বিবাহিত চুক্তি পর্ব ৭+৮

পর্ব ৭+৮
#বৈবাহিক_চুক্তি
#লিখাঃ Liza Bhuiyan
#পর্বঃ৭

কান্নারত মেয়েটিকে দেখে সায়ানের খুব মায়া হলো যাকে অন্তরের অন্তস্থঃতল থেকে মায়া, মেয়েটির দিকে হাত বাড়িয়েও কিছুটা দমিয়ে বলে উঠলো

“তোমাকে যে কি দেখে চুজ করলো আমি ভেবে পাচ্ছিনা, আই ফিল স্যাড ফর ইউ রিয়ালি স্যাড”

“মা..মানে?কি বলতে চাইছো তুমি? ” বলেই সায়ানের দিকে হাত বাড়াতেই ও কয়েকপা সরে গেলো।

“তোমরা মেয়েরা বুঝো না তাই না যে আমি তোমাদের মত গায়ে পড়া মেয়েদের দেখতে পারিনা, আমার বউ আর যাইহোক তোমার মতো ছেঁচড়া না।এক মিনিট সময় দিচ্ছি নিজের সবকিছু নিয়ে চলে যাও। তোমার ভাগ্য ভালো তুমি মেয়ে আর মেয়েদের গায়ে হাত তুলি না, নাহয় তোমাকে সায়ান জামিল খানের সামনে দাঁড়িয়ে নাটক করার সাহস গুচিয়ে দিতাম ”

মেয়েটি দ্রুত বেরিয়ে যেতে নিলে সায়ান পেছন থেকে বলে উঠে ” তোমার ওই কাপুরুষ বস কে বলে দিও খুব শিগ্রই আমাদের সামনা সামনি দেখা হচ্ছে, টেল হিম টু বি প্রিপেয়ার্ড আদারওয়াইজ…” ভিলেনমার্কা হাসি দিয়ে বললো।

মেয়েটি চলে যেতেই সাহিল ভেতরে ঢুকে বললো ” বস মেয়েটি চলে গেলো যে? ”

“ও আমার বউ না সাহিল, আমার বউ আর যাইহোক এমন না”

” এতো শিওর হলেন কি করে? মেয়েটি ওইদিন রাতের অনেক কিছুই জানে”

” এক্সেকলি অনেক কিছু জানে তাইতো ওভার কনফিডেন্স হয়ে ভুল করেছে।প্রথমত, আমার বউ ওর মতো গায়ে পড়া না, প্রথম দিনেই বুঝে গেছি যে ও অন্য মেয়েদের মত আমার সাথে ওইভাবে কথা বলবে না। দ্বিতীয়ত, আমি ওর কণ্ঠ খুব ভালো করে চিনি যেটা এই মেয়ের মতো না।আর শেষ মতে ও আনিকা নয় ওর নাম হচ্ছে রু.শা.নি, ওর নামরুশানি। কাজি যখন নাম বলেছিলো আমার এই নাম মনে গেঁথে গেছে তাই আমার বউয়ের নাম ভুলে যাবো এটা কখনো হবে না আর এক্টিং লেভেল যা বাজে যে কেউ ধরতে পারবে ”

” কিন্তু বস ফোনে ওই লোকটি যে বললো ও ম্যাডাম কে চিনে ”

” আমাকে ভয় দেখানোর জন্য ভুল বলেছে, যেখানে আমিই খুজে পায়নি সেখানে তার খুজে পাওয়ার প্রশ্নই আসে না, সে চায় আমি যাতে রুশানিকে খুজে বের করার জন্য মরিয়া হই আর খুজে পেলে সে আমার দূর্বলতার সুযোগ নিবে যেমন ভিলেন রা নেয় , হাহা হাহা ব্লাডি থার্ডক্লাশ প্ল্যান ও তো জানে না যে আমি কোন হিরো নই। আমি এই গল্পের ভিলেন যে খেলার রুলস তৈরি নিজে আর জিতেও। এন্ড আই উইল উইন ইন দিস গেম ফর শিউর ”

” ইয়েস বস, আমি আপনার পাশে আছি ”

“তাইতো ভরসা পাই সাহিল, তুমি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক ” কাধে হাত রেখে, চলো ম্যাডামকে দেখে আসি, না জানি সকালে মুখ দেখে কি করেছে হাহা

” বস আপনি তাহলে ওই মুস একে দিসেন? সকালে সেই লেভেলের চেতে গেছিলো পরে আমাকে দেখে ওয়াশরুমে চলে গেছে হাহা ”

” মেয়েটাকে দেখলে রাগি মনে হয় কিছুটা রুশানির মতো ” রুশানির কথা মনে পড়লেই বুক চিরে দীর্ঘনিঃশ্বাসেরা বের হয়, কবে ফিরে তার শ্রেয়সী তার বুকে! বড্ড মন খারাপ হয় তাকে ছাড়া।এই মন খারাপটা বড্ড কঠিন একটা অসুখ। যখন মন খারাপেরা হানা দেয় তখন বিরক্তি নামক শব্দটিও যেন আস্ত বিরক্তিতে পরিণত হয়, এই বিরক্তি দূর কোন স্বচ্ছ হাসিতে যে হাসিটা সে চার বছর ধরে খুজে বেড়াচ্ছে। এই আঠাশ বছর জীবনে প্রাপ্তির শেষ নেই তবে দিনশেষে সে শুন্য আর একা বড্ড একা।

কয়েকদিন পর, রুশি রুহানকে ডিসচার্জ করে পরেরদিন কিছু না বলেই চলে এসেছিলো কিন্তু এভাবে চলে আসটা ওর ভালো লাগেনি। এটলিস্ট উপকারের জন্য থ্যাংকস বলা উচিৎ তার। আর খালি হাতে থ্যাংকস বলা যায় না তাই একটা চাবির থোকা কিনেছে কে জানে পছন্দ হবে কিনা! সাহিল থেকে ঠিকানা নিয়ে সায়ানের বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিলো রুশি।

#পর্বঃ৮

পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে সোফার উপর বসে আছে রুশি, এতক্ষণ বসে থাকতে থাকতে পা ধরে গেছে কিন্তু লোকটি আসছে না, সেই নয়টা থেকে বসে আছে এখানে। সামনে নানান ধরনের খাবার আর ফ্রুট সাজানো কিন্তু মুখে দেয়া তো দূরের কথা বিরক্তির কারণে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না।

লোকটি নাকি এখনো ঘুম থেকেই উঠেনি, সারারাত কি চুরি করে নাকি যে সকাল নয়টা পঁয়তাল্লিশ বাজে এখনো ঘুম থেকে উঠছে না। আর সার্ভেন্টদেরো বলি হারি লোকটি কি বাঘ না ভাল্লুক যে ডাকতে ভয় পাচ্ছে, নিজে আগবাড়িয়ে গিয়ে ডাকতেও পারছেনা যদি অভদ্র মনে করে। একা একটা ছেলের ঘরে নক করা যুক্তিসংগত নয় বিধায় এতক্ষণ দম ধরে বসে আছে কিন্তু আর সহ্য হচ্ছে না।
আজকে যদি ধন্যবাদ না দিতে পারে তাহলে হয়তো আর কখনো দেয়া হবেনা, রুহানকে ছোট মার বাসায় একা রেখে এসেছে, না জানি ছোট মা কি বলে যাতে ছোট্ট বাচ্চাটির মনঃক্ষুণ্ণ হয়। নাহ আর থাকা যাবে না আর যাইহোক রুহান যদি জানতে পারে ও বাবাবিহীন সন্তান তাহলে অনেক কষ্ট পাবে। একজন সার্ভেন্টকে একটা পেপার আর পেন এনে দিতে বললো ও আর সেখানে কিছু একটা লিখে নিয়ে আসা গিফট সহ সার্ভেন্টদের কাছে রেখে বেরিয়ে পড়লো। লোকটিকে দেখার খুব কৌতুহল ছিলো ওর কিন্তু সেই কৌতুহল মনের মাঝেই দমিয়ে রেখে নিজ গন্তব্যে ছুটলো ও।

ছোট মার বাসায় ফিরে এসে ঘড়িতে দেখলো ১০টা বেজে ২০ মিনিট, দাদিমার ঘরের দিকে যাওয়ার পথে ছোটমার কটাক্ষের দৃষ্টি অগোচর হয়নি, এই বাড়িটা যে আস্ত ছোটমার রাজ্যে পরিণত হয়েছে তার কথাই শেষ কথা। তিশানটা ছোটমার ভয়ে অনেকটা লুকিয়ে কথা বলে আমার সাথে। আর বাবা তাকেতো আমি আসার পর থেকে চোখের দেখাও দেখিনি, হয়তো সে জানেইনা আমি এসেছি, তানহার আগের থেকেও উৎশৃংখল হয়ে গেছে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরনের কাপড় সংকির্ণ হয়ে এসেছে, ছোটমার বদৌলতে হয়তো। দাদিমার ঘরে রুহানকে গুটিসুটি মেরে সুয়ে থাকতে দেখলাম, রুহান আজকাল কথা খুব কম বলে আগের থেকেও আরো গম্ভীর হয়ে উঠেছে। সেইদিককার ঘটনার পর থেকে কেমন জানি ভয়ে ভয়ে থাকে। ওকে স্বাভাবিক করতে হলে আগের পরিবেশে নিয়ে যেতে হবে। দাদিমা এখন কিছুটা সুস্থ তাই আজই কলকাতা ফিরে যাচ্ছি আমরা, দুপুর দুইটায় ফ্লাইট। আর ছোটমার চাহনি সহ্য হচ্ছে না তাই একদিন আগেই ফিরে যাচ্ছি।

হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ হয়ে হোটেলে উঠে ছিলাম কালকে দাদিমার অনুরোধে এখানে উঠেছি যদিও এখানকার অনেকেরি তা পছন্দ হয়নি কিন্তু আমার আর এখন কিছু যায় আসেনা, আমি স্বাবলম্বী কারো বোঝা নই যে চুপচাপ মুখ বুজে হজম করে যাবো সব। সবকিছু গুছানো হয়ে গেছে অলরেডি, এই ঘরের কিছু মুখে দেয়ার ইচ্ছা নাই তাই আগেই বেরিয়ে পড়েছি এয়ারপোর্টের উদ্দ্যেশ্যে। আসার সময় দাদিমা বাধা দেয়নি কেন দিবে?এই ঘরের কর্তী যে অন্য কেউ তারতো কিছু বলার অধিকার নেই। সত্যিই ওইসব ছেলেদের প্রতি ঘৃণা হয় যারা বউয়ের জন্য মাকে অবহেলা করে। প্রতিটা ছেলের জীবনে প্রথম নারী হচ্ছে তার মা আর প্রথম ভালোবাসাও। যে নিজের মাকে ভালোবাসতে পারেনা সে আর কাউকেই ভালোবাসতে সক্ষম নয়।

🌸🌸🌸

দুপুর বারোটায় ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছে সায়ান, আজকাল ঘুমের ঔষুধ ছাড়া ঘুম আসেনা তার, বুকটা বড্ড ফাকা ফাকা লাগে। কালরাতে একটা খাওয়ার পরোও ঘুম আসছিলো না তাই দুটো ঘুমের ঔষুধ একসাথে খেয়েছে যারফলে কিচ্ছুক্ষণ আগে ঘুম ভেংগেছে ওর। উফফফ এতক্ষণ যে কিভাবে ঘুমালো আল্লাহ জানে। খাবার ফিনিশ করে সোফায় বসতেই মনে হলো কিছু একটার উপর বসেছে, হাতে নিতেই দেখে একটি চেইন যার থেকে কিছু একটা নিচে পড়ে গেছে, নিচে নেমে খুঁজতেই সোফার নিচে গোল কিছু পড়ে থাকতে দেখলো হাতে নিতেই দেখে একটা আংটি। আংটিটি দেখেই ওর চোখ চড়াগাছ, এটাতো সেই আংটি যে ও ওর বউকে পরিয়ে দিয়েছিলো কারণ এই আংটিটি ওর মায়ের ছিলো যেটা ও ওর বউকে দিয়েছে।কে এসেছিলো তা গার্ডদের জিজ্ঞেস করতে যাবে তখনি পেছন থেকে একজন সার্ভেন্ট বলে উঠলো

” স্যার একটা মেয়ে এসেছিলো আপনার কাছে ”

” মেয়ে, কেমন দেখতে? লম্বা, চিকন? ”

” জি স্যার ফর্সাও দেখতে ”

” তুমি আমায় উঠাওনি কেন ডেমেট? “চিল্লিয়ে উঠে কথাটা বললো সায়ান

” স্যার আপনি ঘুমের মাঝে কারো ডিস্টার্ভেন্স পছন্দ করেন না তাই ডাকি নি, উনি অনেকক্ষণ বসে ছিলো আর যাওয়ার আগে এই জিনিসগুলো দিয়ে গেছে ”

সায়ান হাতে নিয়ে দেখে একটা ছোট বক্স আর চিরকুট যাতে লিখা

” অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সেইদিন বাচানোর জন্য, আপনি না থাকলে হয়তো বেচে থাকতাম না। সামনা সামনি ধন্যবাদ দেয়ার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু তাতো আর হয়ে উঠলো না। যাইহোক থ্যাংকস ওয়ান্স এগেইন, আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক”
ইতি
রুশানি আনাম

নামটা কয়েকবার ছুঁয়ে দিলো ও, এতো কাছে ছিলো ওর বউটা অথচ ও বুঝতেই পারেনি, চিনতেই পারেনি ওকে।সাহিলকে ফোন করে ঠিকানা জোগাড় করতে বললো ওর।
সাহিলের পাঠানো ঠিকানাতে গিয়ে জানতে পারলো রুশানি কলকাতা যাওয়ার উদ্দ্যেশ্যে আরো দুঘণ্টা আগে বেরিয়ে পড়েছে, কথাটা শুনে খুব অস্থিরতা কাজ করেছিলো। খুব দ্রুত ড্রাইভ করে এয়ারপোর্টের উদ্দ্যেশ্যে যাচ্ছে। বারবার মনে মনে দোয়া করছে যাতে ফ্লাইট না ছেড়ে যায়। কিন্তু কথায় আছেনা যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। রিসেপশন থেকে জানতে পারলো কলকাতা গামি প্লেন আরো আধাঘণ্টা পুর্বেই গন্তব্যের উদ্দ্যেশ্যে ছেড়ে গেছে।

সায়ান ওইখানে থাকা চেয়ারে বসে পড়লো, চোখজোড়া টলমল করছে পানিতে, তবে কঠোর অনুশাসনের কারণে ক্ষয়ে পড়ার অনুমতি তাদের নেই,ছেলেদের যে কাঁদতে হয়না, কান্না শব্দটা তাদের জন্য নিষিদ্ধ তবে তার যে কান্না পাচ্ছে ভিষন, কোন নিরাপদ আশ্রয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে আমি আবারো তাকে হারিয়ে ফেলেছি যার মুখখানি দেখার জন্য চারটি বছর ধরে মরিয়া হয়ে আছে…

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here