বন্ধ দরজা পর্ব ২৩

#বন্ধ_দরজা
পর্ব-২৩
লেখা-মিম
রাত সাড়ে আটটার দিকে সুহায়লার পায়ে ড্রেসিং করে দিচ্ছে তানভীর। মাথা নিচু করে পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সুহায়লা চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষন বাদে সুহায়লা টের পেলো ওর পায়ের উপর ফোঁটাফোঁটা পানি পড়ছে। চমকে গেলো সুহায়লা। ভালো মতো লক্ষ্য করে দেখলো তানভীরের চোখ বেয়ে পানি ঝড়ছে। প্রথমবারের তাকে কাঁদতে দেখছে সে। তানভীরকে সামান্য ধাক্কা দিয়ে বললো,
-” কি ব্যাপার? কাঁদছো কেনো?”
-” না আমি কাঁদিনা। নাটক করছি তোমার সাথে। আমার মতো জানোয়ার কি কখনো কাঁদতে পারে নাকি?”
-” ……………….”
-” কেনো কাঁদি বুঝো না? সব ভেঙে ভেঙে বুঝাতে হবে কেনো?”
-” কি বুঝবো? না বললে বুঝবো কিভাবে?”
তানভীর রেগে যাচ্ছে। কেনো বুঝেনা মেয়েটা তাকে? বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। দাঁত মুখ খিচিয়ে বললো,
-” তোমাকে আমার একদম সহ্য হয় না।একদমই না। তুমি আমার শত্রু । তুমি এক্সিডেন্ট করেছো, মরতে চাচ্ছো এজন্য আমি খুব খুশি। এত বেশিই খুশি হয়েছি যে প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। খুশিতে কাঁদছি আমি।”
কথাটা বলেই হাতে থাকা ড্রেসিং করার লিকুইড টা ফ্লোরে ছুঁড়ে মারলো। ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তানভীর। বের হওয়ার সময় দেখতে পেলো সাবা রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর দিকে একবার তাকিয়েই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বের হয়ে গেলো তানভীর। সাবা খুব করুন দৃষ্টিতে তানভীরের চলে যাওয়াটা দেখছে। ছেলে মানুষকে কাঁদতে দেখলে বরাবরই খুব কষ্ট হয় সাবার। তার উপর আবার তানভীরের মতো মানুষ কাঁদছে, ব্যাপারটা সত্যিই কেমন যেনো! সুহায়লার পাশে এসে বসলো সাবা।
-” তানভীর ভাই তোকে সত্যিই ভালোবাসে রে সুহা। তুই এক্সিডেন্ট করেছিস পর থেকে উনার চেহারার রঙ উড়ে গেছে। উনার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে উনি কষ্ট পাচ্ছে। এখন দেখ কাঁদছেও। সবাই মুখ ফুটে সব বলতে পারে না। উনিও উনার কথাগুলো বুঝিয়ে বলতে পারছে না। ভেতরে ভেতরে অনুতপ্ত হচ্ছে ঠিকই। উনি অনেক পাল্টে গেছে রে। উনাকে তুই ক্ষমা করে দে।”
কিছুক্ষন চুপ থেকে সুহালা বলতে শুরু করলো,
-” বদলেছে সেটা আমিও জানি। কিন্তু আমাকে বদলে দিয়ে ও নিজে বদলেছে। গতরাতে ও আমাকে আই লাভ ইউ বলেছে। শুধু আই লাভ ইউ না আরও অনেক কিছু বলেছে। কথাগুলো শুনলে যেকোন মেয়ে পাগল হয়ে যেতো ওর জন্য। গতরাতে আমি ঘুমাইনি। সারারাত কথাগুলো কানে বেজেছে। কিন্তু ওকে ক্ষমা করতে পারছিলাম না। ওর এক্সিডেন্ট যে রাতে হলো সে রাতের ঘটনা আর কথাগুলো সব চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো। আমার স্বামী…… অন্য পুরুষ আমার বুকে হাত দিলেও তার নাকি কিচ্ছু আসে যায় না। আমার মতো মেয়ের সাথে এসব হবে এটাই স্বাভাবিক জানিস সাবা ও গত দেড় বছরে যা করেছে সব ভুলে যেতে পারতাম চেষ্টা করলে। কিন্তু সেদিন রাতের ঘটনা….. কোনোদিনও সম্ভব না । ওর ঐ কথাটা আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। কি বললো ও এটা? আমার ক্যারেক্টার কি এতটাই জঘন্য? নাকি মিডেল ক্লাস মেয়েরা জন্মসূত্রে প্রস্টিটিউট হওয়ার সিল গায়ে লাগিয়ে নিয়ে আসে? ভুলতে পারি না সাবা। সত্যিই ভুলতে পারিনা। কথাগুলো প্রতিদিন কাঁটার মতো গায়ে বিঁধে। তুই জানিস শুধুমাত্র ওর প্রশ্রয়ে রাহাত এই ঘর পর্যন্ত চলে এসেছিলো আমি যেনো রাজি হয়ে যাই। একটা বাহিরের লোকের এত দুঃসাহস হয় কোথ্থেকে? আমি তানভীরের ওয়াইফ। ওর ঘরে এসে ওরই ওয়াইফকে অন্য ছেলে বিয়ে করার জন্য জোরাজোি করবে এটা কি কোনো ন্যায়সঙ্গত কথা? এত কোথায় পেয়েছে? তানভীর দিয়েছে ওকে সাহস। ও আমাকে বউ হিসেবে ট্রিট করেনা সেটা মেনে নিয়েছি। এখন ও এসবকথা বাহিরের লোকের কাছে বলে বেড়াবে, বাহিরের লোকেরা আমাকে সে নজরেই দেখবে এটাও কি মেনে নিবো? ওর সাথে আমার যা হয়েছে সেটা চারদেয়ালের মধ্যে আর নেই। লোকের কান পৌঁছে গেছে। তানভীর এসব পৌছিয়েছে। খুব কি বেশি প্রয়োজন ছিলো আমাকে এভাবে ছোট করার? আমি কি মানুষ না? আমার কি মান সম্মান বলতে কিছুই নেই?
-” তোর কষ্টটা বুঝতে পারছি। কিন্তু উনি তো কষ্ট পাচ্ছে। তুই ছাড়া উনার কে আছে বল? তাছাড়া তুইও তো উনার কাছ থেকে দূরে সরে ভালো নেই। তুইও তো কষ্ট পাচ্ছিস।”
-” হ্যাঁ পাচ্ছি। তবে ওর কাছেও আমার যেতে ইচ্ছে হয়না। আজকাল ওকে ঘৃনা হয় দেখলে। তুই জানিস সেদিন রাহাত বাসায় এসে কি বলেছে?”
-” কি?”
-” তোমার পিঠে যে একটা তিল আছে সেটা আমি জানি। কথাটা তোমার হাজবেন্ড বলেছে। শুধু এতটুকুই না। ও ডিটেইলসে বলেছে। তোমার ফর্সা পিঠের ঠিক মাঝ বরাবর লালচে তিলটা দেখলেই নাকি ওর….. বাকিটুকু কি বুঝিয়ে বলবো নাকি বুঝেছো? বিশ্বাস কর সাবা সারা শরীর আমার ঝাড়া দিয়ে উঠেছিলো ঘৃনায়। ইচ্ছে হচ্ছিলো পিঠের তিলের জায়গাটার চামড়া কেটেই ফেলি।”
-” তুই অসভ্যটাকে কিছু বলিস নি?”
-” হুম গালি দিয়েছি। উত্তরে সে বললো, আমাকে গালি না দিয়ে তাকে গালি দাও যে তোমার সম্মানটুকু বাহির পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তানভীর না বললে তো এসব আমি জানতামনা। যে ছেলে তার বউয়ের শরীরের খবর বাহির পর্যন্ত টেনে আনে তার সাথে কিভাবে সংসার করতে চাচ্ছো তুমি? নূন্যতম রেসপেক্ট ও তোমাকে দেয় না। আমি তোমাকে পরিপূর্ন সম্মান দিয়ে াখতে চাচ্ছি। ঘরের বউ বানাতে চাচ্ছি।”
-” তুই আমাকে ডাকিসনি কেনো?”
-” ডেকেছিলাম। তুই ছাদে কথা বলছিলি। তুই শুনিসনি। আর এখানে রাহাতের দোষ দিয়ে লাভ কি? তানভীরই তো ওকে প্রশ্রয় দিয়েছে। এখন তুই বলে এমন মানুষকে কি আদৌ মাফ করা সম্ভব? আমার মন একদমই টানে না ওকে ক্ষমা করতে। কি করতে পাি এখন বল? ”
-” তোকে কি বলা উচিত সেটা নিজেও জানি না। এতটুক জানি দুজন দুজনকে ভালোবাসিস ঠিকই। কিছু তিক্ত স্মৃতির কারনে ঘৃনার কাছে ভালোবাসাটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে। মানুষটা কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়েছে। দেখে আসি কোথায় আছে?”
পুরো বাড়ি খুঁজে তানভীরকে পাওয়া গেলো না। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলো তানভীর বাহিরে গেছে কি না। সে নাকি যায়নি। তারমানে সে বাড়িতেই আছে। হতে পারে ছাদে গেছে। ছাদে গেলো সাবা। তার ধারনাই ঠিক হলো। তানভীর ছাদে রেলিংএর উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। তার কাছে গেলো সাবা। ল্যাম্পপোস্টের হালকা আলোতে দেখা যাচ্ছে তানভীরের চোখের কোনে পানি চিকচিক করছে।
-” দুলাভাই,
-” হুম?”
-” কথা বলি কিছুক্ষন আপনার সাথে?”
-” হুম বলো।”
-” কাঁদবেন না প্লিজ। ছেলে মানুষকে কঁাদতে দেখলে আমিও কেঁদে ফেলি।”
-” কি করবো কি করবো না সেসব ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছি না। এমন একটা সিচুয়েশনে পড়েছি, তোমার বোনের দূরে সরে যাওয়াটা সহ্য হচ্ছে না, আবার ভালোবাসা দিয়ে তোমার বোনকে আগলে রাখতেও পারছি না। নিজের কাছেই লজ্জা লাগে যাকে এত খারাপ কথা শুনিয়েছি তাকে কিভাবে ভালোবাসার বুলি শোনাই? তবু গতকাল মনের কথা বলেছি। কিন্তু তোমার বোন মানতে নারাজ। তার কাছে এখন এসব অসহ্য লাগে। আমি দু তিনদিনেই অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছি ওর আচরনে। আর ও দেড় বছর কিভাবে সহ্য করেছে? ওর কষ্টগুলো এখন টের পাচ্ছি। কতটুকু পাচ্ছি জানি না। তবে কিছু হলেও টের পাচ্ছি। আমি যাস্ট ওকে একবার আই লাভ ইউ বলেছি। তাও এই প্রথম। ওকে বলেছিলাম আমাকেও আই লাভ ইউ বলতে। কিন্তু ও বলেনি। উল্টা আমাকে আমার কুকীর্তিগুলো মনে করিয়ে দিয়েছে। জানো আমার ভিতর ফেটে যাচ্ছিলো এটা ভেবে ও আমাকে আই লাভ ইউ বললো না। অথচ ও গত দেড় বছরে কয়শত বার যে আই লাভ ইউ বলেছে তা আল্লাহ জানে। প্রতিবারই আমি ওকে আই লাভ ইউ বলা বাদে কড়া কথা শুনিয়েছি। ওকে নির্লজ্জ, বেহায়া কত কি যে বলেছি! মেয়েটা দিনের পর দিন আমার পিছনে ঘুরেই গেছে আমি ফিরেও তাকাইনি। এখন আমি ওর পিছনে ঘুরি, আর ও নিজেকে আড়াল করে। তোমার বোনের বরাবরই আমার প্লেটের মাছের টুকরা থেকে একটু ভেঙে নিতো। প্রতিবেলায় ও এই কাজটা করতো। কি যে বিরক্ত হতাম! কয়েকদিন বকেছিও। তবুও তোমার বোন নিতোই। এক্সিডেন্ট করার পর তো পুরো দেড়মাস ওর হাতে খেয়েছি। ও আমাকে খাইয়ে পরে নিজে খেয়েছে। পরে যখন সুস্থ হয়ে নিজ হাতে খেতে শুরু করলাম তখন খেয়াল করলাম ও আর আমার প্লেট থেকে মাছ নেয়না। তিন চারদিন খেয়াল করলাম ব্যাপারটা। এরপর একদিন আমি নিজেই মাছ ভেঙে ওর প্লেটে দিলাম। ওখেলো না। আমাকে ফেরত দিয়ে দিলো। এরপর আরো দুদিন দিয়েছি। দুদিনই ফিরিয়ে দিয়েছে। ও আগের চেয়ে একটু একটু করে অনেক চেইন্জ হয়ে গেছে জানো। প্রথম প্রথম টের পাইনি। কিন্তু কয়েকদিন ধরে খুব টের পাই। কষ্ট হয় অনেক। কিন্তু ওকে বোঝাতে পারি না। আমি তো ওর সাথে শুরু থেকেই মিসবিহেভ করে আসছি। এতদিন তো ও আমার সাথে ভালোই ছিলো। হুট করে কি হয়ে গেলো ওর? বদলে গেলো কেনো এভাবে?”
-” সুহা কবে থেকে বদলেছে জানেন? ফাহিম ভাইয়ার পার্টিতে যে ঝামেলাটা হয়েছিলো সেদিনের পর থেকে। আপনি ওকে খুব বাজে কথা বলে ফেলেছিলেন দুলাভাই। ও আপনার ওয়াইফ। ওর বুকে কেউ হাত দিলেও আপনার কিচ্ছু হবে না, ও এসব ডিজার্ভ করে এগুলো কোনো কথা? নিজের বউকে কেউ এসব বলে? আপনার বউয়ের শরীরের কোথায় কি আছে সেগুলো কি বন্ধুকে বার বিষয়? আপনি সেগুলোও বলে বেড়িয়েছেন।”
– কাকে কি বলেছি আমি?”
-” রাহাতকে। সুহায়লার পিঠে তিল….. ঐ ব্যাপারটা নাকি ডিটেইলে বলেছেন?”
-” এটা সুহায়লা জানলো কিভাবে?”
-” রাহাত বলেছে।”
-” ও এসব বলে দিয়েছে?”
-” হুম।”
তানভীর মাথা নিচু করে বসে আছে। রাগ উঠছে ওর নিজের উপর আর রাহাতের উপর।
– ” যে ব্যাপারগুলো জানার অধিকার একমাত্র একটা মেয়ের হাজবেন্ডের আছে, কোনো মেয়ে যখন জানতে পারবে যে তার হাজবেন্ড সেই ব্যাপারগুলো অন্য পুরুষে কাছে শেয়ার করে বেড়াচ্ছে তখন তার কেমন লাগবে? সেই পুরুষ আবারকথাগুলো তাকে সব শোনাবে। অবস্থাটা বুঝতে পারছেন? যে শুধুমাত্র আপনার তাকে আপনি সবার মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন। আপনি নিজে ওকে খারাপ নজরেদেখে এসেছেনসেটা আপনাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকলে মেনে নেয়াযেতো। সুহা মেনেও নিয়েছিলো। কিন্তু সবার মাঝে কথাগুলো এনে কতটুকু অসম্মান ওকে করেছেন ভেবে দেখেন তো?”
-” বিশাল বড় অন্যায় হয়েছে আমার। এখন আমি কি করবো? যা করে ফেলেছি তা তো বদলাতে পারবো না।তোমার বোনকে ছাড়া থাকা অসম্ভব।ওর আস্তে আস্তে দূরে সরে যাওয়াটা একদম মানতে পারছি না। আগের সুহায়লাকে অনেক বেশি মিস করি আমি। ওর মতো ধৈর্য্য ধরা আমার পক্ষে সম্ভব না। এই কয়দিনেই মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আরো কিছুদিন এভাবে গেলে বোধহয় পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। কি করা উচিত এই মূহূর্তে সাবা?”
-” আমি জানি না কি করা উচিত। সুহা মনের দরজায় খিল দিয়েছে দুলাভাই। আমি আপনাকে আগেই সতর্ক করেছিলাম। আপনি শোনেন নি আমার কথা। ওর আত্মসম্মান খুব বেশি। এত অপমান সহ্য করে কিভাবে এতদিন আপনার সংসার করলো সেটাই মাথায় আসে না। ও যেমন মেয়ে, হিসেবে তো আরো আগেই চলে আসার কথা।”
-” এই জানোয়ারটাকে ভালোবেসে ফেলেছে তো তাই ছেড়ে যেতে পারে নি। জানোয়ার থেকে মানুষ হয়েছি এখন আর আমাকে ও ভালোবাসে না।”
-” এখনও বাসে দুলাভাই। কিন্তু ঘৃনার নিচে চাপা পড়ে গেছে।”
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here