সে কত দূরে।জীবনটা তো সুন্দরই ছিল তবে আজ কেন সব এলোমেলো?বুঝতে পারে না প্রাঙ্গণে।চোখ লাল হয়ে আসে প্রাঙ্গণের।সে বুঝে!এদিকে আর দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না।

মাত্রই প্রেমের জন্য জামা-কাপড় নিয়ে ভেতরে আসে সাহিল।দেখে রুম অন্ধকার আর প্রাঙ্গণ ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।ছোট একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে সাহিল;এই পর্যন্ত সে অনেকবারই দেখেছে প্রাঙ্গণকে ছবিটির দিকে চেয়ে থাকতে কিন্তু এরা কারা,প্রাঙ্গণের এদের সাথে সম্পর্ক কী?যতবারই জিজ্ঞেস করেছে প্রাঙ্গণকে,সে কখনোই বলে নি।অনেকবার প্রাঙ্গণকে জিজ্ঞেস করেছিল যে তার পরিবারের মানুষগুলো কোথায় কিন্তু প্রাঙ্গণ জবাব দেয় নি।হয়তো বলতে চায় না অথবা কিছু লুকানোর প্রচেষ্টা।

–কি ভাবছিস এতো?

প্রাঙ্গণের গলার স্বরে ঘোর ভাঙে সাহিলের।প্রাঙ্গণকে স্বাভাবিক দেখে ছোট করে একটা হাসি দিয়ে এগিয়ে যায় প্রাঙ্গণের দিকে,কাছে গিয়ে প্রাঙ্গণের কাধে হাত রাখে।

–তোর কথা অনুযায়ী মেয়েটার জন্য জামা-কাপড় নিয়ে এসেছি।বেচারী চারদিন ধরে একি জামা-কাপড় পড়ে আছে,ইয়াক!(শেষের কথাটা বলেই সাথে সাথে নাক ছিটকায় সাহিল)

সাহিলের নাটক দেখে মুখ বাকা করে হালকা হাসে প্রাঙ্গণ!মেয়েটার দোষ কোথায়?তারা বেধে রেখেছে মেয়েটাকে,এখন তারা যদি জামা-কাপড় না দেয় তো সে পড়বে কি।প্রাঙ্গণ জানে সাহিল সব জেনে-শুনেই শুধু শুধু এমন নাটক করছে।

–যা সাহিল,মেয়েটাকে জামা-কাপড় দিয়ে আয় আর হ্যা,মেয়েটার সাথে একদম খাতির জমানোর দুঃসাহস করবি না।

লাস্টের ওয়ার্নিংটুকু শুনে সাহিল মুখ ভেংচি কাটে।সে কি আর ইচ্ছা করে মেয়েদের সাথে খাতির জমায়?আজ পর্যন্ত একটা মেয়েকেও পটাতে পারে নি তবে হ্যা যারা তার সাথে লাইন মারার চেষ্টা করেছে তাদেরকে আবার সাহিলের পছন্দ হয় না।সবকিছুই জানে প্রাঙ্গণ,তাই বলে এভাবে খোটা দিবে সে?সাহিল যেতে যেতে আরেকটা ভেংচি কাটে প্রাঙ্গণের দিকে চেয়ে।

~~
বিগত চার ঘন্টা ধরে মরার মতো ঘুমিয়েছে প্রেম।এখন তার নিজেকে মেঘের মতো নরম আর হালকা মনে হচ্ছে,একদম ফ্রেশ বলে যাকে।প্রেম আশেপাশে চোখ বুলায়,নজর যায় জানালায়।বাইরের পরিবেশ লাল-লাল লাগছে,অনুমান করে বলতে পারে এখন বিকাল অথবা সন্ধ্যা হবে।জানালার কাছে যায় প্রেম,বাইরের জায়গাগুলো দেখে অবাক হয়।এত সুন্দর জায়গা বাংলাদেশে আছে সে জানত না।তবে জায়গা দেখে প্রেমের একটু খটকা লাগল,আছে কোথায় সে?

মাত্রই ঘরে ঢুকে সাহিল কিন্তু ঘরে এসে যেন অবাকই হয় কারণ ঘরে প্রেম নেই।সাহিল ব্যাগগুলো রেখেই এদিকে-সেদিকে খুজতে থাকে প্রেমকে।প্রেমকে খুজে না পাওয়া গেলে প্রাঙ্গণ তাকে জীবিত রাখবে না।ভালোমতো চারিপাশ দেখে সাহিল,চোখ যায় ব্যালকনির দিকে।প্রেম দাঁড়িয়ে বাইরে উকিঝুকি মারছে।সাহিল নিজেও ব্যালকনিতে যায়,একদম প্রেমের পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়।

‘ভাওওওওওওওওওও’

প্রেম ভয় পেয়ে যায়,পিছনে ঘুরে তাকায়।দেখে সাহিল দাড়িয়ে।নিজের বুকে থু থু দেয় প্রেম,এভাবে কেউ ভয় দেখায়?এখন যদি সে পড়ে যেত?তখন কি হত?তেড়ে যায় সাহিলের দিকে।সাহিল হাসতে হাসতে ব্যালকনির চেয়ারে বসে পড়ে।প্রেম মুখ ফুলায়!এভাবে ভয় দেখানোর মানে কি?

–ভয় পেয়েছেন মিস?

–আমি প্রেম(আড়চোখে সাহিলের দিকে তাকিয়ে)

–ওহ হ্যা,সরি সরি।সো মিস প্রেম,এভাবে উকিঝুকি দিচ্ছেন কেন?পালানোর প্ল্যান আছে নাকি?

প্রেম বাইরে আবার উকিঝুকি দিতে দিতেই জবাব দেয়,”এখনো প্ল্যান করি নি,কিন্তু আপনি ভালো বুদ্ধি দিয়ে দিলেন”

সাহিলের মুখে বাকা হাসি!এগিয়ে যায় প্রেমের দিকে।প্রেমের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,”আপনি কি জানেন আপনি এখন কোথায়?”

প্রেম কিছু না বলে ভ্রু-কুচকে চেয়ে থাকে সাহিলের দিকে।সাহিল আরেকটু এগিয়ে এসে আস্তে করে বলে উঠে,”ইউ আর ইন কক্সবাজার মিস প্রেম”

বিস্ময়ে প্রেমের চোখ দ্বিগুন বড় হয়ে যায়,মুখ আপনাআপনি হা হয়ে যায় তার!তাকে এভাবে কক্সবাজার তুলে নিয়ে এসেছে ঢাকা থেকে?ধুপ করে চেয়ারে বসে পড়ে সে।চিন্তা একটাই,এবার এখান থেকে বের হবে কিভাবে সে?

~~
বেশ গভীর রাত এখন।চারিদিকে ঝিঝি পোকার মেলা!ঝি-ঝি শব্দ একদম কানের সাথে মিশে যাচ্ছে।বাইরে চাঁদের আলো পরিবেশটাকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছে,হালকা হালকা ঠান্ডা বাতাসের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে।প্রেম উঠে দাঁড়ায়,আর পারছে না সে।এভাবে তাকে কিছু না বলে বন্দি করে রেখেছে তাও আবার চারদিন ধরে।আসলে সে জানত না যে আজ চারদিন যাবত সে বন্দি কারন প্রায় দুইদিন সে অজ্ঞান ছিল,মূলত সাহিলই তাকে আজকে বলেছে।কিন্তু এভাবে বিনা কারণে বেধে কেন রেখেছে তাকে?মাথায় খেলছে না প্রেমের।আজকে যাই হয়ে যাক,সে এদিকে আর এক মূহুর্ত থাকবে না,যেদিকে চোখ যায় সেদিকে যাবে কিন্তু এভাবে বন্দি সে আর থাকবে না।

খোলা ব্যালকনি দিয়ে নিচে তাকায় প্রেম।বেশী উচু না,সম্ভবত একতলা উপরে হবে।সাহিল আজকে নিজ মনের ভুলে ব্যালকনির দরজা তালা মেরে যায় নি আর এরই সৎ ব্যবহার এখন প্রেম করছে।নিচে বালি চিক চিক করছে,লাফ দিলে সামান্য ব্যথা পাওয়ার ভয় আছে তবে হাত-পা অন্তত ভাঙবে না।অভিজ্ঞতা আছে এসবের তার,কতবার স্কুল পালিয়ে এভাবে বের হয়েছে,এটা তার কাছে বা হাতের খেলা!প্যান্ট টা হালকা উচু করে গলায় থাকা স্কার্ফ মাথায় ভালোভাবে পেচিয়ে নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে নিচে লাফ দেয় প্রেম।চোখ খুলে তাকায় আস্তে আস্তে,বালিতে একদম মাখামাখি অবস্থা তার।দাঁড়িয়ে বালিগুলো শরীর থেকে ঝেড়ে নেয়,ঝাড়তে ঝাড়তে উপরে তাকায় প্রেম।আর সামনেই নজর পড়ে একটি ছায়ার।ভয়ে প্রেমের প্রানপাখি এখন উড়ুউড়ু!সামনে কি মানুষ না ভূত বুঝতে পারছে না।আস্তে আস্তে ছায়াটা কাছে আসে,প্রেম পিছাতে থাকে।কাছে আসতে আসতে এক পর্যায়ে প্রেম হোচট খায়।পড়বে পড়বে এমন সময় কেউ জোরে হাত ধরে টান দেয়,প্রেমের চোখ ভয়ে আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়।টান দেওয়ার সাথে সাথে বাড়ি খায় কোনো শক্ত কিছুর সাথে, সেউ কড়া ঝাঝের মন মাতানো পারফিউমের ঘ্রান নাকে ঠেকে।প্রেম আন্দাজ করতে পারে সামনে কে?প্রেমের মাথা আপাতত তার বুকে,ধুক ধুক করে একটা সুর টানছে সামনের ব্যাক্তির বুকে।প্রেম ভালোমতো শুনলে বুঝতে পারে!ভয়ে এখনো চোখ খুলে নি প্রেম।কানে কিছু ফিসফিসিয়ে বলা শব্দ আসে,,

–ইউ আর ঠু মাচ ফুল মিস।

মাদকের চেয়ে চরম পর্যায়ে যদি কিছু থাকে তাহলে তার সাথে হয়তো তুলনা করা যেত সামনের ব্যাক্তির কন্ঠের।নেশার ঘোর যেন কাটতেই চায় না।কানে বার বার প্রতিধ্বনিত হয় শব্দগুলো,,ইউ-আর-ঠু-মাচ-ফুল-মিস?শব্দগুলো ভালোই লাগল তার কিন্তু শব্দের মিলনে যেই বাক্য তৈরী হলো তাতে মনে ভয়গুলো ফুরুত করে আবার জমতে শুরু করলো।প্রানপাখিরা তো আগেই বিদায় নিয়েছে,এবার যেন অন্তর আত্মাও মরি মরি অবস্থা।উপরে চোখ তুলে তাকায় প্রেম,সামনে একজোড়া সে মায়াবী বাদামী চোখগুলো।নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে প্রেম;সামনের ব্যাক্তির ডান হাত তার ডান কাধে,বাম হাত তার বাম পাশে কোমরে আর মুখ একদম কাছাকাছি।যে পরিমানে কাছাকাছি আসলে একজন আরেকজনের নিশ্বাস শুনতে পারে একদম সেই পরিমানে।হাত-পা কাপছে প্রেমের,এত কাছাকাছি তো সে কোনো পুরুষের মাধ্যমে হয় নি।

–পালিয়ে যাওয়ার পরিনাম আপনাকে ভোগ করতে হবে মিস।

বাকা হাসি দিয়ে বলা কথাগুলো শ্রবণ করল প্রেম,বুঝল ভয়ানক কিছু তার জন্য আছে সামনে যখন সে নিজেকে আবিষ্কার করল বাকা হাসির বাদামী চোখজোড়ার মালিকের কোলে নিজেকে!
‘প্রেম প্রাঙ্গণ’🍂
|পর্ব-০৪|
লেখাঃসুনেহরা শামস
.
.
কাঠের চেয়ারে হাত-পা আর মুখে কাপড় ঢুকিয়ে বেধে রাখা প্রেমের।এবার এতো শক্ত ভাবে বেধে রাখা হয়েছে তাকে যে সে না পারছে নড়তে ভালোভাবে,হাতের আর পায়ের বাধনগুলোও শক্ত।এভাবে প্রায় তিন ঘন্টা যাবত বেধে রাখা হয়েছে তাকে।কারণ একটাই,সে পালিয়ে যেতে নিয়েছিল।গত তিন ঘন্টার আগের কাহিনী মনে পড়ে তার……

প্রাঙ্গণের কোলে নেওয়ার সাথে সাথে অতি বিস্ময়ে আর ভয়ের কাবু হয়ে প্রেম গলা জড়িয়ে ধরে তার,মিশে যায় একদম বুকের সাথে।প্রাঙ্গণের কোলে নেওয়ার ভঙিতে তার শরীরের যেখানে প্রাঙ্গণের হাত সে জায়গাগুলো মনে হচ্ছিল এই বুঝি ক্ষত-বিক্ষত হিয়ে ঝাঝরা হয়ে যাবে।ব্যথায় একবার ‘আহহ’ শব্দ বের হয়েছিল তার মুখের থেকে।কিন্তু তাতে যেন কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না প্রেমের সামনে থাকা সেই নিষ্ঠুর ব্যাক্তির।এবার যেন প্রেম ধৈর্যহারা হয়ে বলেই উঠে…

–আপনি খুবই নিষ্ঠুর…

প্রাঙ্গণ সাথে সাথে সেখানেই দাঁড়িয়ে যায়।আর প্রেমের দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।এসব শান্ত দৃষ্টির ভয়ানক পরিনাম কি তা তো আর প্রেম জানে না।প্রেম এবার সুযোগ পেয়ে নিচে নামার জন্য মোচড়ামুচড়ি শুরু করে,এদিকে হালকা পাতলা প্রেমের এমন মোচড়ানো যেন গায়েই লাগছে প্রাঙ্গণের।সে প্রেমকে নিয়ে আবার হাটা শুরু করে,প্রেম আবার বলে উঠে….

–আমি কি করেছি আপনার সাথে?যে আপনি আমাকে এভাবে আটকে রেখেছেন?এমনকি কেন আটকে রেখেছেন তাও বলছেন না।

পুরো বিচ নিস্তব্ধ!কেবল প্রেমের ফুপানোর শব্দ আর পানির ঢেউয়ের শব্দ কানে আসছে।প্রাঙ্গণ দাঁড়ায়,নিচে নামিয়ে দেয় প্রেমকে।নিচে নামানোর সাথে সাথে প্রেম একদম বালিতেই বসে পড়ে।আবার কানে আসে সেই ফুপানোর শব্দ আর পানির ছলছল শব্দ।প্রাঙ্গণ তাকায় সাগরের দিকে,চাঁদের আলোতে পানিগুলো ঝলমল করছে।আশে পাশে দূর-দূরান্ত কোনো মানুষ চোখে পড়ছে না।প্রাঙ্গণ পকেট থেকে লাইটার বের সিগারেট জ্বালায়,একটানে নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে।প্রেম এতক্ষন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল প্রাঙ্গণের কান্ডকারখানা কিন্তু এবার সে অবাক হয়।কারণ প্রাঙ্গণ ধোঁয়াগুলো একটা নির্দিষ্ট আকারে নাক-মুখ দিয়ে বের করছে।যেমন,মাত্রই ধোয়ার কুন্ডলী একদম গোলাকৃতির বের হলো আর মিশে গেল হাওয়ার সাথে।প্রেম চট করে উঠে দাঁড়ায়,ভালোভাবে দেখে!এদিকে প্রাঙ্গণ এতক্ষন খেয়াল না করলেও এখন সে লক্ষ্য করে যে প্রেম তার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে।প্রাঙ্গণ নিজের দিকে এভাবে কারো চেয়ে থাকা একদম পছন্দ করে না,বিরক্ত হয় ভীষণ!

–হোয়াট?

প্রাঙ্গণের বিরক্তিমাখা হোয়াটে প্রেম একটু নড়েচড়ে দাঁড়ায়।ছি!ছি!সে তো এমন না। তাহলে এভাবে কেন চেয়ে ছিল প্রাঙ্গণের দিকে?নিজের আত্মসম্মানে নিজেই আঘাত হেনেছে।প্রেম গলা ঝেড়ে নিল,,

–আসলে,আমি দেখছিলাম যা কিডন্যাপারদেরও এত ট্যালেন্ট হয় নাকি?

প্রাঙ্গণ এক ভ্রু উঁচু করে তাকায় প্রেমের দিকে।প্রেম এবার একটু উৎসাহ আর সাহসের মিশ্রন নিয়েই বলে উঠে,,,

–আরেকবার দেখাবেন প্লিজ??

প্রাঙ্গণ এক মিনিটের জন্য হলেও ভাবে,” এই মেয়ে কি তাকে একটুও ভয় পায় না?”
প্রাঙ্গণ কিছু না বলে আবার আগের মতো ধোঁয়া ছাড়তে থাকে আর প্রেম?সে তো একদৃষ্টে লক্ষ্য করছে তাকে।প্রাঙ্গণকে তার উপর-নিচ সবই ভালোলাগলেও প্রাঙ্গণের এই কিডনাপিং এর রহস্য এখনো বের করতে পারছে না।প্রেম একটু কাছে যায় প্রাঙ্গণের,উদ্দেশ্য নাম জিজ্ঞেস করবে।উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে প্রাঙ্গণকে প্রশ্ন করেই ফেলল…কিন্তু এখানে প্রাঙ্গণ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোতে সে হতাশ হলো,আর প্রশ্ন করলো না কোনো।

বাইরের পরিবেশটা মনোমুগ্ধকর!গভীর রাতের আবছা আলো,বালির সুগন্ধ,পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ,চাঁদের ঝিকিমিকি আলো,বিনাপাতার গাছগুলোর ছায়া,ঠান্ডা হাওয়া,শো শো শব্দ।আবহাওয়াটা কাপলদের জন্য একদম মানানসই!তারা এদিকে হাত ধরে একসাথে হাটবে,পায়ে পা রেখে চলবে,দুজন দুজনার উপস্থিতি এই নিস্তব্দ পরিবেশে উপভোগ করবে,চোখে চোখে কথা বলবে।ইশ কি সুন্দর নাহ?কিন্তু এদিকে প্রেম এই আবহাওয়াকে উপভোগ করছে এমন এক ব্যক্তির সাথে যে তাকে অপহরণ করেছে,ভাবা যায়?প্রেমের মাথায় হুট করে একটা কুবুদ্ধি কিলবিল করে উঠে।আশেপাশে ভালোভাবে তাকায় সে,কেউ আছে কি না।এরপর প্রাঙ্গণকে দেখে যে এখনো সামনের দিকে তাকিয়ে সিগারেটে একের পর এক টান দিয়ে যাচ্ছে।যেই সুযোগ বুঝে দৌড় দিতে যাবে ঠিক সে সময়ই নিজের চুলের মুঠিতে কারো হাতের স্পর্শ পায়।এবারও যে সে ধরা খেয়ে গিয়েছে তা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত প্রেম।বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেরেই যাচ্ছে।হুট করে উল্টোদিকে টান মেরে পাশে থাকা গাছের সাথে চেপে ধরে প্রেমকে।পিঠে প্রচুর ব্যথা পায়,তাতে সামনের মানুষটার কি?সে তো নিজের মতো করেই একদম গাছের সাথে মিশিয়ে দিয়েছে প্রেমকে।এদিকে প্রেমের ব্যথায় চোখ দিয়ে পর্যন্ত পানি চলে এসেছে।এখন বার বার ভাবছে,কেন সে এতো পাকামী করতে গিয়েছিল।নিজেকে নিজেরই জিজ্ঞেস করতে মন চাইছে,,একটু আগে কি ধরা পড়ে শিক্ষা হয় নি তোর?”

–ইউ নো হোয়াট,ইউ আর একচুয়ালী ঠু মাচ ফুল।

প্রেম তাকায় প্রাঙ্গণের দিকে।চেহারায় কোনো আলগা এক্সপ্রেশন ধরা পড়ছে না।যেমন ছিও তেমন ভাবেই কথাগুলো বলল সে।কিন্তু কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে তার কথায় একটা আলাদা নামের মাদক আছে।আচ্ছা জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়,,”এই যে,মি.নিষ্ঠুর।কন্ঠে কি আফিম ঢেলে দিয়েছে আপনার?”কিন্তু তা আর জিজ্ঞেস করা হলো না প্রেমের।তার আগেই প্রেমের মুখে রুমাল বেধে দেয় আর কোলে তুলে নেয় আগের মতো আর নিয়ে যায় সেখানে যেখান থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল সে,,,,,

টুংটাং শব্দে ভাবনার ঘোর থেকে বের হয় প্রেম।দেখে,সামনে ক্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাহিল,হাতে খাবারের প্লেট।প্রেম চোখ সরু করে তাকায়।এই ছেলেকে সে কখনো কোনো কাজের সময় পায় না।অবশ্য সে তো আর তার বন্ধু না,ওই নিষ্ঠুর লোকটির জানের-প্রাণের বন্ধু।সাহিল হাসতে হাসতেই পাশে বসে প্রেমের।সে একবার তাকায় সরু চোখে আর সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।সাহিল একটু বুঝে!বেশী না।

–বলেছিলাম না বেশি পাকামী না করতে….

আর বেশী বলতে পারল না সাহিল কারণ সামনেই প্রেম তার দিকে অগ্নিদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।সাহিল গলা ঝাড়া দেয়।তার আশে-পাশেই এত রাগী মানুষ কেন থাকে সে বুঝে না তবে একটা কথা,প্রেমের রাগ তার কাছে ভালোই লাগে।সাহিল ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে এগিয়ে যায় প্রেমের দিকে।উদ্দেশ্য প্রেমের হাতে বাধন খুলে দেওয়া!সাহিল আগায়,দড়ি গুলো খুলে,সাথে প্রেমের মুখের কাপড়।যেই দড়ি খুলছে তেমনি প্রেম হাত ঝাড়া মেরে উঠে দাঁড়ায়।সাহিল বোকা বনে যায়।এই মেয়ের কি একবার পালিয়ে গিয়ে আবার ধরা খেয়ে শিক্ষা হয় নি?

–এই সরুন সরুন,আপনারা মানুষ না।এভাবে কেউ বেধে রাখে?মন তো চাইছে আপনাকে আর আপনার ওই বন্ধুকে একসাথে বেধে রেখে দিতে।আপনাকে……

আর কিছু বলতে পারল না প্রেম কারণ তার অবস্থান এখন আবারও এই চেয়ারেই।আর সাহিলের হাত চেয়ারের দুইপাশে।সে এখন পুরোপুরি বন্দি সাহিলের কাছে।সে ভীত দৃষ্টিতে তাকায় সাহিলের দিকে,,,,

–ইউ আর সো প্রিটি মিস প্রেমমমমমম……

প্রেম হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাহিলের দিকে।আর সাহিল?তার দৃষ্টি এখন প্রেমের চোখের একদম গভীরতায় নিবদ্ধ।একদম গভীরে…

চলবে…
চলবে…..

[ভুল-ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন।আজকের পর্ব সম্পর্কে একলাইনের মন্তব্য ছেড়ে যাবেন।ধন্যবাদ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here