বাসন্তীগন্ধা পর্ব -১০

#বাসন্তীগন্ধা
|১০|
লাবিবা ওয়াহিদ

হঠাৎ ইলিরার ডাকে মেহেরের ধ্যান ভাঙলো। মেহের পলক ফেলে তাকাতেই দেখলো ইলিরা তারই দিকে এগিয়ে আসছে। ঠোঁটে তাঁর হাসি ঝুলে রয়েছে। মেহের হাসার চেষ্টা করলো। ইলিরা মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

–“কেমন আছো? ডাকলাম, শুনলে না যে?”

মেহের সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলে,
–“ভালো আছি। খেয়াল করিনি। তা তুমি হুট করে আসলে যে?”

ইলিরা অধর জোড়া আরও প্রসারিত করে বললো,
–“তোমার ভাইয়ার সাথে মিট করতে আসলাম। কী মনে হয়, আমার এই রূপ দেখে পটবে তো?”

ইলিরার কথাগুলো মেহেরের মাথার উপর দিয়ে গেলো। মেহের ভ্রু কুচকে বলে,
–“ভাইয়া মানে? কার কথা বলছ আপু?”

–“ওহ, কাম অন মেহের। সারিমের কথা বলছি আমি!”

বুকটা হঠাৎ কেমন কেঁপে উঠলো মেহেরের। পরমুহূর্তে মেহের নিজেকে সামলে বললো,
–“ও..ওহ! তোমার তো বন্ধু-ই হয়!”

ইলিরা এবার লাজুক হেসে বললো,
–“এবার বন্ধুর থেকে বড়ো কিছু হতে যাচ্ছে। তোমার মতো কিউট ননদ পাবো আমি। হাউ লাকি আই এম। এনিওয়ে, তোমার ভাই কোথায় বলো তো? এত সুন্দর করে যার জন্যে সেজে আসলাম, তাকেই তো পেলাম না। কলটাও ধরছে না!”

কেমন যেন অস্থিরতা অনুভব করলো মেহের। বুকের বা পাশটা কেমন চিনচিন করছে তার। নিজেকে ধাতস্থ করে মেহের আটকে গলায় বললো,
–“ওহ। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি আপু!”

–“ওহ। স্যরি। কথার ব্যস্ততায় তোমার মাত্র ফেরার কথা খেয়ালেই আসেনি। যাও।”

মেহের নিশ্চুপ হয়ে ধীর পায়ে উপরে চলে গেলো। কেমন অস্থির অনুভব করছে মেহের। এর কারণ কী? ইলিরা সারিমকে পছন্দ করে বলে, নাকি সারিমের সাথে ইলিরাকে মানতে পারছে না? এই তিক্ত অনুভূতিটা কিসের? কেন তাঁর চোখ ফেটে অশ্রু বেরিয়ে আসতে চাইছে? মনের মাঝে তাঁর কিসের এত হাহাকার?

এদিকে মেহেরের দাদী গম্ভীর মুখ করে বসে আছে। কোনো এক কারণে তিনি ভীষণ রেগে আছেন। জ্যুতি এর মাঝে দাদীর রুমে প্রবেশ করলো। জ্যুতি আমতা আমতা করে বললো,

–“ইলিরা মেয়েটা আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে মা!”

দাদী তেঁতে ওঠেন। গলায় কাঠিন্য এনে বললেন,
–“খবরদার ওই মেয়ে আমার ঘরের ত্রি-সীমানায়ও যাতে না আসে। পোশাক-আশাকের কোনো রূচি নেই তো নেই, আজ আবার কী মতলবে শাড়ী পরে উদয় হয়েছে? এই মেয়েকে দেখলে আমার পাপ হবে!”

জ্যুতি নিচু স্বরে বললো,
–“তাও মা, মেয়ে মানুষ! আর সারিমের…”

–“আমার নাতীর রূচি এত বাজে তা তো জানা ছিলো না। আমার বাড়ির মেয়েদের দেখেছো মাথায় ঘোমটা ছাড়া কোথাও বের হতে? সময় থাকতে বিদায় করো এই মেয়েকে, নয়তো আমাদের বাড়ির মেয়েরা এর ছায়াতলে পরলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”

বলেই “আস্তাগফিরুল্লাহ”, “নাউজুবিল্লাহ” পড়তে শুরু করলেন দাদী। জ্যুতি কিছুতেই বোঝাতে পারলো না শহুরে মেয়েদের চলাফেরার ধরণ। সব পরিবার তাদের মতো না, সেটাও বোঝাতে অক্ষম হলো।

—————-
মেহের নিচে নামলে দেখলো ইলিরা এখনো বসে আছে। বর্তমানে সামিরার সাথে খোশগল্পে মত্ত সে। মাহিম তাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেলো। ইদানীং সারিম তাকে দিয়ে আসে এবং আসার সময় মাহিম তাকে নিয়ে আসে। এভাবেই চলছে মেহেরের দিনকাল। সেদিনের পর অবশ্য অভির দেখা পায়নি মেহের। এখন ভুল করেও ভার্সিটিতে পা ফেলে না মেহের। সেদিনের পর তার দারুণ শিক্ষা হয়েছে।

ইলিরা তাকে দেখে মুচকি হেসে কাছে ডাকলো। মেহের ধীর পায়ে ইলিরার দিকেই এগোলো। প্রথমবারের মতো ইলিরাকে তার পছন্দ হচ্ছে না। কেন পছন্দ হচ্ছে না জানা নেই তবে সারিম এবং ইলিরাকে বারবার কল্পনায় গুলাচ্ছে সে। যা তার চিনচিন ব্যথা ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইলিরা মেহেরের দিকে চেয়ে হেসেই বললো,
–“ছোট্ট মেহের বাবুটা কত বড়ো হয়ে গেছে তাই না সামিরা?”

সামিরা আলতো হেসে বলে,
–“সময় কার জন্যে বসে থাকে বলো, আপু? সময় গড়িয়েছে মেহেরও ধীরে ধীরে আঠারোতে পা দিলো।”

–“হ্যাঁ, ঠিক বলেছো।”

ইলিরা এবং সারিমের বয়সে তিন বছরের ডিফারেন্স। তাও এক বন্ধুর মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। পরে কীভাবে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো কেউ বুঝলো না।

জ্যুতি খেতে ডাকলে ওরা তিনজন একসাথেই লাঞ্চ করলো। ইদানীং শীত কিছুটা কমে এসেছে। শহরে এখন হাড় কাঁপানো শীতের ছোঁয়া নেই। তাই সেরকম শীত এবার অনুভব হয়নি। ইলিরা প্ল্যান করছে ভ্যালেন্টাইন নিয়ে। এদিকে মেহের বিধ্বস্ত সারিমকে নিয়ে ভেবে ভেবে।

ইলিরা যেন আজ পণ করেছে সারিমের সাথে মিট না করে সে ফিরবে না। এদিকে রাস্তায় সারিমের সাথে হুট করে মাহিমের দেখা হয়ে যায়। মাহিম সারিমকে দেখেই সাবধানতার সাথে বললো,
–“ভুল করেও এখন বাড়িতে যেও না ভাইয়া!”

সারিম ভ্রু কুচকে তাকালো মাহিমের দিকে। সারিমের চাহনি বুঝতে পেরে মাহিম আবার বললো,
–“ইলিরা আপু নাকি বাড়িতে এসেছে। তোমায় ইমপ্রেস করতে শাড়িও পরে এসেছে। মেহেরকে নাকি অলরেডি ননদ বানিয়ে ফেলেছে। এ কারণে বেচারীর প্রায় কাঁদা কাঁদা অবস্থা!”

সারিম বেশ চমকালো। হতভম্ব স্বরে আওড়ালো,
–“মেরুর কান্না আসবে কী করে?”

মাহিম গালে হাত গুঁজে কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বললো,
–“ওর ভেতরে তো মনে হচ্ছে তোমাকে নিয়ে কিছু চলছে। পড়তে বসলে লক্ষ্য করি তোমায় দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। কিন্তু… তোমার সাথে মেহেরের…”

মাহিম আঙুল তুলে একবার সারিমের দিকে তো একবার শূণ্যে ইশারা করে আবার আকাশ পাতাল ভাবনায় মত্ত রইলো। সারিমও কিছুক্ষণ ধ্যানে থাকার পর হঠাৎ-ই মিনমিন করে বলে ওঠে,
–“ইলিরা আমার বউ হতে চাইলে তোর এত ফাটছে কেন রে মেরু?”

–“কিছু বললে?”
সারিম চমকে চাইলো মাহিমের দিকে। পরমুহূর্তে হেসে দিয়ে বললো,
–“না কিছু না। তবে মনে হচ্ছে বাসায় যাওয়া উচিত!”

———————
প্রায় নয়দিন কেটে গেলো রোজার কোনো দেখা পায়নি সাইয়ান। সেদিন রোজার বলা কথাটার পর কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি, শূণ্যতা সাইয়ানকে গ্রাস করেছে। সে ঘুমাতে গেলে অস্থির অনুভব করে। আঁখিদ্বয়ে বারংবার রোজার মলিন মুখশ্রীটা ভেসে ওঠে। কানে পিয়ানোর মতো প্রতিনিয়ত বাজতে থাকে রোজার বলা কথাগুলো।

মাঝে দিয়ে একদিন তাকে বাইরের খাবার খেতে হয়েছিলো, এ নিয়ে অসুস্থতায় তাঁর দুটো দিন কেটে যায়। অফিস গেলেও দু’বেলা রোজার শূণ্য ডেস্কের দিকে তাকাতে সে ভুলে না। এই শূণ্যতায় সাইয়ানের অনুভব হয়, সে তার নিত্যদিনের অভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ কাউকে হারিয়ে ফেলেছে, যে তাকে তার একাকিত্বে সঙ্গ দিয়েছে, নিজ উদ্যোগে সাইয়ানের সবকিছুতে খেয়াল রেখেছে। এসবের চাইতেও বেশি বিষাক্ত হচ্ছে রোজার বলা শেষ কথাটা। সাইয়ান যেন মানতেই পারছে না রোজার বিয়ের কথাটা। রোজার বিয়ে মানে তো এই অদেখা রোজা অদেখাই থেকে যাবে। বিয়ের পরপর তার হাসবেন্ড তো কখনোই তাকে চাকরি করতে দিবে না। এছাড়া রোজা অন্যকারো হবে এটাই তার মাথা ব্যথা বাড়িয়ে তুলছে। বিবাহিত রোজার সাথে আগের মতো মিশতেও পারবে না সে। আচ্ছা, যদি রোজা কখনোই ফিরে না আসে?

হাতে কলম ঘুরাতে ঘুরাতে সাইয়ান আকাশ-পাতাল ভাবতে ব্যস্ত নিজ কেবিনে। এর মাঝে সাইয়ানের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট এসে জানালো,
–“মিস রোজা এসেছে স্যার। তাকে কী ডেকে দিবো?”

~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here