মেঘের উল্টোপিঠ পর্ব -০২

#মেঘের_উল্টোপিঠ
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
[০২]

পূর্বের বর্তমান বলা কথাটি শুনে হটাৎই উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসলো।ত্রস্ত পায়ে দু’কদম পিছিয়ে যেতেই তিনি কপালে সুক্ষ্ম ভাজ ফেললেন। তার হাবভাব এমন, সে বুঝতে পারছে না তার সামনের ব্যাক্তির বর্তমান মনোভাব। পূর্ব জ্বরাক্রান্ত কন্ঠে থেমে থেমে বলল,

‘ পিছে নয় সামনে, কাছে আসতে বলেছি তোমায়। তুমি কি কানে কম শুনো?’

আমি থমকে দাঁড়াই। আমি কিভাবে বলবে আমার অস্বস্তি হচ্ছে? খানিক বাদে পূর্ব বোধহয় কিছু আন্দাজ করতে পারল। তাই সে বিরক্তি মিশ্রিত তপ্তশ্বাস ফেলে চিবিয়ে বললেন,

‘ স্টুপিড! ফোনটা এগিয়ে দেওয়ার জন্য ডাকছি তোমায়। উল্টোপাল্টা চিন্তা কেনো করো?’

প্রশান্তির শ্বাস ফেলে আমি লজ্জায় নতজানু হই। ইশ! কি কি ভাবছিলাম আমি। পূর্বের আমার মনোবস্থা বুঝে যাওয়াতে লজ্জাটা ক্রমশ যেনো দ্বিগুণ হলো। স্বাভাবিক গতীতে এগিয়ে গিয়ে বেড সাইড টেবিল থেকে পূর্বের ফোন এগিয়ে দেই। ফোন এগিয়ে দেয়ার পর আলত আঙুলের ছোঁয়ায় ধাতস্থ হই পূর্বের বেশ জ্বর আছে এখনো শরীরে। চটজলদি অস্থির হয়ে বলি,

‘ আপনার তো জ্বর এখনো অনেক। ঔষধ খাননি?’

পূর্ব ফোন স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখে তার স্বভাবরত রাশভারী কন্ঠে উত্তর দেয়,

‘ না। ‘

‘ কেনো? ‘

‘ আমার জ্বর এমনিই কমে যাবে। তুমি নিজের রুমে যাও। ‘

হটাৎ অপমানিত বোধ হলো। ফুঁসে ওঠে আঁড়চোখে তাকাতেই স্বরণ হলো এই লোকের কথার ধরণ সম্পর্কে। পূর্ব প্রয়াসই এভাবেই কথা বলে। খোঁচা মেরে! আজ অব্দি দেখিনি পূর্ব কারো সাথে রাশভারী কন্ঠ ছাড়া নম্র, স্বাভাবিক স্বরে কথা বলেছে।

‘ দাঁড়িয়ে আছো কেনো?’

হকচকিয়ে আমি পূর্বের পানে তাকাই। অতঃপর পিছন ফিরে দরজার কাছে আসতেই দরজা বাহির থেকে লক দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম ! দুই একবার ধাক্কাধাক্কি করেও বিশেষ কোনো লাভ হয়না। পূর্ব বিরক্তি চাহনি নিক্ষেপ করে আমার সকল কার্যক্রম যে মৌন রূপে দেখছে তা বেশ বুঝতে পারছি। পরিশেষে সে ধৈর্যের বাধ ভেঙে বলল,

‘ কি হয়েছে? দরজা ধাক্কাধাক্কি করছো কেনো?’

আমি পিছন তাকিয়ে বিরস মুখে বলল,

‘ দরজা মেবি লক হয়ে গিয়েছে। এই দরজাটায় একটু প্রবলেম আছে। পুরোপুরি লাগালে অটোমেটিক লক হয়ে যায়। ‘

পূর্ব এবার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। চোখ বন্ধ করে নিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে রইল। নিজ স্বভাবরত কন্ঠে বললেন,

‘ এখানে এসে বসো। এতো রাতে কাকে ডাকাডাকি করবে?সবাই নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত আজ! ‘

খানিক সম্মতি জানাই।তবে গহীনে আমি বিষাদ মনে কুপোকাত। যা চাইছিলাম না, তাই কাকতালীয় ভাবে ঘটলো আমার সাথে। ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে পূর্ব এবং আমার মাঝে বেশ ব্যাবধান বজায় রেখে এক কোনায় বসে পড়ি। অতঃপর সময় পার হতে গোঙানির সুর কর্ণপাত হয় আমার। চট করে পূর্ণ দৃষ্টি পূর্বের মাঝে আবদ্ধ করতেই দৃশ্যমান হয় তিনি তার দু’হাত দ্বারা মাথা চেপে ধরে মৃদু স্বরে কিছু বলছেন।

হতভম্ব হয়ে চিন্তিত চাহনি নিক্ষেপ করার এক পর্যায়ে বিশাল সঙ্কোচকে দূরে ঠেলে পূর্বের খানিক কাছে গিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বললাম,

‘ আপনি ঠিক আছেন? ‘

পূর্ব জবাব দিলো না। পিটপিট করে তাকিয়ে ব্যাথাতুর কন্ঠে বললেন,

‘ মাথা ব্যাথা করছে একটু। তাছাড়া ঠিক আছি!’

অতঃপর নিশ্চুপতা! পূর্ব আর একবারও কোনো শব্দ করলেন না। তবে তার ফর্সাটে মুখ কেমন শুকিয়ে আসছে। অসুস্থতার প্রমাণ তার মুখশ্রী প্রমানিত করছে। হুট করেই সকল জরতা পিছু ফেলে তার দিকে এগিয়ে যাই। আলত করে একহাত তার কপালে রাখতেই সে চমকে বদ্ধ নেত্রপল্লব উন্মুক্ত করে। আমার দিকে আশ্চর্য ভঙ্গিতে তাকিয়ে ফের নেত্রপল্লব বন্ধ করে নিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,

‘ আমার সেবা করে নিজে অসুস্থ হওয়ার কোনো দরকার নেই। বেশি রাত জাগলে তার মাথা ব্যাথা করে এটা মনে থাকা উচিত! ‘

বিষ্ফোরিত দৃষ্টিতে পূর্বের দিকে তাকিয়ে আছি। এই লোক জানলো কিভাবে রাতের বেলা বেশিক্ষণ জেগে থাকলে আমার মাথা ব্যাথা করে?

________________________

সকাল হতেই পূর্বের বাবা, মা জরুরি কাজ থাকায় ঢাকার বাহিরে চলে যায়।পূর্ব এখনো আমাদের বাসায় ঘুমে মগ্ন! আমি বিরস মুখে বারংবার আম্মুর দিকে দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করার পরও আম্মু তাতে ভাবলেশহীন ভাবে নিজের কাজ করে যাচ্ছে। পরিশেষে ব্যাকুল হয়ে বলি,

‘ আম্মু প্লিজ আমি পূর্বের সাথে মেডিকেল যাবোনা। সবাই আমাদের একসাথে দেখলে কি বলবে বলো তো? পূর্ব আমার টিচার হয় আম্মু যতই বিয়ে হোক না কেনো আমাদের। এটা তো আর মেডিকেলে কেও জানেনা। ‘

আম্মু ব্যাস্ততার ভঙ্গিতে বলল,

‘ কলেজের সবাই অলরেডি জেনে গিয়েছে। পূর্বের বাবা, তোর শশুর সবাইকে বলে ফেলেছে। সবাইকে বলতে টিচারদের। তাদের থেকেই আস্তে আস্তে পুরো মেডিকেল কলেজে ছড়িয়ে পড়েছে তোদের কথা। ‘

মুখশ্রী পাংশুটে আকার ধারণ করে বিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। কলেজে যাওয়ার পর কি হবে কে জানে?টিচারকে বিয়ে করেছি! নিশ্চিত এ নিয়ে পুরো কলেজে সমলাচোনা তৈরি হবে। কিছু খোঁচা মারা স্টুডেন্ট খোঁচা দিতে শুরু করবে। সবথেকে বড় কথা সমাজ অতি বিশ্রী কথা রটিয়ে ছাড়বে। টিচার বিয়ে করেছে স্টুডেন্ট কে! নিশ্চিত তারা চুপ থাকবে না। আফটার অল বাঙালিদের সমাজ এটা।
আম্মুরও হটাৎ করে পূর্বের সাথে আমায় কলেজ পাঠানোর রিজনটা বোধহয় এটাই। পূর্ব পাশে থাকলে কেও ‘টু’ শব্দ অব্দি করতে পারে না। কিন্তু পূর্ব পাশ হতে চলে যাওয়ার পর?তখন কি করে সামাল দিবো?

.
পূর্ব ঘুম থেকে ওঠার পর আম্মু তাকে জানালেন আমাকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার কথা। পূর্ব কোনো রূপ ভনিতা ছাড়া আলত হেঁসে স্বীকৃত জানালেন তিনি আমায় তার সঙ্গে নিয়ে যাবেন। ক্লাস ৭ টা থেকে শুরু হলেও ৬ টা বাজেই বের হতে হচ্ছে পূর্বের রোগী দেখার তাড়া থাকায়। আম্মুর সাথে একান্ত কিছুক্ষন কথা বলার পর পূর্ব এসে ড্রাইভিং সিটে বসলেন।আমি তার পূর্বেই ফ্রন্টসিটে বসে পড়েছিলাম। গাড়ি স্টার্ট না দেয়ায় পূর্বের পানে অবলোকন করার পর থতমত খেয়ে যাই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে। আমি কিছু বলার আগেই তিনি বললেন,

‘ ফ্রন্টসিটে বসে সিটবেল্ট না লাগিয়ে নিজেকে প্রতিবার ডাফার প্রমাণিত করতে ভালো লাগে তোমার? ‘

বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে তাকাতেই পূর্ব বাঁকা হাসে! আমার দৃষ্টির পরোয়া না করে সে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে তাড়া দেয় সিটবেল্ট লাগানোর জন্য। আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে এখনো বিষ্ময়ের রেশ কাটাতে পারিনি। সে আমার ব্যাক্তিগত অভ্যাসগুলো সম্পর্কে অবগত হলেন কি করে?হাউ?
.

গাড়ি কিছু দূর অব্দি যেতেই আমি আমতা আমতা করে পূর্বকে জিজ্ঞেস করলাম,

‘ শরীর কেমন এখন আপনার?’

দু’সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর পূর্ব ফিচেল কন্ঠে বললেন,

‘ ভালো। কাল রাতে কতক্ষণ অব্দি জেগে ছিলে?’

‘ বেশিক্ষণ না। আপনি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর-পরই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ‘

পূর্ব আর কিছু বলল না। আমি তা দেখে নিঃশব্দে সিটে মাথা এলিয়ে চারপাশ দেখায় মত্ত হই! সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছতেই গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাম দিকে কাত হওয়ার পর হটাৎ পূর্ব বললেন,

‘ ওয়েট! এতো তাড়া কিসের তোমার?’

আমি হতভম্ব হয়ে বলি, ‘ এসে পড়েছি তো। ‘

‘ সেটা আমিও জানি। ‘

পূর্বের কথা মতোন চুপ করে বসে থাকাকালীন সে গাড়ি থেকে নেমে এসে আমার পাশের গাড়ির দরজা খুলে দেয়। বিশাল চমকে তাকাতেই পূর্ব নেত্র দ্বারা ইশারা করে নামতে বলল। আমি কোনোমতে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি! অবাকের সীমারেখা যেনো মিটছেই না। এ যেনো রীতিমতো এক নতুন পূর্বকে ক্ষনে ক্ষনে আবিস্কার করছি।

গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ানোর পর খেয়াল হলো পুরো মেডিকেল কলেজের সকলে আমাদের দু’জনের দিকেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। পিয়ন থেকে শুরু করে সিনিয়র ডাক্তার, টিচার্স, স্টুডেন্ট সকলে!অস্বস্তিতে নতজানু হয়ে আঁড়চোখে পূর্বের পানে অবলোকন করতে তাকে স্বাভাবিক দেখা গেলো। সে হুট করে আমার একহাত আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। মাঝেপথে কেও কেও ফিসফিস করলেও সামনে এসে পূর্বকে মুখোমুখি জিগ্যেস করার মতোন সাহস কারো হলো না। পরিশেষে পূর্বের সিনিয়র একজন ডাক্তার এসে বললেন,

‘ দোলের সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে শুনলাম। কাল তোমার বাবা জানালো। নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা রইল পূর্ব। ‘

পূর্ব তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে ম্লান হাসি বিনিময় করলেন। অতঃপর সেই ডাক্তার প্রস্থান করার পর তার বান্ধবী হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল,

‘ মেয়েটা কে পূর্ব? তুই পুরো কলেজের সামনে ওর হাত ধরে আছিস কেনো?’

পূর্ব ভনিতা ছাড়া রাশভারী কন্ঠে বললেন,

‘সি ইজ মাই ওয়াইফ! মিসেস.ফায়াজ আবরার পূর্ব। ‘

ফারাহ্ আপু দ্বিতীয়বার কোনো কথা বলল না। তার মুখশ্রীতে আহত দৃষ্টি খেয়াল করে আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম তার এরূপ দৃষ্টির কারণ। ক্লাসের সামনে আসার পর জরতা নিয়ে পূর্বকে উদ্দেশ্য করে বলি,

‘ আমার হা..হাত..’

ছিটকে হাত ছেড়ে দেয় সে! দু’হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি দিয়ে কাঠ কাঠ কন্ঠে বলল,

‘ হাত ধরার ইচ্ছে ছিলো না। জাষ্ট সবাইকে জানানোর জন্য তুমি আমার ওয়াইফ এন্ড উই এক্সেপ্ট দিস ম্যারেজ, দ্যাট’স ইট! ক্লাসে কেও কোনোরকম ডিস্টার্ব করলে আমায় কল করবে। নিজের খেয়াল রেখো। ‘

পূর্ব কথার সমাপ্তি টেনে দিক-বেদিক না দেখে নিজের চেম্বারের দিকে যেতে থাকেন।তার যাওয়ার পানে এক নজর অবলোকন করে পাথর মূর্তির ন্যায় তাকিয়ে থাকি। সবকিছু যেনো আমার ভাবনার থেকে উল্টো ঘটছে! অপরিচিত পূর্ব আবিষ্কার করছি বারংবার। এ কোন পূর্ব?

ক্লাসে যেতেই নীরব, আদ্রাফ দুজন মিলে হুট করে বিয়ে করার কারণে স্লাং ওয়ার্ড ইউজ করে ভাষণ ছুড়লো।
পরিশেষে বিরস মুখে অরিন বলল, ‘ সেটা ছাড় আদ্রাফ। দোল যে এতো হ্যান্ডসাম একটা বর পেয়ে গেলো এখন আমার কি হবে?আমি তো পূর্ব স্যাররে্ নিজের ফুটবল টিমের লিডার বানায় ফেলছিলাম মনে মনে। ‘

তিনজনের বিদঘুটে মতবাদে কান না দিয়ে নিজের কাজে মত্ত হই আমি! পূর্বের নতুন রূপ ক্ষনে ক্ষনে উন্মাদে পরিণত করছে আমায়।
চিন্তামগ্ন কালে ফোন টুংটাং ম্যাসেজ আসার শব্দ কর্ণধারে এসে প্রতিফলিত হয়। ম্যাসেজটা পূর্বের নাম্বার থেকে এসেছে। ম্যাসেজ ওপেন করার পর মূর্হতেই ভড়কে যাই!

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here