বিকেলে ভোরের ফুল পর্ব ৯

#বিকেলে_ভোরের_ফুল

#পর্ব_৯

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

দরজা খুলতেই গার্ড দুজন ভেতরে ঢুকলো। তবে আজ সাথে একটা মেয়েও আছে। পরনে তার শার্ট আর জিন্স। ওদের ভেতরে আসতে দেখে ভয়ে ফুল কাঁচুমাচু হয়ে যায়। এরা কিছু করবে না তো??ফুলকে যদি মেরে ফেলে??এই ভয়ে ফুল আরও গুটিয়ে যায়। মেয়েটা ফুলের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতের ব্যাগটা থেকে একটা কালো রঙের বোরকা বের করে দিল। আর ইশারায় পরতে বললো। ফুল ভয়ার্ত চোখে স্পর্শর দিকে তাকালো। স্পর্শও ইশারায় বোরকাটা পরতে বলে বাইরে চলে যায় সাথে গার্ড দুজনও চলে যায়। মেয়েটা ফুলকে বোরকা পরিয়ে দিল আর একটা কুশন নিয়ে ফুলের পেটে বেঁধে দিল। বাইরে থেকে কেউ দেখলে বুঝবে যে মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। ফুল বুঝতে পারছে না যে মেয়েটা এসব কি করছে ওর সাথে তবুও চুপ করে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছে না। মেয়েটা টেপ দিয়ে ফুলের মুখটা আটকে দিয়ে নেকাবটা দিয়ে মুখটা ঢেকে দিলো। যাতে ফুলকে কেউ যেন চিনতে না পারে। তারপর মেয়েটাও একটা বোরকা পড়ল। ফুলের হাত ধরে বাইরে এসে বলল,

–“স্যার আমরা রেডি চলুন।”

স্পর্শ ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
–“ওকে,,,,,,। এক মিনিট।”

স্পর্শর কথায় সবাই দাঁড়িয়ে যায়। স্পর্শ ফুলের কাছে এসে ওর হাত ধরে হাতের আংটি গুলো খুলে ফেলে। তারপর রুমে গিয়ে আংটি গুলো চেয়ারের উপর রেখে দিয়ে বাইরে চলে আসে। ফুল বুঝলো না যে স্পর্শ কেন ওর হাতের আংটি খুলে নিল?? কিছু বলতেও পারছে না কারণ ওর মুখটা আবার আটকে দিয়েছে। মেয়েটা ফুলের একহাত চেপে ধরে আরেক হাত স্পর্শ চেপে ধরে। মাঝখানে ফুল কাবাব মে হাড্ডি। স্পর্শ ফুলকে নিয়ে হাঁটতে লাগল। ফুলও অসহায়ের মতো হাটতেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাজারে পৌঁছে যায় ওরা। ওখানে স্পর্শের লোক গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতেছে। কিন্তু পুরো বাজারে পুলিশ। নেকাবের আড়ালে থেকে ফুল স্পষ্ট পুলিশের দেখতে পাচ্ছে কিন্তু কথা বলতে পারছে না। মুখটা যে ওর আটকানো আর হাত দুটো অন্য হাতের বাঁধনে আটকানো। স্পর্শ ফুলের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,

–“বি কেয়ার ফুল। কোনরকম সিনক্রিয়েট করার চেষ্টা করেছো তো মরেছো। তোমার পেছনে কিন্তু বন্দুক তাক করা আছে।”

ফুল পিছনে ঘুরে দেখল ওর পাশের মেয়েটা ওর দিকে বন্দুক তাক করেছে বোরকার আড়ালে। ফুলের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। কারণ মুক্তির কাছে এসেও মুক্তি পেল না। এরপর ওর সাথে কি হবে তা ও নিজেও জানে না। প্রেগন্যান্ট মহিলা দেখে পুলিশরা সেদিকে এগোলো না। স্পর্শ তাড়াতাড়ি ফুলকে নিয়ে গাড়িতে বসল। গাড়িও চলতে শুরু করল। ফুলের এবার কেন জানি একটু সাহস পেলো। স্পর্শের হাত ঝাড়ি দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে মুখের নেকাব তুলে ফেলল। আর মুখে লাগানো টেপটাও খুলে ফেলে। স্পর্শ রাগন্বিত স্বরে বলল,

–“কি করছো তুমি?”

ফুল স্পর্শের কথার তোয়াক্কা না করে চেঁচাতে লাগলো,

–“হেল্প হেল্প। কেউ আছেন??”

স্পর্শ ফুলের মুখ চেপে ধরে বলল,

–“চুপ একদম চুপ। আর একটা কথা বললে কিন্তু!!”

ফুল স্পর্শের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,

–“ছাড়ুন আমাকে। আমি বাড়ি যাব। ওখানে পুলিশ আছে ওনাদের ডাকলেই আপনার জিরিজারি খতম।”

ফুল আবার চেচাতে লাগলো। স্পর্শ কোন উপায় না দেখে ফুলের মুখে স্প্রে করল। সাথেই ফুল অজ্ঞান হয়ে গেল। ফুলের নেকাবটা নামিয়ে দিলো যাতে ওর মুখটা কেউ দেখতে না পায়।

🍁🍁🍁

পুলিশ খুঁজতে খুঁজতে সেই পরিত্যক্ত বাড়িতে পৌঁছায়। কিন্তু কিছুই পেল না। শুধু চেয়ারের উপর পড়ে থাকা ফুলের আংটি পেল। পুলিশ আংটি নিয়ে আজমল চৌধুরীর কাছে দেয়। আজমল চৌধুরী ফুলের আংটি চিনতে পারে। তিনি আবার হতাশ হয়ে যায়। মেয়েকে তিনি পেয়েও পেলেন না। তখনই তার ফোন বেজে উঠল। রিসিভ করলেন,

–“হ্যালো”

–“চৌধুরী সাহেব। সো স্যাড মেয়েকে পেয়েছেন??”

আজমল চৌধুরী রেগে বললেন,

–“তুমি আমার মেয়েকে কোথায় নিয়ে গিয়েছ?? ওকে ফেরত দিয়ে দাও।”

–“আপনার মেয়ে এখন যেতে পারবে না। কারণ ও এখন ঘুমাচ্ছে। মুখে স্প্রে করেছি তো।

–“তোমার সাহস তো কম না। তুমি,,,,”

–“সে আপনি যাই বলেন‌ কিন্তু এত সহজে মেয়ে পাচ্ছেন না আপনি। আপনাকে বলেছিলাম কাউকে কিছু না বলতে কিন্তু আপনি তো আমার কথা শুনলেন না। এখন দেখুন আমি কি করি।”

–“তুমি কিছু করবে না,,,,। হ্যালো হ্যালো।”

স্পর্শ ফোন কেটে দিয়ে সিম কার্ড খুলে ফেলল। কারণ বেশিক্ষণ কথা বললে পুলিশের ট্রাক করতে সময় লাগবে না। তাই ফোনটাও বন্ধ করে রাখল। সাবধানের মার নেই। ফুল ঘুমাচ্ছে, ইচ্ছে করে না ওকে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।

গাড়ি আপন গতিতে ছুটে চলছে। বাতাসে স্পর্শর সিল্কি চুলগুলো উড়ছে। স্পর্শ একটা সিগারেট ধরালো।

ফুল আস্তে আস্তে চোখ খোলার চেষ্টা করতেছে। কিন্তু পারছেনা,যতই চোখ খোলার চেষ্টা করছে ততই চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু ও অনুভব করতে পারছে যে ও কোন খড়ের গাদার উপর শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ থাকলেও আশেপাশের শব্দগুলো শুনতে পারছে। মেঘের গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ ওর কানে ভেসে আসছে। ফুল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চোখ খোলার কিন্তু পারছে না। এভাবেই এক ঘন্টা পার হয়ে যায়। তবুও কেউ আসছে না। ফুল এবার চোখ খুলতে সক্ষম হলো। চোখ খুলে চারিদিকে তাকালো সে। ফুল দেখল বাঁশের চাটির তৈরি একটা ঘরের মধ্যে আছে ও। সারাঘরে খড়ের গাদা ছড়ানো। তার উপরেই ফুল শুয়ে আছে। বাইরে থেকে সূর্যের আলো আসছে, তবে অল্প আলো আসতেছে। অনেক কষ্টে ফুল উঠে বসল। কিন্তু দাঁড়াতে পারছে না উঠতে গিয়েও পড়ে গেল। বাইরে থেকে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ আসছে অনেকক্ষণ ধরে কিন্তু আশেপাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না যে আকাশে মেঘ করেছে। চারিদিক তো ভালোই পরিস্কার। আর তারচেয়ে বড় কথা হলো বৃষ্টি হচ্ছে না তো। এতক্ষণ ধরে মেঘ ডাকছে বৃষ্টি তো হওয়ারই কথা।

ফুল হামাগুড়ি দিয়ে জানালা পর্যন্ত পৌঁছায়। চাটাইয়ের বেড়ায় হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। এরপরের দৃশ্য দেখেই খুশিতে ফুলের চোখ চকচক করে উঠলো। এতো সমুদ্র,তার মানে এতক্ষণ সমুদ্রের গর্জন শুনছে ও। ফুল সমুদ্রের বুকে ঢেউয়ের খেলা দেখতেছে। একেকর পর এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের বুকে। ফুল অবাক হয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখায় মগ্ন। এর আগে কখনো সমুদ্র দেখেনি ফুল। এই প্রথম দেখল। এখন ফুলের মনে হচ্ছে কিডন্যাপ হয়ে লস হয়নি। মুহূর্তেই ফুলের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। শক্তি যেন ফিরে পেয়েছে ও। শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে এক দৌড় মারল দরজার দিকে। কিন্তু ফল হলো উল্টো। একটু যেতেই দুম করে পড়ে গেল মাটিতে। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো ফুল। তখনই ওর সামনের দরজাটা খুলে গেল। স্পর্শ ফুলকে নিচে দেখে তাড়াতাড়ি হাতের বাসনটা মাটিতে রেখে ফুলকে টেনে তুলতে তুলতে বলল,

–“পড়লে কিভাবে??”

ফুল নরম গলায় বলল,

–“দৌড়ে বাইরে যেতে গিয়ে পড়ে গেছি।”

–“তোমার পায়ে যে শিকল লাগানো সেটা কি দেখোনি।”

ফুল পায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবল তাই তো। খুশির ঠেলায় পায়ের দিকে তাকাতেই ভুলে গিয়েছে। ফুল মুখটা গোমড়া করে বসে রইল। স্পর্শ বাসনটা ফুলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“নাও খেয়ে নাও। খিদে পেয়েছে তো।”

ফুল হা করে স্পর্শের দিকে তাকিয়ে আছে। স্পর্শ কিভাবে জানলো ওর খিদে পেয়েছে?? স্পর্শ ফুলের হাতে বাসনটা দিয়ে বলল,

–“ওতো ভাবার কিছু নেই। প্রায় দুদিন পর তোমার জ্ঞান ফিরেছে। গাড়িতে যেভাবে চেঁচামেচি করছিলে রাগের মাথায় স্প্রে একটু বেশি করে ফেলেছিলাম। এখন খাও।”

ফুল বাসনের দিকে তাকিয়ে দেখল তাতে পান্তাভাত আলুভর্তা কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ।
ফুল স্পর্শের দিকে তাকিয়ে বলল,

–“আমি সমুদ্রের কাছে যাব।”

–“আগে খাও তারপর নিয়ে যাব।”

স্পর্শের এরকম জবাবে ঘাবড়ে গেল ফুল। এতসহজে স্পর্শ কিভাবে ওর কথা মানলো। আপাতত এসব মাথা থেকে ঝেড়ে খেতে লাগলো। খুব খিদে পেয়েছে ওর। প্রায় দু’দিন না খেয়ে ছিল। খাওয়া শেষ করে ফুল আর একটু ও বসল না। স্পর্শকে বলল,

–“চলুন”

স্পর্শ কোন কথা না বলে ব্যাগ থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে ফুলের সামনে এসে বসলো। ফুল একটু অবাক হয়। স্পর্শ ফুলের হাত ধরে উল্টো করে কনুইয়ের দিকে তাকালো। পড়ে যাওয়ার ফলে কনুই ছড়ে গেছে। রক্ত বের হচ্ছে,ফুল যখন খাচ্ছিল স্পর্শ তখন দেখেছে। স্পর্শ ফুলের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিলো। তারপর বাঁশের খাম থেকে শিকলটা খুলে বলল,

–“চলো।”

–“এভাবে?? আমার পা থেকে শিকলটা খুলে দিন না??”

–“আমি জানি তুমি ছাড়া পেলেই পালানোর জন্য দৌড়াবে। পালাতে তো পারবেই না উল্টো আমাকে দৌড় করাবে। আমার এখন দৌড়াতে একদম ইচ্ছে করছে না। এভাবেই চলো।”

–“আমি পালাবো না কসম।”

স্পর্শ ছোট ছোট চোখে ফুলের দিকে তাকালো। ফুল ঢোক গিলে বলল,

–” না না থাক আমি এভাবেই যাব।”

কাছ থেকে সমুদ্র দেখার মুহূর্ত টা ফুল মিস করতে চাইল না। তাই স্পর্শের পিছুপিছু চলল। স্পর্শের হাতে শিকলটার এক প্রান্ত আর অপর প্রান্ত ফুলের পায়ে বাঁধা। স্পর্শ আগে আগে যাচ্ছে ফুল পিছুপিছু। আশেপাশে কোন মানুষের চিহ্নমাত্র নেই শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। আর এরমধ্যে শুধু একটা ঘর। হালকা ঢালু বেয়ে দুজনে সমুদ্রের তীরে আসলো। ফুলের খুব আনন্দ হচ্ছে। লাফাতে ইচ্ছে করছে কিন্তু স্পর্শের ভয়ে পারছে না। স্পর্শ হাঁটছে সমুদ্রের তীর বরাবর। ওর পায়ের ছাপের উপর পা ফেলে ফেলে ফুলও হাঁটতেছে। স্পর্শ পিছনে তাকিয়ে ফুলের কান্ড দেখে মুচকি হাসে। মনে মনে বলল,

–“দুইবোনের অভ্যাসটাও এক।”

ছোটবেলায় ফুলও এরকম ভাবে স্পর্শের পায়ের ছাপের উপর পা ফেলে হাটতো। স্পর্শ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শিকলটায় টান পড়তেই দাঁড়িয়ে পড়লো। স্পর্শ পেছনে তাকিয়ে দেখল ফুল নিচে বসে বালুর উপর কিছু লিখছে। স্পর্শ এগিয়ে গিয়ে দেখল ফুল লিখছে,

“The Great Moment For বিকেলে ভোরের ফুল।”

স্পর্শ চোখ বড়বড় করে লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। ফুল উঠে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে হাঁটতে নিলেই স্পর্শর সাথে ধাক্কা খেল। স্পর্শ এখনও লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। ফুল বলল,

–“প্লিজ এগুলো মুছবেন না। আমি চাই সমুদ্রের ঢেউ এসে আমার নামটা মুছবে।”

ফুলের কথায় স্পর্শ বড় একটা শক খেল। সাথে সাথেই একটা ঢেউ এসে লেখাগুলো মুছে দিলো। ফুল বলল,

–“যাহ মুছে গেল। কিন্তু আপনার কি হয়েছে? এরকম ভাবে কি দেখছেন??”

স্পর্শ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

–“তোমার ফুল নেইম,,,,”

–“ওহ আপনি তো আমার নামটাই জানেন না। আমি ফুল চৌধুরী ডটার অফ আজমল চৌধুরী।”

স্পর্শ দুকদম পিছিয়ে গিয়ে বলল,

–“তুমি পাপড়ি নও।”

–“পাপড়ি তো আমার আপুর নাম। এক মিনিট আপনি আপুকে কিভাবে চিনেন??আপু তো অনেক আগেই মারা গিয়েছে??”

স্পর্শ ফুলের কথার কোন জবাব দিলো না। হাত থেকে শিকলট অনেক আগেই পড়ে গেছে। ফুল ও ভেবে পাচ্ছে না যে স্পর্শ এমন বিহেব করছে কেন??স্পর্শ হঠাৎ করেই,,,,,,

চলবে,,,,,,,,

জানি পরের পর্ব পড়ার জন্য সবাই অপেক্ষা করবে। তবে আমার পক্ষে পরের পর্ব কাল দেওয়া সম্ভব নয়। এক সপ্তাহ ধরে দৌড়ের উপর আছি কাজিনের বিয়ের জন্য। কালকে গায়ে হলুদ তারপর বিয়ে। বোনের বিয়েতে দায়িত্ব বলে তো কিছু আছে??তাই আগামী তিনদিন গল্প দিতে পারব না। রবিবার থেকে প্রতিদিন গল্প পোস্ট করব। ততদিন পর্যন্ত ভালো থাকবেন সবাই।

সরি,,,,,😞😞😞

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here