ফাল্গুনের ঢেউ পর্ব -০৭

#ফাল্গুনের_ঢেউ
পর্ব – ৭ #সংশোধনের_সময়
লেখিকা – Zaira Insaan

তন্দ্রা বিলাস কেটে যেতেই ধীরে ধীরে চোখ খুলল স্নিগ্ধ। সামনের মানবীকে দেখতে না পেয়ে ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলো। সোফার এক কোণায় চোখ পড়লো। সেখানে পরিপাটি ভাবেই কম্বল ও চাদরখানা টি ভাজ করে রাখা। স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে পুরো ঘরে একবার হাঁটা দিল মিহি কে খুঁজে পেল না। বুঝতে বাকি রইল না যে মিহি তার ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়েই নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে গেল।
____________

নিজ বাড়ির সামনে এক অচেনা মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে মিহি। কেমন পরিস্থিতি নিজেকেই নিজ ঘর হতে চলে যেতে হলো! ভয়ে কাঁপুনি ধরেছে। কপাল ঘামে ভিজে একাকার। ওড়নার এক কোণা দুই আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে আছে। বুকে যেন তোলপাড় সৃষ্টি হলো। চোখ উঠিয়ে রুগল সাহেবের বারান্দায় তাকালো। দরজা লাগানো। ঠোঁট চেপে এক হাত বাড়িয়ে দরজায় টোকা দিল ও। তারপর দুই কদম পিছিয়ে গেল। দরজায় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট! না দরজা খুলছে না। বিরক্ত হয়ে ফোঁস করে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে আবারো বারি দিল। এবারের টোকায় আওয়াজ উঁচু হলো হয়ত ভেতরে কেউ শুনতে পেল। দরজার লক খোলার শব্দ পেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো মিহি। দরজা খুলল সামনের ব্যাক্তি। মিহি তাকে দেখে চরম অবাক হয়ে ভ্রু কুটি করল। শম্পা দাঁড়িয়ে আছে দরজার সাথে ঘেঁষে। মিহিকেও দেখে যেন সেও অবাক হলো। মিহি মনে মনে ভাবতে লাগল,, উনি এখানে কি করছেন!?”
বারান্দায় এসে দাঁড়ালো মিলি কে এসেছে এতো সকাল সকাল? মিহি কে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল ও। বারান্দা থেকে মিহি দিদি বলে চিৎকার দিয়ে নিচে নামার জন্য দৌড় দিল। দৌড়ে নিচে নেমে দরজার কাছে আসলো সাথে প্রণালিও। মিলি এসে তার মিহি দিদি কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এ যদি আবারও চলে যায়? সে যেতে দিতে চাই না তাই তো এমন শক্ত বাঁধন করে আছে। মিহি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মিলি হাঁপিয়ে উঠে বলল,,

“বইন আর যাইস না রে।”

হাসলো মিহি সাথে প্রণালিও। শুধু গোমড়া মুখ করে আছে শম্পা। তার পছন্দ হয়নি মিহির আসার। বিরক্ত ছাপ লেগেই আছে মুখে। প্রণিমা ওর হাত ধরে ঘরে এনে আদুরে গলায় বলল,,

“তোর আর কোথাও যাওয়া লাগবে না, যাবি না তুই কোথাও।”

ঠাসস করে হালকা শব্দ করে দরজা লাগালো শম্পা। সবাই তাকালো তার দিকে। শম্পা টিটকারি মেরে বলল,,

“হায়রে এই মেয়েটাকে ঘরে ঢুকতে দিলেন কেমনে ভাবী? এ না আপনাদের মান সম্মান উড়িয়ে পালিয়েছিল! তাও?”

মুখ শক্তপোক্ত হয়ে গেল প্রণিমার। কড়া নজরে তাকিয়ে বলল,,

“এসব ব্যাপারে কথা বলার প্রয়োজন নেই তোমার।”

“কেমনে বলবো না? এতো কষ্ট করে….।”

পুরো কথা শেষ হতে দিল না মিলি। কথাটি এড়িয়ে বলল,,

“আয় ফ্রেশ হয়ে নে।”

মিলি মিহিকে নিয়ে যেতে যেতে নিলে শম্পা আবারো বলল,,

“কোন ছেলের তালে পড়ছে মনে হয়।”

গা জ্বলানোর কথা বলল ও। সাথে সাথে ক্ষিপ্ত মেজাজ হয়ে গেল মিহির। ফিরে শক্ত হয়ে বলল,,

“নিজের ঘরে না থেকে এখানে কি করছেন?”

“কথার তেজ কাকে দেখাচ্ছিস? উল্টাপাল্টা কাজ করে বাপের সম্মান ডুবিয়ে আবার কথাও কস!”

রেগে বলল শম্পা। এসব কথা গায়ে মাখলো না মিহি। সেও একই তালে বলল,,

“মান সম্মানের কথা বলছেন আপনি! আপনার ছেলে তো বউ থাকার সত্তেও পরকিয়া করছে, কেন আপনার মনে নেই? তাও কার সাথে! ঘরের কাজের মেয়ের সাথে।”

এতটুকুই বলল মিহি। যা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না শম্পা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো শম্পা। কিছু বলল না প্রণিমা। মিহি চলে গেল।
___________

রুগল সাহেব দুলানো চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন দৃঢ় দৃষ্টিতে। এর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মিহি। মিহি কে না দেখলেও টের পেয়েছেন তিনি। মিহি যে ঘরে আসছে তাতে অজ্ঞাত নন। তাও না জানার ভান ধরেই আছেন। মিহি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল রুগল সাহেবের সামনে। মুখের সামনে খবরের কাগজ ধরে আছেন। মিহি দুই হাঁটু ভাঁজ করে বসে কন্ঠ স্বর নামিয়ে বলল,,

“বাবা।”

কোন উত্তর দিলেন না তিনি। যেন শুনেনি। মিহি ঢোক গিললো। রুগল সাহেবের এক হাঁটু স্পর্শ করলো। তারপর তাকালো। রুগল সাহেব খবরের কাগজ ঝপ করে ঝাড়া দিয়ে সোজা করলো এতে অনেকটা কেঁপে উঠে মিহি। সেই হাঁটুতে মাথা রেখে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,,

“আম সরি।”

কাগজের এক ফাঁকে তাকালেন তিনি। মিহি কাঁদছে নিঃশব্দে। রুগল সাহেব কে কিছু বলতে না দেখে মিহি বলে,,

“জানি সবকিছুর দোষ আমার, কিন্তু এটার শাস্তি কি আজীবন পেতে থাকবো?”

“যাও এখান থেকে।”

এতটুকু কথাই বুক ধক করে উঠল মিহির। মিইয়ে কন্ঠে বলল,,

“বাবা।”

“আসছো কিসের জন্য? আমি তো তোমাকে আসতে বলেনি।”

বুক মোচড় দিয়ে উঠলো। সুঁই এর মত লাগলো কথাটা। মিহি কাঁদতে কাঁদতে বলল,,

“আমি ওই মুহূর্তে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সত্যি বলছি। মা কিন্তু অন্য ছেলে দেখিয়ে ওই লোকটার সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিল বাবা।”

কাগজ সরিয়ে ভাঁজ করে পাশের টেবিলে রাখলেন রুগল সাহেব। মেয়ের ক্রন্দন মাখা মুখ দেখে যেন বুক মুচড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন,,

“যাও এখান থেকে।”

মিহি মাথা দুলিয়ে না বলল। সাথে সাথে জড়িয়ে ধরল তার বাবা কে। রুগল সাহেবের পেটে মাথা রেখে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগল। অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলছে। কেউ কিন্তু বুঝতে না পারলেও রুগল সাহেব ঠিকই বুঝতে পারছেন। হিচকি উঠে গেল তার। মাথায় হাত রাখলো। পরম আদর বুলিয়ে দিল মাথায়। মিহি অবাক হলেও কাঁদছে। মিলিও রুমে আসলো পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল রুগল কে। সেও কান্নার আভা নিয়ে বলে,,

“মিহি দিদি কে ছাড়া থাকতে অনেক কষ্ট হয় আমার।”

দু’জনের চাপের মধ্যে পড়ে গেলেন রুগল। শান্ত আশ্বাস দিয়ে বলেন,,

“রুমে যাও মিহি।”

মিহি মাথা উঠিয়ে ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে। রুগল সাহেব তার মাথায় ও গালে হাত বুলিয়ে দিলেন। মিলিকে পেছন থেকে আস্তে করে টেনে সামনে আনলো। মিলির চোখ ফোলা। মনে হয় পেছন থেকেই কেঁদেছিলো। চমকালেন তিনি। দুইজনের চোখ গুলো লাল হয়ে আছে। রুগল সাহেব মিলিকে বলেন,,

“ওকে কিছু খাইয়ে নিয়ে আসো।”

খুশিতে গদগদ হয়ে গেল মিলি। মিহি হেঁসে চোখ মুখ মুছে গলা জড়িয়ে ধরলো।

(চলবে…)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here