ফিলোফোবিয়া পর্ব -১৩

ফিলোফোবিয়া

ঊর্মি প্রেমা (সাজিয়ানা মুনির )

১৩.

( কার্টেসি ছাড়া কপি নিষেধ )

নভেম্বর মাস। শীতের মৃদু আমেজ। জোরেশোরে ইমান্দিপুরে নির্বাচনের আয়োজন চলছে। আজকাল প্রায় প্রতি সাপ্তাহে গ্রামে আসে শতাব্দ। পড়াশোনার পাশাপাশি এদিকটাও দেখছে। বাপ চাচাদের সাথে নির্বাচনের কাজে হাত লাগাচ্ছে। তার সাথে প্রায়ই চোখেচোখি হয়, চুপিচুপি ফোন কথাও হয়। ‘ভালোবাসি’ প্রকাশ না করলেও। অধিকারবোধটা বরাবরই প্রখর। কিছু সম্পর্ক বোধহয় বেনামিই সুন্দর। আয়োজন করে, ভালোবাসি বলে নাম করণের প্রয়োজন পড়েনা কোন।
প্রিয়’র বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। আজকাল ব্যস্ত খুব। সারাবছর ঝিমিয়ে কাটানোর মাশুল দিচ্ছে এখন। নাকানিচুবানি খেয়ে বই নিয়ে পড়ে থাকে সারাক্ষণ। এর মাঝে বাড়িতে এলো অতিথি’র আগমনী সংবাদ। ছোট খালার বড় ছেলে ‘মজনু ভাই’ আসছে দেশে। বড় আপার সমবয়সী মজনু ভাই। ‘মজনু’ নামটা ছোট খালুর রাখা। হিস্ট্রিকাল লাভস্টোরিতে গভীর ভক্তি তার। লায়লা মজনু’র প্রেমকাহিনী থেকে অনুপ্রেরিত হয়ে বড় ছেলের নাম মজনু। আর ‘রোমিও জুলিয়েট’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছোট ছেলের নাম ‘রোমিও’ রেখেছেন। যদিও বড় হয়ে মজনু ভাই নাম পাল্টে। মেহতাব রেখেছে। কিন্তু মজনু নামটা খাতায় কলমে ঠিকই রয়ে গেছে। নামটা শুনতে বেশ বিব্রত শোনালেও। মজনু ভাই দেখতে যথেষ্ট সুদর্শন। শুধু মাথার মধ্যেখানে একটু চুল কম। অনেক বছর দেখেনি তাকে। সেই ছোটবেলায় দেখেছিল একবার। এতবছরে কি চুল যেয়ে টাক বেরিয়েছে এসেছে তার! কি জানি।
প্রিয় ভাবনা জগতে ডুবে। সামনে বই খুলে উপরের দিক তাকিয়ে কলমের মাথা চাবাচ্ছে। দেখে ক্ষে*পে উঠল খালা। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
‘ কলম লেখা জন্য খাওয়ার জন্য না! এমন করে পড়লে পাশ করতে হবে না আর।’
ভাবনাচ্ছেদ হলো প্রিয়’র। নড়েচড়ে বসলো। কপাল কুঁচকে বলল,
‘ তুমি শুধু আমাকেই বলো। প্রভা যে দুই সাব্জেক্টে ফেল করলো কই তাকে তো ফোন কিছু বললা না! উল্টো আদর আহ্লাদ করলা’
‘ প্রভা আর তুই এক হলি প্রিয়? ও ক্লাস সিক্সে পড়ে আর তুই সামনে বছর মেট্রিক দিবি। ফেল করলে কোথাও মুখ থাকবে আমাদের?’
‘ অত চিন্তা করো না তো খালা। দেখবে কোনরকম ঠিক পাশ করে যাবো!’
খালা এবার আরো অবাক হলো। হতাশ কন্ঠে বলল,
‘ শুধু পাশ?’
‘ হ্যাঁ! মেয়েদের এত পড়ে কি হবে। সেইতো শ্বশুরবাড়িতে চুলাই ঠেলবে।’
খালা রেগে গেল। কট কট করে বলল,
‘ কাউকে সর্বস্র না ভেবে নিজেকে সম্পদ বানা প্রিয়। প্রেম ভালোবাসা বিয়ে এসব খানিকের মোহ। এসব ছাড়াও জীবনে বাঁচা যায়!’
চুপসে গেল প্রিয়। খালা বরাবরই প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে বিরো্ধী।কিন্তু কেন? কারণটা আজো জানে না সে। ছোট থেকে খালাকে আত্মনির্ভরশীল দেখেছে। কখনো কারো কাছে হাত পাততে দেখেনি। নিজের সকল প্রয়োজন সমস্যা নিজেই মিটিয়েছে। সফল নারী বলাই যায় খালাকে।
প্রিয় বিড়বিড় করে বলল,
‘ তুমি শুধু আমাকেই বলো!’
‘ আর কাকে বলবো। তুই আপন তোকেই তো বলবো!’
‘ আমি আপন আর প্রভা পর? ওকে কেন বলোনা এসব?’
মুখ বেজার করে অভিযোগ করলো প্রিয়। খালা দেখে হেসে ফেলল।বলল,
‘ আচ্ছা, এবার দেখা হলে বলবো। ঠিক আছে?’

প্রশ্নপত্র নিয়ে মুখে বাতাস করতে করতে মাঠে এলো প্রিয়। সকালে শীতশীত করলেও এখন ভাপসা গরম ছেড়েছে। বিদুৎ না থাকায় হলে গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার। পরিক্ষা শেষে দূর আমগাছ তলায় তানহা জুবাইদাকে দেখা যাচ্ছে। গলা উঁচিয়ে ডাকলো একবার। শুনেনি তারা। গল্পে মজে। পা চালিয়ে এগিয়ে গেল প্রিয়। কাছাকাছি যেতেই জুবাইদাকে বলতে শুনলো,
‘ শতাব্দ ভাই কি করে…আসলেই…
প্রিয়’র দিক চোখ পড়তেই। জুবাইদা সাথে সাথে থেমে গেল। তার দৃষ্টি অনুকরণ করে তানহা পিছন ফিরে চাইল। প্রিয়কে দেখে চমকে গেল। বিড়বিড় করে বলল,
‘ আরে প্রিয়! কখন আসলি। পরিক্ষা কেমন হলো?’
‘ কি বলছিলি তোরা? আমাকে দেখে থেমে গেলি কেন? কি করেছে উনি।’
ভনিতা বিহীন জিজ্ঞেস করল প্রিয়। জোর করে ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে কথা এড়াতে তানহা স্বভাবিক কন্ঠে বলল,
‘ তেমন কিছুনা এমনি….
চোখ পাকালো প্রিয়। শান্ত স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘ আমি সত্যিটা জানতে চেয়েছি ।’
জুবাইদা তানহা দুজন চোখাচোখি করল। একটু সময় নিয়ে। তানহা বিড়বিড় করে বলল,
‘ গতকাল সমুদ্র তোর কথা জিগ্যেস করছিল বারবার। শতাব্দ ভাইয়ের সাথে সম্পর্কে আছিস কিনা, তুই সিরিয়াস কি না। আরো অনেক কিছু। সন্দেহ হলো আমার। প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও। কড়াকড়ি ভাবে জিজ্ঞেস করতেই গড়গড়িয়ে বলতে লাগল। গতকাল বিকালে শতাব্দ ভাইয়ের মোবাইলে ঢাকা থেকে করিয়ে আনা নির্বাচনের পোস্টারের ছবি দেখতে ঘরে গিয়েছিল। শতাব্দ ভাই ওয়াশরুমে ছিল। আচমকা একটা আইডি থেকে ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজ এলো। কৌতুহল বশত খুলে দেখে একটা মেয়ে শতাব্দ ভাইকে প্রপোজ করছে। আরো কৌতুহল নিয়ে পুরানো মেসেজ পড়ে বুঝল মেয়েটা শতাব্দ ভাইয়ের সাথে একই মেডিকেলে পড়ছে। ম্যাসেজে গুলো এডাল্ট ছিল খুব। সাথে মেয়েটার এডাল্ট ছবি..
থামিয়ে দিলো প্রিয়। বুকে মোচড়ে উঠেছে হ্ঠাৎ । খাড়া থেকে বসে পড়ল। জলে চিকচিক করছে চোখ। শরীর কাঁপছে থর থর। সামনের সব ঝাপসা দেখছে। অদ্ভুত য*ন্ত্রণায় বিষিয়ে যাচ্*ছে মন। জুবাইদা তানহা পাশে বসল। জুবাইদা বুঝানোর স্বরে বলল,
‘ শতাব্দ ভাইয়ের কোন দোষ….’
উঠে দাঁড়ালো প্রিয়। ধরে আসা কন্ঠে বলল,
‘ বাড়ি যাবো আমি।’
বলেই তড়িঘড়ি পা চালিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেল। রিকশা ডেকে বাড়ির দিক রওনা হলো। চোখ ভরে আসছে বারবার। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে। শরীর অবশ লাগছে। কান্না পাচ্ছে খুব।
রিকশা বাড়ির কাছাকাছি আসতেই শতাব্দকে দেখল। লোকজন জমিয়ে মিটিং করছে। বুকের য*ন্ত্রণাটা যেন আরো কয়েক গুন বেড়ে গেল। চোখাচোখি হতেই মুখ ফিরিয়ে নিলো প্রিয়। ভাড়া মিটিয়ে তড়িঘড়ি করে ভেতরে চলে গেল। পেছন থেকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল শতাব্দ।
না খেয়ে, না নেয়ে ঘরে দুয়ার দিয়ে কাটালো সারাদিন। বিকালেও ছাদে উঠেনি আজ। সন্ধ্যায় খালা এসে জিজ্ঞেস করতেই হুহু করে কেঁদে উঠল প্রিয়। খালাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘ আমার এখানে ভালো লাগছেনা খালা। বুকে কষ্ট হচ্ছে খুব…. বাড়ি যাবো।’
হ্ঠাৎ বুক ব্যথা করছে কেন? উল্টাপাল্টা কিছু খেয়ে পেটে গ্যাস জমলো কি মেয়েটা! আয়েশা বেগম ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লো। কয়েকবার কারণ জানতে চাইল। ডাক্টারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলল। প্রিয় সাড়াশব্দ করলো না কোন। কাঁদোকাঁদো গলায় বিড়বিড় করে বলল, ‘ ডাক্টারের কাছে না। মাকে খুব মনে পড়ছে! আমার মায়ের কাছে যাবো।’
আজ পরিক্ষা শেষ হয়েছে। তাই বারণ করলেন না তিনি। সকাল সকাল গাড়ি ভাড়া করে প্রিয়’কে ঢাকায় দিয়ে এলেন।

ঢাকায় এসেও ভালো লাগছেনা প্রিয়’র। বাবা মা প্রভা কারো সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে করছে না। শান্তি পাচ্ছেনা কোথাও। তানহার কথা গুলো কানে বাজছে সারাক্ষণ। রাতে মায়ের ফোনে সিম ঢুকালো। অন করতেই, সাথে সাথে ম্যাসেজের টুংটাং আওয়াজে কেঁপে উঠল ফোন। শতাব্দের ম্যাসেজ সব। মিনিট পাঁচেক গড়াতেই শতাব্দের নাম্বার থেকে ফোন এলো। ঝাপসা চোখে ফোনে স্কিনে তাকিয়ে থাকলো প্রিয়। ধরলো না। খানিক বেজে একাই থেমে গেল। শতাব্দের ফোন থেকে ম্যাসেজ এলো,
‘ ইগনোর করছো! কি হয়েছে? সমস্যা কোন? এখানে আসো সামনা সামনি বসি। সবটা শুনে, সমাধান করি। এভাবে পালিয়ে বেড়ালে লাভ হবে না কোন। তোমার ঢাকার বাড়ির ঠিকানা আমার জানা। যদি সেখানে বড়সড় কোন ঝা*মেলা না চাও। ভালোয় ভালোয় কালকের ভেতর ফিরে আসবে ইমান্দিপুরে।’
দ্রুত মোবাইল বন্ধ করে সিম খুলে নিলো প্রিয়। হা পা কাঁপছে তার। ম্যাসেজের কথা গুলো স্বাভাবিক দেখালেও। এর ফল কতটা অস্বাভাবিক হতে পারে আন্দাজ করতে পারছে প্রিয়।

পরের দিন সকালে বাবার জোরাজোরিতে। বাবার সাথে মজনু ভাইকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে গেল। প্রিয়’র ধারণা ঠিক। এই কয় বছরে চুল গিয়ে টাক বেরিয়ে এসেছে মজনু ভাইয়ের।উঁচা লম্বা বলিষ্ট শরীর, সুন্দর চেহারা সবই ঠিক ছিল। শুধু মাথার টাকটার জন্য সুদর্শন হতে হতে পিছিয়ে গেল বেচারা।
গাড়িতে বসে দেশে আসার কারণ জানালো মজনু ভাই । ছোট থেকে ইউরোপে বড় হয়েছে। দেশের রীতিনীতির থেকে দীর্ঘকাল বিচ্ছিন্ন। এখানকার কালচার সম্পর্কে সম্পূর্ণ অ*গ্যত। তাই এবার লম্বা সময় হাতে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ঘুরে দেখবে। সেই সাথে আরেকটা কারণও আছে। মজনু ভাইয়ের চাচা সোহরাব আলি ইমান্দিপুরের পাশের গ্রামের চেয়ারম্যানি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে এইবার। সেই নির্বাচন দেখতে আরো তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছে। প্রিয়’র হাসি পেল। মজনু ভাইকে প্রচণ্ড বুদ্ধিহীন বোকা লোক মনে হলো। নয়তো নির্বাচন দেখার জন্য কেউ এভাবে ছুটে আসবে কেন?

মজনু ভাই সবার জন্য বেশ উপহার এনেছে। সারাদিন ভরপুর খাওয়া দাওয়া ব্যস্ততার সাথে কাটলো প্রিয়’র। রাতে সিম খুলতেই শতাব্দের ম্যাসেজ। পাঁচ মিনিট আগে পাঠিয়েছে।,

‘ তোমাদের বাড়ির সামনে আছি। তুমি আসবে? নাকি আমি উপরে আসবো!’

আঁতকে উঠল প্রিয়। তড়িঘড়ি করে জানালার পর্দা সরিয়ে বাহিরে তাকালো। রাস্তার অপর পাশে গাড়ি থেমে। ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলোতে শতাব্দের মুখ ভেসে। ড্রাইভিং সিটে বসে এদিকটাই চেয়ে। ভীষণ এলোমেলো ক্ষে*পে আছে সে। ঘড়ির দিক তাকালো প্রিয়। এগারোটা আটচল্লিশ। ভ*য়ে ঢো্ক গিলল। এতো রাতে কেন এসেছে সে?

চলবে…..

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই সবার মতামত জানাবেন।

টাইপোগ্রাফি: Maksuda Ratna আপু🌺❤️।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here