বাসন্তী প্রেম পর্ব ২০

#বাসন্তী_প্রেম 🌼🌼
#লেখনীতে: ইনায়াত আহসান ( ছদ্মনাম)
#বিংশ_পর্ব

– ” ড,ড্,ডক্টর রূপ!”
বিস্ফোরিত নয়নে রূপের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে চন্দ্রিকা।
দুজনের চোখাচোখি হতেই রূপ বিনিময়ে একটা মুচকি হাসি দেয়। চন্দ্রিকার কাছে সবকিছু যেন এখনো ঘোরের মতো লাগছে। তার সুক্ষ্ম ভাবনায় ছেদ পড়ে রূপের মায়ের কথায়।
– ” আচ্ছা এখন তো অনেক কথা হলো; রূপ আর চন্দ্রিকাকেও না হয় এবার আলাদা করে কথা বলতে দেয়া যাক!”
রূপের মায়ের কথায় হালকা নড়েচড়ে উঠে চন্দ্রিকা। হুট করেই যেন নার্ভাসনেস কয়েক গুণ পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে যেখানে সে আর রূপ আগে থেকেই পরিচিত।
– ” জী আপা অবশ্যই! পূরবী, তুমি রূপকে নিয়ে যাও। ”
না চাইতেও জোরপূর্বক দাঁড়িয়ে হাঁটা দিল চন্দ্রিকা। আর তাকেই অনুসরণ করে পিছু পিছু চলে রূপ।

বিকেলের আকাশে সূর্য অস্তায়মান‌। রোদের প্রখরতা নেই বললেই চলে। প্রবাহমান বাতাসের শীতল স্পর্শ কিছুক্ষণ পর পর ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে চন্দ্রিকাকে‌। যার ফলস্বরূপ কোমর অবধি লম্বা খোলা চুলগুলো তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। আর তার ঠিক সামনেই কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে রূপ। দুজনের মাঝেই পিনপতন নীরবতা। মিনিট পাঁচেক বাদে নীরবতার সমাপ্তি ঘটিয়ে চন্দ্রিকা খানিকটা শান্ত গলায় বলে ওঠে,
– ” এসবের মানে কি ডক্টর রূপ?”
চন্দ্রিকার প্রশ্নে সোজা হয়ে দাঁড়ায় রূপ। গলা হালকা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠে,
– ” কোন সব? কিছু কি হয়েছে?”
না জানার ভান করে এদিক সেদিক তাকিয়ে বলে রূপ। এতে করে খানিকটা রেগে যায় চন্দ্রিকা। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব সামলে আড়চোখে তাকিয়ে বলে উঠে,
– ” আমি মজা করছি না ডক্টর রূপ। আমি সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করছি; এসবের মানে কি? আপনি ভালো করেই জানতেন যে আমার এসব বিয়ে, ভালোবাসা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই আর না এগুলোর সাথে কখনো জড়াতে চাই!
আপনি সবটা জানার পরেও কেন বিয়ে নিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন?”
চন্দ্রিকার রুক্ষ কন্ঠস্বর শুনে রূপের মুখের হাসি উবে গেল। নিজের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে গাম্ভীর্য ভাব এনে বলা শুরু করে,
– ” হ্যাঁ আমি জানি আমি কি করেছি!
তবে চন্দ্রিকা এখানে নিশ্চয়ই কোনো ভুল নেই। আর যদি আমি তোমার আঙ্কেলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব না আনতাম তাহলে ইয়াসিন আঙ্কেল তোমার বিয়ে অন্য আরেকটা ছেলের সাথে দিয়ে দিত।”
– ” মানেহ্?”
– ” হ্যাঁ ইয়াসিন আঙ্কেল তোমার অজান্তেই তোমার বিয়ের প্ল্যানিং করছিল এন্ড ফরচুনেটলি এই ব্যাপার নিয়ে তিনি আমাকেও বলেছিলেন!
আর এটা আমি কখনোই হতে দিব না যে নিজের চোখের সামনে প্রিয় মানুষটিকে অন্য কারো হাতে তুলে দিতে।”
রূপের কথাবার্তা শুনে অবাক হয় চন্দ্রিকা। বিস্ফোরিত চোখে রূপের দিকে তাকায় সে।
– ” কি বলছেন আপনি ডক্টর রূপ? প্রিয় মানুষ মানে?”
– ” কাম অন চন্দ্রিকা। তুমি এতটাও ইম্যাচিউর নও যে আমার কথা বুঝতে পারো নি!
আমি জানি তুমি ভালো করেই জানো যে আমি তোমাকে ভালোবাসি; আর তুমি জেনে শুনে ইচ্ছে করেই সবটা জেনেও এড়িয়ে গিয়েছ আমায়।”
রূপের কথায় কিঞ্চিৎ কেঁপে ওঠে চন্দ্রিকা। কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু দুশ্চিন্তার ঘাম ঝড়ছে। রূপ সবটা জানত তাহলে ভাবতেই মাথা ঝিমঝিম করা শুরু করে দিয়েছে ইতোমধ্যে।
– ” আপনি তো তাহলে সবটা জানতেন ই! তাহলে শুধু শুধু কেন যেচে আবারো আমার কাছে এসেছেন? আমি তো বলেছিই যে আমি কাউকে বিয়ে করতে পারব না।”
– ” ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড চন্দ্রিকা। আমার ইনটেনশন‌ খারাপ না; আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই বিয়ের প্রপোজাল টা দিয়েছি! আমি তোমাকে হারাতে চাই নি। আমাকে প্লিজ ফিরিয়ে দিও না!”
– ” আমি জানি আপনার ইনটেনশন খারাপ না ডক্টর রূপ! আর আমি এটাও বলছিনা যে আপনি খারাপ। তবে ঐ যে একটা জিনিস বিশ্বাস! সেটাই দ্বিতীয় বারের মত করা কখনোই সম্ভব না।”
– ” আমি কথা দিচ্ছি আমি আমার বেস্ট তোমাকে দিব! সবসময় আগলে রাখব, ভালোবাসব! তবুও এই বিয়েতে রাজি হয়ে যাও। তোমাকে আমার ভালোবাসতে হবে না ; বরং শুধু দিনশেষে আমার সাথে থাকলেই চলবে! প্লিজ চন্দ্রিকা, আই রিকোয়েস্ট ইউ‌।”

– ” আর আমি যদি এ বিয়েতে রাজী না হই তাহলে? ”
স্থির দৃষ্টিতে রূপের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠে চন্দ্রিকা। রূপের দৃষ্টিও স্থির‌। তবে সে দৃষ্টিতে আছে একরাশ অভিযোগ, অসহায়ত্ব আর একরাশ ভয়।

পুরোটা বিকেল এক অজানা আতংকের মধ্য দিয়ে কেটেছে সিরাতের‌। সকালে রিয়ার বলে যাওয়া কথাই শুধু মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। তাছাড়া দিনকে দিন তাকে নিয়ে ফাইয়াজ আর জাফর সাহেবের মাঝে বেড়ে যাওয়া দ্বিধাদ্বন্দ্ব তাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। রুমের মধ্যে বসে এতক্ষণ এগুলোই ভাবছিল সিরাত‌। তার সুক্ষ্ম ভাবনায় ছেদ পড়ে রুমের দরজা খোলার খটখট শব্দে।
– ” আসতে পারি? ”
হঠাৎ করে সাবিনা বেগমের কথায় একটু নড়েচড়ে উঠে সিরাত‌।
– ” আন্টি আপনি? ভেতরে আসুন।”
সিরাতের কথা শুনে গুটি গুটি পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন সাবিনা বেগম। মুখশ্রী জুড়ে হাসি হাসি ভাব তার।
– ” জি বলুন আন্টি; কিছু হয়েছে? ”
– ” না তেমন কিছুই হয় নি! একটু দেখা করতে আসলাম তোমার সাথে। আসলে এ বাড়িতে আসার পর তোমার সাথে তেমন করে কোনো কথাই হয়নি। তাই ভাবলাম আজ কিছুক্ষণ সময় কাটানো যাক!”
সাবিনা বেগমের কথার বিনিময়ে একটা মুচকি হাসি দেয় সিরাত‌।
– ” তুমি কি ফাইয়াজকে ভালোবাসো সিরাত ঠিক যেমন ফাইয়াজ তোমাকে ভালোবাসে? ”
মিসেস সাবিনার প্রশ্নে মুহূর্তেই থমকে যায় সিরাত‌। মুখে লেগে থাকা হাসির রেখাটুকু ও নিমিষেই মিলিয়ে যায়। সিরাতকে এভাবে চুপচাপ হয়ে যেতে দেখে মিসেস সাবিনা ধীর গতিতে নিজের হাতটা সিরাতের কাঁধের উপর রাখলেন।
– ” আমি জানি তোমার মনের ভেতর কি চলছে সিরাত। হ্যাঁ ও না এই দুইয়ের মাঝে দ্বন্দ্বে পেরে ওঠা খুবই কঠিন। তবে হ্যাঁ একটা কথা ফাইয়াজের তোমার প্রতি ভালোবাসাটা কিন্তু সত্যি। একজন মা হয়ে নিজের সন্তানের ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা অন্তত আমার আছে। আর সেটা থেকেই তোমাকে বলছি, ফাইয়াজ তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে! তুমি ও ঠিক তাকে ভালোবাসো কি না সেটা আমার জানা নেই তবে তুমি যে ফাইয়াজকে ভালোবাসলে ঠকবে না এটা অন্তত ভরসা করতে পার।”
সাবিনা বেগমের প্রশ্নোত্তর অনেকাংশেই দূর করে দেয় সিরাতের মনে থাকা দ্বিধাদ্বন্দ্বকে‌। নিজের প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতেই মুচকি হেসে ধীর গতিতে গিয়ে মিসেস সাবিনাকে জড়িয়ে ধরে। মিসেস সাবিনা ও নিজের উত্তর পেয়ে সিরাতের মাথায় হাত বুলাতে শুরু করেন।
– ” উহুম উহুম! নতুন মেয়েকে পেয়ে সব আদর নতুন মেয়েকেই দেয়া হচ্ছে। বাড়িতে যে আমার মতো একটা কিউট, সুইট মেয়ে আছে তা তো সবাই ভুলতেই বসেছে। ”
সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ ফুলিয়ে কথাগুলো বলে উঠে ফারিহা। আর সে কথা শুনতেই উচ্চশব্দে হেসে উঠে সিরাত এবং মিসেস সাবিনা দুজনেই।

ঘড়িতে রাত আটটা বাজে,,
এখনো ফাইয়াজের বাড়িতে ফেরার কোনো নাম গন্ধ নেই। সকাল সকাল একটা কনসার্টের উদ্দেশ্যে যে বেরিয়েছে এখনো ফেরার কোনো নাম গন্ধ নেই। বেডরুমে বসে আনমনে পছন্দের লিস্ট থেকে কিছু গান শুনছিল সিরাত‌।
” তুমি যাকে ভালোবাসো,
স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো;
তার জীবনে ঝড়!
তোমার কথার শব্দদূষণ; তোমার গলার স্বর
আমার দরজায় খিল দিয়েছি,
আমার দারুণ জ্বর!
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর!”
আচমকা দরজার অপর প্রান্ত থেকে কড়া নাড়ার আওয়াজ পেয়ে সজাগ হয়ে ওঠে সিরাত। ধীর পায়ে এগিয়ে দরজা খুললেও অপর পাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। মনের ভ্রান্তি মনে করে পেছন দিকে পা বাড়াবে এমন সময় আবারো সিঁড়ির কাছে কিছু পড়ার শব্দ হয়। এবার খানিকটা সন্দেহের সৃষ্টি হয় সিরাতের মনে। গুটি গুটি পায়ে সিঁড়ির দিকটায় এসে আরেক পা দিতেই পায়ে তেল জাতীয় পদার্থের সংস্পর্শে পা পিছলে পড়ে যেতে নিলেই এক জোড়া শীতল পুরুষালী হাত তার কোমরের সংলগ্ন জড়িয়ে ধরে। এতে করে চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে যায় সিরাত‌। মুখ দিয়ে টু শব্দ ও বের হয় না।…………..

#চলবে 🍂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here