বেসামাল প্রেম পর্ব – ৫২+৫৩+৫৪

#বেসামাল_প্রেম
#জান্নাতুল_নাঈমা
#পর্ব_৫২
-” তোর প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পেয়েছি সূচনা। কিন্তু উত্তরটা তোকে আমি দিব না। কাউকেই দিব না। কারণ এতে আমি অপরাধী হয়ে যাব। ভয়ংকর অপরাধী। তুই নিশ্চয়ই জানিস, অপরাধীদের সঙ্গে কেউ সংসার করতে চায় না। অপরাধীদের কেউ ভালোবাসে না। ”

কথাগুলো সহজভাবে বলল ঠিক। কিন্তু এর তাৎপর্য বুকের ভিতর বিষাক্ত অনুভূতির জন্ম দিল। কারণ, সে কোনোদিন তার ভুল স্বীকার করতে পারবে না। যদি স্বীকার করে হৈমীর চোখে মস্ত বড়ো অপরাধী হয়ে যাবে। কিন্তু স্বীকার না করেও যে অপরাধী হয়ে গেছে এই বোধ তার মাঝে জাগ্রত হলো না। অপরাধী স্বীকার করুক বা না করুক সে সব সময় অপরাধী হয়েই থাকে। রুদ্র থমথমে মুখে ওঠে দাঁড়াল নিঃশব্দে। ঠিক যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে যাবার প্রস্তুতি নিল। প্রস্তুতি অনুযায়ী প্রস্থান করতে সক্ষম হলো না। অদৃশ্য এক মায়ার জালে আঁটকে পড়ল আচমকা। মনের ঘরে প্রশ্ন জমল, আর পাঁচটা দম্পতির মতো তারা কি পারে না সুখী হতে? আর পাঁচটা দম্পতির মধ্যে নতুন প্রাণের আগমনী বার্তা এলে তাদের মতো কি জটিলতা তৈরি হয়? হয় না তো! নিষ্ঠুর বাস্তবতায় তার শৈশব চাপা পড়েছে বলে এর অংশীদার তার সন্তান কেন হবে? হৈমীরই বা দোষটা কোথায়? ভালোবাসা কি কখনো অপরাধ হয়? মেয়েটা তাকে ভালোবাসে। ভয়ংকর ভাবে ভালোবেসে। তার মতো করে সে কি ভালোবেসেছে বা বাসতে পারবে? রুদ্রর বেসামাল হৃদয়ে তিক্ত হয়ে দানা বাঁধল করুণ এক সত্যি। আত্মোপলব্ধি হলো। সে স্বার্থপর! ভীষণ রকমের স্বার্থপর একটা মানুষ সে। সময়ের বিবর্তনে, পরিস্থিতির ভারে এতটা স্বার্থপর কীভাবে হয়ে গেল! আপন মনেই বড়ো বিস্ময় জেগে ওঠল। দৃষ্টিজোড়া ঝাপসা হলো সহসা। অজান্তেই আবারো বসে পড়ল হৈমীর পাশে। ভারি নিঃশ্বাস ফেলল ক্রমশ। বলিষ্ঠ ডান হাতটা ধীরেধীরে এগিয়ে নিল। হৈমীর উদর স্পর্শ করল সন্তর্পণে। চোখ বুঁজে, শ্বাস রোধ করে অনুভব করার চেষ্টা করল আরেক অপরাধীকে। হ্যাঁ অপরাধী! যে পৃথিবীতে না এসেই বাবা, মা’য়ের মধ্যে ঝামেলা লাগিয়ে দিয়েছে। শিশুসুলভ ভাবনায় বুঁদ হতেই
দু’চোখের কার্ণিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়াল। ঠোঁট কামড়ে হাসল কিঞ্চিৎ। কয়েক পল হাত বুলাল উষ্ণ উদরে। চুমু খেতে মুখও এগুলো। নড়াচড়া করে ওঠল হৈমী। রুদ্র চট করে কামিজের ফালি ওঠাল। ভেজা ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেল তলপেটে। আচমকা চোখ খুলল হৈমী। রুদ্র আর এক মুহুর্ত ব্যয় না করে ঝটপট রুম ত্যাগ করল। তড়াক করে ওঠে বসল হৈমী। খোলা পেটে হাত রেখে পলক ফেলল ঘনঘন। নিশ্বাস ফেলল দ্রুত। পাশে তাকিয়ে ঘুমন্ত সূচনাকে দেখে নিল জহুরি চোখে। আশপাশে সচেতন দৃষ্টি বুলিয়ে পুনরায় কাঁথা গায়ে শুয়ে পড়ল। কতক্ষণ পিটপিট করে মেকি হাসল চোখ বুজে। বিরবির করে বলল,

-” আপনি চলেন ডালে ডালে, আমি চলি পাতায় পাতায়। বেয়াই মশায়, আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন ঘুমন্ত হৈমী এতটা নিশ্চুপ থাকে না। ভাগ্যিস গভীর ঘুমাইনি। তাই তো আপনি রুমে প্রবেশ করার সাথে সাথে আপনার পারফিউমের ঘ্রাণে বুকটা ঢিপঢিপ করে ওঠেছে! গোপনে এসে এতগুলো আদর দিয়ে গেলেন? কী ধরনের মানুষ আপনি? ভালোবাসা প্রকাশের সৎ সাহসটা নেই। অথচ ক্ষোভ প্রকাশের পূর্ণ সাহস রয়েছে। ”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র দুঃশ্চিন্তা সে করছে না। দুঃশ্চিন্তা কেবল রুদ্রর মন নিয়ে, রাগ নিয়ে, বেসামাল চিন্তা, চেতনা নিয়ে। আর এসব কারণেই কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। এই সিদ্ধান্ত নিতে তাকে সহায়তা করেছে তার বেস্ট ফ্রেন্ড, খালাত বোন টিশা। এবার দেখার অপেক্ষা সিদ্ধান্তটি কতটা যৌক্তিক। দিন গোণা শুরু। কাঙ্ক্ষিত সময়টা আসতে অনেকগুলো মাস অপেক্ষা করতে হবে। ধৈর্য্য ধরতে হবে। বাচ্চাটাকে সুস্থভাবে পৃথিবীতে আনতে হবে। সবশেষে শান্তি এটাই বাচ্চাটার কিছু হয়নি। সে তো রুদ্রর ভয়ে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস রুদ্র ঠিক সময় উপস্থিত হয়েছিল। নয়তো কতবড়ো সর্বনাশ ঘটে যেত। এরজন্য অবশ্য রুদ্রর প্রতি সে কৃতজ্ঞ। কিন্তু এর পরের ঘটনা গুলো শুধুই দীর্ঘশ্বাস। এই দীর্ঘশ্বাস গুলোর শেষ পরিণতি কী হবে। সে জানে না। সে শুধু জানে ভালোবেসে মাথা নত করে আর থাকবে না। রুদ্র যখন মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছে তাকে ডিভোর্স দেবে। তখন এর মূল্য রুদ্রকে চুকাতেই হবে। যেই রুদ্র সেদিন তাকে বলেছিল, শুধু তাকে ভালোবাসতে, তাদের মধ্যে তৃতীয় কাউকে না আনতে। শুধু তার জন্য বাঁচতে। সেই রুদ্রই তৃতীয় কারো জন্যই তাকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছে। তার কাছে ঐ এক মুহুর্তে বউয়ের চেয়ে বাচ্চা বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুদ্রকে জানাশোনার পর তার একটা উপলব্ধি হয়েছে,
মানুষের অপর নাম গিরগিটি। এরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মনের রঙ বদলায়। রুদ্র তার চাক্ষুষ প্রমাণ দিয়েছে। যার দাম তাকে দিতেই হবে। দিনশেষে একবার না হয় হৈমীও রঙ বদলাবে। স্বার্থপর হবে। সহ্য করতে পারবে তো রুদ্র?
______________________
সকালবেলা ঘুম ভাঙল মায়ের ফোনে। মেয়ের খবর নিয়ে হামিদা তার আফসোস শুরু করলেন,

-” আল্লাহর কাছে চাইলাম ছেলের ঘর আলো করে ছোট্ট প্রাণ আসুক। কিন্তু পেলাম মেয়ের বেলায়। ”

হৈমী হাই তুলতে তুলতে বলল,

-” ছেলের ঘরেও আসবেনি আম্মু চিন্তা করো না। ”

হামিদা উদাস গলায় বলল,

-” বিয়ের পর থেকেই তো বলতেছি বউকে। এখনো সুখবর পেলাম না৷ আল্লাহ জানে সমস্যা আছে কিনা। আমার তো সন্দেহ হয় ওরা আদেও ডাক্তার দেখিয়েছে কিনা! ”

-” উফফ আম্মু অযথা চিন্তা করছ তুমি। সেরকম কিছুই না। ”

-” থাক বাদ দে ওসব। রুদ্রর কথা বল। সব ঠিকঠাক আছে তো? শোন হৈমী, এরপর যদি আর একবার তোর গায়ে ও হাত তোলে আমি কিন্তু বধু নির্যাতনের কেস দিয়ে দিব ওর নামে! ”

খিলখিল করে হেসে ওঠল হৈমী। বলল,

-” তুমি চিন্তা করো না তো আম্মু। কিছুই হবে না। দোয়া করো সময় দ্রুত চলে যাক। আর আমিও ফিরে আসি। ”

আঁতকে ওঠল হামিদা। বলল,

-” ফিরে আসি মানে? কবে, কখন। ”

চুপসে গেল হৈমী। ক্ষীণ স্বরে বলল,

-” বাচ্চাকে তার বাবার কাছে দিয়ে তবেই ফিরব। ”

চমকাল হামিদা। গা শিউরে ওঠল নিমিষেই। কী ভয়ানক কথা! শঙ্কিত গলায় বলল,

-” বাচ্চা কে দিয়ে আসি মানে। এটা কি দোকানে কেনা জিনিসপত্র নাকি! কষ্ট করবি তুই, তুই হলি মা। মায়ের অধিকার সবচেয়ে বেশি। কোন দুঃখে তুই ওকে দিয়ে আসবি? আসলে এখনি আয় তোর ভাই এখনো বেঁচে আছে। আমি বেঁচে আছি। কোনো সমস্যা হবে না। ”

-” কোন দুঃখে দিয়ে আসব সেটা তোমাকে বোঝাতে পারব না। তুমি এসব কথা কারো সাথে শেয়ার করবে না। শুধু জানবে আমি যা করব ভেবেচিন্তেই করব। ”

-” তুই আর কী সর্বনাশ করবি নিজের? আর কী সর্বনাশ হওয়ার বাকি আছে বল আমাকে! ”

-” ধরে নাও শেষ একটা সর্বনাশই করব। ”

-” এক থাপ্পড় খাবি। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার মতো বয়স এখনো তোর হয়নি। এজন্যই একের পর এক ভুল করছিস। সর্বনাশ বয়ে আনছিস! ”

-” সিদ্ধান্ত নিতে বয়স লাগে না আম্মু। বাস্তবতাই শিখিয়ে দেয় কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রাখছি আমি। এ ব্যাপারে প্লিজ তুমি কাউকে কিছু বলবে না। ”

হামিদাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না সে। চট করে ফোন কেটে দিল। উত্তেজিত হয়ে পড়ল হৈমী। মাহের কে ডেকে সমস্ত কথাই বলল। দেরি না করে মাহের কল করল হৈমীকে। মায়ের ওপর বিরক্ত হলো হৈমী। মাহেরকে বুঝিয়ে বলল,

-” চিন্তা করো না ভাইয়া। আমি তোমাকে সবটা বুঝিয়ে বলব। ”

মাহের বিচলিত ভঙ্গিতে বলল,

-” নিজের জীবনের আর কোনো সিদ্ধান্ত একা নিয়ো না হৈমী। তুমি এখনো ছোটো। অন্তত আমার ওপর বিশ্বাস করে সবটা জানিয়ো। আর হ্যাঁ যে কোনো সমস্যায় পড়লে তৎক্ষনাৎ আমাকে জানাবে। ”

ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে ফোন কেটে দিল হৈমী। কিছুক্ষণ পর সূচনা রুমে এলো। মিষ্টি এক হাসি উপহার দিয়ে বলল,

-” ফ্রেশ হয়েছ? নাস্তা রেডি। ”

হৈমী দু’দিকে মাথা নাড়াল। সূচনা এসে রুম ঝাড় দিল। এরপর বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে হৈমী ডাকল,

-” ভাবি এদিকে আসো কথা আছে। ”

সূচনা কিঞ্চিৎ বিচলিত হলো। ফিরে এসে বসল হৈমীর পাশে। হৈমী কোনো প্রকার ভণিতা ছাড়াই বলল,

-” সবার আগে আমি তোমার ননদ। এরপরের সম্পর্ক গুলো আপাতত ভুলে যাও। ”

সহসা হৈমীর মুখে এমন কথা শুনে ভড়কে গেল সূচনা। হৈমী পুনরায় বলল,

-” ননদের শশুর বাড়িতে এতদিন এসে থাকাটা লোকে ভালো চোখে দেখে না। এবার তুমি বলবে এটা তোমার বাপের বাড়ি, ভাইয়ের বাড়ি। এখানে এসে মাসের পর মাস থাকতেই পারো৷ তাহলে আমিও বাঘিনী ননদ হয়ে বলব, এটা যদি করো আমার ভাইয়ের জন্য দ্বিতীয় বিয়ের বন্দোবস্ত করতে হবে! ”

সূচনার বুকটা ধক করে ওঠল। চোখের পলক পড়ল ঘনঘন। বিস্ময়ে মুখ হা! মনে হচ্ছে আঠারো বছর বয়সী হৈমী নয় তার সম্মুখে চল্লিশের ঊর্ধ্বে এক হৈমী বসে আছে। বেশ বিচক্ষণ নারী। ভারি বুদ্ধি সম্পন্ন। রায় বাঘিনী ননদিনী যাকে বলে। ঢোক গিলল সে বিস্মিত কণ্ঠে বলল,

-” আমি শুধু ভাইয়ার কথায় এখানে নেই। মাহেরও আমাকে তোমার দেখাশোনার জন্য এখানে থাকতে বলেছে। ”

চটে গেল হৈমী। বলল,

-” কেন? আমি কি পঙ্গু হয়ে গেছি। যে আমার দেখভাল করার জন্য আলাদা লোক লাগবে। তাছাড়া আমি যার বউ, যার বাচ্চা আমার পেটে সেই আমার দেখাশোনা করুক। সে কি অযোগ্য, সে কি অকর্মা, নাকি সে প্রতিবন্ধী! যে তার বউকে দেখাশোনার জন্য আরেজনের বউকে ধার করতে হবে! ”

বাক্য গুলো প্রায় চিৎকার করে উচ্চারণ করল সে। দূর থেকে মনে হলো বেশ ঝগড়া লেগেছে। তাই ছুটে এলো রুদ্র। পাশের ঘরের সাদমানেরও ঘুম ছুটে গেছে। খালি গায়ে চোখ কচলাতে কচলাতে সেও বেরিয়ে এলো। নিচ থেকে রুদ্র আর সাদমান কে দেখে রিনাও উপরে চলে এলো।

সূচনা হৈমীকে আস্তে কথা বলতে অনুরোধ করল। শুনল না হৈমী। চিৎকার করে বলল,

-” আমার ভাই কি বউকে বাপের বাড়ি রাখার জন্য বিয়ে করেছে? এ বাড়ির মেয়ে যদি শশুর বাড়িতে নিজ কর্তব্য পালন না করে বাপের বাড়ি এসে থাকতে পারে আমি কেন পারব না? আজই বাপের বাড়ি চলে যাব আমি। ”

শক্ত মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে পড়ল রুদ্র। সাদমানের ঘুমটা পুরোপুরি ভেঙে গেল। রিনার মুখ হা হয়ে গেল হৈমীর মুখে এ ধরনের কথা শুনে। এসব বলার মেয়ে তো সে না। ভুতে টুতে ধরল নাকি! সকলের উপস্থিতি টের পেয়ে বিশেষ করে রুদ্রর উপস্থিতি স্বচক্ষে দেখে হৈমীর গলার জোর বাড়ল। সে রাগে ফোঁস ফোঁস করে বলল,

-” আমি এ ঘরে কেন? কেন আমি এই ঘরে থাকছি। আমার কি এই ঘরে থাকার কথা? যে আমাকে বিয়ে করে এই বাড়িতে এনেছে তার ঘরে কি বন্যা হয়েছে? নাকি তার ছোঁয়াচে রোগ আছে কোনটা? ”

রুদ্রর কঠিন ভাবমূর্তি দেখে সরে গেল সাদমান। সূচনাকে তাকে মানাতে বলল,

-” আচ্ছা আচ্ছা এত রাগ করো না। বাবা আসুক এরপর মাহের এসে আমাকে নিয়ে যাবে। তুমি প্লিজ শান্ত হও। ”

পিটপিট করে তাকিয়ে রইল হৈমী। ঠোঁট টিপে হাসল আড়ালে। বলল,

-” হ্যাঁ তাড়াতাড়ি চলে যাবে। আমার আম্মু চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে ছেলে ঘরের নাতি-নাতনির মুখ দেখার। মন দিয়ে সংসার করবে আর আল্লাহর কাছে আম্মুর জন্য নাতি, নাতনি চাইবে। অন্যের বউকে নিয়ে এত ভাবার দরকার নেই। যার বউ সে যদি দেখে রাখতে না পারে না পারুক। এর দায় অন্যরা কেন নেবে। নিজে সুখী থাকবে না বলে অন্যদের সুখ কেন কেড়ে নেবে? বউকে ভালোবাসার যোগ্যতা তার নেই বলে অন্যের যোগ্যতাকে খাটাতে দেবে না কেন? আমার ভাই তো কারো মতো কাপুরষ না। যে বউকে চোরের মতো ভালোবাসবে। ”

এক নাগাড়ে কথা বলে হাঁপিয়ে ওঠল হৈমী। পানি পিপাসা লেগে গেল তার। সূচনা বুদ্ধিমতী মেয়ে। তাই হঠাৎ হৈমীর অদ্ভুত আচরণের কারণ টের পেয়ে গেল। তাই রাগ করল না একটুও। বরং স্বস্তিই পেল। মাহেরকে ছেড়ে থাকতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। আর বেচারা মাহের একদিকে বোন অন্যদিকে বউ। দুই মেরুর টানে চুপসে রয়েছে। সবদিক বিবেচনা করেই হৈমী সকাল সকাল হট্টগোল বাজিয়েছে। যা সবার জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে। কিন্তু তার এই হট্টগোলের মাঝে চরম অপমানিত হয়েছে রুদ্র। যার পরিপ্রেক্ষিতে না পারল কিছু বলতে আর না পারল সহ্য করতে। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু স্মরণ করে গেল। তার বউ তাকে, কাপুরুষ বলেছে। অযোগ্য , অকর্মণ্য। আর যেন কী? মনে করতে পারল না। গম্ভীর মুখটা আরো বেশি গম্ভীর করে বসে রইল নিজ রুমে। সিদ্ধান্ত নিল সূচনাকে বলবে,

-” হৈমী যেন রাতে তার ঘরে গিয়ে ঘুমায়। ”
_______________________
প্রাকৃতিক নিয়মে দিন পেরিয়ে রাত এলো। হৈমী চুল আঁচড়াচ্ছিল। সূচনা রুমে এসে বলল,

-” হৈমী ভাইয়া ও ঘরে যেতে বলেছে। তোমায়। একটুও খারাপ আচরণ করবে না। কথা দিয়েছে। ”

ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল হৈমী। অবিশ্বাস্য সুরে বলল,

-” কথা দিয়েছে? ”

-” না মানে আমি বললাম তুমি ওর সঙ্গে খারাপ বিহেভ করবে না তো? ভাইয়া না করল। খারাপ বিহেভ করবে না৷ একটা ধমকও দেবে না। সরাসরি কথা দেয়নি। তবে মুখে বলেছে। ”

-” কিন্তু আমি যাব না৷ তুমি গিয়ে বলো হৈমীর বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও করছে না ও ঘরে যেতে। একটুও শখ জাগছে না

-” তাহলে সকালবেলা চ্যাঁচামেচি করলে কেন? ”

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভারিক্কি স্বরে প্রশ্নটি ছুঁড়ল রুদ্র। চমকে ওঠল সূচনা৷ চমকাল হৈমী নিজেও। বেশ ভাব নিয়ে মুখ ফিরিয়ে চুল বাঁধল। রুদ্র শান্ত কণ্ঠে আহ্বান জানালো,

-” রুমে এসো। ”

চেতে ওঠল হৈমী। বলল,

-” আমি যাব না। কী করবেন? মেরেধরে নিয়ে যাবেন? ”

রুদ্র সহসা কয়েক পা এগুলো। সূচনার দিকে তাকিয়ে বলল,

-” চোখ বন্ধ কর। ”

আচমকা চোখ বন্ধ করে নিল সূচনা। ঢোক গিলল হৈমী। রুদ্র গম্ভীর মুখে শীতল কণ্ঠে বলল,

-” মেরে নয় ধরে নিয়ে যাব। ”

কথাটা বলতে বলতেই সহসা হৈমীকে পাঁজা কোল করে নিল। চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলল হৈমী। বুকের ভিতর চিনচিন অনুভূতি হলো সেই রাতের কথা ভেবে। রাগে, দুঃখে চোখ গলে পানি বেরিয়ে এলো। গম্ভীর মুখো রুদ্র হৈমীর ছোট্ট দেহখানি আগলে ধরে সন্তর্পণে বেরিয়ে গেল। নিজ রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে হৈমীকে শুইয়ে দিল বিছানায়। এরপর ঝটপট লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালালো। নিজেও এসে হৈমীর পাশে শুয়ে পড়ল।একহাত দূরত্বে শুয়ে দু’জন। থেকে থেকে হৈমীর ফোপাঁনোর শব্দ ভেসে আসছে। আর রুদ্রর বুক চিরে বেরুচ্ছে এক একটা দীর্ঘ শ্বাস। মন বলছে মেয়েটাকে বুকের ভিতর শক্ত করে জরিয়ে নিতে। কিন্তু নিজের ভিতর চলা অদ্ভুত অপরাধবোধে হাতটা এগুচ্ছে না। এরপর কেটে গেল ঘন্টার পর ঘন্টা। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো হৈমী। সেই সুযোগে রুদ্র কাছে টেনে নিল ওকে। প্রশস্ত বুকটায় হৈমীকে জড়িয়ে শান্তি মিলল। এক মুহুর্ত অনুভব করল, সে ভীতু ভীষণ রকম ভীতু। সে হেরে গেছে। এই মানুষটার কাছে করুণভাবে হেরেছে সে।
#বেসামাল_প্রেম
#জান্নাতুল_নাঈমা
#পর্ব_৫৩
সন্ধ্যার আগ মুহুর্ত। শশুর বাড়ি এসে পৌঁছাল সূচনা৷ বউকে বাড়ির ভেতরে রেখে বাইক নিয়ে বাজারে গেল মাহের। হামিদা কিঞ্চিৎ রাগ দেখাল সূচনার সঙ্গে। বলল,

-” বেলা থাকতে আসতে পারো না? কতদিন বলেছি সন্ধ্যা মাথায় আসবে না। ”

সূচনা আমতা আমতা করে বলল,

-” আসলে মা, বাবা আমাদের সঙ্গে বেরোলো। তাই দেরি হয়ে গেছে দুঃখীত। ”

নরম স্বরের দুঃখ প্রকাশে গলে গেল হামিদা। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,

-” বেয়াই তো এলো না! ”

ত্বরিত স্বরে সূচনা বলল,

-” আসবে আসবে। আসলে বাবা আজ জরুরি কাজে ঢাকায় গেল। কয়েকদিন ওখানে থেকে তারপর আপনার সঙ্গে দেখা করে যাবে। ”

-” বেশ যাও হাত, মুখ ধুয়ে আসো। সেমাই রেঁধেছি। ”

মৃদু হেসে মাথা কাত করল সূচনা। ধীরপায়ে চলে গেল নিজের ঘরে। স্বস্তির শ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে৷ অনুভব করল বড্ড শান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে আপন নীড়ে ফিরেছে। কী আশ্চর্য! এ বাড়ি, এ ঘর এতটা আপন, এতটা শান্তির কবে থেকে হয়ে গেল? পরমুহূর্তেই মনে পড়ল এ বাড়ির ছেলের মনের সঙ্গে মনের মিলন ঘটেছে যখন তখন এ ঘর, সংসার আপন মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না৷ পাশের মানুষটা যদি স্বস্তির হয় তাহলে যে কোনো ঘরেই শান্তি মেলে। তৃপ্তি ভরে হাসল সূচনা৷ ফেলল নিঃশ্বাস। হাতমুখ ধুয়ে পোশাক পাল্টে চলে গেল শাশুড়ির কাছে। সে তাকে পিরিচে সেমাই বেড়ে দিল। সূচনা বাচ্চাদের মতো করে শাশুড়ির বানানো সেমাই খেল। তার খাওয়া দেখে মৃদু হাসল হামিদা৷ বলল,

-” ফ্রিজে আরো আছে। পরে আবার খেয়ো। এখন খেয়ো না। তাহলে ভাত খেতে পারবে না। ”

সূচনা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। জিজ্ঞেস করল,

-” রাতে কী রান্না হবে মা? ভাত বসিয়েছেন? ”

কী রান্না হবে বলে দিল হামিদা। ভাত বসানো হয়নি। তাই সূচনা গিয়ে ভাত বসিয়ে দিল। এরই মধ্যে মাহের কাঁচা সবজি নিয়ে এলো। মায়ের কাছে আবদার করল পাঁচ মেশালি সবজি রেঁধে দিতে। স্বামীর আবদার কান খাড়া করে শুনে নিয়ে সে হামিদাকে বলল,

-” আমি করব আপনি আরাম করুন। ”

হামিদা বলল,

-” সবজি গুলো কেটে দিই? ”

বাঁধা দিয়ে সূচনা বলল,

-” আমি করে নিব। আপনি বরং ওর সঙ্গে বসে গল্প করুন। ”

এতদিন পর শশুর বাড়ি এসে শাশুড়িকে দিয়ে কাজ করাতে মন সায় দিল না। স্বামী, শাশুড়িকে যত্ন নিয়ে রেঁধে বেড়ে খাওয়াতে মনটা পিপাসিত হয়ে ওঠল সূচনার। হামিদা যেন স্বস্তিই পেল। বয়স বেড়েছে তো। আর কতই করবে একা হাতে? বসার ঘরে বসে টিভি অন করল সে। পোশাক পাল্টে মাহের এলো। মায়ের পাশে বসে রান্নাঘরের দিকে উশখুশ করল। এতদিন পর বউ বাড়ি ফিরেছে। কাছে পাবার তৃষ্ণা বেড়েছে চারগুণ। মায়ের পাশে বসলেও মন পড়ে রইল রান্না ঘরে। সূচনা সবজি কাটছিল। পানি খাবার ছুতায় এলো মাহের। নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

-” আমি কি হেল্প করব? ”

চমকে তাকাল সূচনা। আলতো হেসে বলল,

-” কী বলছ! তুমি কেন রান্নায় হেল্প করবে? হেল্প নেয়ার হলে মায়ের থেকেই নিতাম। ”

বাক্য শেষে কাজে মন দিল সে। মাহের মুখ ছোটো করে তাকিয়ে রইল। সে সাহায্য করতে চেয়েছিল কারণ এতে কাজগুলো দ্রুত সরবে৷ একা হাতে বেশ সময় লাগবে। আর যত সময় লাগবে তত তাকে কাছে পাওয়ার প্রহর গুনতে হবে। রান্নার পুরো সময় অন্তত মাহের দশবার এলো গেল। শুরুতে টের পায়নি সূচনা। যখন টের পেল তখন ক্রমশ তার গাল গুলো লাল হতে শুরু করল। শেষে চোখ রাঙাল। বসার ঘরে হামিদা রয়েছে। তার সামনে এতবার আসা যাওয়া করছে। মাহেরের কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? লজ্জা, শরমকে কি ভুলে খেয়ে নিল আশ্চর্য! রান্না শেষ করে হাত ধুচ্ছিল সূচনা৷ সেই সময় এগারো বারের মতো আগমন ঘটন মাহেরের। হাত ধোঁয়া শেষে তোয়ালেতে হাত মুছে দৃঢ় চোখে তাকাল সূচনা। বলল,

-” কী হচ্ছে এটা। মা কী ভাবছে বলো তো? তুমি তো লজ্জা পাচ্ছ না, আমি লজ্জায় কীভাবে এখন বেরোব সেই চিন্তা করছি। ছিঃ ছিঃ। নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়ে গেছে! ”

বসার ঘরের দিকে উঁকি দিল মাহের। মা টিভি দেখায় মগ্ন৷ ঘাড় ফিরিয়ে এক কদম এগোলো লজ্জাবতীর সামনে। সহসা কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে আনল লজ্জার লতিকাকে। লজ্জা, ভয়ে শিউরে ওঠল সূচনা। মাহেরের বুকে ধাক্কা দিয়ে চাপা স্বরে আর্তনাদ করে ওঠল,

-” হায়রে এসব কী হচ্ছে! মা এসে যাবে। সর্বনাশ হয়ে যাবে। লজ্জায় মরে যাব আমি। ”

শেষ বাক্যটায় মাহের আহত সূচক শব্দ করল। তর্জনী বাড়িয়ে চেপে ধরল গোলাপি রাঙা নরম ঠোঁটজোড়া। বলল,

-” চুপপ। মা আসবে না। আর না তুমি লজ্জায় মরবে। আর শোনো, সত্যি আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এ ক’টা দিন উন্মাদের মতোই ছটফট করেছি। এবার আমার খারাপ হয়ে যাওয়া মাথাটা ঠিক করো। সব ছটফটানি কমিয়ে দাও। বুকের ভিতর বেসামাল প্রেমের উন্মাদনা চলছে। যতক্ষণ না একান্তে পাচ্ছি ততক্ষণ এই উন্মাদনা কমবে না। ”

ঠোঁট কেঁপে ওঠল সূচনার৷ গলা শুঁকিয়ে চৌচির। মসৃণ কোমরে উষ্ণ হাতের চাপ পড়লে মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট কামড়াল সে। মৃদু হেসে বেসামাল নিঃশ্বাস গুলো নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল মাহের৷ কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

-” জলদি খাবার বাড়ো। খাবারের পাট জলদি চুকিয়ে ঘরে যাও। নয়তো এই বেসামাল হৃদয় ভয়াবহ বিদ্রোহ করে বসবে! ”

ঢোক গিলল সূচনা৷ নিঃশ্বাস গুলো অস্থিরতায় রূপ নিল নিমিষে। একটু দূরে যাওয়াতে যদি এমন ভয়ংকর প্রেমিকের দেখা মেলে। বেসামাল প্রেমের স্পর্শ পায়। তাহলে মাঝেসাঝে একটু বেশি দূরে গিয়ে জ্বালাতন করাই যায়। বিনিময়ে না হয় চারগুণ জ্বলবে সে৷ এক নিগূঢ় পবিত্র প্রেম আগুনে জ্বলতে কার না ভালো লাগে?
_______________________
হৈমীর গর্ভাবস্থার তিনমাস চলছে। শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। রুদ্রর বাবা হৈমীকে খুবই স্নেহ করেন। কাজের ফাঁকে মাঝেমধ্যে বেশ গল্প করে দু’জন মিলে। গতকাল গল্পের ফাঁকেই হৈমীর চোখ, মুখে অস্বাভাবিকতা টের পেয়েছিল। সকাল হতেই রুদ্রকে বলে পাঠিয়েছিল ডক্টরের কাছে। হৈমীর বর্তমান ওজন আটচল্লিশ কেজি। তিনমাসে দু কেজি ওজন বেড়েছে। পেটও ফুলেছে। ঠিক যেন পাঁচ মাসের গর্ভবতী! এতে তেমন কোনো সন্দেহ ডক্টর করেনি৷ তবুও নিশ্চিন্ত থাকার জন্য আলট্রাসনোগ্রাম করতে বলল। কিন্তু হৈমীর মা, রুদ্রর দাদিন এতে মত দিলেন না। তারা পাঁচ মাসের আগে আলট্রাসনোগ্রাম করতে দেবে না। রুদ্র বরাবরের ত্যাড়া স্বভাবের। তবুও এক্ষেত্রে কেন জানি ভয় পেল! এত ভয় কেন করছে জানা নেই। শুধু জানে শাশুড়ি আর দাদিনকেই ভরসা করা যায়। প্রথম মা হচ্ছে হৈমী। এতদিন সেরকম ভাবে অনুভূতি জাগেনি। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায়, শারীরিক পরিবর্তনে ধীরেধীরে মাতৃত্ব জাগ্রত হচ্ছে। আজকাল ঘুমের ঘোরের সে বেশ সচেতন থাকে। আগের মতো ছটফট, হাত, পা ছোড়াছুড়ি করে না। সর্বক্ষণ মন, মস্তিষ্ক জুড়ে থাকে তার মাঝে কেউ আছে। তার একটু অসাবধানতা কারো ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই নিয়ে তার ভয়ের শেষ নেই। তার সে ভয়টাই চোখে পড়েছে রুদ্রর। হৈমী যেমন প্রথম মা হচ্ছে, সেও প্রথম বাবা হচ্ছে। তাদের জীবনে প্রতিদিন যা কিছু ঘটছে সবই দুজনের কাছে নতুন। তারা দু’জন যেন সদ্য হাঁটতে শেখা শিশু। যে যেভাবে পা ফেলতে বলবে তারা যেন ঠিক সেভাবেই পা ফেলবে।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর বমি হলো হৈমীর। বাথরুমে ঢুকে বমি করছিল সে। শব্দ শুনে দৌড়ে এলো রুদ্র। কাঁধ চেপে ধরল আচমকা। রাশভারি, ভরাট চোয়ালের মানুষটার মুখ ছোটো হয়ে গেল। দু-চোখে নেমে আসল রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা। বমি করতে করতে অস্থির হয়ে পড়ল হৈমী। চোখে মুখে পানি দিয়ে শরীর এলিয়ে দিল রুদ্রর বুকে। আতঙ্কিত রুদ্র মিইয়ে গেল। পাঁজা কোল করে হৈমীকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। টেনশনে হাঁটু কাঁপছে তার। চোখ বুঁজে শুয়ে থাকা হৈমীর শরীরটাও কাঁপছে। কী করবে রুদ্র? কিছু বুঝতে না পেরে কল করল বড়ো কাকির নাম্বারে। জেরিন রুদ্রর ফোন পেয়ে অবাক হলো। মাত্রই রুদ্র, হৈমী হাসপাতাল থেকে ফিরে ঘরে গেল৷ বাড়িতে থেকেই ফোন! বিচলিত ভঙ্গিতে উপরে ছুটল সে। পেছন পেছন দাদিনও ওঠে এলো। দরজায় টোকা দিতেই রুদ্র দরজা খুলে দিল। কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে তার। দুঃশ্চিন্তায় চোখ দু’টো লাল টকটক করছে। দাদিন উত্তেজিত হয়ে বলল,

-” কী হইছে কী হইছে? ”

জেরিন কোনো প্রশ্ন না করে হৈমীর কাছে ছুটে এলো। রুদ্র থমথমে কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

-” ওর বমি হচ্ছে। বমির সঙ্গে রক্তও এসেছে অল্প। ”

রুদ্রর বিধ্বস্ত মুখ, ভাঙা স্বরে শিউরে ওঠল দাদিন। জেরিন অবাক হলে রুদ্রর অবস্থা দেখে। হৈমীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

-” আরে চিন্তার কিছু না। বমি করতে করতে গলা ফেটে হয়তো একটু রক্ত এসেছে। এমন হয়। রাদিফ পেটে থাকার সময় আমারো এমন হয়েছিল। ”

জেরিনের দিকে নির্লিপ্ত চোখে তাকাল রুদ্র। তার ভিতরে কী চলছে কেবল সেই জানে। অনুভূতিটা ঠিক প্রকাশ করতে পারছে না। ভয় হচ্ছে তার খুব ভয় হচ্ছে। কেন হচ্ছে! হৈমীকে ভালো ডক্টর দেখাতে হবে৷ শিঘ্রই ভালো ডক্টর দেখাতে হবে। ভাবতে ভাবতেই সে সেলফোন বের করল। কল করল বান্ধবী সুবর্ণাকে। কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা হলো সুবর্ণা তার ভয়টাকে পাত্তাই দিল না৷ তার মতে গর্ভাবস্থায় এসব খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। রাগ করে ফোন কেটে দিল সে। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে হৈমীর অবস্থার উন্নতি ঘটল। আচমকা চোখ খুলে সে জেরিন কাকিকে বলল,

-” খুব খিদে পেয়েছে। আমি ভাত খাব। ”

জেরিন ত্বরিত চলে গেল খাবার আনতে। দাদিন চিরুনি নিয়ে হৈমীর পাশে বসল। চুল আঁচড়ে বলল,

-” তেল দিয়ে দেই। এমন সময় মাথা শুষ্ক রাখতে হয় না। ”

হৈমী বলল,

-” না না তেল দিয়ে থাকতে পারি না আমি। ”

রুদ্র পাঁচ মিনিটে গোসল শেষ করে বের হলো। ডিভানে বসল নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। জেরিন খাবার এনে বিছানার সাইট টেবিলে রাখল। দাদিন হৈমীর চুল আঁচড়ে বেঁধে দিল৷ রুদ্রকে বলল,

-” ও খেতে থাকুক তুই চল খেয়ে নিবি। যাও বউ মা ওর জন্য খাবার বাড়ো। ”

জেরিন, দাদিন দু’জনই চলে গেল। হৈমী রুদ্রর দিকে কিয়ৎকাল চেয়ে থেকে নিঃশ্বাস ছাড়ল। বলল,

-” এত চিন্তা দেখাতে হবে না৷ খেয়ে নিন গিয়ে। ”

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুদ্র। ওঠে এসে হৈমীর পাশে বসে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

-” আসলে তোমার কেমন লাগে হৈমী?”

-” আপনাকে? সত্যি বলতে এখন একটুও ভালো লাগে না। কিন্তু ভালোবাসি। ”

সোজাসাপ্টা কথাটা বলেই খেতে মন দিল সে। রুদ্র আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলল,

-” আমি বলছি তোমার শরীর কেমন লাগে? কেমন ফিল করো তুমি? ”

-” ওহ। ”

ক্ষীণ স্বরে বলল হৈমী। আড়ালে জিভ কামড়াল। পানি খেয়ে শুঁকনো গলা ভিজিয়ে নিয়ে বলল,

-” শরীরে শুধু অস্বস্তি লাগে। আর বমি পায়। ”

রুদ্র চিন্তান্বিত মুখে কয়েক পল তাকিয়ে রইল।হৈমী বলল,

-” যান খেয়ে নিন গিয়ে। ”

মুখ ফিরিয়ে নিল রুদ্র। বলল,

-” তুমি খেয়ে নাও। ”

-” আপনি খাবেন না? ”

-” জানি না। ”

মুখ ভেঙচিয়ে নিজের খাওয়ায় মন দিল হৈমী৷ অর্ধেক খাবার শেষ করে আর খেতে পারল না। কিঞ্চিৎ ভয় নিয়ে রুদ্রর দিকে তাকাল। যতই রুদ্র শান্ত থাকুক যতই তার মুখ ঝামটা সহ্য করুক। খাবারের বেলায় ছাড় দেবে না। তাই বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলল,

-” আমি খাইয়ে দিই আপনাকে? ”

ভারি অবাক হলো রুদ্র। হৈমী তাকে খাইয়ে দেবে? সেই যে সল অসুস্থ হবার পর মাঝেমধ্যে যত্ন নিয়ে খাইয়ে দিত অমন? বুকের ভিতরটায় যেন ভালো লাগার স্পর্শ পেল। থতমত খেয়ে তাকিয়ে রইল পলকহীন। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ বুঝে খুশি মনে খাইয়ে দিল হৈমী। সুযোগে একটু ভালোবাসা লুফে নিল রুদ্র। টের পেল হৈমী৷ মনে মনে রহস্যময় হাসল খুব। খাওয়া শেষ করে নিজের শরীরের অবস্থা জানিয়ে ম্যাসেজ করল টিশাকে। সে তাকে বেশকিছু বিষয় সাজেশন দিল। সাহসও দিল খুব। এরপর ম্যাসেজে জিজ্ঞেস করল,

-” হে রে তোর জামাই এর কী খবর? ভাবসাব কেমন? ”

হৈমী রিপলাই করল,

-” ভাবসাব তো বদলেছে। জানিস প্রতিদিন রাতে এক হাত দূরত্ব রেখে ঘুমাই। সকালে দেখি আমি তার বুকে! এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে ঘুমের ঘোরে আমিই যাই নাকি সেই আদর করে বুকে নেয় বুঝতে পারছি না। ”

টিশা সঙ্গে সঙ্গে রিপলাই দিল,

-” যদি তুই যেতি সে তো সরে যেতে পারত৷ যায়নি তো এর মানে সেই কাছে টেনেছে। বাব্বাহ তোর জামাই তো পাক্কা সেয়ান! ”

হৈমী হাসল কিঞ্চিৎ। বলল,

-” জানিস হাসপাতাল থেকে এসে একবারো বাইরে যায়নি। ডিভানে বসে আছে। থেকে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবে। আমার যে কী হাসি পাচ্ছে। ”

-” তোর কথা শুনে তো আমারই পেটে খিল ধরে যাচ্ছে। এই শোন রাতে কি শুধু ঘুমাসই রুদ্র ভাই আদর টাদর করতে চায় না? ”

-” মাঝেমধ্যে করতে আসে আমি সরিয়ে দিই। ”

-” বাব্বাহ মানে? এতদিনে একবারো ধরা দিসনি? ”

-” আরে বইন মেনে যায় কিন্তু… ”

-” কী? ”

-” তাও দু’দিন হয়ে গেছে। ”

-” জানি তো অমন হয়েই যায়। শোন মাঝেসাঝে একটু আধটু ধরা দিবি৷ পুরুষ মানুষ বুঝিসই তো? আর শোন আবার যেন গলে গিয়ে নিজের পরিকল্পনা থেকে সরে যাস না৷ মনে রাখবি পুরুষ মানুষকে জব্দ করা অতো সহজ না। রুদ্র ভাই যতই ভালো মানুষি দেখাক পুরোপুরি গলবি না। আগে একটা ধাক্কা দিবি তারপর টেনে তুলবি বুঝছিস। যাই আমার বাবুটা কান্না করছে। পরে নক দিব আবার। ”

-” আচ্ছা টাটা। ”
________________________
রাত তখন একটা বেজে ঊনপঞ্চাশ। আচমকা ঘুম ভেঙে গেল হৈমীর। তলপেটে মিঠে মিঠে ব্যথা অনুভূতি হলো। এক সময় এই ব্যথা বাড়লে শরীরে ঘাম ছেড়ে দিল তার। ছটফট করতে করতে রুদ্রর বুকে হাত লেগে গেল। সহসা ধড়ফড়িয়ে ওঠে বসল রুদ্র। হৈমীর দিকে বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে বলল,

-” কী হয়েছে, কী হয়েছে? ”

হৈমী হাসফাস করতে করতে বলল,

-” একটু ফ্যানটা জুড়ে দিন। আমার অস্থির লাগছে। ”

ত্বরিত ফ্যানের সুইচ টিপল রুদ্র। এরপর কাছে এসে ওর কপাল, গলায় হাত দিয়ে ঘাম মুছল। হৈমী অসহায় চোখে তাকিয়ে। ভাবছে, এ মুহুর্তে এ বাড়িতে রুদ্রর চেয়ে আপন কেউ তার নেই। এরপর আচমকা ভাবল, শুধুই কি এ বাড়িতে? এ পৃথিবীতে নয় বুঝি? এই যে চোখজোড়ায় এত দুঃশ্চিন্তা! এগুলো তো তার জন্যই। পরমুহূর্তে মনে হলো, তার জন্য নাকি তার গর্ভের বাচ্চাটার জন্য। চোখ উপচে পানি বেরিয়ে এলো হৈমীর। রুদ্র সহসা হাত বাড়িয়ে তার গাল স্পর্শ করল। বিচলিত কণ্ঠে বলল,

-” বেশি খারাপ লাগছে? আমি কি ডক্টরকে ফোন করব? ”

হৈমী নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল। রুদ্র বিচলিত হয়ে পাশে শুয়ে কাছে টেনে নিল ওকে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

-” কী অসুবিধা লাগছে হৈমী? বলো আমায়। ”

-” কার জন্য এত চিন্তা আমার জন্য নাকি ওর? ”

মুহুর্তেই শক্ত হয়ে গেল রুদ্র। শ্বাসরুদ্ধ করে জবাব দিল,

-” আমার বউয়ের জন্য। ”

কেঁপে ওঠল হৈমী। এক নিমিষেই সমস্ত খারাপ লাগা যেন উধাও হয়ে গেল। পেটের ভিতর খিদে ভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠল৷ কয়েক পল পর ওঠে বসে রুদ্রর দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল। রুদ্রও তার গভীর দৃষ্টি জোড়া স্থির রাখল। হৈমী মুখ বাঁকাল। হকচকিয়ে পলক ফেলল রুদ্র। স্মরণ হলো কিশোর বয়সে, ক্লাস টাইমে পাশের সিটে থাকা এক কিশোরীর মুখ। প্রথম ক্লাসে, প্রথম চাহনিতে মেয়েটা ঠিক এভাবেই তাকে মুখ বাঁকিয়ে ছিল। এ মুহুর্তে হৈমীকে তার সম বয়সী ক্লাসমেট মনে হলো। গোপনে হাসল কিঞ্চিৎ। হৈমী উদাসি রুদ্রর বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলল,

-” আমার খুব খিদে পেয়েছে। যা খাই সব বমি হয়ে চলে যায়, আবার খিদে পায়। ”

হুঁশ ফিরল রুদ্রর। বলল,

-” খিদে পেয়েছে খাবে। এত ভাবার কী আছে। আমি যাচ্ছি কী খাবে বলো? ”

-” কী আছে? ”

-” কী খাবে বলো। ”

-” বার্গার খাব। ”

-” আচ্ছা আমি গরম করে আনছি। ”

চোখ পিটপিট করে হৈমী বলল,

-” আপনি গরম করবেন! ”

-” কেন আমি কি পঙ্গু গরম করতে পারব না ? ”

আচমকা শব্দ করে হেসে ফেলল হৈমী। হাসি পেল রুদ্ররও কিন্তু সে হাসিটা চেপে নিয়ে বেরিয়ে গেল। হৈমী নিজের কথা ফেরত পেয়ে হাসিমুখেই ধীরপায়ে বেরিয়ে গেল নিচে। সে যাওয়া তে রুদ্র একটু অখুশি হলো। বলল,

-” মাতব্বরি না করলেও চলত। আমি রুমেই নিয়ে যেতাম। ”

চেয়ার টেনে বসে হৈমী বলল,

-” যতটুকু করেছেন এতেই ধন্য। ”

বার্গার গরম করে হৈমীকে দিয়ে জুস আনতে গেল রুদ্র। নিয়ে এসে বলল,

-” এটা রুমে গিয়ে খাবে৷ সে পর্যন্ত ঠান্ডা কমুক। ডিরেক্ট ঠান্ডা খাবে না। ডক্টর নিষেধ করেছে। ”

মাথা দুলাল হৈমী৷ রুদ্র তাকে বসিয়ে ডাইনিং থেকে বের হলো। আসার সময় মোবাইল ড্রয়িংরুমের সোফায় রেখেছে। সেটাই আনতে গেল৷ ঠিক সেই মুহুর্তেই দাদিনের রুম থেকে কান্নার শব্দ পেল। স্পষ্ট বুঝতে পারল দাদিন কাঁদছে। সন্দিহান হয়ে এগিয়ে গেল সে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকতে উদ্যত হয়েছে তখনি কানে ভেসে এলো,

-” আমি তো মা দিলু। মায়ের কাছে তো সব সন্তানই সমান বল। আমারো তো মন চায় তিন ছেলেকে একসঙ্গে সুখী দেখি। তিন ছেলে চোখের সামনে থাকুক, মা মা ডাকুক। ”

ওপাশের কথা শুনল না রুদ্র। দাদিন আবার বলল,

-” আমি তোকে কালই টাকা পাঠাব। বাড়িতে কবে আনতে পারব জানি না। কিন্তু আমি চেষ্টা করব বাপ। তুই চিন্তা করিস না। ছেলেটারে দেখে রাখিস। ”

শরীরটা নড়ে ওঠল রুদ্রর। রাগে, দুঃখে সরে যেতে উদ্যত হতেই হৈমীর মুখোমুখি হলো। হৈমী কিছু বলতে ঠোঁট নাড়াতেই সে তার ঠোঁট চেপে ধরল৷ এরপর হাত টেনে চলে গেল উপরে নিজেদের ঘরে। ঘরে গিয়ে মুখ খুলল হৈমী। বলল,

-” দাদিন দিলওয়ার চাচার সাথে যোগাযোগ রেখেছে! ”

রুদ্র সহসা চোখ বুজে ফেলল। সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। একদিন না একদিন বেরিয়ে আসেই। দাদিন তার চোখে ধরা পরেছে অনেক আগেই আর হৈমীরও চোখেও ধরা পড়ে গেল। নিজের ক্রোধ টুকু নিয়ন্ত্রণে এনে রুদ্র বলল,

-” এ কথা কাউকে বলবে না মনে থাকবে? ”

মাথা নাড়িয়ে হৈমী বলল,

-” থাকবে। ”

মলিন হাসল রুদ্র। দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে বসল। ঘাড় খিঁচছে তার। হৈমী বুঝল অনেক কিছুই। তাই নিঃশব্দে এসে পাশে বসল। রুদ্র তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করল,

-” যদি কোনোদিন এ বাড়ির সঙ্গে আমি সম্পর্ক ছিন্ন করে দেই তুমি পাশে থাকবে তো? ”

বিস্মিত চোখে তাকাল হৈমী। বুকের ভিতর ধক করে ওঠল তার। ঢোক গিলল সময় নিয়ে। কী বলবে সে? কী বলা উচিৎ তার? সেসব চিন্তায় না গিয়ে শুধু মাথা নাড়াল। রুদ্র আর একটি শব্দ ব্যয়ও করল না। ইশারায় তাকে শুয়ে পড়তে বলে নিজেও শুয়ে পড়ল। বাকি রাতটা কাটিয়ে দিল নিদ্রাহীন। মনে মনে শুধু ভাবল, দাদিনকে যে কোনো একজনকে বেছে নিতে হবে। জানি, সে একজন আমি না!

চলবে…
রিচেক দিইনি। ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।#বেসামাল_প্রেম
#জান্নাতুল_নাঈমা
#পর্ব_৫৪

দুপুরবেলা। লাঞ্চ শেষে রুমে এলো রুদ্র। হৈমী দাদিনের ঘরে। আমের আচার খাচ্ছে। এই সুযোগে সে সিগারেট ধরাল। রুমে নয় বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। বেলকনির দরজা আঁটকে দিয়েছে। জানালার গ্লাসও লাগানো। ধোঁয়া রুমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। আগে এসব মানতে হতো না। এখন মানতে হচ্ছে। শুধু হৈমীর জন্য বললে বিষয়টা মিথ্যে হবে। বরং তাদের দুজনের জন্যই মানছে। দু’জনের জন্য কীভাবে? হৈমীর গর্ভে যে ছোট্ট প্রাণটা আছে। গতমাসে যার হার্টবিট এসেছে বলে ডক্টর নিশ্চিত করলেন। সেই ছোট্ট প্রাণটার সঙ্গে তারা দু’জনই জড়িত৷ একজন তাকে পৃথিবীতে আনার জন্য যুদ্ধ করছে। আরেকজন এ পৃথিবীতে তাকে টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে। স্বপ্ন বুনে চলেছে রাতের পর রাত। দিনের পর দিন। বলা চলে সময়টা বেশ ভালো। এ সময়ে সুখী সুখী একটা ব্যাপার আছে। মাঝেমধ্যে তীব্র ভয়ে অবশ্য বুকে কাঁপুনি ধরে। প্রিয়জন হারানোর ভয়ে টনটন করে ওঠে বুকের বা’পাশটায়। সে টনটনে ব্যথা নিয়ে সে যখন নির্লিপ্ত হয়ে যায়। দুর্বল চোখে তাকিয়ে মলিন হাসি উপহার দেয় হৈমী। কিছুটা খোঁচা দিয়েই বলে,

-” খুব ভয় পাচ্ছেন? আপনাকে তো ভয় পেলে মানায় না। আপনার এই অসহায় মুখটা দেখতে ভালো লাগে না। একটু গম্ভীর হয়ে ভয়কে ধমকে দিন। ”

এ কথা শুনে রুদ্র মুখ ফিরিয়ে নিলে সে কানের কাছে এসে ফিসফিসে বলে,

-” যত হম্বিতম্বি সব আমার সাথেই। কোথায় গেল সেই গম্ভীরতা, তিরিক্ষি মেজাজ? ”

মানুষের সময় সব সময় সমান যায় না। রুদ্ররও যাচ্ছে না। বিগড়ানো মেজাজটাও ইদানীং শান্ত হয়েছে। বেঁচে থাকার একটিমাত্র অবলম্বনকেও হারানোর ভয় বুকে বাসা বাঁধলে দিশেহারা লাগবে না বুঝি? জন্মলগ্ন থেকেই বোধহয় লেখা ছিল জীবনের পরতে পরতে সে মানসিক অশান্তিতে থাকবে। সুখ থাকবে চিরকাল ধোঁয়াশাতেই। এরই মধ্যে দাদিন তাকে অসাধারণ এক অশান্তি উপহার দিয়েছে। দু’দিন আগে তিনি পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলাকে দিয়ে দু’ভরি সোনার গয়না বিক্রি করেছেন। যার বর্তমান বাজারমূল্য এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। এই টাকা দাদিন তার বড়ো ছেলের ঠিকানায় পাঠিয়েছে গতকাল। টাটকা খবরটি যার মাধ্যমে পাঠিয়েছে সেই জানিয়েছে রুদ্রকে। যে মানুষ দু’টো স্বার্থপরের মতো নিজেদের সুখের আশায় পুরো পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে গিয়েছিল। তাদের সুখ কি এতটাই ঠুনকো হয়ে গেছে আজ? চোরের মতো করে মায়ের কাছে হাত পাতছে। বৃদ্ধা মহিলাটির শেষ অবলম্বন টুকু কেড়ে নিতেও কুণ্ঠা বোধ করছে না। ঘৃণার মুখ বিকৃত হলো রুদ্রর। স্মরণ হলো ছোটো ভাইয়ের বউকে নিয়ে যে ভেগে যেতে পারে তার আবার কুণ্ঠা কিসের? ঐ দু’জন তো মানুষই নয় অমানুষ। কিন্তু দাদিন? সে কী করে এতটা বুদ্ধি ভ্রষ্ট হয়ে গেল? মাতৃস্নেহে? স্নেহ করা ভুল নয় কিন্তু স্নেহে অন্ধত্ব অপরাধ। ক্রোধে কপালের রগগুলো দপদপিয়ে ওঠল। নিঃশ্বাস ভারি হলো খুব। উত্তেজনা কমাতে সিগারেটে টান দিল একাধারে। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল,

-” দরজা খুলুন, দরজা খুলন। ”

দরজায় টোকা দিয়ে জানালার কাছে গেল হৈমী। কাঁচ ভেদ করে রুদ্রর কাণ্ডগুলো স্পষ্টই দেখল সে। মজা পেল খুব। হৈমীর উপস্থিতি টের পেতেই রুদ্র ত্বরিত সিগারেট ফেলে দিল। চারপাশের ধোঁয়া হাত দিয়ে রেলিঙের বাইরে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল৷ হা করে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ছাড়ল। যেন সিগারেটের গন্ধ বেরিয়ে যায়৷ হৈমী যেন এই গন্ধ একটুও না পায় তাই বারেবারে হা করে নিশ্বাস ছাড়ল। হৈমী অধৈর্য্য হয়ে দরজায় টোকা দিল। রুদ্র শান্ত হতে বলে আরো কয়েক পল পর দরজা খুলল। হৈমী উৎসুক হয়ে বেলকনিতে যেতে নিলে রুদ্র ওর হাত চেপে ধরল৷ দরজা বন্ধ করে রুমে টেনে এনে বলল,

-” আচার খাওয়া শেষ। ”

হৈমী মাথা নাড়িয়ে তার থেকে হাত ছাড়িয়ে নিল। রুদ্র মৃদু হেসে বিছানায় বসল। হৈমীর ফুলে ওঠা পেটের দিকে তাকিয়ে রইল নির্নিমেষ। তা লক্ষ করে এক পা এগোলো হৈমী। বলল,

-” চুমু খান। ”

হকচকিয়ে গেল রুদ্র। মুখ ঘুরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। পরোক্ষণেই মনে পড়ল পেটে চুমু খেলে সমস্যা নেই। মুখের গন্ধ বেবি পর্যন্ত পৌঁছাবে না। তাই স্বাচ্ছন্দ্যে পেটে চুমু খেল। খুশিতে গদগদ হলো হৈমী। মোটামুটি শরীরটা তার ভারি৷ স্বাস্থ্যের উন্নতি হওয়াতে চেহেরায় নাদুসনুদুস ভাব এসেছে। পাঁচ মাস পড়েছে। আরো কটা মাস গেলে পেট ভারি হলে ওজন ষাট প্লাস হবেই। সেই ফিনফিনে শরীর আর আজকের এই নাদুসনুদুস শরীর ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। এই শরীর নিয়েই রুদ্রর কোলে চড়ে বসল সে৷ আচমকা বসাতে সামলাতে বেগ পেল রুদ্র। হঠাৎ এভাবে কাছে আসায় ঘাবড়ালোও। টের পেল কুমতলব আছে নিশ্চিত। তার ধারণাই সঠিক হলো। হৈমী মুখ এগিয়ে আবদার করে বসল,

-” কিস মি প্লিজ। ”

চমকে ওঠল রুদ্র। হৈমী এ অবস্থায় না থাকলে বিষয়টা এখন অন্যরকম হতো। কুমতলব সুমতলব করে মেয়েটাকে নাজেহাল করে ছাড়ত। কিন্তু সময়টা এমন যে নাজেহাল শুধু তাকেই হতে হবে। অসহায় মুখ করল রুদ্র। অপরাধীর ন্যায় বলল,

-” সরে বসো। ব্রাশ করে আসি। ”

-” না না এক্ষুনি আমার চুমু চাই। ”

-” বোঝার চেষ্টা করো হৈমী। আমি সিগারেট খেয়েছি সমস্যা হবে। ”

মৃদু ধমকে টনক নড়েনি হৈমীর। সে বাচ্চাদের মতো জেদ করল,

-” আমারো সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে। ”

চোখ রাঙাল রুদ্র। হৈমী পাত্তা না দিয়ে টোপ করে ওর ঠোঁটে চুমু খেল। রুদ্র ঝটকায় মুখ সরিয়ে কৌশলে হৈমীকে বিছানায় শুইয়ে দিল। হৈমী বাহু চেপে ধরল ওর। রুদ্র হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,

-” জ্বালাচ্ছ কেন? ”

-” আমি না সিগারেট জ্বালাচ্ছে আপনার ফুসফুস। ”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্র বলল,

-” রেগুলার খাই না এখন৷ হঠাৎ… ”

-” জানি। ”

-” তাহলে পাগলামি করছ কেন? ”

-” এটুকু বাদ দিন। ”

-” দেব শর্ত আছে মানবে? ”

সহসা ক্ষেপে ওঠল হৈমী। বলল,

-” সবকিছু তে শর্ত শর্ত আর শর্ত। আর কত শর্ত দেবেন। ভালো লাগে না এসব। ”

পাশফিরে শুয়ে রইল হৈমী। শ্বাস ফেলল ঘনঘন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওঠে গেল রুদ্র। ব্রাশ করে এসে রুমের দরজা রুদ্ধ করে বিছানায় এলো৷ হৈমীর পাশে শুয়ে হাত বাড়িয়ে পেটে স্পর্শ করল৷ কয়েক পল যেতেই হাতটা কেঁপে ওঠল। সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রর শরীরও কাঁপল। উত্তেজনায় শ্বাস আঁটকে এলো৷। এরপর সে আতঙ্কিত গলায় বলল,

-” অ্যাঁই অ্যাঁই ও নড়ছে! এইতো এইতো! ”

চিৎকার করে ওঠল রুদ্র। হৈমী ভয় পেয়ে গেল রুদ্রর উত্তেজনা দেখে। রুদ্র প্রায় লাফিয়ে ওপাশে চলে গেল। হৈমীর মুখের দিকে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে পেটে তাকাল। গতকাল ঠিক একই উত্তেজনা নিয়ে হৈমী কল করেছিল তাকে৷ রাতে খাওয়ার পর রুদ্র একঘন্টার জন্য বাইরে বেরিয়েছিল। হৈমী আরাম করছিল রুমে বসে। এমন সময় পেটের ভিতর অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা চলছিল। ভয়, উত্তেজনা নিয়ে রুদ্রকে ফোন করে আনার পর সব শান্ত। রুদ্র কিছুতেই তার কথা বিশ্বাস করল না। শেষে মন খারাপ করে সেও বিশ্বাস করাতে যায়নি। ভাগ্যিস মাঝেমধ্যে পেটে হাত রাখার অভ্যেস রুদ্রর। তাই তো ম্যাজিকটা ঘটে গেল। পেটের ভিতর বাচ্চার নড়াচড়া চলল অনেকক্ষণ। রুদ্রর হাতের স্পর্শ পেয়ে যেন ওখানে থাকা প্রাণটা প্রচণ্ড খুশি হয়েছে। বেশি নড়াচড়া করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। হৈমীর চোখ দিয়ে জল গড়াল। খেয়াল করল রুদ্র কেমন বাচ্চাদের মতো তার পেটের সঙ্গে খেলা করছে। হাত বুলাচ্ছে সস্নেহে। কয়েক পল রুদ্রর ঝাপসা দৃষ্টি, ঠোঁটে মৃদু হাসিরও দেখা মিলল। তৃপ্তির শ্বাস ফেলল হৈমী। চোখ বুজল আরামে। মিনিট দুয়েক পর অজান্তেই ঘুমিয়েও পড়ল। রুদ্র শান্ত, অপলকে তাকিয়ে আছে ফুলে থাকা নগ্ন চামড়াটার দিকে। যে চামড়া আজ থেকে পাঁচ মাস আগেও তাকে কামুক করে তুলত। সে চামড়ায় এ মুহুর্তে কোনো কামুকতা নেই। আছে শুধু প্রতীক্ষা, স্নেহ, আদর, ভালোবাসা।
_____________________
মাঝরাতে ওঠে একবার খায় হৈমী। আজো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। রুদ্র ওকে খাইয়ে নিচে এসেছিল সবকিছু রাখতে। তখনি দাদিনের ঘর থেকে কান্নার শব্দ পেল। আজ যেন ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল তার। বড়ো বড়ো পা ফেলে বিনা অনুমতিতে আধখোলা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সে। তার উপস্থিতি দেখে আঁতকে ওঠল দাদিন। ত্বরিত ফোন কেটে দিয়ে কাঁপা স্বরে বলল,

-” তুই! ”

-” কেন খুব অসুবিধায় ফেললাম? কী চায় তোমার বড়ো ছেলে আর তার বউ। গত সপ্তাহে গয়না বিক্রির দেড় লক্ষ টাকা পাঠালে। সব শেষ, আরো চাই? এবার কী দেবে এ বাড়িটা বিক্রি করবে? দাদানের নামে বাড়ি তুমি চাইলে বিক্রি করতেই পারো। ”

-” রুদ্র! ”

-” একদম ধমকাবে না দাদিন। তোমার প্রতিও ধীরেধীরে আমার মনে ঘৃণা জন্মাচ্ছে। ছিঃ তুমি কেমন মা? রিদওয়ান শেখ কি তোমার নিজের সন্তান? আমার তো মনে হয় না। তাই যদি হতো তার জীবন ধ্বংসের জন্য যে দায়ী তাকে নিজের সর্বস্ব দিতে না। ”

মুখে আঁচল চেপে ডুকরে উঠলো দাদিন। রুদ্র মুখ ঘুরিয়ে নিল। দাদিন বলল,

-” আমাকে ভুল বুঝিস না রুদ্র। ওরা খুব অসহায় হয়ে পড়েছে। ওর চাকরিটা নেই আজ দু’বছর। বউ বাচ্চা নিয়ে পথে থাকতে হতো আমি টাকা না পাঠালে। ”

-” এবার কী করবে? ঐ টাকা শেষ হলে কী দেবে আর কী আছে তোমার? ”

-” রুদ্র, আমি তো মা। আমি জানি দিলু অন্যায় করেছে। কিন্তু মা হয়ে সন্তানের মৃত্যু তো চাইতে পারি না। ”

খুব কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছিল রুদ্র। দাদিন হঠাৎ বলে ফেলল,

-” অনেক বছর তো হলো। পুরোনো কথা ধরে রেখে কী লাভ। যা ভুল তা তো করেই ফেলেছে। তাই বলে সারাজীবন কি বাপের ভিটে ছাড়া থাকবে? ”

দু-হাত শক্ত মুঠ করে ফেলল রুদ্র। বলল,

-” বাহ চমৎকার। তোমার বড়ো ছেলে মেজো ছেলের বউ নিয়ে ভেগে সংসার পাতলো। সে ঘরে বাচ্চা সহ এবার এ বাড়িতে ফিরে আসবে। আর মেজো ছেলে দেখবে তার প্রাক্তন স্ত্রী তার বড়ো ভাইয়ের ঘর করছে। আর বড়ো চাচি যে এখনো তোমার বড়ো ছেলের বউ হিসেবে এ বাড়িতে আছে। তার কথাটাও তুমি ভাবলে না। এতটা স্বার্থপর তুমি হয়ে গেলে? কীভাবে সম্ভব দাদিন। কীভাবে সম্ভব এই বাড়িতে ওদের আসা? তুমি এতটা নিচু মনের কী করে হয়ে গেলে। ”

দাদিন বসে পড়ল। হাউমাউ করে কেঁদে বলল,

-” ওরা তাহলে থাকবে কোথায়? রিদুকে বলবি, ঢাকার একটা বাড়ি ওদের দিতে? ”

তাচ্ছিল্য হেসে রুদ্র বলল,

-” অসম্ভব। আমার মতো নির্দয় মানুষকে এমন আবদার করা মোটেই উচিৎ হয়নি তোমার। ”

রুদ্র ফিরে যেতে নিয়েও থামল। দাদিনের দিকে তাকিয়ে রুঢ় স্বরে বলল,

-” তোমার বড়ো ছেলে সম্পর্কে আমার চাচা আর তার বউ আমার জন্মদাত্রী! তোমার মেজ ছেলে আমার বাবা অথচ আমার মা তার বড়ো ভাইয়ের বউ! গা ঘিনঘিন করে না দাদিন এসব শুনতে? জানো আমার ভাবতেই মরে যেতে ইচ্ছে করে! এরপরও যদি তুমি এই ঘৃণ্য, জটিল সম্পর্কের মানুষদের এক বাড়িতে আনার দুঃসাহস দেখাও মনে রেখো, বাবা, আমি, বড়ো চাচি, রাদিফ ভাই সকলের সঙ্গে সম্পর্কের সুতো কাটতে হবে তোমাকে। ”

শেষ বাক্যগুলো বড্ড অসহায়ের মতো আওড়াল রুদ্র। এরপর প্রস্থান করল দাদিনের ঘর। বলা চলে আজীবনের জন্য। ছোটোবেলা থেকে যে মানুষটা তাকে আগলে বড়ো করল সেই মানুষটার ভুল আবদার এক নিমিষে সব তছনছ করে দিল। নিশ্চিত করে দিল শেষ ভবিতব্য।

চলবে….
ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here