বিবর্ণ বৈশাখে রংধনু পর্ব -০৫

#বিবর্ণ_বৈশাখে_রংধনু
#নুরুন্নাহার_তিথী
#পর্ব_৫
বাংলোতে ফিরে রুহানী নিজের বাবা-মায়ের ঘরটার বাহিরে দাঁড়ায়। ওই ঘরটার পাশের ঘরটাই তার চাচা-চাচির। বাবা-মায়ের ঘরটাতে প্রায় আঠারো বছর ধরে কেউ থাকে না। বছরে এক-দুই বার কেয়ারটেকার সবগুলো ঘর পরিষ্কার করে যেহেতু এখানে অনেকগুলো বছর যাবত কেউ আসে না। উপরে আসার আগে রুহানী এই ঘরটার চাবি কেয়ারটেকারের কাছ থেকে নিয়ে এসেছিল। এখন রুমটার দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। রুমটা থেকে বদ্ধ একটা গন্ধ ভেসে আসছে। হাতে থাকা ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের বদৌলতে প্রথমেই নজরে আসে, পূর্ব দিকের দেয়ালের উপর তার বাবা-মায়ের সাথে তার বছর দুয়েকের একটা হাস্যজ্জ্বল বড়ো ফ্রেমের ছবি টাঙানো। রুহানী এক দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে আছে। কিয়ৎক্ষণ পর তার চোখের কোন বেয়ে অশ্রুকণা টুপ করে ফ্লোরে পরল। রুহানী ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী দ্বারা নিজের অশ্রু মুছে নিল। অতঃপর দক্ষিণ দিকের ব্যালকনির দরজাটা খুলে দিল। বহুদিন পর দরজা খোলাতে দমকা হাওয়া এসে শরীরে শীতল কম্পনের সৃষ্টি করল। দরজাটা খোলা রেখেই রুহানী ঘরের সুইচ টিপে দেখল লাইট জ্বলে না। স্বাভাবিক! এতো বছরে লাইট ঠিক থাকে নাকি? ঘরটা খোলা রেখেই নিজের ঘরে ছুটে গেল, টেবিল ল্যাম্প ও নিজের পারসেনাল ডায়েরিটা আনতে।

রুহানীর দৌঁড়ে যাওয়া দেখে পৌঢ়া গৃহকর্মীটি বলে ওঠলেন,
“কোথায় যাচ্ছেন ছোটো আপা? আস্তে দৌঁড়ান। পরে যাবেন তো।”

রুহানী শুনল না। সে ছুটে চলল। মূলত রুহানীরা সিলেটে আসার আগে দুইজন গৃহকর্মীও সাথে করে নিয়ে এসেছেন।
নিজের ঘরে এসে ডায়েরি ও টেবিল ল্যাম্পটা নিয়ে আবার বাবা-মায়ের ঘরে গিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল। তারপর পুরানো টেবিলের উপর ল্যাম্পটা রেখে চেয়ার টেনে বসল। চেয়ারটাও খটখট করছে। ভয় হচ্ছে কিছুটা। কিন্তু তার এখন নিরবে কিছু লিখতে হবে।

রহমত শেখ ও জাহানারা শেখ বাংলাতে ফিরে সার্ভেন্টকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“রুহানী কোথায়?”
তখন সারভেন্টরা বলল,
“রুহানী আপা তার বাবা-মায়ের ঘরের দরজা খুলে সেখানেই দৌঁড়ে গেল দেখলাম।”

জাহানারা শেখ তা শুনে হতাশ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“মেয়েটার খুব মন খারাপ। মন খারাপ তো হবেই। তাই না? বারবার বিয়ে ভাঙলে! আর এইবার তো বিয়ের পিঁড়িতে বসেই বিয়েটা ভাঙলো! মন খারাপ হওয়ারই কথা। ও হয়তো ভাবছে, আমরা ওর দুঃখে দুঃখী না হয়ে নিজেদের মেয়ের বিয়েতে আনন্দ করেছি। আমার লজ্জা লাগছে আমার মেয়েটা এরকম করতে পারলো? অবশ্যই এতে আমাদেরও দোষ আছে। ওকে এখান থেকে পাঠিয়ে দেওয়ার পর ভেবেছিলাম হয়তো শুধরে যাবে। কিন্তু ও যে আরো বেপরোয়া হয়ে যাবে তা বুঝিনি। কী করতাম আর? আমি যে আমার আপুকে কথা দিয়েছিলাম, তার মেয়েকে আমি নিজের মেয়ের মতো করে বড়ো করব।”

রহমত শেখ গাড়ো নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“পুরনো কথা বাদ দাও জাহানারা। এখন চলো দেখি, রুহানী সেখানে কি করছে?”

“কী আর করবে? ওর সেই প্রিয় ডায়েরি! সেই ডায়েরিতেই হয়তো নিজের মনের দুঃখগুলো লিখে রাখছে। কাউকে বলতে তো পারে না। শেয়ার করতে পারে না। ওর তো ডায়েরিটাই আছে এখন।”

বলতে বলতে জাহানারা শেখের চোখের কোণে পানি চলে আসলো। তিনি রুহানীকে নিজের মেয়ের থেকে বেশি ভালোবাসেন তার কারণও আছে। রুহানী হচ্ছে তার বড়ো বোন হাসনেয়ারার মেয়ে। রহমত শেখের বড়ো ভাই রবিউল শেখের সাথে জাহানারা শেখের বড়ো বোন হাসনেয়ারার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের প্রায় ৮ বছর পর অনেক কষ্টের পর রুহানীর জন্ম হয়েছিল। রুহানীর জন্মের আগে হাসনেয়ারা ও রবিউল শেখ রিহাকে নিজেদের মেয়ের মতো আদর করতেন। তারপর রুহানীর জন্মের পরও রিহার প্রতি তাদের আদর কিন্তু কমেনি বরং সমান সমান ছিল। কিন্তু রিহা সেটা সহ্য করতে পারত না। রিহা ভাবতো, রুহানীর জন্য তার আদরে বিভাজন চলে এসেছে। তাই এক কথায় রুহানীকে তার পছন্দ ছিল না। তারপর হাসনেয়ারা ও রবিউল শেখের মৃত্যুর পর জাহানারা শেখ ও রহমত শেখের কাছে রুহানীকে নিজেদের মেয়ের মতো আগলে নেওয়াতে রিহার ক্রোধ যেন দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। সে রুহানীকে বিভিন্নভাবে আ*ঘাত করার চেষ্টা করতে থাকে। এমনকি বড়ো হওয়ার পরে রিহার এসব কর্মকাণ্ড সাইলেন্টলি বাড়তে থাকে। রিহাকে এজন্য সাইকোলজিস্টও দেখানো হয়েছিল। সাইকোলজিস্ট সাজেস্ট করেছিলেন রিহাকে তারা যেন রুহানীর থেকে দূরে রাখে। তাইতো জাহানারা শেখ ও রহমত শেখ বাধ্য হয়ে রিহাকে তার মামার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

জাহানারা শেখ রুহানীর বাবা-মায়ের রুমের দরজায় নক করে রুহানীকে ডাকেন,
“রুহানী, দরজাটা খোল মা। আমাদের উপর রাগ করে থাকিস না মা।”

ভেতর থেকে রুহানী শুনল কিন্তু তার তখনও একটি কিছু লিখা বাকি ছিল। তাই বাকিটুকি লিখে তারপর দরজা খুলবে বলে ভাবলো।

রহমত শেখ বলে ওঠেন,
“জিহান চলে গিয়েছে বলে তুই একদম কষ্ট পাবি নারে মা। দেখবি তোর জন্য জিহানের থেকেও ভালো পাত্র আমি খুঁজে আনব। যে তোর খারাপ-ভালো সবকিছু নিয়ে তোকে ভালবাসবে। তোকে নিজের করে নেবে। আমারই ভুল হয়েছিল, তাদের থেকে লুকানোটা উচিত হয়নি। আসলে আমি তোর ভালো করতে গিয়ে খারাপটাই করে ফেললাম।”

চাচার কথা শুনে এবার রুহানী দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরিটা বন্ধ করল। অতঃপর দরজা খুলল। তারপর মুচকি হাসি দিয়ে তাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরে। কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর তাদেরকে ছেড়ে খানিক সরে এসে তাদের চোখের কোণে চিকচিক করা জলরাশির গতিপথ রুদ্ধ করে দিয়ে মাথা নাড়িয়ে মন খারাপ করতে নিষেধ করে। তারপর তাদেরকে জোর করে ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে ইশারায় রেস্ট নিতে বলে নিজেও নিজের ঘরে চলে গেল।

_______
ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। আরহান সবে বাড়ি ফিরেছে। আরহান সিঁড়ি দিয়ে নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য উপরে উঠতে নিলে তার বাবা আজমল খান ডাক দেন। আজমল খান নিজেই বসার ঘরের লাইট জ্বালিয়ে বলেন,

“এতোক্ষণ কোথায় ছিলে? ঘড়িতে সময় দেখেছ? এতো রাত করে তবে বাড়ি ফেরার কী দরকার ছিল? যেখানে ছিলে সেখানেই থেকে যেতে।”

আরহান চোখ বন্ধ করে ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে পেছোনে ঘুরে নিচে তাকিয়ে বলে,
“বলছ চলে যাব?”

ছেলের কথা শুনে আজমল খান রেগে যান। তিনি রাগী কণ্ঠে বলেন,
“এমন একটা ভাব করছো যেন তুমি আমার সব কথা শোনো! আমার সব কথার বাধ্য তুমি! কিন্তু তুমি যে আমার কত বড়ো অবাধ্য তা তো আমার জানা আছে।”

“তোমার বাধ্য হতে,, আই মিন, আপনার বাধ্য হতে কী করতে হবে মে’য়র সাহেব? যদি বলে দিতেন উপকার হতো। তাহলে এখন থেকে চেষ্টা করতাম।”

ছেলের আপনি সম্বোধনে ভীষণ হতাশ আজমল খান। তিনি বলেন,
“তোমাকে আমি বলেছিলাম আমার হয়ে রহমত শেখের মেয়ের বিয়েতে চলো। কিন্তু তুমি গেলে না। তারপর আমাকেই কাজ শেষ করে যেতে হয়েছে। সেখানে না গিয়ে তুমি সারা দিন-রাত কোথায় ছিলে তুমিই ভালো জানো।”

“মিসটেক মেয়র সাহেব। রহমত শেখের মেয়ের বিয়ে ছিল না। রহমত শেখের ভাতিজির বিয়ে ছিল। কিন্তু বিয়েটা তো হয়নি। তাহলে সেখানে গিয়েও বা কি লাভ! টাইম ওয়েস্ট করার কোনো মানেই হয় না। তাছাড়া আমার এসব বিয়ে বাড়ির কোলাহল অতটা পছন্দ না। আমার একটু নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশ পছন্দ। আকাশের মতো প্রশান্ত, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ পছন্দ।”

ছেলের কথা শুনে আজমল খান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকান। অতঃপর বলেন,
“তোমাকে কে বললো বিয়েটা হয়নি? বিয়েটা হয়েছে। আমি নিজে বিয়েতে ছিলাম। হ্যাঁ আমার কিছু কাজের জন্য বিয়ের লাস্ট সময় আমি গিয়েছি।”

“এটাই তো মেয়র সাহেব, আপনি বিয়ের লাস্ট সময় গিয়েছেন। আর আমি বিয়ের লাস্ট সময়ে বিয়ের যে আসল কনে ছিল তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসেছি। হয়তো বিয়েতে কোন ঝামেলা হয়ে বিয়ের কনে বদলে গেছিল! এমন কিছু সামথিং হবে হয়তো। হোয়াটএভার। ভালোই করেছি যাইনি। এতো ড্রামা দেখার আমার সময় নেই। আপনি ভাবেন আমার কোন কাজ থাকে না। কিন্তু ভুলে যাবেন না, আমার উপরও একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে।”

এই বলে আর আরহান সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। নিচ থেকে আজমল খান বলতে থাকেন,
“হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার কি কাজ তা তো জানা আছেই। আমার অবাধ্য হয়েই তো তুমি এটা করছ।”

আরহান তার বাবার কথা মোটেও পাত্তা দিলো না। সে তার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

চলবে ইনশাআল্লাহ,
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন। কপি নিষিদ্ধ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here