বিন্দু থেকে বৃত্ত পর্ব -০৩

#বিন্দু_থেকে_বৃত্ত
#পার্ট_৩
জাওয়াদ জামী

তাহমিদ খাবার টেবিলে বসে আছে। স্যারের বাসায় গিয়েছিল বইয়ের কিছু প্রবলেম সলভ করার জন্য। সেখান থেকে ফিরতে রাত হয়েছে। যদিও স্যার অনেকবার বলেছে খেয়ে আসার জন্য কিন্তু তাহমিদ খায়নি। বাসায় এসে ওর মা’কে সামনে দেখেই খেতে চেয়েছে। ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলে বসে আছে ঠিকই কিন্তু ওর কিছুই ভালো লাগছেনা। সে প্রতিদিন বাসায় ঢুকেই বড়মাকে দেখে। কিন্তু গতরাতের পর আজ আজ রাত পর্যন্ত বড়মাকে একবারও দেখেনি। এমনকি ওকে খেতে দিতে আসেনি! বড়মা তো জানে তার হাতে না খেলে তাহমিদের পেট ভরেনা। তবুও কেন আজ সারাদিন বড়মা একবারও ওর সামনে আসলনা!
” মা, আজ তুমি খেতে দিচ্ছ যে! বড়মা কোথায়? সারাদিন একবারও বড়মাকে দেখিনি। বড়মা জানে তার হাতে ছাড়া আমি খেতে পারিনা তবুও আজ একবারও আমাকে খাইয়ে দেয়নি। ”
” তোর বড়মার শরীর আজ ঠিক নেই। তাই রুমেই শুয়ে আছে। আজ আমি খাইয়ে দিচ্ছি তোকে। ” কাজের ফাঁকে উত্তর দেন তাহমিনা।
” কি হয়েছে বড়মার! আমি এখন খাবনা। আগে বড়মাকে দেখে আসি তারপর খাব৷ ” হন্তদন্ত হয়ে আফরোজা নাজনীনের রুমের দিকে ছোটে তাহমিদ।
আফরোজা নাজনীন সটান হয়ে কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে। কোন অনুমতির অপেক্ষা না করে তাহমিদ হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকে। ওকে দেখে সানাউল রাশেদিন কপাল কুঁচকে তাকায়।
” কি ব্যাপার তুমি হঠাৎ এ সময়ে এখানে? কারো রুমে ঢোকার আগে নক করতে হয় এটা বোধহয় ভুলে গেছ? এত কিছু জানো আর এই সামান্য বিষয়টা জানোনা! ” সানাউল রাশেদিনের রাশভারী গলার কথাগুলো শুনে তাহমিদ থমকে যায়।
যে বড় চাচ্চু ওকে প্রান দিয়ে ভালোবাসে আজ তিনি এভাবে বলছেন! নিজেকে সামলে নেয় তাহমিদ। ও বেশ বুঝতে পারছে গত রাতের ঘটনায় বড় চাচ্চু ওর ওপর রেগে আছে। সে সানাউল রাশেদিনের থেকেও রাশভারী গলায় বলে ওঠে, ” বাবা-মা’ র রুমে আসতে সন্তানের কোন পারমিশনের প্রয়োজন নেই। তাদের এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে তাই হুটহাট রুমে ঢুকলেই অপ্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণের কৌশল অনেক আগেই শিখেছে। ” সানাউল রাশেদিন ভাতিজার কথা শুনে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থাকে। মনে মনে ভাবে, এই ছেলে কি বলছে এসব! লজ্জা জিনিসটা কি বেঁচে খেয়েছে!
তাহমিদ বড় চাচ্চুকে তোয়াক্কা না করে বড়মার দিকে এগিয়ে যায়। ঘুমন্ত বড়মার মাথায় হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। সে কি খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে এই মমতাময়ীকে! এই অন্যায়ের কোন ক্ষমা ত্রিভুবনে আদৌ কি আছে?
বড়মার মাথায় ছোট্ট করে চুমু দেয় সে।
” এ কি করছ তুমি? সে কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়েছে। এখন তুমি বাইরে যাও। ওকে বিরক্ত করনা। ” সানাউল রাশেদিনের রা’গ এখনো কমেনি।
” তো তুমি কি করছ এখানে! এত বয়স হয়েছে এইটুকু জানোনা অসুস্থ কেউ ঘুমালে বাতি নিভিয়ে দিতে হয়? কিন্তু তুমি দিব্যি বই নিয়ে বসে আছ! বুড়ো হয়েছ ঠিকই কিন্তু বুদ্ধির ‘ব’ ও নেই দেখছি! ” তাহমিদ কৃত্রিম রা’গে’র সাথে বলে।
ওদের কথপোকথনের আওয়াজ কানে যেতেই চোখ মেলে চায় আফরোজা নাজনীন। তাহমিদকে এসময়ে রুমে দেখে একটু অবাকই হন বৈকি।
” তাহমিদ, কি হয়েছে বাপ? তোর চাচ্চুর সাথে এভাবে কথা বলছিস কেন? ”
” বড়মা, আমিতো শুধু চাচ্চুকে বুঝাচ্ছি তার করনীয় কি। সেই সাথে কিছু ভুল শুধরে দিচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি উঠলে যে! তোমার শরীর এখন কেমন আছে? খেয়েছ কিছু? কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার? প্রেশার চেক করেছিলে আজকে? ” ব্যাগ্র হয়ে একের পর এক প্রশ্ন করছে তাহমিদ।
আফরোজা নাজনীন হেসে দেন তাহমিদের অস্থিরতা দেখে।
” আমি ঠিক আছি বাপ। মাথা ব্যাথা করছিল তাই শুয়েছিলাম। তুই কখন এসেছিস? খেয়েছিস? তোর মুখটা এমন শুকনা লাগছে কেন? ”
” আমি আগেই জানতাম মা-ছেলে একসাথে হলে সব ভুলে বসে থাকবে। তাই দুজনের খাবার এনেছি। কষ্ট করে আর ডাইনিং টেবিলে খেতো যেতে হবেনা। ” তাহমিনা আক্তার খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে।
তাহমিদ বড়মার হাত ধরে নিয়ে যায় ওয়াশরুমের কাছে। তিনি ওয়াশরুমে প্রবেশ করলেও তাহমিদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। সানাউল রাশেদিন আঁড়চোখে ভাতিজার কার্যকলাপ দেখছেন। তাহমিনা আক্তার একে একে সব খাবার সেন্টার টেবিলে সাজিয়ে রাখে। আফরোজা নাজনীন বেরিয়ে আসলে তাহমিদ তাকে ধরে চেয়ারে বসায়।
” এবার আমাকে খাইয়ে দাও। ”
আফরোজা নাজনীন কিছু না বলে মুচকি হেসে প্লেটে ভাত বাড়তে থাকেন।
তাহমিদকে খাইয়ে দিয়ে নিজেও অল্প পরিমানে ভাত খেয়ে নেন। সানাউল রাশেদিন আগেই খেয়েছেন তাই তার বসে বসে সামনের নাটক দেখা ছাড়া কোন উপায় নেই। হ্যাঁ তার কাছে এটা নাটকই মনে হচ্ছে। যার জন্য ভাতিজার উপর রাগ ঝাড়লেন তিনিই এখন তার ভাতিজাতে খাইয়ে দিচ্ছেন। এটা তার কাছে অতিনাটকীয় মনে হচ্ছে। তার নিজেকে অকালকুষ্মাণ্ড মনে হচ্ছে। এত রাগ দেখিয়ে কি হল! শেষে সেই আমে-দুধে মিলে গেল আর তিনি আঁটি হয়েই রইলেন!

সকালে ফজরের আজানের একটু পর ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো কুহুর। চোখ কচলে বিছানা হাতড়ে ফোন হাতে নেয়। মেজো ফুপুর নাম দেখে মৃদৃ হাসি ফুটে ঠোঁটের কোনে।
” আসসালামু আলাইকুম মেজো ফুপু। কেমন আছো তুমি? ”
” ওয়ালাইকুমুসসালাম কুহুতান। আমি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুই কেমন আছিস? ”
” আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ফুপা, মাহিন ভাইয়া, মাইশা আপু কেমন আছে? তুমি কবে আসবে ফুপু? কতদিন এখানে বেড়াতে আসোনা। ”
” তোর ভাইয়ার পরিক্ষা শেষ হলেই তবে যাব । তোর রেজাল্ট দিতে এখনো তো কিছুদিন বাকি আছে, এ কয়দিন এখানে এসে ঘুরে যাবি কুহুতান? ” আচমকা ফুপুর এই প্রস্তাব শুনে কুহুর মুখ চুপসে যায়। মনে পরে সেদিন রাতের অপমান। সেদিনের পর থেকে কোন ফুপুর বাড়িতে যাওয়ার কথা মনে হলেই ভয় এসে ভর করে।
” বড় ফুপুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসলাম মাত্রই। আর কিছুদিন যাক তখন তোমার কাছে যাব। ”
ফুপুর সাথে বেশ সময় নিয়ে কথা বলে অজু করে এসে জায়নামাজে দাঁড়ায় কুহু।
নামাজ আদায় করে বাড়িঘর ঝাড়ু দিয়ে পরিপাটি করে রান্নাঘরে আসে। শিউলি আক্তার তখনও ঘুমে। সে নামাজ রোজার ধারেকাছেও যায়না। কায়েস অনেক বলেও তাকে নামাজ ধরাতে পারেনি।
কুহু একে একে রুটি, আলু ভাজি, ডিম ভাজি বানিয়ে রেখে বাগানের দিকে যায়। খোঁয়াড় থেকে হাঁস-মুরগিগুলো বের করে শস্যদানা ছড়িয়ে দেয়। এরপর মাচা থেকে পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া শাক তুলে নিয়ে আসে।
অতঃপর সেগুলো বেছে, কেটে ধুয়ে নেয়। এরপর টুকিটাকি কাজ সেরে নেয়। ততক্ষণে শিউলি আক্তার উঠেছে। কায়েসও মসজিদ থেকে চলে আসে। কুহু বাবাকে দেখে দৌড়ে আসে। কায়েসও মেয়েকে দেখে গালভরা হাসি দেয়। দুই বাবা-মেয়ের হেসে হেসে কথা বলতে দেখে রাগে দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওঠে শিউলি আক্তারের।
” হইছে এত আল্লাদ দিতে হইবনা। এতদিন আল্লাদ দিয়া মাথায় তুইলাও সাধ মিটেনি? আরো দুইডা সন্তান আছে এবার তাগোর দিকে নজর দেন। খালি একটারে নিয়াই পইরা থাইকেননা৷ ” মুখ বেঁকিয়ে বলতে থাকেন শিউলি আক্তার।
” শিউলি, আমি আগেই বলেছি তুমি আমার ফুলের মত মেয়েকে নিয়ে এভাবে বলবেনা। ”
” আইছে ফুলের মত মাইয়া। ফুলতো সুন্দর হয় তা আপনের মাইয়া কোন ফুল শুনি। আমিতো তার চেহারায় কোন ফুলের ছাপ দেখিনা। আমিতো শুধু কালো রংই দেখি। ” হাসতে হাসতে ঢলে পরছে শিউলি আক্তার। সে নিজে দুধে-আলতা ফর্সার জন্য শ্যামলা কুহুকে খুব ঘৃণা করে। শিউলি আক্তার নিজেও যেমন সুন্দরী, তার ছেলে-মেয়েও মায়ের মতই রুপ পেয়েছে। যদিও কায়েসও কোন অংশেই কম নয়। আর কুহু ওর মায়ের রং পেয়েছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্নের মায়াবী চেহারা মায়ের সাথে অনেকাংশে মিলে যায়।
কায়েস শিউলির কথার কোন প্রত্যুত্তর করেনা। সে যত কথা বলবে শিউলি ততই কথা পেঁচিয়ে ঝগড়া বাঁধাবে।
কুহু ছোটমার কথা শুনে খুব কষ্ট পায়। মাথা নিচু করে নিজের ঘরে আসে। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটে খুঁটে নিজেকে দেখছে। সে কি এতই কুশ্রী যে বারবার ছোটমা কালো বলে উপহাস করে! মাঝে মাঝেই ওর খুব আফসোস হয় বাবার মত, ফুপুদের মত ফর্সা না হবার কারনে।
কতবার মনে হয়, তার মায়েরই কেন শ্যামলা হতে হল! সবার মা কত ফর্সা, কত সুন্দর কিন্তু আমার মা’ই শুধু কালো। তাই আমিও কালো হয়েছি আর এখন প্রতিনিয়ত ছোটমার খোঁটা শুনতে হয়।
ছোট্ট মনে কত যে কথা কত যে প্রশ্ন এসে ভীর জমায়। যার কোন উত্তর নেই বা উত্তর দেয়ার মানুষ নেই।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here