ভালোবাসা তুই পর্ব ১৩

#ভালোবাসা_তুই
#পর্বঃ১৩
#লেখিকাঃসাদিয়া_আক্তার

——————————–
ইরা তূর্যের আম্মুর বুকে মাথা গুজে আছে।তূর্যের আম্মু রেহেলা বেগম ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।তবুও ইরা রেহেলা বেগমের বুক থেকে মাথা উঠাতে নারাজ।কিছুক্ষনপর তৌহিদ চৌধুরী তূর্যের বাবা ঘরে প্রবেশ করলো।প্রবেশ করতেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সোফায় ফেলতেই রেহেলা বেগমের বুকে মাথা জড়িয়ে কোন মেয়ে যেনো মুখ গুজে আছে।
তৌহিদ তা দেখে জিজ্ঞেস করলো,
——তূর্যের মা কে এই মেয়ে? যাকে এভাবে ধরে আছো?

তৌহিদ সাহেবের ডাকে সাড়া দিয়ে তাকিয়ে কিছুটা ভয় পেয়ে যায় রেহেলা বেগম।কি করে আর কি বলবে যে ছেলে বিয়ে করে ফেলেছে হুটহাট।ইরাও কিছুটা ভয় পেয়ে যায়।কাপা কাপা কন্ঠে রেহেলা বেগম বলে,
——ও হচ্ছে ইরা।

——আচ্ছা।তো কার জন্যে এসেছে?(গম্ভীর স্বরে বলে তৌহিদ সাহেব)

গলার ঢোক গিলে রেহেলা বলে,
——ও তোমার ছে….ছেলের

——ও তোমার ছেলের বউ বাবা।(পিছন থেকে তূর্য আওয়াজ করে বলে উঠে)

তা শুনে তৌহিদ সাহেবের চোখ কপালে উঠে গেলো।
——কি কি বললি তুই?আমার অনুমতি ছাড়ায় নিজেই নিজের বিয়ের কাজ সেরে ফেললি?

——আব্বু এমনটা নয়।অনেক সমস্যার মধ্যে পরে বিয়েটা করতে হয়েছে।তুমি জানোই আব্বু যে আমি তোমাকে না জানিয়ে এমন কোনো কাজ করিনি আজ অবধি।তবে এইটা খুব দ্রুত করতে হয়েছে তাই তোমাকে জানাতে পারিনি।আমি তোমাকে সব বলছি।

সব শুনার পর তৌহিদ সাহেব মাথা নাড়ালেন বুঝার চেষ্টা করছেন।নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করেছে যে ছেলে তার না জানিয়ে বিয়ে করেছে তা বাধ্য হয়ে পরিস্থিতির শিকার হয়ে করেছে নিজেকে এভাবে বোঝাচ্ছেন।ইরাকে ডাক দিলেন।ইরা বসে আছে মাথা নিচু করে তূর্যের পাশাপাশি। আর ঠিক তার বিপরীত পাশে বসা তৌহিদ সাহেব।ইরাকে কিছু প্রশ্ন করলেন।যাচাই করে নিচ্ছে সে এই বাড়ির বউ হওয়ার কতটা যোগ্যতা রাখে।

তৌহিদ সাহেব ইরার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
——শিক্ষা যোগ্যতা কতদু?

ইরা শুকনো গলায় ঢোক গিলে বলে,
——জ্বি আংকেল অনার্স ১ম বর্ষ।

——ওয়াট? আংকেল?

——জ জ্বি মানে বাবা।

——হুম।ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?আর তোমার ফ্যামিলির বাবা-মা কে কি করেন আর তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে কবে?

——জ জ্বি বা বাবা আ আমি

—–ওহ বাবা! তুমি এখন প্লিজ একটু অফ যাবে বাবা।তখন থেকে ওকে প্রশ্ন করে যাচ্ছো।(তূর্য)

—–হ্যা তূর্য ঠিকি বলেছে।তুমি দেখতে পারছো মেয়েটা সবে এলো ওর বাসা ছেড়ে।সারাজীবন পাবে এসব প্রশ্ন করার জন্যে এখন ওকে রেস্ট নিতে যেতে দাও।(রেহেলা বেগম)

—–কেনো এখন কি আমার এতোটুকু অধিকার নেই যে আমার ছেলের বউয়ের এডুকেশনার বেকগ্রাউন্ড,ফ্যামিলি স্ট্যাসের বেপারে জানা?(তৌহিদ সাহেব)

—–তা তো আছেই।বাট ওরা মাত্র এসেছে।এখন ওদের রেস্ট নিতে দাও।

🌹

তূর্য রুমে ঢুকতেই ইরা দৌড়ে রুমের দরজা বন্ধ করে দিলো।তা দেখে তূর্য বলে,
——ওহ আল্লাহ দরজা কেনো এভাবে ধাপ করে লাগিয়ে দিলে?প্লিজ একা পেয়ে আমার মতো অবলা নিষ্পাপ ছেলের সাথে কিছু করো না।বলেই খিলখিল করে হাসছে)

—–উফফ তূর্য প্লিজ ফাজলামো বন্ধ করেন।আর বলেন ভাইয়ার কি হয়েছে।ওখানে আপনার আব্বুর সামনে কিছু বলতে পারছিলাম না।আমি চাইনি আপনার আব্বুর সামনে একটা ড্রামা ক্রিয়েট করতে।

—–না কিছু হয়নি তোমার ভাই ঠিকি আছে।
——আপনি মিথ্যা বলছেন।আমি নিজে শুনেছি ভাইয়ার কন্ঠ।

—–হ্যা তোমার ভাইকে কিডনেপ করা হয়েছিলো।আমি ওই জাগায় গিয়ে দেখি তোমার ভাইকে হাত পা বেধে রাখা হয়েছে।অজ্ঞান হয়েছিলো।বাট ওখানে কাউকে আর খুঁজে পাইনি।

——ক কি ভা ভাইয়ার কি হয়েছে?আমি এখুনি যাবো।

——দুর তুমি একটু হলেই এতো বিচলিত কিভাবে হতে পারো বলবে?আমাকে তোমার এই মনে হয় যে তোমার ভাইয়ের এমন অবস্থায় আমি কিছু না ঠিক করেই চলে আসবো?যদিও উনি আমার অনেক ক্ষতি করেছেন।কিন্তু এখন তোমার ভাই আমার শালা হয় সো আমি সব ঠিক করেই এসেছি।নাও এখন ফোন দিয়েছি কথা বলে শান্ত হও প্লিজ।

তূর্য ফাহিমকে কল দিয়ে ইরার কাছে দিয়ে দেই।
——ভাইয়া ভাইয়া ক কি হয়েছে ত তুমি ঠিক আছো?

——হ্যা রে!আমি এখন বাসায় আছি।ভালোই আছি।এই বেপারটা নিয়ে এখন এতো মাথা ঘামোছ না আর তোর শ্বশুরবাড়ির লোকদের বুঝতে দিস না।

—–তুমি ভালো আছো শুনে শান্তি পেলাম।

—–এই সবই তূর্যের সাহায্যের জন্যে হয়েছে।অকে এখন রাখছি।ভালো থাকবি।

ইরা তা শুনে এখন কিছুটা শান্ত।ফাহিমের মুখে তূর্যের প্রশংসা শুনে ইরাও অনেক খুশি হয়েছে।ইরা মুচকি হেসে হেসে তূর্যকে ফোনটা দেয়।তূর্য ইরার এই হাসির রহস্য বুঝতে পারছে।তাই জিজ্ঞেস করে,
——-কি হলো? এত খুশি, কথা বলার পর?

——-ভাইয়া ভালো আছে শুনে এখন শান্তি পেলাম।
——-ভাই ভালো থাকলেই খুশি।আর নিজের হাসবেন্ড ভালো আছি নাকি খুশি আছে নাকি তা তো দেখার মতো কেউ নেই(অভিমানি সুরে বলে)

——আল্লাহ!কি বলেন এগুলা।আমি খেয়াল রাখি না?

——হে আল্লাহ তুমিই বিচার কইরো।আর কি বলব তূর্য তোকে কেউ ভালোবাসে না।আই থিংগ তোকে ভালোবাসার কেউ নাই।(কান্নার সুরে)

ইরা কিছুটা ভ্রু কুচকে বলে,
——-ওহ আচ্ছা তাই?ভালোবাসার কেউ নাই?তাই তো তাহলে আমি আছি কেনো চলে যায়।ইরা চলে যেতে নিলে

——এই না না শুনো। বলে তূর্য ইরার হাত ধরে একটু জোরে টান দিয়ে সামনে ঘুরিয়ে এনে নিজের দিকে আনে।ইরাকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে।
আর বলে,
——ফাজলামো করছিলাম।তুমি সিরিয়াসলি নাও কেনো বলবে?তুমি ছাড়া আমাকে কেউ তোমার মত করে ভালোবাসতে পারবে না বুঝলে ইরু।

ইরা তূর্যের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে বলে,
——-আমি কখন বললাম আমি সিরিয়াস ছিলাম।ফাজলামি কি শুধু আপনিই করতে পারবেন?আমি না?আমিও করলাম।

তা শুনে তূর্য ইরাকে বুক থেকে সরিয়ে এনে বলে,
—–এতো দুষ্ট রে।ধারা এখনি মজা দেখাচ্ছি বলে ইরাকে আরও শক্ত করে ধরে বিছানায় ফেলে দেয়।ইরা তূর্যকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলে তূর্য ইরার পিছন ছুটতে থাকলে ইরা রুমের দরজা খুলে বের হতে নিলে কারো গায়ের ধাক্কায় মাটিতে পরে যায়।

——আহা ভাবি।দেখে চলবেন তো একটু।
ইরা ওই মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।চিনতে পারছে না।

তূর্য পিছন থেকে এসে বলে,
——তুই। তুই এখানে অবেলায় কি করিস রে লিজা?

——বাহ রে! ভাইয়া।তুমি অবেলায় বিয়ে করে বউ আনবা আর আমি অবেলায় ভাবিকে দেখতে আসতে পারবো না?(রেগে লিজা)

তূর্য আর লিজার কথার মাঝে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে ইরা।তা দেখে তূর্য বলে,
——-ইরা ওহ আমার ছোট বোন লিজা।তোমাকে তো বলেছিলাম ওর কথা।

ইরার ভাইয়ের চিন্তায় তূর্যের ছোট বোন লিজার কথা যেনো ভুলেই গেছে।তাই প্রথম চিনতে পারেনি।এবার আবার নতুন করে পরিচয় দেওয়ার পর চিনলো।

——ওহ হ্যাঁ চিনতে পেরেছি এখন।(ইরা)

——আচ্ছা চলেন ভাবি অনেক কথা আছে আপনার সাথে।(লিজা)

——ওই শুন বুড়ি বেশি পেট পেট করে ভাবির মাথা খাবি না।আমি বাইরে থেকে আসছি।

——-উফফ ভাইয়া তুমিও না।ভাবির সামনে আমার আর ইমেজ খেয়ো না তো।যাও ভাগো!

🌺

লিজা আর ইরা রুমে গিয়ে অনেক গল্প করলো।গল্প করতে করতে ইরা লিজাকে বলে,
—–আচ্ছা লিজা শুনো আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি ফ্রেস হয়ে ততক্ষণ তুমি থেকো।
—–অকে ভাবি।আমি আছি।তোমাদের ভালোবাসার স্মৃতিগুলো দেখি আই মিন পিক গুলো দেখতে থাকি।

🍂

নাইট ক্লাবে বসে আছে আমির।হাতে ড্রিংকসের গ্লাস ধরে।পাশে তার ফ্রেন্ড রাহাদ বসে আছে।আমির রাগে ফুলে উঠছে তূর্যের সকালে বলা কথাগুলো মনে করে।ইরাকে কিভাবে পারলো তূর্য তার চোখে ধুলো দিয়ে নিয়ে যেতে।তা আমির কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।রাহাদ আমিরের এই অবস্থা দেখে বলে,
——দোস্ত তুই প্লিজ শান্ত হো।

——আমি কিভাবে শান্ত হবো তুইই বল।ওই তূর্য আমার কাছ থেকে ইরাকে কিভাবে নিয়ে গেলো?

——আচ্ছা শুন তোকে আমি একটা বুদ্ধি দেই।এতে সাপ ও মরবে আর লাঠিও ভাঙাবে না।

এই কথা শুনার পর আমির কিছুটা শান্ত হলো।ভ্রু কুচকে বলল,
——কি আইডিয়া?

——তুই ইরার কাছে গিয়ে মাফ চাবি আর তূর্যের কাছেও।

——-তোর মাথা ঠিক আছে?কি বলসিছ?

——আরে শুন না পুরোটা ইরাকে পেতে চাইলে আর তূর্যের থেকে প্রতিশোধ নিতে চাইলে।
——বল।(রেগে)

——তুই ওদের ভালো ফ্রেন্ড হবি।তারপর তুই ইরার সাথে কিছুটা ঘনিষ্ঠ হবি।ইরাও ভাব্বে তুই ওর ফ্রেন্ডই তাই সেও তোর সাথে আরও কথা বলবে,ঘুরতে যাবে।আর তুই এরমধ্যে ওদের দুইজনের মধ্যে এমন কিছু সন্দেহ তৈরি করবি যাতে ওদের মধ্যে ঝগড়া তৈরি হয় আস্তে আস্তে।

——-হাহাহা।ওয়াও ইয়ার। তারপর কি করতে হবে তা খুব ভালো করেই জানি।তুই পড়াশোনায় বাজে হলেও এসব বুদ্ধিতে টপ দোস্ত।

——হুহ।কি বললি তুই?

——বুকে আয় দোস্ত।বলেই দুইজন হাসতে থাকে।

🍂

পরদিন সকালে,
রেহেলা বেগম তূর্যের দরজা নক করতে লাগলো।”তূর্য বের হো।তোর আর ইরার ফ্রেন্ড এসেছে দেখা করতে”।রেহেলা বেগমের ডাকে ইরার ঘুম ভাঙে।দ্রুত গোসল করে রেডি হয়ে তূর্যকে ডেকে দেয়।তূর্য আর ইরা লিভিং রুমে এসে দেখে আমির বসে আছে।ওদের দেখে দাঁড়িয়ে যায়।তূর্য ইরার হাত শক্ত করে চেপে ধরে।ইরাও তূর্যকে আরও শক্ত করে আকড়ে ধরে আছে।
আমির ইরার কাছে এসে বলে,
——-ইরা শুনো।আমাকে আর ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখো না।আমি আজ তোমাদের আলাদা করার জন্যে আসিনি।আমি যাই করেছি তার জন্যে মাফ চাইতে এসেছি।প্লিজ তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও।

তা শুনে ইরা আর তূর্য পুরোই অবাক।তূর্যের কিছুটা সন্দেহ হয়।কিন্তু ইরা তূর্যকে বলে,
——ক্ষমা করে দেয় তূর্য?

আমির তূর্যের কাছে এসে কান্না জোরিত কন্ঠে বলে,
——মাফ করে দে ভাই।আর আমি তোমাদের দোয়া দিতে এসেছি নতুন জীবনের জন্যে।তূর্য তুই চাইলে আমি তোর পাও ধরতে রাজি আছি।

——-আরে না না।ঠিক আছে।মাফ করে দিলাম।
——আমি কি তোমাদের ফ্রেন্ড হওয়ার সুযোগ
পাবো?যদি না বলো তাহলে আর কখনো আসবো না।

তূর্য আর ইরা অনেকক্ষন ভাবলো।ভেবে বলল,
——আচ্ছা ঠিক আছে।(তূর্য)

তা শুনে আমির এসে তূর্যকে জড়িয়ে ধরলো।আর শয়তানির হাসি হাসলো।
——অনেক থ্যাংকস ভাই।আমাকে তোমাদের ফেন্ড হওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্যে।(আমির)

——-অকে প্রবলেম নেই।ইরা তুমি আমাকে মাফ করেছো?

——-হ্যা করে দিয়েছি।(মুচকি হেসে)

——আচ্ছা ইরা, তূর্য আমি আসি এখন। আমার কাজ আছে।

এই বলে শয়তানির হাসি হেসে বের হয়ে বাহিরের দিকে যাচ্ছে আমির। হঠাৎ দুর থেকে জোরে বৃষ্টির মতো পানি এসে নিমিষেই ভিজিয়েই দিলো আমিরকে।
আচমকা এমন হওয়ায় আমির রেগে চেচিয়ে বলে,
——হুয়াট হেল ইস দিস!এতো বড় সাহস কার আমার গায়ে এভাবে পানি ফেলল?

——সরি সরি স্যার।ইচ্ছে করে করিনি।(পিছন থেকে লিজা বলে উঠে)

আমির লিজার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
——বেয়াদব মেয়ে!দেখে চলতে পারো না?এভাবে কেউ গাছে পানি দেই?

——আজব! ভুল হয়ে গেছে।এভাবে রিয়েক্ট করার কি আছে?রাগ কি অলওয়েজ নাকের ডগায় নিয়ে ঘুরেন যা ইচ্ছা তা বলে যাচ্ছেন?

——ওয়াট রাবিশ!তোমার মতো মেয়ের সাথে ঝগড়া করার টাইম আমার নেই।বলেই চলে যায় আমির।

পিছন থেকে জোরে চেচিয়ে লিজা বলে,
——হ্যা হ্যা আমারও টাইম মনে হয় পরেই আছে?ফালতু লোক!

——————–
চলবে।🍁

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here