বিরহ শ্রাবণ ২ পর্ব – ৩৮

#বিরহ_শ্রাবণ(দ্বিতীয় খণ্ড)
#পর্ব_৩৮
#লেখিকা_সারা মেহেক

ফারিয়ার এরূপ কথায় আমি হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ ওর দিকে চেয়ে রইলাম। এর মানে অভ্র ভাই আমার ব্যাপারে ফারিয়াকে সব বলে দিয়েছে! ফারিয়া আমাদের ব্যাপারে সব জানে! আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য খানিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ওকে জিজ্ঞেস করলাম,
“ ফারিয়া? অভ্র ভাই কি তোমাকে সব বলে দিয়েছে? ”

ফারিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“ জ্বি ভাবী, বিয়ের দিন রাতেই আমাকে সব জানিয়ে দিয়েছিলো উনি। কিছুই গোপন রাখেননি৷ আপনাদের ব্যাপারে। সব জানিয়ে দিয়েছেন উনি৷”

এবার মনে মনে অভ্র ভাইয়ের প্রতি ভীষণ রাগ হলো আমার৷ এমন সেন্সিটিভ কথাগুলো ফারিয়াকে বিয়ের রাতেই বলার কি প্রয়োজন ছিলো! কিছুটা সময় নিয়ে বলতেন উনি। আচ্ছা, বলেছেন তো বলেছেন, সবটা বলার কি দরকার? এখন ফারিয়ার সামনে নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগছে।
ফারিয়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কি বলা উচিত তা মাথায় এলো না আমার। খানিক সময় নীরব থেকে অতঃপর বললাম,
“ ফারিয়া, যা হয়েছে সবটাই অতীত। অতীতকে আশ্রয় করে কেউ চলে না। আর এ বর্তমানের উপর অতীতের কোনে ছায়া নেই। এজন্য অভ্র ভাই যা বলেছেহ তা ভুলে গিয়ে নতুন করে সব শুরু করো। ”

ফারিয়া দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বললো,
“ আর নতুন করে কি শুরু করবো ভাবী? আমার তো মনে হয় বিয়ের রাতেই আমার সব শেষ হয়ে গিয়েছিলো। আমি উনার ভালোবাসা পাবার আশা একদমই ছেড়ে দিয়েছি। ”

“ এমনটা বলো না ফারিয়া। খুব বেশি দেরি হয়নি। আমি হলাম উনার অতীত। আর তুমি উনার বর্তমান, ভবিষ্যত। তুমি একটু সময় দাও। দেখবে সব ঠিক হয়ে গিয়েছে। তোমাদের সম্পর্কটা তুমি যেমন চাইছো তেমনই হয়ে যাবে। শুধু একটু সময় আর ধৈর্য্যের প্রয়োজন। ”

ফারিয়া আর কথা বাড়ালো না। মুখ লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আমি নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়েও ফারিয়ার কষ্ট কিছুটা হলেও অনুমান করলাম। কিন্তু আমি জানি, আমার এ অনুমানের কাছে ফারিয়ার কষ্ট কিছুই না। আমার অনুমানের চেয়েও শত গুণ কষ্টে আছে সে। তবে আমি এই ভেবে ভীষণ অবাক হলাম যে, ফারিয়া সবটা জানার পরও আমার সাথে এতোটা অবাধে কি করে কথা বলছে? ওর কি আমার উপর ভীষণ রাগ থাকার কথা নয়? কিন্তু ও যে আমার সাথে একদম মুক্তমনে কথা বলছে! এতে কোনো সন্দেহ নেই, ফারিয়া বড্ড উদার মনের মেয়ে। অভ্র ভাই যে ভাগ্য করে এমন জীবনসঙ্গীনী পেয়েছেন তাতে উনার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কিন্তু উনি এখনও সেই দূর্বিষহ অতীত নিয়ে পড়ে আছেন। আর এ নিয়ে উনাকে বুঝানোর মতো ধৈর্য্যও আমার নেই।

————————

দেখতে দেখতে জীবন থেকে চলে গেলো তিন বছর। সময়টা খুব দ্রুতই কেটে গিয়েছে৷ সময়ের সাথে পরিবর্তন হয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের ধরণ। বদলে গিয়েছে আমাদের নিত্যকর্মের ধরণ। এখন একে অপরের জন্য সময় বের করাই দুঃসাধ্য হয়ে গিয়েছে। আমি ব্যস্ত থাকি পড়ালেখা নিয়ে, প্রোজ্জ্বল ব্যস্ত থাকে ডিউটি নিয়ে। ও এখন এই মেডিকেলেই মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে মেডিকেল অফিসার হিসেবে জয়েন করেছে। আমি যখন থার্ড ইয়ারে উঠি তখন ও লেকচারার পদ থেকে মেডিকেল অফিসার হিসেবে জয়েন হয়েছে। মূলত আমার কারণেই ও লেকচারার পদ থেকে বদলি হয়ে মেডিকেল অফিসার হয়েছে।

এখন আমি ফিফথ ইয়ারে। আর সাত মাস পরে আমার ফাইনাল প্রফ। ক্লাস, ওয়ার্ড ঘুরতে ঘুরতে সময় চলে যাচ্ছে। যেদিন একটু নিজের জন্য সময় পাই সেদিন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেই সারাদিন। এ নিয়ে মামিও কিছু বলেন না। কারণ উনি দেখেন যে আমি ঠিক কতোটা ক্লান্ত হয়ে যাই বাসায় ফিরে। আজকাল আবার ক্লান্তির পরিমাণ বেশ বেড়েছে বোধহয়। এজন্য ঘুমও পায় প্রচুর।

প্রোজ্জ্বলের সাথে সময় কাটাই ঐ রাতটুকুই। রাত দশটার পর থেকে ওর সাথেই সবসময় থাকার চেষ্টা করি। যদিও সারাদিনের ডিউটির পর ওর শরীর ভীষণ ক্লান্ত হয়ে যায়। তাই দ্রুতই ঘুমিয়ে পরে ও। এখন ওর সাথে প্রেম, ভালোবাসা, বৈবাহিক জীবন, এসব নিয়ে কথা হয় না। আমাদের কথা হয় রোগী নিয়ে, রোগ নিয়ে। এখন ক্লিনিক্যাল সাবজেক্ট নিয়ে পড়া হচ্ছে বলে রোজ প্রোজ্জ্বল এসে আমাকে কি কি রোগী দেখলো তা নিয়ে গল্প শোনান৷ আমিও বেশ মনোযোগ সহকারে শুনি। পরীক্ষায় বেশ কাজে আসবে ভেবে। তবে মাঝে মাঝে কাজের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে ভীষণ বিরক্ত হয়ে যাই আমি। মন চায় টুকটাক প্রেমালাপ করি। কিন্তু পরে কি ভেবে যেনো মিইয়ে যাই। দিন শেষে উপলব্ধি করি, আমাদের দুজনের বিরতি দরকার। কাজ ও পড়া হতে বিরতি। যে বিরতিতে দুজনে মন খুলে কথা বলতে পারবো, মন মতো কোথাও ঘুরতে যেতে পারবো, আমাদের সাংসারিক জীবনটা উপভোগ করবো। কিন্তু আফসোস, সে সময় বের করার সময়টুকু আমাদের নেই। আমরা দুজনেই ব্যস্ত। একজন ডিউটি ও পড়াশোনা নিয়ে। আরেকজন পড়াশোনা নিয়ে। তিন বছর আগে প্রোজ্জ্বল যে এমডি পরীক্ষা দিয়েছিলো তাতে ওর চান্স হয়নি। এরপর আর কোনো পিজি’তে চান্স পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেনি ও। ওর কথা, আমি আমার এমবিবিএস আগে শেষ করবো তারপর ও পিজি’র জন্য চেষ্টা করবে।

প্রোজ্জ্বল বাসায় ফিরলো যথাসময়ে। তবে রুমে প্রবশে মাত্র আমার হাতে প্রেগন্যান্সি কিট ধরিয়ে দিয়ে বললো,
“ চন্দ্রিমা, বাসায় টেস্টটা করিয়ে ফেল। ”

ওর হাতে হঠাৎ টেস্ট কিট দেখে আমি যেনো আকাশ থেকে পড়লাম। কণ্ঠে বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম,
“ প্রেগন্যান্সি কিট কেনো! আমি কি শিওর কিছু বলেছি তোমাকে?”

“ শিওর হয়ে বলিসনি বলেই তো টেস্ট করতে চাচ্ছি। এক মাস তোর পিরিয়ড অফ। সাথে মাঝেমধ্যে তোর মাথাও ঘুরায়। শিওর তো হতে হবে তাই না?”
প্রোজ্জ্বলের কথায় এবার দুশ্চিন্তার ছায়া পেলাম। ওর এরূপ চিন্তিত চাহনি ও কথাবার্তায় আমিও চিন্তিত হয়ে পড়লাম। মনের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক হলো, সত্যিই কি আমি প্রেগন্যান্ট!
প্রোজ্জ্বলকে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
“ যদি রেজাল্ট পজিটিভ হয়?”

প্রোজ্জ্বল মাথা চুলকিয়ে শান্ত তবে উদ্বিগ্নপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,
“ পজিটিভ হলেও কিছু করার নেই। তবে আমি চাই না এ মুহূর্তে পজিটিভ হোক। তোর ফাইনাল প্রফের আর সাত মাস আছে। এর মাঝে প্রেগন্যান্ট হওয়া মানে বাচ্চারও ক্ষতি, তোর পড়াশোনারও ক্ষতি। বুঝছি না কি করবো। তুই এখন গিয়ে টেস্ট কর আগে। তারপর যা হওয়ার বুঝা যাবে। ”

আমি আর কথা না বাড়িয়ে কিট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। ২০ মিনিট অপেক্ষার কর বেরিয়ে এলাম ওয়াশরুম থেকে। কিটটা হাতের মুঠোয় নিয়ে রেখেছি। রেজাল্ট দেখিনি। মনের মাঝে ভীষণ ভয় করছে। উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠা এবং কোথাও না কোথাও খানিক খুশির উত্তেজনা কাজ করছে।

আমি রেজাল্ট না দেখে কিটটা সরাসরি প্রোজ্জ্বলের হাতে ধরিয়ে দিলাম। উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দু চোখ খিঁচে বন্ধ করে রাখলাম। অপেক্ষায় রইলাম প্রোজ্জ্বলের জবাবের। কিন্তু বেশ কিছু সময় পেরিয়ে যাবার পরও যখন ওর নিকট হতে কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না তখন খানিক ভয়ে দৃষ্টি মেললাম। দেখলাম ও অপলক দৃষ্টিতে কিটের দিকে চেয়ে আছে। ওর এরূপ চাহনি দেখে আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেলো। গলা শুকিয়ে এলো। জিব দিয়ে ওষ্ঠ জোড়া ভিজিয়ে নিলাম। কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
” রেজাল্ট কি?”

প্রোজ্জ্বল ছলছল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। বিনা বাক্যে আচমকা আমায় জড়িয়ে ধরলো। বললো,
“ পজিটিভ চন্দ্রিমা। আমি বাবা হবো চন্দ্রিমা। আর তুই মা।”

প্রোজ্জ্বলের প্রতিটি বাক্য আমার কানে ঝংকার তুললো। খানিক সময়ের জন্য বোধহয় নিঃশ্বাস নিতে ভুলে বসলাম। আমি প্রোজ্জ্বলকে ছেড়ে দিয়ে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
“ সত্যি! সত্যি বলছো তুমি? নাকি মজা করছো আমার সাথে?”

“ মজা না। সত্যি বলছি। এই দেখ রেজাল্ট। ”
বলেই প্রোজ্জ্বল আমার দিকে কিটটা এগিয়ে দিলো। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না৷ রেজাল্ট আসলেই পজিটিভ। অসীম খুশিতে আমার হৃদয় উতলে উঠলো। প্রোজ্জ্বলকে পুনরায় জড়িয়ে ধরে বাঁধাহীন খুশির ফলে কেঁদে ফেললাম। আমার দু চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। এর মাঝে অনুভব করলাম প্রোজ্জ্বলও কাঁদছে। আমি ওকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দেখলাম ওর দু চোখে পামি টলটল করছে। আমি ভেজা চোখেই সামান্য হেসে ফেললাম। জিজ্ঞেস করলাম,
“ কাঁদছো তুমি?”

প্রোজ্জ্বল আমার প্রশ্নে দ্রুত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখমুখ মুছে ছিলো। নাক টেনে বললো,
“ উঁহু, আমি কাঁদছি না তো। তুই কাঁদছিস। এই দেখ, তোর চোখে পানি। আমার চোখে নেই তো।”

আমি পুনরায় হেসে ফেললাম। প্রোজ্জ্বল আমায় জড়িয়ে ধরলেন। অদ্ভুত এক সুখের সাগরে ভেসে গেলাম যেনো। কখনো কল্পনা করিনি এভাবে আচমকা আমাদের জীবনে খুশি এসে চমকে দিবে। বদলে দিবে সব কিছু। প্রোজ্জ্বল আমার কপালে আলতো চুমু দিয়ে বললো,
“ এমন একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য থ্যাংকস চন্দ্রিমা। ”
এই বলেই উনি আমায় নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“ কিন্তু এতো প্রেশার আর পরীক্ষার সামনে কিভাবে কি সামলাবো চন্দ্রিমা? হঠাৎ আমার মাথা যেনো কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। পরীক্ষার আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। এর মাঝে তুই প্রেগন্যান্ট। পরীক্ষার মধ্যে তুই প্রেগ্ন্যাসির লাস্ট ট্রাইমেস্টারে এ থাকবি তখন সময়টা খুব রিস্কি থাকে। আর তোর তখন থাকবে পাহাড় সমান প্রেশার। কিভাবে কি করবো আমি!”
বলেই প্রোজ্জ্বল দু হাত মাথায় দিয়ে চেয়ারে বসে পড়লো। ওর এ চিন্তার কারণ আমারও বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার দুশ্চিন্তা করার অর্থ প্রোজ্জ্বলকে আরো দুশ্চিন্তায় ফেলে দেওয়া। এজন্য আমি স্বাভাবিক থাকার ভান করলাম। ওকে আশ্বস্ত দেওয়ার জন্য বললাম,
“ এতো টেনশন করে কি হবে? আল্লাহ দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ-ই সব ব্যবস্থা করে দিবেন। আমাদের কাজ হবে শুধু সতর্ক থাকা। আর বাবুর খেয়াল রাখা। ব্যস। এতো টেনশন করো না তো প্লিজ। আমার ভালো লাগছে না। ”

আমার কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই প্রোজ্জ্বল উঠে দাঁড়ালো। সচেতন কণ্ঠে বললো,
“ আচ্ছা আচ্ছা, আর টেনশন করবো না। এখন আমার কাজগুলোও করতে হবে অনেক চিন্তা ভাবনা করে। আচ্ছা, ভালো কথা, আমরা এতো দূরের কথা ভেবে ফেললাম। কিন্তু এখনো বাড়ির বড়দের জানানো হলো না। চল, সবার আগে দাদীকে জানাতে যাই। তারপর আব্বা, আম্মার রুমে যাবো। ”

এই বলে ও আমার হাত ধরে রুম থেকে বের করে নিয়ে এলো।

নানুকে এ সংবাদ দেওয়ার পর নানু কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। অতঃপর আচমকা নানুর চোখ দিয়ে টলটল করে জল গড়িয়ে পড়লো। নানু আমাকে জড়িয়ে ধরে সারা মুখ অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিলো। তন্মধ্যে মামি এবং মামাও রুমে চলে এলো। মামা, মামি প্রোজ্জ্বলের নিকট হতে আমার প্রেগন্যান্সির খবর শুনলো। তাঁরা দুজনে যেনো প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারলো না। এ সংবাদটা হজম করতে বেশ সময় লাগলো দুজনের।
মামি আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই দিলো। আমার কপালে চুমু দিয়ে বললো,
“ আলহামদুলিল্লাহ। এ খবর শোনার জন্য যে কতদিনের অপেক্ষায় ছিলাম একমাত্র আল্লাহ-ই ভালো জানেন। অবশেষে আমি দাদি হচ্ছি। তোকে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো তা আমার জানা নেই মা। শুধু দোয়া করবো যেনো তুই, প্রোজ্জ্বল আর তোদের অনাগত সন্তান সারাজীবন সুখে শান্তিতে বসবাস করে। ”
এই বলে মামি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। সবার চেহারায় এ খুশির ছোঁয়া দেখে আমি যে ঠিক কতোটা আনন্দিত হলাম তা প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না আমার পক্ষে। শুধু মনে মনে দোয়া করলাম আল্লাহ যেনো এ কঠিন পথচলায় আমাকে সহযোগীতা করেন।

———————-

তৃতীয় মাস চলছে। আজকাল মন মেজাজ ঠিক থাকে না একদম। সবসময় যেনো তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে চলাফেরা করি আমি৷ পড়তেও ভালো লাগে না। তবুও জোরপূর্বক ক্লাস করি, ওয়ার্ড করি, দিনশেষে দু পাতা পড়ি। এভাবেই আমার পড়ালেখা এগুচ্ছে। নিজের যে অতিরিক্ত একটু খেয়াল রাখবো সে সুযোগটুকুও নেই। বাসায় থাকলে মামি আর নানুই আমার যথাসম্ভব খেয়াল রাখছে। আমার যেকোনো প্রয়োজনে এগিয়ে আসছে। আমার পাশে থাকছে। কিন্তু এ সময়গুলোতে যাকে আমার পাশে সবচেয়ে বেশি থাকার কথা সে-ই ব্যস্ত থাকছে বাইরে। আমার জন্য সময়টুকু দেয় না সে। যদিও সময় দেয় না বললে ভুল হবে। সময় দেয়, তবে সে সময়টুকুতে আমার পোষায় না। রাত এগারোটার পর প্রোজ্জ্বলের খানিক সময় হয়। তবে আমার সাথে যে গল্প করবে সে সুযোগটুকু ওর হয়ে উঠে না। সারাদিনের পরিশ্রমে বালিশে মাথা দেয়ার পরমুহূর্তেই ও ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে শুয়ে শুয়ে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ও ঘুমিয়ে পড়ে। ও তো ঘুমিয়ে পড়ে ঠিকই। কিন্তু আমার ঘুম আসে না। যতক্ষণ জেগে থাকি ততক্ষণ ডিম লাইটের আবছা আলোয় ওর চেহারা দেখতে থাকি। এভাবেই দেখতে দেখতে কখন যে ওর বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি টের পাই না।

মাঝে মাঝে যখন রাতে ঘুম হয় না তখন খুব করে কাঁদি। কিন্তু একদম নীরবে নিশ্চুপে। প্রোজ্জ্বলকে টের পেতে দেই না৷ ভাবি, সারাদিন পরিশ্রম করে এসে একটু ঘুমিয়েছে, ঘুমাক। কিন্তু আজ ওকে বিরক্ত না করে থাকতে পারলাম না। মাঝ রাতে এক প্রকার শব্দ করেই কেঁদে উঠলাম। এ কান্নার কারণ কি তার সঠিক কারণ জানি না। মাঝেমাঝে কোনো এক অজানা কারণেই কষ্ট হয় বুকের মাঝে, শূন্যতা অনুভব হয়, তখন কেঁদে ফেলি। আবার মাঝেমাঝে আমার প্রতি প্রোজ্জ্বলের খামখেয়ালীপনায় কেঁদে উঠি।

আমার কান্নার শব্দে প্রোজ্জ্বল ঘুম হতে হুড়োহুড়ি করে জেগে উঠে। আতঙ্কিত চাহনিতে আমার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কি ব্যাপার চন্দ্রিমা? কাঁদছিস কেনো? কোনো সমস্যা হয়েছে? ব্যাথা করছে পেটে?”

আমি ক্রন্দনরত চাহনিতে একবার প্রোজ্জ্বলের দিকে চাইলাম। কিন্তু ওর প্রশ্নের কোনো জবাব দিলাম না। বরং বসে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আমার কান্না দেখে প্রোজ্জ্বল এগিয়ে এলো। আমায় জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। স্বাভাবিক হয়ে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“ চন্দ্রিমা? কিছু হয়েছে কি? এভাবে মাঝ রাতে কাঁদছিস কেনো? আমাকে বল। ”

প্রোজ্জ্বলের এহেন প্রশ্নে আমার কান্নার বেগ আরো বেড়ে গেলো। এবার আমি সশব্দে কাঁদতে লাগলাম। আমার কান্নার শব্দে বোধহয় প্রোজ্জ্বল চিন্তায় পড়ে গেলো। চিন্তিত কণ্ঠে ও জিজ্ঞেস করলো,
“ চন্দ্রিমা, তুই না বললে আমি বুঝবো কি করে যে তোর কিসে সমস্যা হচ্ছে? সবটা খুলে বল আমাকে। ডাক্তারের কাছে নিতে হবে?”

আমি আচমকা শক্ত করে প্রোজ্জ্বলকে জড়িয়ে ধরলাম। ক্রন্দনরত গলায় অভিযোগের সুরে বললাম,
“ আমাকে বলতে হবে কেনো? তুমি কি আমাকে বুঝো না? তুমি আর আগের মতো নেই প্রোজ্জ্বল। তুমি অনেক বদলে গিয়েছো। ”

ওপাশ থেকে ওর কোনো প্রত্যুত্তর পেলাম না। আমি পুনরায় বললাম,
“ তুমি আমাকে একদম সময় দাও না। সারাদিন পেশেন্ট, ডিউটি, এগুলো নিয়েই পড়ে থাকো। এ সময় কি তোমার পেশেন্ট বেশি জরুরি নাকি আমি? তুমি আমার সাথে এমন করছো কেনো? কোথায় দু চারটা গল্প করবো সে সুযোগটাও পাই না। প্রতিদিন মন চায় আজ কি কি হলো তা বলি। মন চায় আমার মাঝে আমাদের অংশটা কিভাবে একটু একটু করে বাড়ছে সব শেয়ার করি। কিন্তু তোমার সময় হয় না। ”
এই বলেই আমি প্রোজ্জ্বলকে ছেড়ে দু হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলাম। ঝাপসা দৃষ্টিতে প্রোজ্জ্বলের দিকে চাইলাম। দেখলাম ও এল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর দৃষ্টিতে বোধহয় খানিক অপরাধবোধ দেখতে পেলাম। ও জিজ্ঞেস করলো,
“ সত্যিই কি আমি বদলে গিয়েছি চন্দ্রিমা?”

আমি তীব্র অভিমানী স্বরে বললাম,
“ হ্যাঁ। অনেক বদলে গিয়েছো তুমি। আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসো না তুমি। এখন তোমার কাছে কাজই সব৷ এ সময়ে যে আমার কিছু প্রয়োজন, শখ আছে তার কিছুই জানো না তুমি। তুমি শুধু কাজ নিয়ে পড়ে থাকো। ”
এই বলে আমি আবারো কাঁদতে শুরু করলাম। আজ যেনো কান্না কোনো বাঁধাই মানছে না৷

প্রোজ্জ্বল এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
“ এতো অভিযোগ তোর! আচ্ছা আজ থেকে সব অভিযোগ সুদে আসলে মিটিয়ে দেবো। তোকে সময় দেবো। গোল্লায় যাক সব কাজকর্ম। আমি এতদিন ভুল করেছি, বুঝতে পারিনি। কিন্তু আজ তোর এ কান্না, এ অভিযোগ দেখে বুঝতে পেরেছি আমি তোকে তোর প্রাপ্য দিতে কতোটা অপরাগ হয়েছি৷ আর এমন করবো না প্রমিস। আজ থেকে সব কাজ বাদ। কালকেই গিয়ে ক্লিনিকে রেজিগনেশন লেটার দিয়ে আসবো। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু আমার বউ আর বাচ্চাকে সময় দিবো। ”

প্রোজ্জ্বলের কথায় আমি যেনো ভরসার জায়গা খুঁজে পেলাম। ওকে ছেড়ে দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
“ অনেকদিন পর তোমার মুখে বউ ডাক শুনেছি। এখন থেকে আমাকে বউ ডাকবে। বুঝলে?”

“ আচ্ছা, বউ বলেই ডাকবো তোকে। তো বউ, এখন কি কিছু খেতে মন চাইছে?”

আমি কান্না থামিয়ে নিতে চেষ্টা করলাম। সে অবস্থাতেই বললাম,
“ এখন মিষ্টি খেতে মন চাচ্ছে। ”

প্রোজ্জ্বল খানিক বিস্মিত হলো। জিজ্ঞেস করলো,
“ ফ্রিজে আছে কি?”

“, আছে বোধহয়। মামা গতকাল বিকেলে এনেছিলো। ”

“ আচ্ছা, তাহলে গিয়ে দেখি। ”
এই বলেই প্রোজ্জ্বল উঠতে নিলো। কিন্তু এর পূর্বেই আমি ওর হাত ধরে বায়না করলাম,
“ কালকে কিন্তু আমাকে বিরিয়ানি খাওয়াবে বলে দিলাম। অনেকদিন থেকে খেতে ইচ্ছে করছে। আর বিকেলে ফুচকা, চটপটি। ”

“ আচ্ছা বউ। কালকে সারাদিন আপনার নামেই লিখে দিলাম। কিন্তু এতো উল্টাপাল্টা খেলে যে অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়বে। ”

“ একদিনই খাবো। রোজ রোজ তো আর খাবো না। ঐ একদিনে কিচ্ছু হবে না। কিন্তু যা হবার হবে। আমি এগুলো খাবো মানে খাবো। ”

প্রোজ্জ্বল হেসে ফেললো আমার কথায়। বললো,
“ঠিক আছে, শুধু কালকের জন্য যা খেতে মন চাইবে তাই খাওয়াবো তোকে। এবার খুশি?”

আমি মুচকি হেসে বললাম,
“ হুম, খুশি। ”

#চলবে
®সারা মেহেক

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here