মুগ্ধতায় তুমি পর্ব ১২

#মুগ্ধতায়_তুমি
#পর্বঃ১২
#Saiyara_Hossain_Kayanat

ডান গালে সজোড়ে থাপ্পড় খেয়ে মনে হচ্ছে আমার মাথা পুরো ঘুরছে চোখে পুরো অন্ধকার দেখছি। শুভ্র ভাই এখনো আমার বাম হাত ধরে আছে শক্ত করে। আরেক হাত দিয়ে আমার গাল আলতো করে ঘষতে ঘষতে বললেন-

—”কি করছিস কি শাকিল?? এতো জোরে কেউ থাপ্পড় দেয়?? এমনিতেই ভয় পেয়েছে মেয়েটা তারপর আবার তুই এইরকম করছিস।”

পাশে তাকিয়ে দেখলাম ভাইয়া দাড়িয়ে আছে। তার মানে কি ভাইয়া আমাকে থাপ্পড় দিলো?? ভাইয়া তো আমাকে আগে কখনো মারে নি। কিন্তু আজ আমাকে মাঝ রাস্তায় এতো জোড়ে চড় দিলো এটা ভাবতে কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। মনের মধ্যে অভিমান আর কষ্ট জমে তা নোনাজল হয়ে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরছে। আমি পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছি মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না শুধু নিশ্চুপে চোখের পানি ফেলছি।

শুভ্র ভাইয়ের কথা শুনে পাশ থেকে ভাইয়া রাগে গর্জে উঠে বললো-

—”তো কি করবো ওকে শুভ্র ভাই আদর করবো না-কি!! আমার তো ইচ্ছে করছে আরও দুটো থাপ্পড় দিয়ে ওর গাল গুলো লাল করে দিতে। রাস্তায় হাটার সময় কোন দিকে খেয়াল থেকে ওর!! আপনি যদি ঠিক সময় ওকে না দেখতেন তখন কি হতো ভাবতে পারছেন আপনি একবারও???”

শুভ্র ভাই ভাইয়ার কাধের হাত রেখে বললেন-

—”কিছু হয়নি অনন্য ঠিক আছে মাথা ঠান্ডা কর এখন। অনন্য ভয় পাচ্ছে তাকিয়ে দেখ কান্না করছে।”

ভাইয়া আমার দিকে একপলক তাকয়ে গাড়িতে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পরলো। আর শুভ্র ভাই আগে আগে গিয়েই পেছনর সিটে বসতে বসতে বলছেন-

—”অনন্য তুই সামনে বস আমি পিছনে বসছি।”

শুভ্র ভাই হয়তো চাইছে আমি ভাইয়ার সাথে সাথে বসি তাই উনি সামনে বসেন নি। আমি ভাইয়ার সাথে বসবো না তাই আমি কিছু না বলে চুপচাপ পিছনে গিয়ে বসতে নিব তখনই ভাইয়া রাগী কন্ঠে বললেন-

—”আমি কারও ড্রাইভার না যে সামনে একা একা বসে ড্রাইভিং করবো। সামনে এসে বসলে বস আর না হয় হেটে বাসায় যা।”

ভাইয়া কথায় প্রচুর অপমান বোধ করলাম তাই আর কথা না বাড়িয়ে সামনে সিটে বসে পরলাম। আর শুভ্র ভাই পিছনে হতাশ হয়ে চুপচাপ করে বসে আমাদের কাহিনি দেখছে।

———————

গাড়িতে কোনো কথা বলিনি আর বাসায় এসেও কারও সাথে কোনো কথা না বলে নিজের রুমে এসে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিলাম। সারাদিন রুমের মধ্যেই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। আম্মু এসে খাবারের জন্য বার বার ডেকে গেছে তবুও যাইনি। শুভ্র ভাইও এসে ডেকে গেছিলো তখনও বের হইনি।

আম্মুর জ্বালায় রাতে খাবারের জন্য বাধ্য হয়ে ডাইনিং রুমে গেলাম। চুপচাপ বসে আছি টেবিলে ভাইয়া আমার সামনের চেয়ারেই বসে আছে। আব্বু আম্মুও আজ কিছু বলছে না। পুরো নিস্তব্ধ একটা পরিবেশ হয়ে আছে এখন। আমি বুঝতে পারছি ভাইয়া আমার দিকেই তাকিয়ে আছে হয়তো কিছু বলতে চাচ্ছে। আমি ভাইয়ার দিকে না তাকিয়ে চুপ করে খাবার শেষ করে চলে যাবো তখনই ভাইয়া ডাক দিলো। আমি শুনেও পাত্তা না দিয়ে চলে যাচ্ছি তখন ভাইয়া আমার সামনে এসে বললেন-

—”অনু আমার কথাটা শোন একবার এভাবে চলে যাচ্ছিস কেন?”

আমি কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে রুমে চলে আসলাম। ভাইয়ার প্রতি অনেক বেশিই অভিমান জমেছে আমার মনে সেটা এতো সহজে গলবে না।

———————

ছাদে দাঁড়িয়ে আছি আধা ঘণ্টা ধরে এখন হয়তো রাত প্রায় ১টা বাজে। যখনই আমার মন খারাপ হয় তখনই এই ছাদটা আমার সঙ্গী হয়ে যায়। এই নিস্তব্ধ পরিবেশ আর রাতের আকাশে যেন নিজেকে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। রাতের এই ঘুমন্ত শহর আমার মনকে খুব করে টানে তার কাছে।

ছোট থেকেই ভাইয়া আমার সব থেকে কাছের মানুষ ছিল। সুখ দুঃখ সব কিছুতেই ভাইকে সাথে পেয়েছি। সব পরিস্থিতিতেই আমাকে আগলে রেখেছে। আহনাফের কাছ থেকে ধোকা খেয়ে যখন নিজেকে সবার কাছ আলাদা করে রেখেছিলাম তখন এই মানুষটাই আমাকে নানান ভাবে হাসানোর চেষ্টা করেছে। আমার পিছে লেগেই ছিল সারাক্ষণ। ভাইয়ার জন্যই হয়তো আমি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলাম। নতুন করে হাসতে শুরু করে ছিলাম। তবে ভাইয়াকে কখনও ধন্যবাদ বলা হয়নি। কখনো বলতে পারিনি ভাইয়া আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর কতটা ভালোবাসি।

ভাইয়ার সাথে কখনো ভালো ভাবে কথা হয়নি। সব সময় শুধু মারামারি আর ঝগড়াই লেগে থাকতাম আমরা। আজ প্রথম ভাইয়াকে আমার উপর এতটা রাগতে দেখেছি আর আজই প্রথম ভাইয়া আমাকে এভাবে থাপ্পড় দিয়েছে। তাই এতটা খারাপ লাগছে আর প্রচুর অভিমান জমেছে ভাইয়ার প্রতি।

হঠাৎ করেই শুভ্র ভাই আমার কাছে এসে আমার হাতে কতো গুলো আইসক্রিম ধরিয়ে দিয়ে বললেন-

—”নে ধর… শাকিল কিনেছে এগুলো তোর জন্য কিন্তু কিভাবে দিবে বুঝতে পারছে না কতক্ষন ধরে ছাদের দরজার সামনে দারিয়ে আছে তোর কাছে আসার সাহস পাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে আমিই নিয়ে আসলাম।”

আমি কিছু বললাম না চুপ করেই দাঁড়িয়ে আছি। শুভ্র ভাই দরজার কাছ থেকে ভাইয়াকে টেনে আমার সামনে এনে দাড় করিয়ে দিয়ে শাসনের সুরে বললেন-

—”যতক্ষণ পর্যন্ত তোদের এই মান অভিমান সব শেষ করবি না ততক্ষণ পর্যন্ত তোরা দুজন এখান থেকে এক পা ও নাড়বি না। থাক তোরা আমি ওইদিকে আছি।”

এই কথা বলেই শুভ্র ভাই ছাদের অন্য পাশে চলে গেলেন। ভাইয়া আমার দিকে এগিয়ে আসতেই আমি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। আইসক্রিম গুলো দোলনায় রেখে আমি এক পাশে বসলাম।ভাইয়া আমার কাছে এসে নিচে বসে আমার হাত দুটো ধরে বলতে লাগলো-

—”তুই জানিস অনু তখন রাস্তায় তোকে ওই ভাবে দেখে আমি কতটা ভয় পেয়ে গেছিলাম?? মনে হয়েছিলো আমি হয়তো তোকে হারিয়ে ফেলছি। শুভ্র ভাই একটু দেরি করলেই কি হতো ভাবতে পারছিস তুই?? তোর কিছু হলে আমাদের সবার কি হবে একবার ভেবে দেখেছিস?? আমাদের সবার জান তুই অনু। তাই তখন তোর এইরকম অসাবধানতা দেখে রাগের মাথায় তোকে থাপ্পড় দিয়ে ফেলেছি। এভাবে চুপ করে থাকিস না অনু। এবাবের মতো তোর ভাইকে মাফ করে দে।”

ভাইয়ার কথা গুলো শুনে নিজের অজান্তেই কান্না করে দিলাম। ভাইয়া নিচ থেকে উঠে আমার পাশে বসে আমাকে এক হাত দিয়ে জরিয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো-

—”কিরে কান্না করছিস কেন?? কষ্ট পেয়েছিস অনেক??”

আমি ফুপিয়ে কাদতে কাদতে বললাম-

—”সরি ভাইয়া আমি বুঝতে পারিনি এমন হয়ে যাবে তখন আমারই ভুল ছিল। আর আমি কিছু না বুঝেই শুধু শুধু তোর উপর রাগ করে ছিলাম।”

ভাইয়া আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো-

—”হয়েছে হয়েছে এখন আর কাদতে হবে না থাম এবার।”

শুভ্র ভাই আমাদের কাছে এসে বললেন-

—”তোদের সব ঠিক হয়ে গেলে নিচে চল এবার, কয়টা বাজে দেখেছিস!!”

ভাইয়া শুভ্র ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললেন-

—”শুভ ভাই আজকের জন্য আপনাকে আবারও ধন্যবাদ। আপনি না থাকলে যে কি হতো….”

—”নিজের জান নিজে বাচিঁয়েছি তোমার এতো ধন্যবাদ বলতে হবে না। আর যাইহোক ও তো আমারই দায়িত্ব।”

শুভ্র ভাইয়ের কথা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। কি বললেন শুভ্র ভাই এসব!! ওনার জান বাচিঁয়েছে মানে কি?? আর আমিই বা ওনার দায়িত্ব কবে থেকে হলাম???

ভাইয়া শুভ্র ভাইয়ের কথা শুনে মুচকি হেসে চলে যেতে যেতে বললো-

—”আমি এখন নিচে যাচ্ছি শুভ্র ভাই আপনি অনন্য নিয়ে আসেন।”

ভাইয়া এমন করে হেসে আমাকে রেখেই চলে যাচ্ছে কেন?? শুভ্র ভাইয়ের সাথে সাথে কি আমার ভাইও পাগল হয়ে যাচ্ছে নাকি!!!
ভাইয়া চলে যেতেই শুভ্র ভাই আমার কাছে এসে দোলনায় বসে পরলেন। একটা আইসক্রিম নিয়ে খেতে খেতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-

—”ইসসসস একদিনেই নিজের কি হাল করেছো তুমি। কান্নাকাটি করে নাক আর গাল গুলো একদম লাল করে ফেলেছো তুমি। ইচ্ছে করছে এই আইসক্রিমের মতো করে তোমাকেও খেয়ে ফেলি। কিন্তু কিছু করার নাই নিজেকে কন্ট্রোল করেই রাখতে হবে সব সময় যেভাবে করে আসছি।”

শুভ্র ভাইয়ের কথা শুনে আমার চোখ রসগোল্লার মতো গোলাকার হয়ে বেরিয়ে আসার মতো উপক্রম হয়ে গেছে। কি বলে এই লোক আমাকে খেয়ে ফেলবে!!!!

—”কিরে আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন চোখ দিয়েই কি খেয়ে ফেলবি নাকি আমাকে??? খেতে ইচ্ছে করলে আইসক্রিম খা আমাকে না।”

কি সাংঘাতিক লোকরে বাবা!! উনি নিজেই বলছে আমাকে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে ওনার আর এখন আমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। আমি কিছুটা রাগী কন্ঠে বললাম-

—”আপনি তো খুব অসভ্য লোক শুভ্র ভাই কি সব উদ্ভট কথা বলেন আবার পরক্ষণেই কথা বলার ধরন পালটে ফেলেন। আমার মনে হয় কি জানেন?? আপনার সাথে জ্বিন ভূত কিছু আছে। না হলে এমন অদ্ভুত আচরণ করে আমাকে এমন বিভ্রান্তিতে ফেলেন কি করে!! আপনার জন্য আমি একদিন পাগল হয়ে যাবো নিশ্চিত।”

শুভ্র ভাই কিছু বললেন না শুধু মুচকি হাসলেন। বসা থেকে উঠে দারিয়ে বললেন-

—”অনেক রাত হয়ে গেছে নিচে চল অনন্য।”

আমি চুপচাপ নিচে চলে গেলাম ফ্ল্যাটের দরজা খুলবো তখনই শুভ্র ভাই পিছন থেকে আমার কানে ফিসফিস করে বলে উঠলেন-

—”পাগল তো তুমি একদিন হবে তবে সেটা শুধু এই শুভ্রর জন্য। আর হ্যাঁ এই শুভ্র থাকতে তার অনন্যময়ির কোনো ক্ষতি হতে দিবে না।”

শুভ্র ভাইয়ের কথা শুনে আমার হার্ট যেন লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। আমি স্তব্ধ হয়ে এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি। কিছু ভাবে ওঠার আগেই শুভ্র ভাই হাল্কা ধমকের সুরে বললেন-

—”সারারাত এখানেই দাঁড়িয়ে কাটাবি নাকি যা ভিতর যা এখন।”

আমি কিছু না বলেই চুপচাপ এসে পরলাম। রুমে এসে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম আহনাফ আর শুভ্র ভাইয়ের বলা কথা গুলো। কিছুতেই আমি হিসেব মেলাতে পারছি না। নিজেকে কেমন জ্ঞান শূন্য মানুষ মনে হচ্ছে।

(বিঃদ্রঃ- বাসায় সারাদিন বোরিং সময় কাটানোর ফলে মেজাজ প্রায়শই বিগড়েই থাকে। তবে কিছু কিছু পাঠকদের কমেন্ট পরে আনমনে আমার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসে ফুটে উঠে। অনেক অনেক ধন্যবাদ আর ভালোবাসা তাদের জন্য যারা আমার হাসির কারন হয়। আর আজকের পর্বটা তাদের জন্যই বড় করে লিখেছি। কোনো ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন। ভালোবাসা❤️)

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here