ভালো তোকে বাসতেই হবে পর্ব ৩৩+৩৪

পর্ব ৩৩+৩৪
#ভালো তোকে বাসতেই হবে ❤️
#পরিধি রহমান বিথি🍁
#পর্ব-৩৩

আর কিছু শোনা হলো না।চোখ বন্ধ হয়ে গেল।শত চেষ্টা করেও মেলে রাখতে পারলাম না। আমার মস্তিষ্ক ও হার মানলো। হারিয়ে গেলাম অতলে,,,,,

আমি চোখ খুলে তাকালাম। হ্যাঁ হ্যাঁ,,আমি সোনালী। আমিই চোখ খুলে তাকিয়েছি। ঘরটা ঠিক পরিচিত লাগছে না। আমার সেই চিরচেনা রুমটায় চোখ খুলে তাকাতেই হালকা গোলাপি রঙের দেয়ালে একটা সাদা ডায়ালের ঘড়ি চোখে পড়ে। কিন্তু আজ চোখ খুলে তাকিয়ে দেখছি সাদা পেন্ট করা খালি একটা দেয়াল,, যেখানে কিছু ব্রেন,হার্ট, লিভার এসবের ছবি ছাড়া আর কিছু চোখে পরছে না।সিওর হলাম যে এটা হাসপাতাল।আর একটু খুঁটিয়ে দেখছি,, আমার পরনে নীল রঙের হাসপাতালের পোশাক। আমাকে চোখ টলমল করতে দেখে আম্মু পাশ থেকে চোখে জল নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলছেন,,

,,”সোনালী,,তুই চোখ খুলেছিল মা??(আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আর একটু উত্তেজিত গলায় বলছেন)তোর কষ্ট হচ্ছে না তো মা?? তুই ভালো আছিস তো??দেখবি তুই খুব জলদি ঠিক হয়ে যাবি।”

আম্মুর কথা কানে যেতেই বাইরে বসে অপেক্ষারত একদল মানুষ দরজা ঠেলে এসে হাজির হল কেবিনে। আমার মুখ থেকে কোনো কথা ফোঁটার আগেই ভালো আন্টি , ভালো আঙ্কেল, জেরিন, ভাইয়া, আব্বু সবাই গোল করে দাঁড়ালো আমার বেডের চারপাশে।মনে হচ্ছে কোনো দাগী আসামিকে আর্মির একদল দুঃসাহসী সৈন্য ঘেরাও করেছে।সবাই খুব উদ্বিগ্ন আমার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য। জেরিন আমার পাশে বসে বিষন্ন মুখ নিয়ে হালকা গলায় বলল,,

“,,কিরে এখন কেমন লাগছে??নিজে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমাদের তো টেনশনে মেরে ফেলেছিস। ইডিয়ট।”

আমি হালকা করে হাসার চেষ্টা করলাম। তারপর শুরু হলো প্রশ্ন পর্ব।সবাই একসাথে প্রশ্নের পসরা সাজালো। ভালো আন্টি উত্তেজিত গলায় বলছেন,,

,,”মিষ্টি মা। তুই কি ঠিক আছিস??মাথাটা ব্যাথা করছে না তো?? আমাকে চিনতে পারছিস??

পাশ থেকে আম্মু আবার আমার চোখের সামনে হাত নাচিয়ে বলছে,,

,,”সোনু তুই আমাকে চিনতে পারছিস তো মা?? আমি তোর মা। দেখ,, আমাকে দেখে।(বলতে না বলতে আবার কেঁদে ফেললেন।)

ভাইয়া নিজের কষ্ট লুকিয়ে নেয়ার চেষ্টায় মত্ত। তবুও পারছে না।ভ্রু কোচকাতে কোচকাতে বলল,,,

,,,”আমাকে চিনতে পারছিস?? আমি তোর অপু ভাইয়া। সোনুর আপু ভাইয়া।(মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে রইল উত্তরের আশায়)

আমি সবাইকে স্পষ্ট চিনতে পারছি‌। কিন্তু সবাই এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন??যে ই আসছে সে ই প্রশ্ন করছে কেমন আছি?? তাকে চিনতে পারছি কিনা?? মাথায় অবশ্য চিনচিনে ব্যাথা সঙ্গে বেশ ভার ভার অনুভব করছি। কিন্তু তা ছাড়া সব অলরাইট বলেই মনে হচ্ছে। হঠাৎ আব্বু এসে সামনে দাঁড়াল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুখে বশ একটা অসহায় অসহায় ভাবে। জেরিন বেড থেকে সরে আব্বু কে বসার জায়গা করে দিল। আব্বু ও নির্দ্বিধায় আমার পাশে বসল। আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলছেন,,

,,”সোনা মা তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?? আমি তোমার আব্বু,, আমার প্রিন্সেস কি ঠিক আছে??(ওনা মুখে প্রশান্তির ছাপ ছিল । হয়তো মেয়েকে ফিরে পাওয়ার শান্তি)

কিন্তু আমি বিরক্ত।বলতে পারেন চরম বিরক্ত।কোপার কোচকালাম।চোখে মুখে বিরক্তর আভা ছড়িয়ে দিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললাম,,

,,”আরে বাবা মানছি আমার এক্সিডেন্ট হয়েছে।তাই বলে কি আমি সবাইকে ভুলে গেছি?? বাংলা সিনেমার মতো মাথায় আঘাত পেয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছি নাকি??(চোখ মুখ উল্টে বাচ্চাদের মতো করে ফেললাম।)

আমার কথা শুনে সবাই প্রশান্তির হাসি হাসল। আমি পাশ থেকে কান্নাভেজা গলায় বলল,,

,”কে বলবে এই মেয়েই দীর্ঘ ১০ ঘন্টা যাবত অজ্ঞান ছিল??সব সময় আজব আজব কথা বলে সবার মাথার পোকা নড়িয়ে দেবে(আম্মু ও মুখে হাসি আনল)

আমি অবাক কোথা থেকে কি হয়ে গেল কে জানে??১০ঘন্টা যাবত আমি অজ্ঞান ছিলাম??কি সাংঘাতিক কান্ড!! আচ্ছা আমার এক্সিডেন্টের সময় তো রাত ভাইয়া ও ছিল ।উনি কোথায় ??উনি ঠিক আছেন তো?? হঠাৎ কেবিনের দরজা ঠেলে একজন মধ্যবয়স্ক নার্স প্রবেশ করল।সবাই একবার তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।নার্সটির মুখে কোনো খুশি নেই বরং রোগীর কেবিনে এতো লোকের ভিড় দেখে সে বড়ই বিরক্ত।চোখ পাকিয়ে পাকিয়ে তাকাচ্ছিল সবার দিকে। কিন্তু কারো কোনো ভাবান্তর না দেখে উনি উত্তেজিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,,

,,”কি ব্যাপার ?? রোগীর কেবিনে এতো লোক ভীড় জমিয়েছেন কেন??(কর্কশ গলায় বললেন) এক্ষুনি কেবিন খালি করুন।পেসেন্টের ভেন্টিলেশনে প্রবলেম হবে।আর আমাদের ও চিকিৎসা করতে প্রবলেম হচ্ছে।”

নার্সের এতো ঝাড়ি শোনার পর কেউ আর কেবিনে থাকা ঠিক বলে মনে করলেন না ।সবাই একে একে বের হতে লাগলেন। জেরিন আম্মুর দিকে দুপলক চোখ ঝাপকে বলল,,

,,”আন্টি আমি এখানে বসছি তুমি বাইরে যাও।”

আম্মু ও আর দ্বিমত প্রকাশ করল না। বেড়িয়ে গেলেন। জেরিন এসে আমার পাশে বসল।নার্স কিসব দেখে চলে গেল। আমি বসবো বলে নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করলাম তখনই পেযশে খুব তীব্র ব্যথার অনুভূতি হলো। জেরিন আমাকে নড়তে দেখেই উৎসাহ দেখিয়ে বললো,,

,,কিরে তুই কি বোসবি??

আমি মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম হ্যাঁ।

জেরিন আমাকে ধরে সাহায্য করল উঠে বসতে । আমি বসলাম।বসে পায়ে দিকে তাকিয়ে আমি আকাশ থেকে পড়লাম।পড়বোই বা না কেন??বাম পায়ের পাতা থেকে হাঁটু অব্দি প্লাস্টার করা।পা দেখে অবাক হয়ে মাথায় হাত দিতে গিয়ে দেখি মাথায় ও ব্যান্ডেজের দোকান ঢেলে দিয়েছে মাথায়।
হাত পায়ের অনেক জায়গায় ছুলে গেছে। জেরিনকে প্রশ্ন করলাম,,

,,”দোস্ত আমার পা টা কি অপরাধ করেছিল,,যে এভাবে তাকে প্লাস্টার করে তার দম বন্ধ করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে??

জেরিন করুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নির্বাক ভঙ্গিতে বলল,,

,,”তুই এখনো মজা করছিস??তোর পা ভেঙ্গে গেছে ‌।আর মাথায় ও প্রচন্ড আঘাত পেয়েছিল।”

আমার আবার মনে পড়ল রাত ভাইয়ার কথা।সে কেমন আছে ?? কোথায় আছেন তা জানা আমার অতি প্রয়োজনীয়। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে রাত ভাইয়া যখন আমার দিকে ছুটে আসছিলেন তখন তার মাথা থেকে গাল বেয়ে রক্ত পড়ছিল। ওনার সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না ।সে শুধু আমার কষ্ট দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। আচ্ছা,, ওনার অবহেলা জন্য তার বড় কোনো সমস্যা পড়তে হয় নি তো?? মনের মধ্যে একটু একটু করে ভয় জমা হচ্ছিল। নিজের কষ্ট লাঘব করতে আমার ওনাকে প্রয়োজন। কোথায় আছেন রাত ভাইয়া??সামনে বসে আছে জেরিন।মনে হলো। জেরিনকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয় যে উনি কোথায়?? আমি একটু উত্তেজিত হয়ে পরলাম। ছটফটানি বন্ধ করতে জেরিনে বললাম,,

,,”জেরি,,রাত ভাইয়া কোথায় তুই কি জানিস??উনি কি ঠিক আছেন?? আমার সাথে সাথে তো উনিও এক্সিডেন্ট করেছিলেন। ওনার কিছু হয়নি তো??

জেরিন আমার প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে উঠলো। কিছুটা অপ্রস্তুত ও। আমি ভয় পেলাম জেরিনের ভাব ভঙ্গি দেখে। দুশ্চিন্তা আর দুশ্চিন্তা,,রাত ভাইয়ার কিছু হলো নাতো??

#এক্সট্রা পর্ব

জেরিন আমার প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে উঠলো। কিছুটা অপ্রস্তুত ও। আমি ভয় পেলাম জেরিনের ভাব ভঙ্গি দেখে। দুশ্চিন্তা আর দুশ্চিন্তা,,রাত ভাইয়ার কিছু হলো নাতো??

জেরিন চুপ মেরে রইল। আমি চিন্তায় আরো ছটফট শুরু করলাম। কপাল কুঁচকে চিন্তিত চোখে জেরিনের দিকে তাকালাম। জেরিনের তেমন কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। আমি উত্তেজিত হয়ে জেরিনকে বললাম,,

,,,”দোস্ত কিছু তো বল। আমি টেনশনে মরে যাচ্ছি। প্লিজ বল রাত ভাইয়া ভালো আছে তো??(মাথার চিনচিনে ব্যাথাটা বড় আকার ধারণ করছে। আমি মাথায় হাত দিয়ে কুঁকড়ে উঠলাম।চোখ মুখ বিকৃত রুপ নিল। তবু ও জেরিনের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে উত্তেজনায় চেঁচিয়ে প্রশ্ন করছি,,

,,,”রাত ভয় আই ঠিক আছে তো ,জেরি?? ওনার কিছু হয়নি তো?? তুই কথা বলিস না কেন??(আমার ছলছল চোখ থেকে এবার জল ঝরতে শুরু করলো।),,তুই কেন কথা বলছিস না?? আমি আর সইতে পারছি না এই টেনশন।”

জেরিনের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল শ্ জেরিন মাথা নিচু করে বসে আছে। হয়তো আমার থেকে চোখ সরানোর উপায়। আমার কথার উত্তর দিতে জেরিন সংকোচ বোধ করছে। আমার প্রাণ বাইরে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় উত্তেজিত হয়ে ছোটাছুটি করছে। গ্যাস কনার মতো।রাত ভাইয়াকে হারানোর ভয় আমাকে ঘন কালো অন্ধকারের মতো গ্রাস করছে ধীরে ধীরে। আমি কাঁদছি । প্রচন্ড বেগে,, নিঃশব্দে । জেরিনের কাঁধে হাত দিয়ে ওকে প্রবল বেগে ঝাঁকুনি দিচ্ছি আর ক্রমাগত কেঁদে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছি “রাত ভাইয়ার কিছু হয়নি বলে”। কান্নাভেজা গলায় বলছি,,

,,”তুই কি কোনো কথা বলবি না??(কান্নায় আমার কথা জরিয়ে আসছে।ঢোক গিলে কান্না থামানোর চেষ্টা করছি),, আমাকে বল,, রাত ভাইয়া কোথায়??জেরি আমি এই মানুষিক চাপ সহ্য করতে পারছি না শ্ প্লিজ আমাকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দে।(কাঁদতে কাঁদতে নিজের হাত মুখ লুকিয়ে নিয়ে বসে রইলাম)

হঠাৎ কারো আলতো স্পর্শের ছোঁয়া পেয়ে লাফিয়ে উঠলাম।মনে আশার আলো জ্বলে উঠলো।এই বুঝি রাত ভাইয়া এসে অমাইক হাসি দিয়ে আমার পাগল করে ঠান্ডা গলায় বলবে,,

,,”সোনাই তুমি কাঁদছো কেন??এই তো আমি তোমার সামনে ,,দেখ। আমি একদম ঠিক আছি। তোমার থেকে আমায় কেউ আলাদা করতে পারবে না।(আলতো হাতে আমার চোখ মুছবে আর বলবে),,সোনাপাখি আর কাঁদে না। তুমি কাঁদলে আমি সইতে পারি না,,থাকি তুমি জান না??”

আমি চোখ মুছে তাড়াতাড়ি সামনে থাকা ব্যাক্তির দিকে তাকালাম। নিমিষেই আমার মুখ কালো হয়ে গেল। কারণ সামনে রাত ভাইয়া ছিল না‌।ছিল জেরিন। মাথা জাগিয়ে রাত ভাইয়াকে দেখতে না পেয়ে আমার মাথায় বাজ পড়ল।রাত ভাইয়াকে ফিরে পাওয়ার খুশি তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ের অন্ধকার কূপে তলিয়ে গেল। তবে জেরিনের মুখ এবার ফ্যাকাসে নয়।হাসি লেগে আছে। কিন্তু তাতে আমার মনের উপর দাগ কাটল না।হতাশ ভঙ্গিতে আমার হাতের ভাঁজে মুখ লুকালাম।জেরিন ঠোঁটে মিষ্টি হাসি নিয়ে আমার দুই বাহু ধরে ঝাকুনি দিচ্ছে আর বলছে,,

,,”সোনু তাকা আমার দিকে।(আমার হেলদোল না দেখে আবার বলল),,কি হলো শুনতে পারছিস না?থাকা আমার দিকে।

আমি চুপ করে রইলাম।আর মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে উঠছি। জেরিন এবার ধমকের সুরে বলল,,

,,”বলছি না আমার দিকে তাকাতে ??দেখ তোর সাথে কে দেখা করতে এসেছেন??

আমার আরো বেশি বিরক্ত লাগছে এই মুহূর্তে।জেরি কি বুঝতে পারছে না আমার কষ্ট??ও আমার সাথে এতো ভনিতা কেন করছে?? আমার কান্না কি ওর কাছে ঢং বা ড্রামা মনে হচ্ছে?? আমি কাঁদছি। কান্নায় গলায় স্বর আটকে যাচ্ছে। তবু ও আমি প্রবল বিরক্তি নিয়ে বলছি,,

,,”আমি কারো সাথে দেখা করতে চাই না‌,,জেরি। পাঠিয়ে দে তাকে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।(অগগ্যত ব্যক্তিকে ভাগানোর ধান্দা),, আমি করো সাথে দেখা করতে পারব না।

আমার কান্নার গতি বেড়ে চলেছে। জেরিন শীতল গলায় বলছে,,

,,”আচ্ছা তাহলে আমি রাত ভাইয়াকে চলে যেতে বলছি।”

আমি মাথা নেড়ে হ্যা সূচক উত্তর দিলাম। হঠাৎ আমার মস্তিষ্ক আমাকে উত্তেজনার জোগাড় দিল।জেরি কার নাম বলল??রাত,, হ্যাঁ আমি ঠিক শুনেছি।দেরি রাত ই বলেছে। আমি লাফ মেরে উঠে বসলাম আর বড়বড় চোখ করে তাকালাম সামনে। সামনে রাত ভাইয়া একগুচ্ছ গোলাপের একটি বড় তোরা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। খুশিতে কান্নার বেগ আর ও বেড়ে গেল।রাত ভাইয়া আলতো করে জড়িয়ে ধরে বললেন,,

,,”সোনাই তুমি কাঁদছো কেন??এই তো আমি তোমার সামনে ,,দেখ। আমি একদম ঠিক আছি। তোমার থেকে আমায় কেউ আলাদা করতে পারবে না।(আলতো হাতে আমার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে আর বলছে),,সোনাপাখি আর কাঁদে না। তুমি কাঁদলে আমি সইতে পারি না,,থাকি তুমি জান না??”

,,চলবে,,

#ভালো তোকে বাসতেই হবে ❤️
#পরিধি রহমান বিথি🍁
#পর্ব-৩৪

,,”সোনাই তুমি কাঁদছো কেন??এই তো আমি তোমার সামনে ,,দেখ। আমি একদম ঠিক আছি। তোমার থেকে আমায় কেউ আলাদা করতে পারবে না।(আলতো হাতে আমার চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে আর বলছে),,সোনাপাখি আর কাঁদে না। তুমি কাঁদলে আমি সইতে পারি না,, তুমি জান না??”

রাত ভাইয়াকে নিজের সামনে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না।রাত ভাইয়া এখনো আমায় জড়িয়ে ধরে আছেন। আমার কান্নার বেগ জোয়ারের জলের মতো বাড়ছে। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বলছি,,

,,”আমি তো ভেবেছিলাম আমি আপনাকে হারিয়ে ফেলেছি। আপনি না আসলে আমি মরেই যেতাম।”

রাত ভাইয়া শক্ত হয়ে। গেলেন। তার বুক থেকে আমাকে সরিয়ে তার সামনে আনলেন।আর কঠিন গলায় বললেন ,,

,,,”সোনাপাখি তোমার মুখে এমন কথা যেন আর কখনো না শুনি। রাতের কাছ থেকে তার সোনালীকে কেউ কেড়ে নিয়ে পারবে না।(ধমকের সুরে বলল) বুঝতে পেরেছি??আর যদি শুনি এমন কথা তাহলে বুড়িগঙ্গায় নিয়ে গিয়ে বস্তায় ভরে ফেলে দিয়ে আসব।”

আমি স্থির । একদম কোনো নড়াচড়া নেই। ড্যাবড্যাবে চোখে রাত ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। আমাকে উনি ধমকাচ্ছেন। কিন্তু আমার একটুও খারাপ লাগছে না। কারন ওনার ধমকে ও ভালোবাসা ভালোবাসা সুর বইছে। আমাকে বাড়ানোর ভয় ওনার চোখে তীব্র ভাবে লেগে আছে। আমি যেমন ওনাকে হাড়ানোর ভয়ে তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করছিলাম,,রাত ভাইয়ার চোখে মুখেও সেই তীব্র যন্ত্রণার ছাপ।চোখ দুটো লাল হয়ে আছে যেন কান্নার সাগরে ভেসে বেড়িয়েছেন। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবছি,,” কি অদ্ভুত পৃথিবী!!একটু আগে রাত ভাইয়াকে হাড়ানোর ভয় আমাকে কুঁড়েকুঁড়ে খাচ্ছিল আর এখন রাত ভাইয়া আমার সামনে বসে ভাসন দিচ্ছে আর আমি বিশ্বাস ও করতে পারছি না। হঠাৎ আমি রাত ভাইয়ার বুকে আবার ঝাঁপিয়ে পরলাম। জেরিন অন্যদিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছিল। আমি কট করে ওনার গলায় কামড় বসিয়ে দিলাম।রাত ভাইয়া কুঁকড়ে উঠলেন। গলায় হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে একটু ভাব নিয়ে বললেন,,

,,”ওফফফফ নো,,,এ কার প্রেমে পড়লাম। এতো বিদেশি লেডি ডগের মতো আমাকে কামরাচ্ছে।সোনাই তুমি কি আমাকে বার্গার মনে করেছ??”

আমি একটু লাজুক হাসি দিলাম। বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতো ভ্রু কুঁচকে বললাম,,

,,”এটা বার্গার নয়। এটা হচ্ছে রসগোল্লা। ধবধবে সাদা রসগোল্লা।আসলে আপনি এখানে বসে আছেন তাই আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না।তাই রসগোল্লা টেস্ট করে দেখলাম। সত্যি কিনা??”

রাত ভাইয়ার ও মাথায় ব্যান্ডেজ করা। কালো মিচমিচে রেশমি চুলের অর্ধাংশ জুড়ে সাদা ব্যান্ডেজের মোড়ক ‌। মুখে কেমন একটা দেবদাস দেবদাস ভাব চলে এসেছে। তবু ও ওনাকে দেখলে মনে হয় ব্যান্ডেজ টাও যেন ওনার জন্যই তৈরি হয়েছে। শুধু ওনার জন্য। ওনার মোম সাদা শরীরে বাড়িয়ে তোলার জন্য। নিজের অজান্তেই মনে কষ্ট গুলো দীর্ঘশ্বাস হয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।পাশ থেকে জেরিন মুচকি মুচকি হাসছে। আমাদের লজ্জা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,,

,,,”ওহে লাভ বার্ড,,❤️ আমার সামনেই রোমান্স শুরু করে দিয়েছ। আমাকে কি তোমাদের চোখে পড়ে না??

আমি তীক্ষ্ণ নজরে ভ্রু কুঁচকে জেরিনের দিকে তাকালাম। জেরিন খিলখিল করে হাসছে। আমি চড়া গলায় বললাম,,

,,”তোর লজ্জা করে না ?? আমাদের রোমান্স দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস?? নিজের এতোই লজ্জা তো এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন??(বলেই মুখ বাঁকিয়ে হাসছি)

জেরিন হেটে বিছানার কাছে আসল। নিরাশ গলায় বলল,,

,,”ও ,, এখন যত দোষ নন্দ ঘোষ!!”(ভ্রু নাচিয়ে)

সবাই একসঙ্গে হেসে দিলাম। হঠাৎ আমার মাথায় এক্সিডেন্টের পরের কিছু কথা মনে পড়ল। এতোক্ষন রাত ভাইয়ার চিন্তায় চিন্তায় আমার মাথা থেকেই বেড়িয়ে গেছিল।আমি শক্ত গলায় রাত ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম,,

,,”ভাইয়া আপনি কি দেখেছিলেন আমাদের বাইকটা কে যে বাইকটা ধাক্কা দিয়ে ছিল,, সেই বাইকে কে ছিল?? আমি কিন্তু স্পষ্ট দেখেছিলাম।(আমি কথাটা বলা মাত্রই সবার মুখ মলিন হয়ে গেল।)

জেরিন উদ্বিগ্ন গলায় বলল,,

,,”সোনু তোদের কোনো বাইক ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছিল??কোই রাত ভাইয়া তো আমাদের এমন কিছু বলেনি??উনি বললেন ,, গাড়ির গতি বেশি ছিল আর হঠাৎ ইসপ্রিট ব্রেকার্স চলে আশায় টাল সামলাতে না পেরে এক্সিডেন্ট হয়।রাত ভাইয়া আমাদের এ বিষয়ে কোনো কিছু বলেনি। উল্টো চার ঘণ্টা পর ডাক্তার যখন বলল,,তুই আউট অফ ডেঞ্জার তখন উনি হনহন করে রাখে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেলেন এটা কেউ লক্ষ্য না করলেও আমার চোখ এড়ায়নি।”

আমি জানি রাত ভাইয়া ও দেখেছে তাকে। আমি রাত ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে তার কর্মকাণ্ড দেখছি। আমি ৎযে কোনো সিরিয়াস কথা বলছি তাতে তার কোন ভাবান্তর নেই। উনি তো আমার গায়ে চাদর ঠিক করতে ব্যস্ত। জেরিন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল উত্তরের আশায়। তারপর ও কোনো উত্তর না পেয়ে আবার আমাকে উত্তেজিত গলায় বলল,,

,,”সোনু তোদের কে ধাক্কা দিয়েছিল রে??”

আমি রাত ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম,,

,,”সিহাব ভাইয়া।উনি যদিও হেলমেট পড়া ছিলেন কিন্তু আমি ঠিক চিনতে পেরেছি ওটা উনিই ছিলেন। আমি জ্ঞান হারানোর আগে মুহূর্ত পর্যন্ত আমি সব ক্লিয়ার দেখতে পেয়েছিলাম। সিহাব ভাইয়ার বাইকটা একদম আমাদের গা ঘেঁষে বেড়িয়ে যাচ্ছে।”

জেরিন সিহাব ভাইয়ার নাম শুনে আকাশ থেকে পড়ল।ওর চোখে মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ। তবে সিহাব ভাইয়ার নামটা শুনে রাত ভাইয়ার মুখে একটা অদ্ভুত রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। আমি হয়তো এই হাসির মানে জানি।সিহাব ভাইয়া এখনো ঠিক আছে বলে আমার হান্ড্রেড পার্সেন্ট সন্দেহ হচ্ছে। সেই রহস্যময় হাসি বজায় রেখে সরল গলায় বললেন,,

,,সোনাই ,, তুমি এখন অসুস্থ।তাই এসব নিয়ে আমরা পড়ে কথা বলব। তোমার এখান ডিপ রেস্টের প্রয়োজন।তাই শুয়ে রেস্ট নাও। আর আমার শালিকা কাম ভাবী (জেরিন) আমার বউ কে ডিস্টার্ব করো না।আর আই এম এক্সট্রেমলি সরি।আজ তোমাদের জীবনের একটা স্পেশালে দিন। কিন্তু আমাদের কারনে তোমাদের এমন সময়ে হাসপাতালে রাত দিন কাটাতে হচ্ছে।আই এম সো সরি।

জেরিন হাসি মুখে বলল,,

,,”সরি একসেপ্টেড । কিন্তু আমাদের এতে কোন অসুবিধা নেই
। আপনারা দুজন যে ঠিক আছেন তাতেই আমি খুশি। প্লিজ ডোন্ট বি সরি।”

হঠাৎ দরজা ঠেলে একজন বয়স্ক ডাক্তার সাথে দুজন নার্স ঢুকলেন । ডাক্তারের সব চুল সাদা রঙের ‌। গায়ের রং ময়লা হলেও বয়সের ছাপ এখনো তাকে কাবু করতে পারে নি। দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ গম্ভীর টাইপ লোক। ডাক্তার আমার সামনে এসে রিপোর্ট হাতে কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছেন। রিপোর্টের দিকে মুখ গুজে রাত ভাইয়ার উদ্দেশ্যে বলছেন,,

,,”জেন্টলম্যান??”

রাত ভাইয়া এগিয়ে এসে ঠান্ডা গলায় বললেন,,

,,”জি বলুন।আজ এনিথিং রং ডক্টর??”

ডাক্তার একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন,,

,,”নো। এভরিথিং অল রাইট। কিন্তু আপনি তো আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন। এবার বলুন তো?? আমাদের মাইগ্রেন বের করে নিলে এই বিউটিফুল গার্লকে কে সুস্থ করে তুলতো??”

রাত ভাইয়া লজ্জিত গলায় বলল,,

,,”ডক্টর আই এম সরি ফর দিস টাইম। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড ‌।মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল তখন।আই এম সরি।এন্ড থ্যাংকস এগেইন।”

আমি ভাবছি এনারা এসব কি বলছেন?? আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না।উনি কি করেছেন যে সরি বলতে হচ্ছে ওনাকে? আবার ডক্টর বলেছেন তাদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে।কি যে হচ্ছে??জেরিটাকে রিল্যাক্সে জিজ্ঞেস করতে হবে। ডক্টর মাথা ঝুলিয়ে বলছেন,,

,, ইটস ওকে মিস্টার রাত। আমরা বুঝতে পেরেছি আপনি খুব টেনশনে ছিলেন ।সো ইটস ওকে। তবে শুনুন ওনার মাথায় আর কোনো প্রবলেম আছে কিনা সেটা আমাদের দেখতে হবে।তাই সিটি স্ক্যান করাতে হবে।মিস সোনালীকে টেস্ট রুমে নিয়ে যেতে হবে।”

উনি একজন নার্সকে বললেন,,

,, একটা হুইলচেয়ার নিয়ে আসুন পেসেন্টকে নিয়ে যেতে হবে।”

রাত ভাইয়া হুইলচেয়ার আনতে বারন করে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে কোলে তুলে নিলেন। উপস্থিত সবাই হা করে তাকিয়ে রইল। একজন নার্স ছুটে এসে বলল,,

,,”আপনি কি করছেন?? মাথায় আঘাত লাগবে?”

ডক্টর চোখের ইশারায় নার্সকে বাঁধা দিতে বারন করল।রাত ভাইয়া আমাকে নিয়ে কেবিনের বাইরে এলেন। বাড়ির সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখেও কারো মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। আমাকে রাত ভাইয়া কোলে করে নিয়ে যাচ্ছেন আর কারো কোনো পাত্তাই নেই। উল্টো আমি নিজেই অবাক,,

,, চলবে,,?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here