মন দিতে চাই পর্ব -০৫

#মন_দিতে_চাই
#৫ম_পর্ব
#লেখনীতে_সুপ্রিয়া_চক্রবর্তী

বিয়ে বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছে মুক্তো এবং তার পুরো পরিবার। মুক্তো গেইটে সবার দাবিদাওয়া মিটিয়ে ভেতরে আসতে সক্ষম হয়। বরের জন্য বরাদ্দকৃত আসন গ্রহণ করে।

মুক্তোর অপেক্ষার প্রহর যেন আর শেষই হচ্ছিল না। ঝিনুক নামের সেই মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেছে মুক্তো৷ যাকে না দেখেই নিজের মনের মাঝে স্থান দিয়ে ফেলেছে।

স্নিগ্ধা কিছুজনকে সাথে নিয়ে যায় ঝিনুকের রুমে। রুমে এসে ঝিনুককে দেখতে না পেয়ে সবাই বেশ ঘাবড়ে যায়। বাথরুম সহ আশে পাশে ঝিনুককে খোঁজে সবাই। কিন্তু ঝিনুককে কোথাও পাওয়া যায়না। সবাই এবার বেশ চিন্তায় পড়ে যায়।

ঝিনুকের মামি শাহনাজ তো এই সুযোগটাই খুঁজছিল। সবার অলক্ষ্যে মিথ্যা একটা চিঠি ঝিনুকের ডায়েরির মাঝে ঢুকিয়ে রাখে। একটু দূরে সরে এসে স্নিগ্ধার কাছে নাটক করে বলে, দেখতো ডায়েরির মাঝে কিসের একটা চিঠি দেখা যাচ্ছে।

স্নিগ্ধা ডায়েরির মাঝখান থেকে চিঠিটা বের করে। ভাঁজ খুলে চিঠিটা পড়তেই স্নিগ্ধা থমকে দাঁড়ায়। শাহানাজ কিছু না জানার ভান করে বলে, কিছু বল মা। কি লেখা চিঠিতে।

এখানে ঝিনুক লিখেছে ও অন্য কাউকে ভালোবাসে। তাই বিয়েটা করবে না জন্য পালিয়ে গেছে।

শাহানাজ মিথ্যা আহাজারি শুরু করেন। স্নিগ্ধা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। ঝিনুক যে এমন কিছু করবে সেটা স্নিগ্ধার ভাবনার বাইরে ছিল।

ঝিনুকের মামার কানেও কথাটা যায়। তিনি ভীষণ অবাক হয়ে যান এটা জেনে। ঝিনুক তো এই বিয়েতে রাজি ছিল, তাই এভাবে তার পালিয়ে যাওয়া মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। এর পেছনে কোন যুক্তি খুঁজে পারছেন না তিনি। তাই ঝিনুকের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন।

শাহানাজ পরিকল্পনা করে কিছু মানুষের দ্বারা মুক্তোর পরিবারের কানে এই কথা তুলে দেন যে বউ পালিয়ে গেছে।

খবরটা শোনামাত্রই শাহরিয়ার কবিরের মাথায় হাত চলে যায়। মমতাজ পারভিনও ভীষণ মর্মাহত হন। ঝিনুককে তাদের খুব পছন্দ হয়েছিল। সেই মেয়েটা এমন কাজ করবে সেটা ভাবতে পারেনি। বিশেষ করে শাহরিয়ার কবির ভাবছিলেন, যেই মেয়েটা এত সৎ, যার সততায় মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি সেই মেয়েটা এরকম কাজ কিভাবে করল।

মুক্তোর কানে তখনো কথাটা যায়নি। তবে কথায় আছে দেয়ালেরও কান আছে। কোন কথা তাই বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখা যায়না। এক্ষেত্রেও তাই ঘটল। মুক্তোর কানেও পৌঁছে গেল এই খবর৷

মুক্তোর মাথায় রাগ উঠে গেল। জীবনে কখনো প্রত্যাখ্যান নামক শব্দটার সাথে পরিচিত ভয়নি মুক্তো। সেখানে আজ একটা মেয়ে কিভাবে মুক্তোতে প্রত্যাখান করে বিয়ে ছেড়ে পালিয়ে গেল। মুক্তোর মাথায় দাউদাউ করে আগুন জলতে লাগছিল।

ঝিনুকের মামার অনুপস্থিতির সুযোগ নেন শাহানাজ। সবার সামনে ঝিনুকের নামে একটার পর একটা বাজে কথা বলতে থাকেন। স্নিগ্ধা প্রথমে এই রকম পরিস্থিতিতে তার মায়ের বাজে বকাতে বাধা প্রদানের চেষ্টা করলেও শাহানাজ দমে যায়নি। স্নিগ্ধাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে বলতে থাকে, ঐ মেয়েটার মধ্যে আগে থেকেই ঘাপলা ছিল। অভিশপ্ত, অপয়া মেয়ে একটা। নিজের পুরো পরিবারকে খে*য়েছে, এই বাড়িতে এস্ব আমার শ্বাশুড়িকেও খে*ল। এখন আমাদের মান সম্মানও খেয়ে গেলো। আমি আগে থেকে স্নিগ্ধার বাবাকে এই ব্যাপারে সতর্ক করতাম। কিন্তু সে ভাগ্নির স্নেহে অন্ধ হয়ে আমার কোন কথায় পাত্তা দেয়নি। এখন তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে।

মুক্তোর কাছে সবকিছু বিরক্তিকর লাগছিল। এপর্যায়ে মমতাজ পারভিনও নিজের স্বামীকে কথা শুনিয়ে বলে, খুব তো অহংকার করে বলেছিলে তোমার জহুরির চোখ। খাঁটি ডায়মন্ড চিনতে ভুল হবে না। তুমি তো দেখছি হিরে মনে করে কাচ পছন্দ করে ছিলে।

শাহরিয়ার কবিরের মাথা নিচু হয়ে যায়। নিজের স্ত্রীকে এই রকম সময়ে কিছু বলতেও পারেন না তিনি।

মুক্তো রাগী গলায় বলে, এখানে থেকে আর নাটক দেখার কোন প্রয়োজন নেই। মম ড্যাড তোমরা চলো আমার সাথে। এখানে আর এক মিনিটও নষ্ট করবো না।

শাহানাজ নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। সবার সামনে বলে দেয়, আপনারা যখন বিয়ে করে নিজের ছেলের বউকে ঘরে তুলতে চেয়েছেন তখন এভাবে খালি হাতে ফিরবেন না।

মমতাজ পারভিন গম্ভীর গলায় বলেন, তাহলে আপনি কি করতে বলছেন আমাদের? আপনার ঐ পলাতক ভাগ্নির জন্য বসে বসে অপেক্ষা করব নাকি?

ঝিনুকের কথা বাদ দিন। যে স্বেচ্ছায় চলে যায় সে আর ফিরে আসে না। আমি তো আমার মেয়ের কথা বলছিলাম। ঐ ঝিনুকের থেকে হাজারগুণ ভালো আমার মেয়ে৷ একেবারে সোনার টুকরো। আপনারা আমার মেয়েকে সুযোগ দিয়ে দেখতে পারেন আশা করি আশাহত হবেন না।

শাহরিয়ার কবির রাগী রাগী ভাব নিয়ে বলেন, আপনাদের স্পর্ধা দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। আপনারা কি আমাদের নিয়ে ছেলেখেলা করছেন? এক মেয়ে পালিয়ে গেছে এখন নিজেদের মেয়েকে আমার ছেলের গলায় গছিয়ে দিতে চাইছেন। না না, সেটা হবে না। মমতাজ, মুক্তো চলো তোমরা।

শাহরিয়ার কবির যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেও মমতাজ পারভিন যান না। তিনি বলেন, আমি ওনার প্রস্তাবে রাজি৷ যখন এসেছি তখন খালি হাতে ফিরব না। নিজের ছেলের বউ নিয়ে তারপর একেবারে ফিরব।

মুক্তো মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে ছিল। কোন কথা বলা তো দূর সামান্য প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত করছিল না মুক্তো। তার জীবন নিয়ে এত কিছু ঘটে চলেছে অথচ তার অভিব্যক্তির কোন পরিবর্তন নেই।

শাহানাজ তো পারেন না নেচে ওঠেন। অবশেষে তার কুটিল বুদ্ধি কাজে দিল। মমতাজ পারভিনের কথা শুনে তার মন খুশিতে নেচে ওঠে। স্নিগ্ধার কাছে গিয়ে তাকে টেনে ঘরে নিয়ে যায়। মেকআপ আর্টিস্ট বলে, আমার মেয়েটাকে সাজিয়ে দাও ভালো করে। একদম লাল টুকটুকে বউয়ের সাজে সাজাও ওকে।

স্নিগ্ধা এভাবে বিয়ে করতে রাজি ছিল না৷ তাই স্নিগ্ধা বলে, আমি বিয়েটা করব না আম্মু। মুক্তোর সাথে আমার বোন ঝিনুকের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এখন আমি কিভাবে বিয়ে করব।

তুই বেশি কথা না বলে চুপচাপ রেডি হয়ে আয়। বিয়ে হলে তুই সুখীই হবি।

গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় শাহানাজ। সে বেরিয়ে যেতেই স্নিগ্ধা কাউকে ফোন করে।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here