মেঘের ওপর আকাশ উড়ে পর্ব -০৭

#মেঘের_ওপর_আকাশ_উড়ে
#Part_07
#Writer_NOVA

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নিলেই সিয়ামের সাথে দেখা হলো তুলির। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকে তারা। তুলি স্কুল ড্রেস পরে দুই কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেণী নাচিয়ে নিচে নামছে। সিয়ামও কলেজের জন্য তৈরি হয়ে নিচে নেমেছিলো। প্রাক্টিক্যাল খাতা নেওয়ার কথা মনে ছিলো না বলে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। তুলির পথ আটকে সিয়াম বললো,

— কি হয়েছে তোর তুলতুলি?

— কিছু না সিয়াম ভাইয়া।

— তাহলে আমাকে এমন এড়িয়ে চলিস কেন?

— পথ ছাড়ো, আমার স্কুলে দেরী হয়ে যাচ্ছে।

— আমার কথার উত্তর না দিয়ে তুই কোথাও যেতে পারবি না।

— সিয়াম ভাইয়া আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না। দয়া করে রাস্তা ছাড়ো।

— বল না কি হয়েছে? আমাকে এতো এড়িয়ে চলিস কেন? কি করেছি আমি?

— কেন তুমি জানো না?

তুলি কন্ঠে রাগী ভাব রেখে কথাটা বললো।সিয়াম ভ্রু কুঁচকে ওকে জিজ্ঞেস করলো,

— কি জানবো?

— কিছু না সরো সিয়াম ভাইয়া।

— কি হয়েছে তা না বলে তুই কিছুতেই যেতে পারবি না।

— আমাকে কেন ডিস্টার্ব করছো তুমি?

— আমার ভালো লাগে তাই।

সিয়াম কথাটা বলে তুলির বেণী জোরে টান দিলো। তুলি ব্যাথায় আহ বলে চেচিয়ে উঠলো। তবে সেও কম নয়। এগিয়ে এসে সিয়ামের বাহু খামচি দিয়ে ধরলো। সিয়াম ওর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওর মাথায় ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। ওদের দুজনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। সিয়ামের মা নাসিমা বেগম সবেমাত্র ধোয়া কাপড়চোপড়ের বালতি নিয়ে দরজা খুলে বের হয়েছিলো ছাদে শুকাতে দিবে বলে। ওদের দুজনকে মারামারি করতে দেখে চেচিয়ে বললো,

— এই তোরা কি করছিস? সিয়াম, তুলি শুরুটা করেছিস কি? থাম বলছি।

তুলি, সিয়াম দুজনে মারামারি বন্ধ করে নাসিমা বেগমের দিকে তাকালো। তুলি কাদো কাদো ফেস করে বিচারের ঝুলি খুলে বসলো।

— দেখো না আন্টি সিয়াম ভাইয়া আমাকে শুধু শুধু মারছে।

নাসিমা বেগম চোখ পাকিয়ে সিয়ামের দিকে তাকালো। সিয়াম ভয় না পেয়ে সাহসী গলায় বললো,

— ও আমাকে খামচি মেরেছে।

তুলি প্রতিবাদী গলায় বললো,
— তুমি আগে আমার বেণী ধরে টান দিয়েছো সিয়াম ভাইয়া। আমার কোন দোষ নেই।

— সব দোষ তোর। তুই আমাকে এড়িয়ে কেন চলবি?

নাসিমা বেগম ছেলেকে জোরে ধমক দিয়ে বললো,
— দিনকে দিন হচ্ছিসটা কি? একদম বোনের কার্বন কপি। বোনের নাম উজ্জ্বল করছিস। ওর কাছে মাফ চা। আদর-যত্ন দিয়ে ষাঁড় পালছি আমি। যা বলছি তাই কর সিয়াম।

সিয়াম গাল ফুলিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বললো,
— আমি মাফ চাইবো না।

নাসিমা বেগম রাগী গলায় বললো,
— তাহলে আমার মার থেকে তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। জলদী সরি বল।

তুলি সিয়ামের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলো।মনে মনে সে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে। মায়ের চোখ পাকানো আর রাগী গলা শুনে সিয়াম মুখ গোমড়া করে বললো,

— সরি!

তুলি মুখটাকে বাঁকিয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,
— ইট’স ওকে।

নাসিমা বেগম তাড়া দিয়ে বললো,
— এবার চুপচাপ দুজন দুজনার স্কুল,কলেজে যাবি। দুটোকে যেন আমি মুরগীর মতো ঠোকরা-ঠুকরি করতে না দেখি।

মায়ের কথা শেষ হতেই সিয়াম তুলির মাথায় আবারো জোরে একটা থাপ্পড় মেরে ভৌ দৌড় দিলো। তুলি চোখ বন্ধ করে চেচিয়ে বললো,

— সিয়াম ভাইয়া, আজকে তোমার খবর আছে।

সাথে সাথে তুলিও সিয়ামের পেছন পেছন দৌড় দিলো। নাসিমা বেগম বড় করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো,

— কাদের বুঝালাম আমি? যেই লাউ সেই কদু। এরা বড় হবে কবে? এদের কথা তো বাদই দিলাম। বড় মেয়েটা তো বিয়ের পরও বদলালো না। আল্লাহ জানে ভবিষ্যতে কি করবে?

বিরবির করে কথা বলতে বলতে বালতি নিয়ে ছাদের দিকে রওনা দিলেন তিনি। সেখানে থেকে ফিরে দুপুরের খাবার রান্না করতে হবে। বাসায় মেয়ের জামাই আছে। সবকিছু ঠিকঠাক হওয়া চাই।জামাইয়ের কোন অযত্ন তিনি হতে দিতে পারে না।

💞💞💞

— সাবা আমাকে এক কাপ চা করে দে না?

মৃদুলের কথা শুনে কপাল কুঁচকে ভ্রু উঁচু করে তাকালো সাবা। একটু আগেই মৃদুল বাইরে থেকে বাসায় ফিরছে। সাবা সোফায় বসে মনোযোগ সহকারে টিভি দেখছে। মৃদুল সাবার দিক থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আবার বললো,

— প্লিজ এক কাপ চা বানিয়ে দে না।

— আমি পারবো না। তোরটা তুই বানিয়ে খা।

— প্লিজ দে না। আমার মাথাটা কেমন জানি করছে।

সাবা উত্তর দেওয়ার আগে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নাসিমা বেগম রেগে বললেন,

— তোর সমস্যা কি সাবা? ছেলেটা কখন থেকে চা খেতে চাইছে আর তুই হেয়ালি করে যাচ্ছিস?

নাসিমা বেগম মাত্রই টিভির রুম ক্রস করে নিজের রুমে যাওয়ার সময় দুজনের কথোপকথন শুনে দরজার দিকে এগিয়ে এসেছেন। সাবা মুখ গোমড়া করে বললো,

— আমি পারবো না। তোমার মন চাইলে তোমার আদরের মেয়ের জামাইকে তুমি চা বানিয়ে দেও।

— জলদী গিয়ে পানি বসা। আমার যেন দ্বিতীয়বার বলতে না হয়।

সাবা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো। সে দিকে তাকিয়ে মৃদুল বললো,

— থাক আম্মু লাগবে না।

নাসিমা বেগম মৃদুলকে থামিয়ে বললো,
— তুমি চুপ থাকো। ও নিজ হাতে তোমার জন্য চা বানাবে। সাবা তুই কি উঠবি? নাকি ঝাড়ু নিয়ে আসবো?

সাবা রাগে গজগজ করতে করতে কিচেনের দিকে ছুটলো। মৃদুল মন খারাপ করে বললো,

— কি দরকার ছিলো এমন করার আম্মু?

— দরকার ছিলো বাবা। ওকে তো স্বামীর খেদমত করা শিখতে হবে। কিচ্ছু বুঝে না। বুঝতেও চায় না। আমি যদি এখন শাসন করে না শিখিয়ে দেই তাহলে পরবর্তীতে তোমাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হবে।আমি মা হয়ে তা হতে দিতে পারি না। ওর হয়ে আমি তোমার কাছে মাফ চাইছি বাবা। মেয়েটা আমার এখনো বাচ্চাই রয়ে গেছে। তুমি ওকে একটু ধৈর্য্য সহকারে বুঝিয়ে দিও। তাহলে ও বুঝতে পারবে।

— আপনি কোন চিন্তা করবেন না আম্মু। আমি আছি তো। আমি থাকতে ওর কোন সমস্যা হবে না।

— বাঁচালে তুমি। এর জন্য তোমাকে এই পাগলী মেয়ের জন্য পছন্দ করেছে ওর বাবা।

— বাবা কোথায়?

— গার্মেন্টসে আছে। আজ নাকি আসতে দেরী হবে।তুমি চুপচাপ বসে থাকো। মাথাব্যাথার বাম দিবো?

— না আম্মু দরকার নেই। চা খেলে ভালো লাগবে।

— আচ্ছা থাকো তাহলে। কিছু লাগলে আমাকে বলো।

— জ্বি নিশ্চয়ই।

নাসিমা বেগম চলে গেলেন। সে চলে যেতেই মৃদুলের ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি দিলো। মৃদুলের একটুও মাথাব্যথা করছে না। এগুলো সব চালাকি ছিলো। সাবাকে আরমচে টিভি দেখতে ওর সহ্য হচ্ছিলো না।ওকে জ্বালাতে ইচ্ছে করছিলো। সাবার আরামটা ওর সহ্য হচ্ছিলো না বলেই মনে মনে এই ফন্দি এঁটেছে। পর্দার আড়ালে শ্বাশুড়িকে এদিকে আসতে দেখে সাবাকে চা বানানোর ফরমায়েশ দিলো। মৃদুল ভালো করে জানে সাবা রাজী হবে না। তাতে ওর শাশুড়ী চটে যাবে।বকা খেয়ে শেষে সাবাকে চা বানাতে যেতে হবেই। মৃদুল সোফার ওপর লম্বা করে আধশোয়া হয়ে শুয়ে খুশিতে পা নাড়াতে লাগলো।

অপরদিকে সাবা বিরবির করে বকে মৃদুলের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করছে। চায়ে চামচ দিয়ে চিনি মিলাতে মিলাতে বললো,

— আমাকে জ্বালানোর জন্য তুই এমন করেছিস তা আমি ভালো করেই জানি। দেখ আমি এবার কি করি?

মনে মনে শয়তানি হাসি দিলো সাবা। লিকুইড দুধের প্যাকেটটা হাতে নিয়েও রেখে দিলো। রং চায়ের মধ্যে অন্য কিছু মিশাবে। মিটসেফ থেকে গুড়া মরিচের ডিব্বাটা নিয়ে দুই চামচ মিশিয়ে দিলো। তারপর খুশিমনে চায়ের কাপ নিয়ে রুমে চলে এলো।মৃদুলের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো,

— নে তোর চা।

— হুম টেবিলে রাখ।

সাবা চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রেখে মৃদুলের পাশে বসলো। মৃদুল আজকের সংবাদপত্রটা নেড়েচেড়ে হেডলাইনগুলো পড়ছিলো। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে এক ভ্রু উঁচু করে সাবাকে জিজ্ঞেস করলো,

— কিছু মিশাসনি তো?

— এতো সন্দেহ থাকলে খেতে হবে না।

সাবা মুখটাকে সিরায়াস ভঙ্গিতে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। হাসলে মৃদুল বুঝে যাবে। মৃদুল চায়ের কাপটা এদিক সেদিক ঘুরিয়ে দেখছে। ওর কাছে চায়ের রংটা ভালো ঠেকছে না। পরীক্ষা করার জন্য ছোট করে এক চুমুক দিতেই ওর ঠোঁট দুটো জ্বালা আরম্ভ করলো।সে আরেকটা বোকামি করলো। মুখে থাকা চা নিচে না ফেলে গিলে ফেললো। কাপ রেখে সাবার ওড়না দিয়ে জিহ্বা, ঠোঁট ঘষতে লাগলো। জিহ্বা, ঠোঁট ঝালে জ্বলে যাচ্ছে। সে মনে মনে ভেবেছিলো চায়ে চুমুক দিবে না। তবুও কেন যে দিয়ে ফেললো তাই বুঝতে পারছে না।এখন তাতে আফসোস হচ্ছে। অন্যদিকে সাবা হাসতে হাসতে সোফায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। পেটে হাত দিয়ে হাসতে হাসতেই বললো,

— একদম ঠিক হয়েছে। এবার বুঝ ঠেলা। সকালে আমার কফিতে থুথু মিশিশেছিলি তার প্রতিশোধ।

— পানি, পানি! পানি দে সাইব্বানি।

— একটুও না। তোরটা তুই খেয়ে আয়।

— ঝাল🥵।

— কেমন লাগছে চান্দু? আরো লাগবে আমার সাথে?

মৃদুলের চোখ দিয়ে পানি পরছে। ঠোঁট থেকে শুরু করে গলা অব্দি ঝালে জ্বলছে। দুই হাত নাড়িয়ে লাফাচ্ছে সে। তা দেখে সাবা ঘর কাঁপিয়ে হাসছে। মৃদুল আবারো বললো,

— একটু চিনি এনে দে।

— একটুও না।

— প্লিজ দে।

— দিবো না।

— দিবি না?

— একটুও দিবো না।

—ওকে তাহলে আমারটা আমি নিয়ে নিচ্ছি।

— হুম যা।

মৃদুল এগিয়ে এসে এক হাতে কোমড় জড়িয়ে ধরে, আরেক হাতে চুলে ডুবিয়ে, সাবার অধর যুগল দখল করে নিলো। সাবা হকচকিয়ে গেলো। মৃদুল যে এমন কিছু করবে তা সে মোটেও ভাবেনি। সাবার চোখ দুটো চড়কগাছ। সে যে মৃদুলকে ধাক্কা দিয়ে সরাবে সেই ধ্যানেও নেই। মৃদুল আরো শক্ত করে কোমড় জড়িয়ে ধরে পরম যত্নে সাবার অধর যুগলে শাসন চালাতে লাগলো।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here