মরুর বুকে বৃষ্টি পর্ব ৮

#মরুর_বুকে_বৃষ্টি💖
#লেখিকা-Mehruma Nurr
#পর্ব-৮

★আদিত্য আস্তে করে ভেতরে ঢুকলো। নিলা নূরের সাথেই বসে ছিল। আদিত্যকে আসতে দেখে নূরের দিকে তাকিয়ে বললো।
–আপু আমি তোমার জন্য জুস নিয়ে আসছি কেমন?

নূর ঘাড় কাত করে বললো।
–আচ্ছা।

নিলা চলে যেতেই, আদিত্য ধীরে ধীরে নূরের কাছে গিয়ে বেডের ওপর বসলো। নূরের দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর গালে আলতো করে হাত রেখে বললো।
–এখন কেমন লাগছে তোমার? খারাপ লাগছে নাতো?

নূর মুখ ছোট করে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। নূর আদিত্যের দিকে কেমন চোরা ভাবে অপরাধী চোখে তাকাচ্ছে। একবার তাকাচ্ছে আবার মাথা নিচু করে ফেলছে। আদিত্য সেটা দেখে বললো।
–কি হয়েছে? এখনো ভয় লাগছে আমাকে দেখে?

নূর আবারও মাথা নিচু করে দুই দিকে নাড়িয়ে না বুঝালো। আদিত্য আবার বলে উঠলো।
–তাহলে ভালো করে তাকাচ্ছো না কেন আমার দিকে? দেখি ভালো করে তাকাও আমার দিকে।
কথাটা বলে আদিত্য দুই হাতে নূরের মুখটা ধরে উপরের দিকে তুলে বললো।
–কি হয়েছে আমার এঞ্জেলের?

নূর বাচ্চাদের মতো অপরাধী মুখ করে আদিত্যের কপালের দিকে তর্জনী আঙুল দেখিয়ে বললো।
–এটা আমার জন্য হয়েছে তাইনা? আমি তোমাকে ব্যাথা দিয়েছি।
নূর দুই হাতে দুই কানের লতি ধরে অপরাধী সুরে বললো।
–নূর অনেক গুলো সরি। আর কখনো এমন করবো না। সত্যিই বলছি।

আদিত্য একটা প্রাপ্তির হাসি দিয়ে নূরের দুই হাত কান থেকে নামিয়ে নিজের হাতের ভেতর নিয়ে নরম সুরে বললো।
–তোমার সরি বলতে হবে না। আমিতো পুরোটাই তোমার। তুমি আমার সাথে যা খুশী তাই করতে পারো। আর এটাতো সামান্য ব্যাপার। তেমন কিছুই হয়নি আমার। ব্যাস তুমি ঠিক থাকলেই হলো।আর কিছুই চাইনা আমার।

নূর আদিত্যের কপালে ব্যান্ডেজের ওপর আলতো করে হাত ছুঁইয়ে দিয়ে বললো।
–অনেক ব্যাথা হচ্ছে তাইনা? আমি যাদু করে দেই?

আদিত্য ভ্রু কুঁচকে বললো।
–যাদু?

–হ্যাঁ যাদু,আমি যদি কখনো ব্যাথা পাই তাহলে আম্মুও আমাকে এই যাদু করে দেয়।

–আচ্ছা তাই? কি যাদু?

নূর হাঁটু ভর দিয়ে বসে মাথাটা একটু উঁচু করে দুই হাতে আদিত্যের মুখটা ধরে কপালে ব্যান্ডেজ করা জায়গায় একটা চুমু খেল।
ব্যাস এটুকুই যথেষ্ট ছিল আদিত্যর ভাঁটা পড়া নদীকে সুখের জোয়ারে ভাসানোর জন্য। আর কি চাই ওর। আদিত্য চোখ বন্ধ করে এই মধুর স্পর্শ টা নিজের ভেতর মিশিয়ে নিল। এইটুকু আঘাতের জন্য যদি এতটা সুখের জোয়ার পায়,তাহলে আদিত্য প্রতি মূহুর্তে আঘাত পেতে রাজি।

চুমু খাওয়া শেষে নূর আবার ঠিক হয়ে বসলো। আদিত্য এখনো চোখ বন্ধ করে আছে। ঠোঁটে ঝুলছে তার অতিব প্রাপ্তির হাসির রেখা। আদিত্য ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালো। নূর তখন বলে উঠলো।
–এইটা হলো যাদু। আম্মু বলে এই যাদু করলে আর ব্যথা থাকে না। দেখবে এখন তোমারও ব্যাথা সেরে যাবে।

আদিত্য হঠাৎ দুই হাতে নূরকে জড়িয়ে ধরলো। নূরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বললো।
–সারবে না। সেরে গেছে। তুমি সত্যিই যাদুকর। তোমার যাদুতে আমার সব ব্যাথাই ছু মন্তর হয়ে যায়। তুমি সত্যিই একটা এঞ্জেল। আমার লাইফের এঞ্জেল।
কথাগুলো বলে আদিত্য নূরের মাথার পাশে চুমু খেল। মনে মনে ভাবলো, ওর এই এঞ্জেল টার কিছু হয়ে গেলে ও বাচতে পারবে না। কিছুতেই না।

আদিত্যের কথা নূর তেমন বুঝতে না পারলেও হাসিমুখে সে নিজেও আদিত্যকে জড়িয়ে ধরলো।
______

দেখতে দেখতে তিনদিন কেটে গেছে। এই তিনদিনে নূর আদিত্যের সাথে অনেকটা মিশে গেছে। রোজ সকালে উঠে আদিত্য নূরকে ওর বুকেই দেখতে পায়। আর ওই মূহুর্ত টা আদিত্যর কাছে সবচেয়ে স্পেশাল মনে হয়। আদিত্য দিনরাত নূরের সেবায়ই লেগে থাকে। নূরের কি ভালো লাগে,কি পছন্দ করে সেটাই করার চেষ্টা করে। যাতে নূর মন খারাপ না করে। আর এই বাড়িতে ও কম্ফোর্টেবল হয়ে যায়। মা বাবার কথা মনে পড়লে আদিত্য তাদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেয়। আর নিলাও এখন এবাড়িতেই থাকে। তাই তেমন একটা সমস্যা হয় না।

আজ পাঁচ দিন পর আদিত্য অফিসে এসেছে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং ছিল, তাই আসতে হয়েছে। যদিও নূরকে বাসায় রেখে আসতে আদিত্যর টেনশনের শেষ ছিলনা। বারবার করে সার্ভেন্ট দের বলে এসেছে নূরের দিকে খেয়াল রাখতে। আর নিলাকেও বলে এসেছে নূরকে যেন একা না ছাড়ে। সবসময় ওর সাথেই থাকে। আর কোন সমস্যা হলে ওকে ফোন করতে বলেছে।

অফিসে আসলেও আদিত্যের মন টিকছে না। মিটিং টা কোনরকমে শেষ করে এসে নিজের কেবিনে এসেছে আদিত্য। তাড়াতাড়ি করে চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপ টা চালু করে বাসার সিসিটিভি চালু করলো। নূরকে বিয়ে করার দ্বিতীয় দিনই আদিত্য পুরো বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে ছিল। নূরকে সবসময় নজরে রাখার জন্য। তাই এখন নূরকে দেখার জন্য সিসিটিভির লাইভ ফুটেজ চালু করলো। আদিত্য প্রথমে নিজের রুমের ক্যামেরা চেক করলো, ওখানে নূরকে দেখতে পেলনা। এবার ড্রয়িং রুমের ক্যামেরা দেখলো। নূর ওখানেও নেই। শুধু নিলা সোফায় বসে টিভি দেখছে। আদিত্য একটু ঘাবড়ে গেল। নূর কোথায় গেল? আদিত্য এবার বাইরের ক্যামেরা দেখলো। ওখানে নূরকে দেখতে পেল। নূরকে দেখতে পেয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো আদিত্য। আদিত্য দেখলো নূর ওর বিড়াল ছানাকে কোলে নিয়ে লনের চারপাশে হাটাহাটি করছে।

নূরের ওর হিরোকে ছাড়া কেমন যেন ভালো লাগছে না। টিভি দেখেও মজা পাচ্ছিল না তাই বেবিকে নিয়ে একটু বাইরে হাঁটতে এসেছে। নূর চারপাশে তাকিয়ে দেখলো সেই গার্ড গুলো দাঁড়িয়ে আছে।নূরের কথামতো আদিত্য ওদের কালো কাপড় চেঞ্জ করে দিয়েছে। যদিও নূরের সেই ওয়ার্ল্ড ফেমাস কালার গুলো দেয়নি আদিত্য। বেচারাদের ওইরকম সাজ দিলে সবাই ভয় পাওয়ার বদলে ওদের নিয়ে হাসাহাসি করবে।তাই কালোর বদলে শুধু ব্লু কালারের কোট প্যান্ট করে দিয়েছে। নূর এখন আর ওদের দেখে ভয় পায় না। আদিত্য নূরকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তাই আর এখন ভয় লাগেনা।

নূর হেঁটে গার্ড গুলোর সামনে গেল। গার্ড গুলো নূরকে দেখে মাথা হালকা ঝুকিয়ে বললো।
–গুড মর্নিং রাণী সাহেবা।

গার্ডদের এমন সম্মাননা করা দেখে নূরের নিজের ওপর অনেক গর্ব গর্ব ভাব হচ্ছে। নিজেকে সত্যি সত্যি রাণী রাণী মনে হচ্ছে ওর। নূর নিজের সিনা টানটান করে মাথাটা হালকা উঁচু করে রাজকীয় ভঙ্গিতে বললো।
–আমি তোমাদের রাণী তাইনা?

গার্ডসরা মাথা নাড়িয়ে বললো।
–জ্বি জ্বি অবশ্যই। আপনি আমাদের রাণী সাহেবা।

নূর মনে মনে খুশিতে গদগদ করতে লাগলো। হঠাৎ ওর মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো। নূর মনে মনে ভাবছে এদের সাথে একটু দুষ্টুমি করবে। নূর আবারও আগের ভঙ্গিতে থেকে বললো।
–ঠিক আছে, তাহলে আমি যা বলবো তাই শুনতে হবে তোমাদের।

গার্ডসরা বললো।
–জ্বি অবশ্যই আপনি যা বলবেন তাই করবো আমরা।

নূর একটা গার্ডের দিকে আঙুল তুলে বললো।
–শোন তুমি, তুমি তোমার এক নাকের ভেতর আঙুল ঢুকাও।

গার্ড টা থতমত খেয়ে বললো।
–জ্বি??

নূর একটু হুমকির সুরে বললো।
–শুনতে পাওনি? যা বললাম তাই করো। নাহলে কিন্তু তোমার নাকটাই কাটা যাবে।

গার্ড টা অগত্যা আর উপায় না পেয়ে, তার তর্জনী আঙুল টা এক নাকে ঢুকিয়ে দিল।

নূর বললো।
–হুম ঠিক আছে। আজ সারাদিন তুমি এভাবেই নাকে আঙুল দিয়ে থাকবে। নাহলে কিন্তু তোমার নাক কেটে ফেলবো।

বেচারা গার্ডটার এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি অবস্থা।

নূর এবার আরেক গার্ডের দিকে ইশারা করে বললো।
–শোন তুমি, তুমি এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকো।

ওই গার্ড টাও আর উপায় না পেয়ে এক পা উঁচু করে আরেক পায়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বেচারা ব্যালেন্স ধরে রাখার জন্য এদিক ওদিক কাত কুত হতে লাগলো। কিন্তু এতে করে নূরের বেচারার ওপর কোন দয়া হলোনা। ওদের অবস্থা দেখে বাকি গার্ডসরা ভয়ে ঢোক গিলছে। নাজানি এখন ওদের কি করতে বলে।
নূর এবার আরেক গার্ডের দিকে ইশারা করে বললো।
–তুমি দুই হাত উঁচু করো দাঁড়াও।

ওই গার্ডটা ভাবলো,যাক তাকে তাও অনেক সহজ কাজই দিয়েছে। কিন্তু লোকটা যেই হাত উঁচু করে দাঁড়াল অমনি নূর বললো।
–স্টাচু,, একদম নড়বে না। নড়লে কিন্তু তোমাকে নর্দমার পঁচা পানিতে ফেলে দিবো।

গার্ডটা একদম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন দমটাও ফেলছে না। নূর নিচ থেকে একটা দূর্বা ঘাস টেনে তুলে গার্ডটার নাকের কাছে আর কানের কাছে নিয়ে শুরশুরি দিতে লাগলো। বেচারা গার্ডটার বেহাল দশা। না পারছে নরতে না পারছে চুপ করে থাকতে। এভাবে নূর সবগুলো গার্ড কেই নানান ভাবে টর্চার করে।

এদিকে আদিত্য এতক্ষণ ধরে নূরের সব কাজই দেখছিল। নূরের এসব কান্ডকারখানা দেখে আদিত্য ঠোঁটের ওপর দুই আঙুল চেপে হাসতে লাগলো। কি করছে তার পাগলিটা। বেচারা গার্ডসদের কি অবস্থা করে ফেলেছে।
______

এভাবে দেখতে দেখতে আরও পনেরো দিন কেটে গেল। এই পনেরো দিনে নূর পুরোপুরি আদিত্যের সাথে মিশে গেছে। এখন আর আদিত্য ছাড়া কিছুই বোঝেনা নূর। অবশ্য আদিত্যর এতো এতো কেয়ার আর ভালোবাসায় নূরের আদিত্যর প্রতি টান না এসে উপায়ই ছিলনা। আদিত্য যতক্ষণ বাসায় থাকে সবসময় নূরের সাথেই থাকে।ওর ছোট বর সব আবদার পূরণ করে। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে। আর অফিসে গেলে সিসিটিভি ক্যামেরায় নজর রাখে। নূরেরও এখন আদিত্যর অভ্যাস হয়ে গেছে। আদিত্যর সাথে হাসিখুশি আর দুষ্টুমিতে মেতে থাকে। আদিত্য যতক্ষণ অফিসে থাকে ততক্ষণ নূরের সময় কাটে না। অপেক্ষায় থাকে কখন আদিত্য বাসায় ফিরবে। নূর এখন আর তেমন মায়ের কথা বলে না। মাঝে মধ্যে মনে পড়লে ফোনে কথা বলে নেয়। নিলা এখনো আদিত্য দের বাসায়ই আছে।

সন্ধ্যা ৬ টা।
আদিত্যের গাড়ি মাত্রই বাসার গেট দিয়ে ঢুকলো। গাড়ি থামতেই আদিত্য তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে গেল। আজকে অনেকটা দেড়ি হয়ে গেছে। ওর এঞ্জেল টা নিশ্চয় ওর জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। একটু দেরি হলেই পাগলিটা গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। কথাটা ভেবে আদিত্য মুচকি হাসলো। ওর জীবনটা কতো পাল্টে গেছে এই কয়দিনে। আগে ওর এই বাসায় আসতেই ইচ্ছে হতোনা। আর এখন, কখন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবো সেই অপেক্ষায় থাকি। এখন যে ওরও কেও আছে, যে ওর জন্য অপেক্ষায় থাকে। যার হাসিমুখটা দেখলে রাজ্যের সব গ্লানিই দূর হয়ে যায়। এখন আর ওর জীবনটা আগের মতো বিরান নেই। নূর ওর জীবনে এসে ওর জীবনটা সবুজের সমারোহ করে দিয়েছে।

নিজের ভাবনার মাঝেই আদিত্য দরজার কাছে এসে কলিং বেল বাজাল। নূর ড্রয়িং রুমের সোফায়ই বসেছিল। কলিং বেলের শব্দে নূর উচ্ছ্বসিত হয়ে দরজায় দিকে ছুটলো। ও জানে এখন কে এসেছে। তাইতো সবার আগে নিজেই দরজা খুলবে। এটা এখন ও রোজই করে। আদিত্য আসলে নূরই দৌড়ে গিয়ে খুলে দেই। আজও তাই করলো। নূর গিয়ে দরজা খুলে দিল।

দরজা খুলতেই নূরের নিষ্পাপ মায়াবী মুখটা দেখে আদিত্যর সব ক্লান্তি ছু মন্তর হয়ে গেল। আদিত্য মুচকি হেসে নূরের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। কিন্তু নূর মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। আদিত্য বুঝতে পারছে ওর একটু দেরি হওয়ায় নূর এমন গাল ফুলিয়ে আছে। আদিত্য মুচকি হেসে বলে উঠলো।
–কেউ মনে হয় আমার ওপর রেগে আছে। তাহলে এই চকলেট টা নাহয় নিলাকেই দিয়ে দেই।
আদিত্য পকেট থেকে একটা ক্যাডবেরি চকলেট বের করে নূরকে দেখালো।

চকলেট দেখে নূর হাসি মুখে চকলেট টা ছু মেরে নিয়ে নিল। আদিত্য তার পাওনা নেওয়ার জন্য মাথাটা একটু নিচু করলো। নূর সেটা দেখে রোজকার অভ্যাস অনুযায়ী আদিত্যের গালে একটা চুমু একে দিল। আজকাল এটা রোজকার সুখকর অভ্যাস হয়ে গেছে আদিত্যের। একদিন অফিস থেকে ফিরে আদিত্য নূরের জন্য চকলেট এনেছিল। সেদিন নূর চকলেট পেয়ে খুশিতে আদিত্যর গালে চুমু দিয়ে দিয়েছিল। সেদিন থেকেই আদিত্যর এটা অভ্যাস হয়ে গেছে। রোজ নূরের জন্য চকলেট আনে নূরের কাছ থেকে এই মিষ্টি পরশটা পাওয়ার লোভে।

আদিত্য আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো ড্রয়িং রুমে কেউ নেই। আদিত্য এটা দেখে মুচকি হেসে নূরকে কোলে তুলে নিল। এটাও প্রায় রোজকার অভ্যাস হয়ে গেছে আদিত্যের। আদিত্য নূরকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে বললো।
–আমার এঞ্জেল টা সারাদিন কি করলো?
ব্যাস এতটুকু বলতেই নূর তার কথার ঝুড়ি মেলে বসলো। চকলেট খেতে খেতে পা দুলিয়ে দুলিয়ে সারাদিন কি করেছে সেগুলো বলতে শুরু করলো। আর আদিত্য শুধু মুগ্ধ হয়ে তার এঞ্জেলের কথার ঝুড়ি শুনতে লাগলো।

সন্ধ্যা ৭-৩০
আদিত্য ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছে। আর তার এঞ্জেল নূর ড্রয়িং রুমের চারিদিকে ঘুরে ছুটাছুটি করে খেলছে। তার পায়ের নূপুরের ঝুনুরঝুনুর শব্দে পুরো বাড়িটা মুখরিত হয়ে উঠছে। শুধু বাড়িটা না আদিত্যর মনে হচ্ছে ওর এঞ্জেল টা ওর বুকের ওপর দিয়ে পদচারণ করছে। এই নুপুর জোড়া আদিত্যই দিয়েছে নূরকে। প্রথম যেদিন আদিত্য নূপুর জোড়া নূরকে পরিয়ে দিয়েছিল। নূর সেদিন খুশী হয়ে ঘুরে ঘুরে পা নাচিয়ে আদিত্যকে দেখিয়েছিল।
আদিত্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে নূরের দিকেও খেয়াল রাখছে।

হঠাৎ নূরের উচ্চস্বরে চিল্লানোর শব্দ এলো। আদিত্য চমকে উঠে নূরের দিকে তাকিয়ে দেখলো নূর সোফার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে চিল্লাচ্ছে। আদিত্য ঘাবড়ে গিয়ে নূরের কাছে গিয়ে নূরের হাত ধরে বললো।
–কি হয়েছে এঞ্জেল? চিল্লাচ্ছ কেন?

নূর আদিত্যের হাত ধরে ভীতু স্বরে বলে উঠলো।
–কুমিরের বাচ্চা, কুমিরের বাচ্চা। আমাকে খেয়ে ফেলবে।

আদিত্য থতমত খেয়ে বললো।
–কুমিরের বাচ্চা? কুমিরের বাচ্চা কোথা থেকে আসবে?

নূর ফ্লোরের দিকে আঙুল দেখিয়ে ইশারা করে বললো।
–ওই ওইযে দেখ, কুমিরের বাচ্চা। আমাকে খেয়ে ফেলবে। আমাকে বাচাও।

আদিত্য নূরের হাতের ইশারা বরাবর ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে দেখলো, ফ্লোরে একটা টিকটিকি হাঁটছে। আদিত্য বেচারা বোকা বনে গেল। তারমানে নূর এই টিকটিকিকে কুমিরের বাচ্চা বলছে?
নূর আদিত্যের হাত টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করে বললো।
–এই হিরো, তুমিও উপরে আসো। এই কুমিরের বাচ্চাটা তোমাকেও কামড়ে খেয়ে ফেলবে।তাড়াতাড়ি আসো।

আদিত্য একটু হেঁসে নিয়ে বললো।
–আরে ওটা কুমিরের বাচ্চা নাতো? ওটাকে টিকটিকি বলে।

নূর বলে উঠলো।
–কিন্তু ওটাকে তো কুমিরের মতোই দেখা যায়। দেখ একদম কুমিরের মতো দেখতে।

আদিত্য নূরের হাত ধরে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বললো।
–ওইটা টিকটিকি। আর তুমিতো দেখছি একদম ভিতুর ডিম। এইটুকু টিকটিকি দেখে কেউ ভয় পায়?

কথাটা বলে আদিত্য হাসতে হাসতে আবার ল্যাপটপের এসে বসলো আদিত্য। আদিত্যর বলা কথাটা যেন নূরের ইগোতে লাগলো। নূর হালকা রাগ নিয়ে আদিত্যর পাশে বসে বললো।
–আচ্ছা তুমি বুঝি কখনো ভয় পাওনা?

আদিত্য ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থেকেই, জিহ্বা দিয়ে চ এর মতো উচ্চারণ করে খানিকটা এটিটিউটের সাথে বললো।
–আমি আর ভয়? কখনোই না। আদিত্য আর ভয় কখনো একসাথে যায়না।

নূর এবার বিস্ময় নিয়ে বললো।
–সত্যিই হিরো? তুমি কখনো ভয় পাওনা?

আদিত্য একই ভাবে বললো।
–কখনও না

আদিত্যের কথা নূরের কেমন যেন বিশ্বাসযোগ্য হলো না। নূরের মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো। নূর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ করে চুলগুলো একটু এলোমেলো করে সামনে এনে, চোখদুটো বড়ো বড়ো করে দুই হাত উঁচু করে হাতের আঙুল গুলো ছড়িয়ে, আদিত্যের কানের কাছে এসে গলার স্বর ভারী করে বলতে লাগলো।
–হাউ মাউ খাউ, মানুষের গন্ধ পাও। আমি বট গাছের ভুত,আমি তোমার ঘাড় মোটকে খাবো। উ হা হা 👹

নূরের এমন অদ্ভুত ফেস বানানো দেখে আদিত্য প্রথমে কিছুক্ষণ নূরের তাকিয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ হু হা করে হেসে উঠলো। বউটা ওর আজকে ওকে চরম বিনোদন দিয়েছে ।কেমন করে ভয় দেখাচ্ছে যেন আমি কোন ছোট বাচ্চা। আদিত্যের হাসি দেখে নূরের রাগ হলো। ও ভয় দেখাচ্ছে, আর হিরো কিনা ভয় পাওয়ার বদলে হাসছে? নূর আদিত্যের হাসির মাঝেই হঠাৎ করে ওর নাকের ডগায় একটা কামড় বসিয়ে দিল। সাথে সাথে আদিত্যের হাসি থেমে গেল। নূর আদিত্যের নাক ছেড়ে দিয়ে জিহ্বা দেখিয়ে বললো।
–এখন হাসো হাসো,,,

আদিত্য নাকে হাত ঘষে নূরের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে বললো।
–তবেরে দুষ্টু, দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।
কথাটা বলে আদিত্য নূরের দিকে তেড়ে যেতে লাগলো। নূরও উঠে দৌড় লাগালো। নূর আগে আগে আর আদিত্য পেছনে পেছনে ছুটতে লাগলো। নূর খিলখিল করে হাসছে আর সোফার চারিদিকে গোল গোল ঘুরে ছুটছে। আদিত্যও হাসছে আর নূরকে ধরার জন্য ওর পিছনে ছুটছে। এভাবে দুইজনই সারা ড্রয়িং রুম জুড়ে ছোটাছুটি করছে।

হঠাৎ ঠাস্ করে কোনকিছু পড়ার শব্দে দুজনেই থেমে গেল। শব্দটা কোথাথেকে আসলো সেটার উৎস খোঁজার জন্য দুজনেই দরজার দিকে তাকালো। দরজার সামনে ফ্লোরে পড়ে থাকা একটা ব্যাগ দেখতে পেল। তখন এই ব্যাগটা পড়ে যাওয়ারই শব্দ পেয়েছে ওরা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাগের মালিককে দেখে, আদিত্য হাসিমুখে বললো।
–আরে তুই? তুই কখন এলি?

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here