বসন্ত বেলায় পর্ব -০১

#বসন্ত_বেলায়
#মনিয়া_মুজিব

|১|

ঘুমু ঘুমু চোখে আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরে তাকালো রায়া৷ দেখতে পেল তার পাশের সীটে বসা মেয়েটি ফোনে কারো সাথে অনবরত কথা বলে চলেছে। আনমনে মেয়েটার বয়স আন্দাজ করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু মেয়েটির আপাদমস্তক বোরকা, হিজাব, নিকাবে আবৃত থাকায় বয়সটা ঠিক ঠাওর করা গেল না। তবে কথা শুনে মনে হচ্ছে মেয়েটি তার থেকে বছর পাঁচেকের ছোট হবে হয়তো। অবশ্য কণ্ঠ শুনে বয়স ঠিকঠাকভাবে বুঝে ফেলা নিতান্তই কঠিন। ছোট কণ্ঠের কথায় মনে হচ্ছে ফোনের ঐ প্রান্তের ব্যক্তিটি হয়তো মেয়েটার স্বামী বা প্রেমিক। সে ভাবনাও নিতান্তই অমূলক। তবে রায়ার ভাবতে ভালো লাগছে। রায়া রাজশাহী থেকে বাসে করে ঢাকায় ফিরছে। রাত হওয়ায় তার চোখদুটো লেগে গিয়েছিল। রংপুর তার শ্বশুর বাড়ি। তার স্বামী ফারাজ ঢাকায় চাকরি করে। স্বামীর কাছেই ফিরছে সে। তার বাবার বাসাও ঢাকাতেই। পাশের মেয়েটি ফোনে কথা বলা শেষে রায়ার দিকে তাকালো। হাসি হাসি মুখ করে বললো,
“ওঠে গেছেন আপনি। আমি কি খুব বেশি জোরে কথা বলছিলাম?”
“না না, তা নয়। এমনিতেই ওঠে পড়েছি। আপনার হাসবেন্ড ছিল?”
“হ্যাঁ। আর বলবেন না একটু পরপর ফোন দিচ্ছে। এই প্রথম বাবার বাসা থেকে স্বামীর বাসায় একা যাচ্ছি। তাই উনি খুবই চিন্তিত।”

রায়া সন্তর্পণে একটা দী র্ঘ শ্বা স ছাড়ল। দু’ঘণ্টা যাবত সে বাসে বসে আছে। একটাবারের জন্যও ফারাজ কল করেনি। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সে নিজ থেকেই ফারাজকে ফোন দিয়ে জানিয়েছিল। এরপর আর কথা হয়নি। সে স্বাভাবিকভাবে পাশের ব্যক্তিকে প্রশ্ন করলো,
“আপনার বাবার বাড়ি কি রাজশাহীতে?”
“জি, আর আপনার?”
“শ্বশুর বাড়ি।”
“আমি আঈদাহ্। আপনার নামটা কি জানতে পারি?”
“আমি রায়া। ঢাকায় আমার স্বামীর কাছে যাচ্ছি। বাবার বাড়িও ঢাকাতেই।”
“ঢাকায় কোথায় যাবেন?”
“মতিঝিল, আপনি?”
“ধানমন্ডি। আমার মনে হচ্ছে আমি আপনার জুনিয়রই হবো। আমাকে তুমি করেই ডাকতে পারেন।”
“জি আচ্ছা। এসো একদিন মতিঝিল, আমাদের বাসায়, তোমার স্বামীকে নিয়ে।”
“যাব ইনশাআল্লাহ। আপনিও আসবেন ভাইয়াকে নিয়ে। স্টেশনে ভাইয়া নিশ্চয়ই থাকবেন। দেখা হয়ে যাবে মনে হয়। দিগন্তও আসছে আমাকে নিতে।”
“দিগন্ত!”
“আমার হাসবেন্ড।”
“ও আচ্ছা।”
“এই যে দেখুন আবার কল করেছে। দশ মিনিটও হয়নি ফোন রাখলাম।”

আঈদাহ্ দিগন্তের সাথে অবিরাম কথা বলে চলেছে। অন্যদিকে রায়া আবার সীটে হেলান দিয়ে আরাম করে বসল। অতঃপর নিমীলিতলোচনে সে ডুব দিল অতীতের কোনো এক অঙ্গনে।


বরাবরের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল খুবই জাঁকজমকপূর্ণভাবে। টিএসসি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে হয়ে উঠেছিল নানা বর্ণে বর্ণীল। নবীন শিক্ষার্থীদের কিচিরমিচির বোলে মুখরিত ছিল সমগ্র টিএসসি প্রাঙ্গণ। অনুষ্ঠানে অন্যদের পাশাপাশি পঁচানব্বইতম ব্যাচের অনেক নবীন শিক্ষার্থীরা তাদের বক্তব্য রেখেছিল। সেখানে নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রথমেই বক্তব্য রাখে রসায়ন বিভাগের দুজন শিক্ষার্থী, রায়া ফারদিন আর দিগন্ত শাহরিয়ার। সেই বক্তব্য থেকেই সূচনা ঘটে এক নতুন ও রঙিন কাব্যগাঁথার। তার ঠিক মাসদেড়েকের মাঝেই রসায়ন বিভাগে ছড়িয়ে পড়ে রায়া আর দিগন্তের নব্য রসায়নের কথা। ক্লাসের প্রতিটি শিক্ষার্থী জানে এখন রায়া যদি অক্সিজেন হয় তাহলে হাইড্রোজেন হচ্ছে দিগন্ত। এই দুইয়ে মিলে তৈরি করে জীবনের জন্য অবধারিত আরেক জীবন। অবশ্য তারা দুজনেও কোনো প্রকার রাকঢাক রাখে নি তাদের সম্পর্কে। অনায়াসে ঘুরে ফিরে আর পাঁচটা সাধারণ প্রেমিক প্রেমিকার মতো। একসাথে ক্লাসে আসা, রাত জেগে কথা বলা, এটা সেটা নিয়ে সারাক্ষণ লেগে থাকা সবই হতো তাদের দুজনার মধ্যে। এমনকি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা ক্লাসের মোস্ট ফেভারিট কাপল বনে গেল। এভাবেই মান-অভিমান, হাসি-আনন্দে তাদের দিন কেটে যেতে লাগল। কিন্তু ভার্সিটির তৃতীয় বর্ষে উঠতেই চেনাজানা প্রেমের ছকটা হঠাৎ করেই যেন পালটে গেল। দিগন্তের সহপাঠী প্রেমিকা রায়ার জীবনে অসময়ের কোকিল তার মনমাতানো কুহুরবে নববসন্ত জাগিয়ে তুলতে ফের সক্ষম হলো।

দিগন্ত শাহরিয়ার, প্রকৌশলী দম্পতির একমাত্র পুত্রের জন্ম ও বেড়ে উঠা ঢাকাতেই। পড়াশোনাও করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে। যদিও বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে একদিন ওনার থেকে বড় প্রকৌশলী হবে। কিন্তু বিধি বাম, ক্লাস নাইনে পড়ার সময়কালে কোনো এক শিক্ষকের মুখে শুনেছিল, ‘সাইন্সের রয়্যাল সাবজেক্ট হলো রসায়ন।’ সেই থেকে রসকষহীন ছেলে দিগন্ত শাহরিয়ারের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলো জৈব ও অজৈব রসায়ন। রসায়ন বইয়ের প্রতিটি বিক্রিয়া আর ইকুয়েশন ছিল তার ঠোঁটের ডগায়। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিট লিস্টে নাম আসার পর সাবজেক্ট চয়েজলিস্টে সিএসই, ইইই ব্যতিরেকে সর্বপ্রথম স্থানটা দখল করার সুযোগ দিয়েছিল এই রসায়নকেই। আর মিলেও গেল তাই। পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দের সাবজেক্টের পেলে আর কি চাই! না চাইলেও দিগন্ত শাহরিয়ারের পাওয়ার তালিকায় যুক্ত হলো আরও একটি শব্দ, প্রেমিকা। কোনোদিন প্রেমে পড়ব না বলা রসকষহীন ছেলেটাই প্রেমে পড়ে গেল নিজ ডিপার্টমেন্টের অতি সুন্দরী সহপাঠী রায়া ফারদিনের। প্রেমের সূত্রপাত রায়ার দিক থেকে হলেও দিগন্ত যথেষ্ট সায় দিয়েছে তাতে। ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে রায়া ভীষণ উচ্চাকাঙ্খী, চটপটে আর বাকপটু। মানুষকে নিজের দিকে আকর্ষিত করার অসম্ভব ভালো দক্ষতার অধিকারিণী সে। তাইতো দিগন্তের মতো ছেলেকেও নাকে দঁড়ি দিয়ে ঘোরাতে সক্ষম হয়েছে। দিনের পর দিন তার মন নিয়ে খেলে বেরিয়েছে প্রেমের দুনিয়ার এই উঠতি খেলোয়াড় রায়া ফারদিন।


অতীতের পাতায় বিচরণ করতে গিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে গেল রায়া। বুকের ভেতরটাতে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল একসময় তারও এক দিগন্ত ছিল। সেও একটু পরপর খোঁজ নিত রায়ার। পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর কল করতো। এটা নিয়ে রায়ার কত রা গা রা গি, কত ঝ গ ড়া, ঝা মে লা। একসময় দিগন্তের এহেন আচরণের জন্য তাকে বিরক্ত লাগতে শুরু করে রায়ার কাছে। সম্পর্কে অতিমাত্রায় তি ক্ত তা আসায় এবং হাজারদিকে রায়ার নজর হের ফের হওয়ার দরুন একসময় তাদের ব্রে ক আ প হয়ে যায়। অথচ এতো কাঠ খড় পুড়িয়ে যে জীবন সে পেল সেখানে আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ভালোবাসার মানুষ একটা খোঁজ নেয় না তার। সে তো এটাই চেয়েছিল যে কেউ তাকে বিরক্ত না করুক। তাহলে আজ কেন ফারাজের ব্যবহার মেনে নিতে পারছে না রায়া। মানুষ সত্যিই বড় অদ্ভুত জীব। একসময় রায়ার কাছে দিগন্তের ক্ষণে ক্ষণে খোঁজ নেওয়া ভালো লাগতো না। আর এখন ফারাজের নির্জীবতা ভালো লাগছে না। আরো একটা বিষাদমিশ্রিত দী র্ঘ শ্বা স বেরিয়ে আসে রায়ার বুক চিঁড়ে।

বাস থামার শব্দে রায়ার ধ্যান ভাঙলো। হকচকিয়ে জানালার বাইরে তাকাতেই বুঝতে পারল বাস এখন সিরাজগঞ্জে যাত্রাবিরতি দিতে থেমেছে। পাশ ফিরে সে দেখল আঈদাহ্ নামের সে মেয়েটি এখনো সীটে হেলান দিয়েই বসে আছে। নামার কোনো লক্ষ্মণও তার মাঝে নেই। বাধ্য হয়েই রায়া জিজ্ঞেস করে বসলো,
“তুমি কি এখানে নামবে না? একটু ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নিতে পারতে তো!”

আঈদাহ্ বিনয়ের সাথে উঠে দাঁড়িয়ে রায়ার বের হওয়ার জায়গা করে দিতে দিতে জবাব দিল,
“না আপু, পাবলিক প্লেস আমি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলি। আর এসব হোটেলে অনেক মানুষ থাকে, আমার অস্বস্তি হয়।”

রায়া বুঝে উঠতে পারল না পাবলিক প্লেসে
অস্বস্তি হলে এই মেয়ে পাবলিক বাসে কি করছে। হাসবেন্ডকে বলে প্রাইভেট কারের ব্যবস্থা করে নি কেন? ধুর ছাই! এর মধ্যে আবার তার হাসবেন্ড এর কথা মাথায় এলো কেন? সে কি মেয়েটাকে মনে মনে হিংসে করা শুরু করলো নাকি! না না, এমনটা কখনোই হওয়ার নয়। জীবনে যত খারাপ পরিস্থিতি ই আসুক না কেন রায়া ফারদিন কাউকে হিংসে করতে পারে না। বুকে চাপা কষ্টগুলোকে একে একে গলাধঃকরণ করে মনকে কঠোরভাবে শাসিয়ে বাস থেকে নেমে হোটেলের পথে হাঁটা ধরলো সে।

~চলবে~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here