বিচ্ছেদ পর্ব -১৪

#বিচ্ছেদ ১৪

আশিক চলে গেছে কিছুক্ষণ আগে।
রায়নাকে রাতের খাবার ও ঔষুধ খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছে রিয়া।
এখন কোনভাবেই অনিয়ম করা যাবেনা।
সময় মত খাওয়া ঘুম খুব দরকার।
ডাক্তার বার বার বলে দিয়েছেন,ঔষধ যেন সময় মত খাওয়ানো হয়।
রায়নার এত কাজ জমে ছিল।
স্কুলে সব সময় কিছু না কিছু পরীক্ষা চলছেই।
তার উপর পিএসসি,জেএসসি, এবং এসএসসি র ছাত্রীদের তো পরীক্ষা লেগেই আছে। রিয়া ক্লাস এইটের একটা সেকশনের ক্লাস টিচার। ফাইভের একটা ক্লাসও নেয়।
এছাড়াও অন্যান্য ক্লাস তো আছেই। কাজেই ব্যস্ততার শেষ নেই ওর।
থানার প্রশ্নে মডেল টেস্ট চলছে।
ওদের খাতা সময়ের মধ্য দেখা শেষ করতে হয়। রিয়া রাতের খাবারের পর এক কাপ ‘র চা নিয়ে খাতা দেখতে বসলো।
কিছু ছাত্রীর খাতা দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
তেমন কিছুই করতে হয়না।
ঝকঝকে লেখা। কত সুন্দর গুছিয়ে লেখা সব প্রশ্নের উত্তর।
আবার কিছু ছাত্রীর খাতা কারেকশন করতে করতে জীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠে।
রিয়া ধর্য্য ধরে খাতা দেখে। কারণ যে যেমন ছাত্রীই হোক না কেন ওদের কে সঠিক পড়াটা শেখানোর দায়িত্ব শিক্ষক হিসেবে ওর।
এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চায়না রিয়া।
এগারোটা থেকে রাত একটা পর্যন্ত খাতা দেখলো রিয়া।
ঘুমোতে যাওয়ার আগে প্রিয় বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো।
আকাশে আজ এত আলো কেন ?
আজ কি পূর্ণিমা ?
আজ রিয়ার জীবনেও পূর্ণিমা।
তার ‘পূর্ণিমার আলো’ তার ঘর আলো করে ঘুমাচ্ছে। এই আলোটুকুই রিয়ার জীবনকে এখনো নরম আলোয় আলোকিত করে রেখেছে।
খুব ভয় পেয়েছিল রিয়া।
এভাবে রায়না কে নিয়ে এমন বিপদে কোনদিন পড়েনি।
রায়না বেশ সুস্হ একটা বাচ্চা।
রিয়া প্রয়োজন এবং সময় মত চেক আপ করে। তারপরও অসুস্হ হয়ে পড়া না পড়াটা মানুষের হাতে নেই একেবারেই।
আল্লাহ্ র কাছে শুকরিয়া জানালো রিয়া মনে মনে। মেয়েটার বিপদ কেটে গেছে।
আজ আশিক এসেছিল বাসায়। রিয়া আসার পর দেখা করে ভিতরের রুমে চলে এসেছিল।
বহু বছর পর স্ট্রং ব্লাক কফি বানিয়েছিল নিজ হাতে আশিকের জন্য।
অচেনা এক অভিমানে বুক ভরে উঠেছিল।
তবে কফিটা বানিয়েছিল খুব যত্নে।
হাসপাতালে গত দু’দিনে আশিক বেশ একটু কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।
অনেক বদলে গেছে আশিক।
আগের মত কথায় কথায় কি রেগে উঠে না আর ? জেদ করেনা ?
আশিকেরও কি ধর্য্য বেড়েছে অনেক ? জীবনের এত ঘাত-প্রতিঘাত পার হতে গিয়ে ?
হট্যৎ রিয়ার মনে হলো আশিক রিয়ার চেয়েও নিঃস্ব ! রিয়ার চেয়েও দীন।
ওর কিছুই নেই !
কিন্তু রিয়ার তো রায়না আছে।
রায়নাকে আঁকড়ে রিয়া বাঁচতে চেয়েছিল।
রায়না আশিকের প্রতিচ্ছবি !
প্রতিটা মূহুর্ত্যে রায়না তাকে আশিকের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
রায়নার চলা-ফেরা, খাওয়া-দাওয়া,রাগ-অভিমান, ব্যক্তিত্ব সব কিছুতেই আশিক ফিরে এসেছে বার বার রিয়ার সামনে !
তাই আশিককে ভুলে যাওয়া এত সহজ ছিল না রিয়ার পক্ষে।
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ওরা এত বড় ভুল কেন করেছিল ভেবে পায়না রিয়া।
আজকের রিয়া যদি বারো বছর আগে থাকতো তাহলে এমন হতো না জীবনটা।
নিজের ভুল স্বীকার করে রিয়া।
তখন ভুল করেছিল ওরা দু’জনই।
আর একটা ভুলের জন্য হাজারটা ভুলের জন্ম হয়। হয়েছেও তাই।
এরপর আশিক ভুল করলো।
বাবা-মায়ের ভুলের পাহাড় বুকে নিয়ে
প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছে রায়না।
নিজেদের কথায় ভেবেছিল ওরা।
একবারও রায়নার কথা ভাবেনি।
রিয়ার এক কলিগের দাম্পত্য সমস্যা চলছে।
তাদের দু’টো ছেলে-মেয়ে।
পড়াশোনায়ও খুব ভাল। কিন্ত গত ৪/৬ মাস তাদের স্বামী-স্ত্রীরর দাম্পত্যকলহের কারণে ছেলে-মেয়ের রেজাল্ট খারাপ হতে শুরু করেছে।
ওরা সেপারেশান নেয়ার চিন্তা ভাবনা করছে। রিয়া খুব বুঝিয়েছিল ওর কলিগ কে।
একটাই কথা আমি আর কত মানিয়ে নেবো ?
রিয়া বলেছিল, জানি কিছু কিছু বিষয় মানিয়ে নেয়া খুব কঠিন। তবুও সন্তানদের কথা ভাবো। ওরা বাবা-মা দু’জনকেই চায়।
এই মূহুর্ত্যের রাগ বা ইগোর কারণে ভবিষ্যৎ
এ কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে। কাজেই একটু
ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিও,প্লিজ।
সেই সময়ের একটা ভুলের মাশুল জীবন ভর দিয়ে যেতে হবে হয়তো।

সিগারেট এর ধোয়া আর কফির ধোয়া একাকার হয়ে যাচ্ছে। আশিক রুমে বসেই সিগারেট ধরিয়েছে। সাধারণত; রুমে সিগারেট ধরায়না সে। বাসায় স্মোক করলে ব্যালকুনিতেই করে।
মা বেঁচে থাকতে বাসায় সিগারেট খাওয়ার কথা ভাবতেও পারেনি আশিক। তবে রিয়ার সাথে বিয়ের পর প্রথম বাসায় সিগারেট টানার সাহস দেখিয়েছিল। সেটাও বেশ গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর এবং অবশ্যই ব্যালকুনিতে। রিয়া একদম পছন্দ করতো না ঘরে সিগারেট ধরানো।
বেডরুম টাতে চোখ ঘুরিয়ে একটু শাসনের সুরে বলতো, ‘দিস ইজ নো স্মোকিং জোন’ কাজেই তোমাদেরকে এখানে যেন না দেখি। আশিক অবাক হয়ে বলতো,তোমরা মানে আর কে ?
সিগারেট র দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলতো,তুমি আর মিঃ সিগার..
আশিক হো হো করে হাসতো রিয়ার কথায়।
রিয়া সিগারেট নিয়ে শাসন করলেও কফি টা বানিয়ে আনতো খুব যত্ন করে।
আজ রিয়া নেই।
রুমে সিগারেট ধরানোতে কেউ বাঁধা দেয়ারও নেই। কেন এটা মনে হলো আজ ?
এ বাড়ীর সাথে নীলার কোন সম্পর্ক নেই।
কারণ,এ বাড়ীর কেউ নীলাকে মেনে নেয়নি।
তাই এখানে ওর আসা হয়নি।
নীলার কোন স্মৃতিও নেই এবাড়ীতে।
আশিক কফি শেষ করে আবার ল্যাপটপের সামনে বসলো। তখন পুরো মেইলটা পড়তে পারেনি। ঘৃনায় শরীরটা রি রি করে উঠেছিল।
রাশিক কে কফি দিতে বলে সিগারেট ধরিয়েছিল।
এরই মধ্যে তিনটা সিগারেট টানা হয়ে গেছে।
নীলা তার মেইলে লিখেছে,” আশিক ডিভোর্সের কাগজে সাইন করবো যদি তুমি আমার গ্রিন কার্ডের ব্যবস্হা করে দাও। শুধু তাই নয়,আমি দেনমোহরের দশ লক্ষ টাকা মাফ করে দেবো গ্রিন কার্ডের বিনিময়ে। আশা করি তুমি এই সুযোগ হাতছাড়া করবে না। আর সংসার নয় আমার গ্রীন কার্ড চাই।”
আশিক চোখ বন্ধ করে ফেললো।
মেইলটা পুরো পড়ে ব্যালকুনির চেয়ারে এসে বসলো।
গত বছর যখন নীলা চলে যায় তখনও ওর গ্রীন কার্ড পাওয়ার সময় হয়নি। নীলা আসার পর থেকে গ্রিন কার্ডের পেপারস সময় মত রিনিউ করা হয়েছে। আমেরিকা আসার দুবছর পরই তো আশিককে ছেড়ে চলে গিয়ে নিজের মত থেকেছে।
এবছর আশিক যদি তার বউ হিসাবে নীলার পেপারস রিনিউ করে তাহলেই নীলা গ্রীন কার্ড পাবে। তা নাহলে অর্থ্যৎ আশিক নীলার পেপারস রিনিউ না করালে নীলার গ্রীন কার্ড বাতিল হবে এবং নীলাকে আমেরিকা ছাড়তে হবে।
আশিকের ধারণা আশিককে ছেড়ে যাওয়ার সময় নীলা গ্রীন কার্ডের বিষয়টা ঠিকমত বোঝনি বা খেয়াল ছিলনা।
এখন সে বুঝতে পেরেছে গ্রীন কার্ড ছাড়া আশিক কে ছেড়ে দিলে তার আমেরিকায় থাকা হবেনা। তাই এই নোংরা প্রস্তাবটা দিয়েছে আশিক কে।
এত স্বার্থবাদী এত নীচ হয় কি করে মানুষ ?
একে ভালবেসেছিল আশিক ?
এর জন্য মায়ের সাথে, ভাই-বোনের সাথে দূরত্ব তৈরী করে ছিল ? রায়নাকে ছেড়ে ছিল ? রিয়াকে ফিরিয়ে দিয়েছিল এই নীলার জন্য ???
ভাবলেই নিজের উপর ঘৃনা হচ্ছে।
এরকম একটা মেয়ের সাথে নিজেকে জড়িয়ে পুরো জীবনটাই তো ওলট-পালট করে ফেলেছে সে। প্রথম জীবনের করা ভুলটা শুধরে নিতে মা বলেছিল বার বার।
সে শোনেনি মায়ের কথা।
নীলা নামক মরীচিকার পিছনে ছুটে ছিল।
নীলার নীচতা এত দূর নামতে পারে আশিক কল্পনাও করেনি।
আশিক তার ল’ইয়ার কে মেইল করলো।
জানালো ইউ,এস ফিরেই বিস্তারিত আলোচনা করবে।
মনে মনে কঠিন হয়ে উঠলো নীলার প্রতি।

রায়নার শরীরটা আগের চেয়ে ভাল। আজও স্কুলে যেতে পারেনি। প্রচন্ড দূর্বল সে।
মা বলেছে, আরো কয়েকটা দিন রেস্ট নিতে।
রায়নার তো স্কুলে না গেলে একটুও ভাল লাগেনা। তবে এখন তার অত খারাপ লাগছে না। কারণ একটু পরেই বাবা আসবে।
আর দু’দিন পরেই বাবা আমেরিকা ফিরে যাবে। বাবার চলে যাওয়ার কথা মনে হতেই বিষর্ন্ন হয়ে উঠলো রায়নার মন।
বাবা যদি আরো কিছুদিন থাকতো, কত ভাল হত ! গতকাল বাবা তাদের বাসায় এসেছিল।আজও আসবে। খুব খুশী রায়না এজন্য। সে অসুস্হ হয়ে পড়ার কারণেই তো বাবা তাদের বাসায় আসলো। না হলে হয়তো আসতো না।
অসুস্হ হয়ে ভালই হয়েছে, মনে মনে ভাবলো রায়না।
মা তাকে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছিল আর বাবা তার হাত ধরে বসে ছিল হাসপাতালে।
কি ভাল লাগছিল রায়নার সেই রাতে!
মনে হয়েছিল, আরো একটু জ্বর থাকুক।
তাহলে বাবা-মাকে এক সাথে পাওয়া যাবে পাশে। আজ মা বাবাকে দুপুরে খেতে বলেছে তাদের বাড়ীতে। বাবা নাকি শুরুতে রাজি হচ্ছিল না। পরে বলেছে, খাবে।
রায়না কিছুতেই ভেবে পায়না কেন তার বাবা-মায়ের ভাব থাকলো না। তারা তো দুই জনই খুব ভাল। তাহলে ঝগড়া হয়েছিল কেন ?
আর ঝগড়া হলেই কি এরকম হয় ?
তাদেরও তো ক্লাসে কত বন্ধুদের মধ্য ঝগড়া হয়, কিন্তু আবার ভাবও তো হয়ে যায় !
ওরা তো ঝগড়া করে এমন করে কাট্টি নেয়না।
জীবনের কাট্টি নিলেও ক’দিন পরে তো আবার ভাব করে ফেলে।
বাবা-মা কি জীবনের কাট্টি নিয়েছিল ?
তাই আর ভাব করতে পারছেনা।
রায়নার খুব কষ্ট হয়।
বড়রা কাট্টি নিলে কি আর একটুও ভাব করা যায়না ?
কলিং বেল বেজে উঠলো।
নিশ্চয় বাবা এসেছে ।
খুশী হয়ে উঠলো রায়না।

আশিক প্রচন্ড মানসিক চাপের ভেতর আছে।
দু”দিন বাদে ফ্লাইট। ফেরার একটা প্রস্তুতি
আছে। হট্যৎ রায়নার অসুস্হতা.. তার উপর নীলার এই নোংরা আচরণ সব মিলিয়ে আশিক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ভেতরে ভেতরে।
চলে যাওয়ার আগে রায়নাকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সময় দিতে চেয়ছিল শান্ত মনে।
অথচ সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল।
আজ রিয়া ফোন করে তাকে দুপুরে রায়নার সাথে লাঞ্চ করতে বলেছে।
রায়না খুব চাইছে। প্রথমে আশিক না বলেছিল রিয়াকে বিব্রত করতে চায়না বলে।
রিয়া জানিয়েছিল তার কোন সমস্যা নেই।
রায়নার ভাল থাকাটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই আশিক আসলে সে খুশী হবে।
আশিক রায়নার জন্য চকলেট আর ফুল কিনলো।
রায়নাও ফুল ভালবাসে তার মায়ের মতই।
কিন্ত রায়না কোন ফুল বেশী ভালবাসে এখনো বুঝতো পারেনি আশিক।
শিশুরা সব ফুলই ভালবাসে।
তবে রিয়া খুব ফুল ভালবাসতো।
আশিক সাদা গ্লাডিওলাস কিনলো।

খাবার টেবিলে দেখা হলো আশিকের সাথে রিয়ার। আজ আশিক লাঞ্চ করবে বলে একটা বাজার আগেই ভিপি ম্যাডাম কে বলে বাসায় চলে এসেছে স্কুল থেকে। অন্য দিনের মত এটা সেটা কাজের জন্য দেরী করেনি। গতকাল রহিমা খালাকে দিয়ে বড় ইলিশ মাছ আনিয়েছে।
গতকাল রাতে ঘুমোবার আগে রায়না বলেছিল,মা.. বাবার জন্য শরিষা ইলিশ রান্না করবে তুমি। বাবাও তো ইলিশ ভালবাসে আমার মত !
রিয়া হেসে ফেলেছিল রায়নার কথা বলার ধরন দেখে।
বাবা তোমার মত.. নাকি তুমি বাবার মত রায়না ?
রায়না আদুরে গলায় বলেছিল,বাবা আমার মত মা , আবার আমিও বাবার মত।
সব ধরনের দেশী খাবার রান্না করতে বলেছে রিয়া রহিমা খালাকে।
শাক-সবজি,ভর্তা,ছোট মাছ রহিমা খালা করেই রেখেছে। রিয়া বাসায় ফিরেই গরুর মাংস আর শরিষা ইলিশ রান্না করেছে।
আশিক এধরনের খাবার খেতেই বেশী পছন্দ করে।
বিয়ের পর পর কত যে ঝামেলা হত। রিয়া তেমন ভাল রান্না করতে পারতো না।
রায়নার দাদী খুব সুন্দর রান্না করতেন।
তাই রিয়া সেসময় তার শাশুড়ীর কাছ থেকে রান্না শেখার চেষ্টা করতো। কিছু কিছু রান্না শিখেওছিল। তবে রিয়া খুব ভাল রাঁধুনী নয়।
আশিকের সাথে ছাড়াছাড়ির পর থেকে রান্না বান্না তেমন একটা করা হয়নি বা সুযোগও থাকেনা।
তবে আশিকের সাথে সংসারটা টিকে গেলে হয়তো ভাল রাঁধুনী হতে যেতো। কারণ আশিক রান্না সুন্দর না হলে খেতে পারেনা। রহিমা খালা অনেক ভাল রান্না করে।
মেয়েকে পাশে নিয়ে খেতে বসলো আশিক।
রিয়াকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,তুমি খাবে না ?
রিয়া কিছু বলার আগেই রায়না বলে উঠলো, অবশ্যই খাবে। আজ আমরা তিনজন একসাথে খাবো ! প্লিজ মা,খেতে বসো।
রিয়া আর কিছু না বলে খেতে বসলো।
আশিক প্রতিটা খাবারই অল্প অল্প করে প্লেটে নিল। ইলিশ মাছ প্লেটে নিয়ে খুব যত্ন করে কাঁটা বেছে রায়নাকে খাইয়ে দিল।
রায়না তেমন কিছু খেতে পারছে না।
তবুও বাবার হাতে মাছটা খেল আগ্রহ নিয়ে।
আশিক দুই পিস ইলিশ মাছ খেল। রিয়া মনে মনে হাসলো। এখনো ইলিশ মাছটা আগের মতই পছন্দ করে।
গরুর মাংস খেতে চাইল না।
রায়না জোর করলো, বাবা একটু খাও।
এ দুটো মা রেঁধেছে।
আশিক একটু মাংস নিয়ে মুখে দিয়ে হাসল।
আমি জানি মা।
রায়না খুব অবাক হলো,তুমি জানো ? কিভাবে বাবা ?
আশিক কিছু বললো না। শুধু মুচকি হাসলো।

রিয়া মুখ নিচু করে খাচ্ছে।
আসলে রিয়া খাচ্ছে না। সামান্য একটু খাবার প্লেটে নিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে আশিক কে এটা ওটা তুলে দিতে বলেছে রায়নাকে।
আশিকের ভাল লাগলো রিয়ার এই ভদ্রতা।
আশিক বুঝতে পারছে রিয়া সহজ হতে চেষ্টা করলেও সহজ হতে পারছে না।
সেটাই তো স্বাভাবিক !
ওদের মাঝে দূরত্ব তো কম দিনের নয়।
রিয়া, মায়ের কাছ থেকে শরিষা ইলিশ রান্না শিখেছিল। আজও সেভাবেই রান্না করেছে।
আশিক জানে রিয়া এসব কিছুই করছে রায়নার জন্য। মেয়ের খুশীর জন্য।
আশিকের মনটা খারাপ হলো।
পরশুদিনই চলে যেতে হবে হট্যৎ পাওয়া জীবনের এই ছোট ছোট ভাল লাগা, ছোট ছোট আনন্দকে পিছনে ফেলে।
আবার কবে আসতে পারবে এখনই বলতে পারছেনা।
রায়নাকে রেখে যেতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে।
আজ রায়না অনেক খুশী।
আশিকের কানে কানে বলেছে,মা-বাবাকে নিয়ে একসাথে লাঞ্চ করতে নাকি তার খুব ভাল লেগেছে।
কত স্বাভাবিক একটা চাওয়া অথচ রায়নার জন্য কত দূর্লভ!
রিয়া খাওয়া শেষ করে গতকালকের আশিকের আনা কেকটা বের করে ডাইনিং টেবিলে রাখলো।
রায়না খুশী হয়ে কেক কেটে আশিককে নিজ হাতে খাইয়ে দিল। মাকেও খাওয়ালো নিজে হাতে।
আশিক মেয়েকে খুব যত্ন করে একটু কেক খাইয়ে দিলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে রায়না বললো,মা তুমি খাওয়াবে না আমাকে ?
আশিক খেয়াল করছে আজবরায়না সবকিছু দু’জনের কাছ থেকেই পেতে চাইছে।
আহা..

রায়না বললো,বাবা আমার খুব আমেরিকার ডিজনি ল্যান্ড দেখার শখ , তোমার সাথে যেতে ইচ্ছা করছে আমেরিকায়।
আশিক সাথে সাথেই বললো,অবশ্যই যাবে মা। তুমি আমেরিকার সিটিজেন হয়ে গেলে সবসময় গিয়ে থাকতে পারবে আমার সাথে।
রায়না খুশী হয়ে উঠলো।
পরক্ষণেই চিন্তিত দেখালো ওকে।
বললো, বাবা মা ওকি আমার সাথে আমারিকায় যেতে পারবে ?
তুমি কি মাকেও নিয়ে যাবে ?
আশিক থতমত খেয়ে গেল, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কি উত্তর দিবে।
আস্তে করে শুধু বললো, না তোমার মা হয়তো যাবেনা। তবে তুমি নিশ্চয় যাবে।
রায়না খুব দুঃখি গলায় বললো,বাবা আমি তো মাকে ছাড়া একটুও থাকতে পারিনা। তাহলে তোমার কাছে যাবো কিভাবে ?
আচ্ছা.. বাবা, তুমি মাকেও একবারে আমেরিকায় নিয়ে যেতে পারোনা ? তাহলে আমরা তিনজন একসাথে থাকতে পারতাম!
বাবা খুব ভাল হতো না তাহলে…???

আশিক রায়নার মুখের দিকে তাকালো।
মেয়েটা গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে…. এক বুক আশা নিয়ে।
(চলবে…)

২৯/০৮/২০১৭
কুমিল্লা সেনানিবাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here