মিথু পর্ব -০৪

#মিথু
#সাহেদা_আক্তার
#পর্ব_৪

ইশিতা খুশি হয়ে বলল, যাক আমাকে ডাকা শিখলি তাহলে। এবার ভাইটাকে ডাক তো। কি ডাকবি ওকে?

মিথিলা ইহানের দিকে ফিরল। ইহানও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও কিছু না বলে দুই ভাই বোনের মাঝে বসে পড়ল। ইশিতা জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা মিথু, আমাদের দুইজনের মধ্যে তুই কার সাথে থাকবি? মিথিলা কথা বুঝল না। ইশিতা বুঝিয়ে দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল। ও তখন ইহানের শার্টের হাতা ধরল। ইশিতা ওর কান্ডে হেসে ফেলল। ইহান উঠে বলল, আমি কেন!? তারপর নিজের রুমে চলে গেল। ইশিতা ওর মাথায় হাত রেখে অভিমানের সুরে বলল, আমি তোকে এত আদর করি তাও তুই আমার কাছে থাকবি না? আমার বদমেজাজি ভাইটার কাছে থাকবি? মিথিলা কি বুঝে হাসল। ইশিতা ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, আমি চলে গেলে তুই পারবি আমার ভাইটাকে দেখে রাখতে?
.
.
.
.
এই নিয়ে প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল মিথিলা ইহানের সাথে কোচিং যায়। ইহান ওকে বুঝিয়ে দিয়েছে সব। তাই প্রথম দিনের মতো ঝামেলা হয়নি। আর এর মাঝে একজন বান্ধবীও জুটিয়ে ফেলেছে ও। নওরিন নাম। তার বাবা ঘুরতে ভালোবাসে আর মা শিক্ষিকা। ইহান যখন কাছে থাকে না তখন নওরিনের সাথে বসে থাকে। নওরিনও ওর সাথে গল্প করে। মিথিলা হা করে নওরিনের বাবার ভ্রমণকাহিনী শোনে। বেশ ভালো লাগে মিথিলার।

আজ নওরিন আসেনি। কি হয়েছে জানা নেই। ইহানও একটু বাইরে গেছে বন্ধুদের সাথে কথা বলার জন্য। মিথিলা ইহানের দেওয়া খাতাটা বের করল৷ পেন্সিল নিয়ে আপন মনে আঁকিবুঁকি করতে লাগল। রাইসা এসে বলল, কেমন আছো মিথিলা? ও একবার ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে আবার মনযোগ দিল আঁকাতে। ওর এমন অবজ্ঞার চাহনির ব্যাপারটা রাইসার ইগোতে বেশ লাগল। খাতাটা কেড়ে নিয়ে বলল, এত ভাব দেখানোর কি আছে? কি ভাবো নিজেকে? কি এমন আঁকছো। পেইজই নষ্ট করবে শুধু শুধু। বলে খাতার দিকে তাকাল। সাথে সাথে মুখ বন্ধ হয়ে গেল৷ ইগো এত চেপে বসেছে যে মিথিলার আঁকা ছবি দেখে রাগ উঠে গেল। ও ছবির পৃষ্ঠাটা খাতা থেকে নিয়ে নিল। তারপর ছিঁড়ে ফেলল মিথিলার সামনে। সাথে সাথে কান্না করে দিল মিথিলা৷ গিয়ে কাঁপা হাতে ছেঁড়া কাগজগুলো মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিতে লাগল৷ রাইসা বাঁকা হেসে বলল, তোর মতো পিঁপড়া পায়ের নিচেই থাকা উচিত। মিথিলা সব টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে এক দৌঁড়ে বের হয়ে গেল ক্লাসরুম থেকে।

ক্লাসে এসে মিথিলাকে না দেখে আশেপাশে জিজ্ঞেস করতে লাগল ইহান। সবাই বলল রাইসা মিথিলার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে আর তার খাতা কেড়ে নিয়ে কিসের ছবি ছিঁড়ে ফেলেছে। তাই ও কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেছে। আজকে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস। রাইসা জানে ইহান পড়ালেখা ছাড়া কিছুই বোঝে না। এমন তারছেঁড়া মেয়ের জন্য ক্লাস মিস করবে না। এখুনিই স্যার আসবে। সব শোনার পর ইহান একবার ঠান্ডা চোখে রাইসার দিকে তাকাল, তারপর রাইসার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দ্রুত বের হয়ে গেল।

ইহান চারদিকে খুঁজেও ওকে পেল না। মিথিলা কোথায় যে গেছে বোঝা যাচ্ছে না। আগের মতো একে ওকে জিজ্ঞেস করে বিশেষ একটা লাভ হলো না। ও হন্নে হয়ে পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। হঠাৎ ওর বাটন ফোন বেজে উঠতেই ও পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফারাবী ফোন দিয়েছে। রিসিভ করতেই ফারাবী ইহানের উপর রাগ ঝেড়ে বলল, তোর আক্কেল কি? এমন মেয়েকে কেউ একলা ছাড়ে? কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। ইহান দ্রুত বলল, তুই মিথুকে দেখেছিস?

– ও আমার সাথেই আছে। কয়েক টুকরো কাগজ জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদছে।

– নিয়ে আয় কোচিংয়ে। আমি যাচ্ছি।

– বাসায় যাবে বলছে।

– বাসায় কেউ নেই। ইশুবু অফিসে। তুই ওকে বল যে আমি ওকে কোচিংয়ে আসতে বলেছি। ও আসবে।

ইহান ফোন কেটে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফারাবীর হাতে পড়েছে। তাই পেয়েছে। অন্য কারো হাতে পড়লে পেতো কি করে কে জানে।

ইহান আর ফারাবী ক্লাসরুমের দরজায় মিললো। মিথিলা ফারাবীর পেছনে গুটিয়ে আছে। ইহানকে দেখে দ্রুত পাশ বদল করল। ইহানের শার্টের হাতা খাঁমচে ধরলো। এতে নখের ধার লাগলো হাতে। ইহান ফিসফিস করে বলল, কদিন নখ কাটোনি মিথু? রাক্ষসীর মতো হয়েছে।

– আসবো স্যার?

স্যার এসেছে প্রায় দশ পনের মিনিট হয়ে গেছে। তাই কৈফিয়ত দিতে হলো ওদের। কোনোমতে একটা এক্সকিউজ দিয়ে ঢুকলো। বসে পড়ল যে যার জায়গায়। মিথিলা এখনো শার্টের হাতা ধরে আছে। রাইসা ওদের দিকে লালবর্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। ক্লাস শেষ হতেই ইহান জিজ্ঞেস করল, মিথু, কি হয়েছে?

– ছবি।

মিথিলা ওর কাছে থাকা একটা কাগজের তেরোটা টুকরো হাই বেঞ্চে রেখে মিলানোর চেষ্টা করল। ইহান ওকে বলল, আমায় দাও। আমি করে দিচ্ছি। কাজের টুকরোগুলো মেলাতেই একটা মুখ ভেসে উঠল। ইহান অবাক হয়ে দেখল মিথিলা ওর ছবি স্কেচ করেছে। সেখানে ইহান মনোযোগ দিয়ে ফিজিক্স বই পড়ছে। আশেপাশের সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে ছিল। ছবিটা দেখেই পুরো ক্লাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল মিথিলার ছবির কথা। হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই ছবিটা দেখার জন্য। কেবল একজন ছাড়া। রাইসা। সবাই দেখে প্রশংসা করতে লাগল। এমন সময় স্যার আসতেই সবাই আবার বসে পড়ল নিজেদের সিটে। তবে গুঞ্জন থামেনি। চারদিকে কথার খই ফুটছে। স্যার টেবিলে স্কেলের আঘাত করে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, কি হয়েছে? একজন বলল, স্যার মিথিলা ইহানের ছবি এঁকেছে। এই এক সপ্তাহে প্রত্যেক স্যারের মিথিলার সাথে কথা হয়ে গেছে। চেনে সবাই। স্যার বললেন, তাই!? কই দেখি।

ছবি ছেঁড়া দেখে স্যারকেই বেঞ্চের কাছে আসতে হল। দেখে স্যারও অভিভূত হয়ে বললেন, মা শা আল্লাহ! তোমার হাতের আঁকা তো অনেক সুন্দর! কিন্তু এটা এভাবে ছেঁড়া কেন? সবাই চুপ করে রইল। কেউ কিছু বলছে না দেখে ইহান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, রাইসা করেছে। রাইসা দাঁড়িয়ে সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলল, আমি না। পাগলের নিজের দোষেই ছিঁড়েছে। আমি না। শুনেই ইহানের মেজাজ টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। ও দাঁতে দাঁত চেপে শান্ত কন্ঠে বলল, কে পাগল রাইসা? রাইসা কি বলতে গিয়েও ওর ঠান্ডা স্বর শুনে থেমে গেল। স্যার বললেন, এটা ঠিক করোনি রাইসা। এমন ছবি তোমার ছেঁড়া ঠিক হয়নি। রাইসা মুখ কালো করে বসে পড়ল। স্যার মিথিলার মাথায় হাত রেখে বললেন, অনেক বড়ো হও। মিথিলা স্নেহের ছোঁয়া পেয়ে হালকা হাসল।

মিথিলা একটা খাতা বুকে জড়িয়ে মুখে হাসি নিয়ে হাঁটছে। ইহান ওর দিকে তাকাল। খাতাটায় ছবির টুকরোগুলো ঢুকিয়ে দিয়েছে যাতে হারিয়ে না যায়। আর সেটাকেই আগলে রাখছে ও। ইহান ভাবতে পারেনি মিথিলা ওর ছবি আঁকবে। এ কদিন প্রায়ই দেখতে ওর দেওয়া খাতা আর পেন্সিলটা নিয়ে কি যেন আঁকতো। কখনো এসে দেখায়নি কি আঁকছে। হয়ত শেষ হলে দেখাতো। তার আগেই রাইসা ছিঁড়ে দিয়েছে ছবিটা। তাছাড়া মিথিলার হাতের আঁকা বেশ ভালো। ছবিটা দেখানোয় খুশির হাসিটা সারাক্ষণ লেগে আছে ওর মুখে। ইহান দাঁড়িয়ে যেতেই মিথিলাও দাঁড়িয়ে গেল। ওর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, আমাকে কেন!? মিথিলা অবুঝের মতো তাকাল।

– আমার ছবি কেন মিথু? আমাকেই কেন সব সময় চুজ করো? ইশুবু কেন নয়? ইশুবু তো তোমাকে অনেক ভালোবাসে। তাহলে আমাকে কেন?

মিথিলা কি বুঝল জানে না। বলল, ইনু, ভালো। ইহান খেয়াল করল মিথিলা সব খেয়াল করে। ইশিতা ওকে ইনু ডাকে সেটাও খেয়াল করেছে ভালোভাবেই। মিথিলা ইহানের শার্ট হালকা টেনে বলল, ই নু, আইস ক্রিম। একটু দূরেই দুটো বাচ্চা আইসক্রিম খেতে খেতে যাচ্ছে। সেদিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করে তাকিয়ে আছে মিথিলা। ইহান ওর হাত ধরে একটা দোকানে নিয়ে গিয়ে একটা কোণ আইসক্রিম কিনে দিল। দেখেই মেয়েটার চোখে খুশিতে পানি চলে আসল। সে মহাআনন্দে আইসক্রিম খেতে গিয়ে নাকে মুখে লাগিয়ে একাকার করে ফেলল। ওর কান্ডে ইহানের ঠোঁট জোড়ায় হাসি ফুটল। মনে মনে বলল, বাচ্চা একটা।

বাসায় এসে মিথিলা ছবিটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ইহান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখল ও ফ্লোরে বসে ছবিটা মেলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ইহান কাছে গিয়ে বলল, মিথু, আগে ফ্রেশ হয়ে নাও। মিথিলা ওর দিকে তাকিয়ে রইল ছলছল চোখে। ইহানের হাসি পেলেও মুখে কঠিনভাব এনে বলল, যাও বলছি। কি আর করা। বকা খেয়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। ইহান হাসল। তারপর বসল ছবিটা ঠিক করতে। একটা নতুন পেইজ নিয়ে তাতে গাম দিয়ে টুকরোগুলো বসালো। নিজের ছবি নিজে দেখে কেমন যেন ভালো লাগছে। মেয়েটাকে যেমন ভেবেছিল তেমন নয়। বাচ্চাই বটে। তবে সুন্দর ছবি আঁকতে জানে। ভেবে আনমনে হাসতে থাকে ইহান।
.
.
.
.
দশটার দিকে ইশিতা আসলো। ইহান তখন বায়োলজিটা পড়ছিল। ডিএনএ আরএনএ নিয়ে সন্ধ্যা থেকে বসে আছে। জিনতত্ত্বটাও ভালো করে মগজে ঢুকিয়ে নিয়েছে। মিথিলা খাতার আরেকটা নতুন পৃষ্ঠা নিয়ে বসেছে। আগের ছবিটা ইহান জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাও তো ছেঁড়া। তাই অবুঝ মন নিয়ে আরেকটা আঁকতে বসলো। ইশিতা এসেই মিথিলার খোঁজ নিতে লাগল। ইহান পানি দিয়ে বলল, ভালো আছে তোমার মিথু। এখন আর আমার খোঁজ নাও না। খালি মিথুর চিন্তা। পানির খালি গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলল, বাব্বা, আমার ভাইটা তো অভিমানে ফুলে বেলুন হয়ে গেছে। ইহান কিছু না বলে রুমে চলে গেল। ইশিতাও পিছু পিছু ঢুকল। মিথিলা আপন মনে ছবি আঁকছে।

– মিথু…

মিথিলা ডাক শুনে তাকিয়ে হাসল। ইশিতা কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, কি আঁকিস মনোযোগ দিয়ে? ও তাকাল খাতার দিকে। একটা অর্ধ আঁকা ঘুমন্ত মুখ। ইশিতা ভালো করে খেয়াল করে দেখল মুখটা ইহানের। তখনই ইহান ওর সামনে আগের ছবিটা ধরল। দেখেই ইশিতা বিস্মিত হয়ে বলল, এটা কোথায় পেলি। ইহান মিথিলার দিকে ইশারা করল।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here