ভালোবাসা তুই পর্ব ৪

#ভালোবাসা_তুই
#পর্ব_৪
#লেখিকা_সাদিয়া_আক্তার
___________________________

ইরা, ওই ইরা উঠ,,ঘড়িতে কয়টা বেজেছে দেখছিস,এতো কিভাবে যে তুই ঘুমোতে পারিস আল্লাহই জানেন ভালো—বিরক্তি স্বরে চৈতী ইরাকে ডেকেই যাচ্ছে।

ঘুমাতে দেতো।ঘুম ভালো না হলে আমার মুডও ভালো থাকে না বুঝছিস—ঘুম ঘুম স্বরে বলে ইরা।

—–আজ সিলেট ট্যুরের শেষদিন দোস্ত।কাল সকালেই বাসে উঠে আবার সেই প্যারাময় লাইফ শুরু।আজ শপিং করি চল।
—–উফফ!দোস্ত তুইও না।বাট শপিং এর কথা যেহেতু বলেছিস তাইলে চল।(চোখ গুলো বড় করে বলে ইরা
ইরার চোখ চৈতীর দিকে পরতেই, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, কি রে শপিং করতে যাবি ভালো কথা,বাট এতো সেজে সং হওয়ার কারণটা কি রে?
একটু লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে চৈতী বলে,
—-ও এমন কিছু না।এমনি আরকি।
—-এমনি মানে?বান্ধবী আমার এতো সেজেছে আর আমি বুঝবো না কেনো আর কার জন্যে বলেই হি হি করে শয়তানির হাসি হাসলো।
—–মানে দোস্ত,আ আসলে রিয়াদ ভাইয়াও যাচ্ছে আমাদের সাথে আর কি?
তা শুনে ইরার চোখ কপালে উঠলো, ক কি?তার মানে তো ওই ফাজিল,আফ্রিকান বানোর টাও আমাদের সাথে আসছে।
—-আরে দোস্ত তো কি হয়েছে।এমন করছিস কেন?তূর্য ভাইয়াও তো আসবেই।তোর মতো সেও তো রিয়াদ ভাইয়ার বেস্টু।
—-না আমি যাবো না।তোরা যা।
—-প্লিজ দোস্ত এমন করিস না।তুই না আমার সবচেয়ে সবচেয়ে কাছের বেস্টু।তুই না গেলে থাক আমিও যাবো না।যেখানে আমার বেস্টু নাই আমিও নাই।(মাথা নিচু করে করুন কন্ঠে বলে চৈতী)
—-হয়েছে আর বুঝছি।যাবো হয়েছে।আর কাদিস না।
এই কথা শুনতেই এক নিমিষেই চোখের পানি চৈতীর গায়েব।ঠোঁটে এক হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে,যা তারাতাড়ি রেডি হয়ে নে।তা দেখেই ইরা অবাক।ইরা বুঝলো এত্তক্ষনে যে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে চৈতী এমন একটা ড্রামাবাজি করলো।বাট কি আর করবে কথা তো দিয়ে দিয়েছে।এখন যেতেই হবে।

ইরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে আর ভাবছে এইতো সেদিন যেদিন ইরাকে তূর্য পাহাড়ের চূড়া থেকে মরতে মরতে বাচালো।তারপর আবার চৈতীর মুখে তূর্যের বেপারে কনসার্ননেস,কেয়ারিং শুনে ইরা যেনো খুশির ঠিকানা খুজে পাচ্ছিলো না।আসলে প্রথম যেদিন ইরা তূর্যকে ভুল মানুষ ভেবে তার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে ছিলো,তূর্যর প্রতি প্রথম তাকিয়ে সেই হাস্যজ্বল চাহনি,গালের এককোণে টোল,সিল্কি চুল গুলো ঝাপটে পরা এই সবকিছুই দেখে তার কেমন যেনো এক মায়া চলে আসছিলো।মনে মনে ইরা তখন ভাবছিলো,সত্যি এই ছেলেটি এমন নিচু কাজ করেছে,মেয়দের ডিসটার্ব ইভেন গায়ে হাত। বাট এমন মায়াময় চেহারা দেখে আমার বিলিভ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।বাট সে তো করেছে এমনটা তাও আমার বেস্টুকে সো এর শাস্তি তাকে পেতে হবে।বাট সেইদিন আমি থাপ্পড় খেয়ে যতোটা ব্যাথা পেয়েছি তার চেয়ে বেশি আনন্দ লেগেছে যে সেই খারাপ লোকটা তূর্য না অন্যকেউ।ইরা তাই নাচতে নাচতে আয়নার সামনে তার মনের মাদুরি মিশিয়ে সাজতে লাগলো।আজ যাবে সে তূর্যের কাছে দেখা করতে, তাকে থ্যাংকস বলতে।তূর্য তার কয়েকজন ফ্রেন্ডের সাথে বসে আছে টঙের দোকানে। কারো হাতে চা আর কারো হাতে সিগারেট। তূর্য ও এক হাতে চা আর অন্য হাতে সিগারেট নিয়ে আছে।আর হাসি আড্ডায় সবাই মেতে উঠেছে।ইরা তূর্যের সেই হাসিতে আবার নিজেকে যেনো কোথাও হারিয়ে ফেলল।পরে হঠাৎ কি যেনো ভেবে সামনে তূর্যের দিকে এগুতে থাকে।ইরাকে দেখে তূর্যের সব ফ্রেন্ডরা শয়তানিমাখা হাসি দিয়ে চলে যাই।
ইরা তূর্যের কাছে গিয়ে বলে,
—-কেমন আছেন ভাইয়া।
তূর্য সিগারেটটা ফেলে চা টা এক ঢোকে গিলে বলে,
—হুম ভালো। তুমি?এখন শরীরটা কেমন তোমার?
একটু লজ্জা মাখা মুখ করে ইরা বলে,
—জ্বী ভালো ভাইয়া।শুনলাম আপনি নাকি কাল সারারাত আমার পাশে ছিলেন।ওয়েট করছিলেন আমার জ্ঞান ফিরার অপেক্ষায়?
ভ্রু কুচকে তূর্য বলে,
—-কি??কে বলেছে তোমাকে এসব?কাল আসলে আমার রুমের কেবলে ক্যারেন্টের প্রবেলম হওয়ায় রুমের একটা সার্কিটও চলছিলো না।মোবাইলও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।তাই সেইটা চার্জ করতেই বসে ছিলাম।
তা শুনেই ইরার সব ভাবনায় যেনো কেউ এক বালতি পানি ঢেলে দিলো।ইরার মুখ মলিন স্পষ্ট।
তূর্য জিজ্ঞেসা স্বরে আবার বলে, কেনো তুমি কি ভেবেছিলে?
—না না কিছু না।আমি আসি ভাইয়া।বলেই চলে গেলো ইরা।
ছিঃছিঃ ইরা তুই কি ভেবে বসছিলি?এই বানোরের তোর প্রতি এমন কিছুই নেই।এসব ভুলে যা।এভাবে বলেই ইরার চোখে অজান্তেই দু এক ফোটা জল গড়িয়ে পরছে।
চৈতীর ডাকে ইরার ভাবনার জগৎ এর ছেদ ঘটলো।
—কি রে রেডি হওয়া হয়েছে তোর।আমি সেই কখন থেকেই রেডি হয়ে বসে আছি।
ইরা রাগি স্বরে বলে,হ্যাঁ জানিই তো কেনো আগে রেডি হয়ে বসে আছিস।

🍁

জাফলং পিয়াং নদীর তীরে অবস্থিত। চৈতী আর রিয়াদ সামনে হাটছে আর হেসে হেসে কথা বলে সামনে হাটছে।পিছনে ইরা আর তূর্য হাটসে তাও তাদের মাঝে এক হাতের দুরত্ব রেখে।উফফ!নিজে তো সামনে হেসে হেসে মজা করে রিয়াদ ভাইয়ার সাথে হাটছে আর আমাকে এই বানোরটার সাথে ফাসিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিস চৈতী, মনে মনে বলে বিড়বিড় করছে ইরা।সারিবদ্ধ বেশ কয়েকটা দোকান দেখতে পেলো পিয়াং নদীর তীরে যেখানে রয়েছে- মনিপুরী, ত্রিপুরী, খাসিয়া সহ আরো বেশকয়েকটি নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী কর্তৃক তৈরী করা কাপড়ের দোকান, পাথর খোদাইয়ের দোকান, আরো রয়েছে পাঠা তৈরীর দোকান সহ কসমেটিক্সের দোকান। ইরা সামনে এসে চৈতীকে এক টানে দোকানে নিয়ে যায়।তারা দুজন দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছে।প্রচুর লোকের সমাগম। বেশিরভাগই পর্যাটক এসেছে বিভিন্ন শহর থেকে।ইরা জিনিস দেখতে দেখতে চৈতীকে খুজে পাচ্ছে না।খুব অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো এতো লোকের মাঝে।লোকগুলো কেমন যেনো নযরে তাকিয়ে আছে।যেনো তাকে গিলে খেয়ে ফেলবে। হঠাৎ পিছন থেকে পরিচিত একজনের ঘ্রাণ অনুভব করছে ইরা।তূর্য তার হাত প্যান্টের পকেটে ডুকিয়ে পিছন থেকে এমনভাবে ইরাকে ঘিরে ধরেছে যেখানে কোনো লোকেরই ইরাকে চাইতেও না চাইতেও খারাপ উদ্দেশ্যে টার্চ করা সম্ভব না।ইরার কানের কাছে এসে তূর্য বলে,
—-চারপাশে দেখতে পারছো না লোকগুলো কিভাবে তোমাকে দেখছে?এইটুকু তো বুঝতে হবে।গর্দভের মতো যেখানে সেখানে চলে যাবে না একা।
ইরার এখন রাগ উঠছে তূর্যের কথা গুলো শুনে।ব্যাটার আমার সাথে ধমক ছাড়া কি কখনো কথা বলতে পারে না?এতো রুড কেন থাকে বুঝি না সবসময়।নাকি আমার সাথেই এমনটা করে মজা পায় উনি।মনে মনে বলছে ইরা।
তূর্য আবার বলে,
কি হলো?তারাতাড়ি কিনো যা কিনার।বেশিক্ষন তোমাকে এভাবে প্রটেক্ট করতে পারবো না।আমি তোমার বডিগার্ড না বুঝলে?
—তো প্রটেক্ট করতে কে বলেছে আপনাকে?ভাইয়া।
—-কি বললে?(রাগী স্বরে)
ইরা রাগটাকে হাসি দিয়ে চেপে বলে,
—না না কিছু বলি নি ভাইয়া।
ইরা তখন থেকে শাড়ি দেখেই যাচ্ছে।কোনটা নিবে বুঝতে পারছে না।হঠাৎই তূর্য একটা শাড়ি এনে ইরাকে দিয়ে বলে,
—এইটা নাও।আই থিংক তোমাকে এই নীল রঙের কালো পাড়ের মনিপুরী শাড়িতে বেশি মানাবে।

কথা গুলো তূর্য বলতে বলতে ইরাকে নিজের মতো মনের মধ্যে সাজিয়ে নিচ্ছে আর বলছে।কথাগুলো ইরাও মুগ্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছে।ইরা কথাগুলোর মধ্যে আজ তার প্রতি তূর্যের মায়া খুজে পাচ্ছে।হঠাৎই পিছন থেকে চৈতীর স্বরে তারা দুজনেই হকচকিয়ে যায়।বাস্তবে ফিরে আসে।তূর্য শাড়িটা ইরার হাতে ধরিয়ে দোকানিকে টাকা দিয়ে বলে,
—হয়েছে।এখন তারাতারি এখান থেকে বের হও আমাদের হোটলে যেতে হবে।ব্যাগ গুছাতে হবে।কাল রওনা দিতে হবে ঢাকার উদ্দেশে।
ইরা অবাক হলো, কেমন মানুষ রে।হঠাৎই কেমন যেনো নরম হয়ে যাই আমার প্রতি আবার ততক্ষণে আচরণ চেঞ্জ করে ফেলে।

🍁

সব শপিং শেষে হোটেলে ফিরে আসলো তারা।চৈতীর মুখে মুচকি মুচকি হাসি।কারণ আজ সে রিয়াদের সাথে অনেকটা সময় কাটিয়েছে।আর কি কি কথা বলেছে, কতো কি কিনেছে তা বলে বলে ইরার মাথা আজ খেয়েই ফেলছে চৈতী।
ইরা এখন বিরক্তি স্বরে বলে,
—দোস্ত এবার থাম।আর বললে আমাকে কাল ঢাকায় না পাবনায় যেতে হবে তাও পাবান পাগলাগারদে এডমিট হতে হবে।এখন ঘুমা কাল সকালে উঠতে হবে।

🍁

সিলেটের মালনিচড়া
চাবাগান,লালাখাল,তামাবিল,জৈন্তাপুর আর বেশিকিছু দেখার সুযোগ হয়নি ।তাই এসব কিছু ঘুরেই ঢাকার উদ্দেশ্যে তাদের নিয়ে বাস রওনা হলো।

_____________________

চলবে 🌺

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here