মেঘের পালক চাঁদের নোলক পর্ব -১৪

#মেঘের_পালক_চাঁদের_নোলক
#পর্ব_১৪
#অধির_রায়

আযানের ধ্বনি কর্ণধারে আসতেই তন্দ্রা কেটে যায় নিধির৷ কিন্তু কিছুতেই তন্দ্রা চোখের পাতা থেকে কাটছে না৷ এদিকে শাওনের বাহুতে বন্ধি হয়ে আছে৷ সবকিছুর উর্ধ্বে সালাত৷ মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন৷ তার মধ্যে এক ঘন্টা আল্লাহর পথে ব্যয় না করলে মুসলিম হিসেবে জীবন ব্যর্থ৷ আল্লাহকে ভয় করতে হবে৷ দুনিয়ায় হলো আখিরাতের শষ্যক্ষেত্র৷ দুনিয়ায় ভালো কাজ করলে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের শান্তিময় হবে৷ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। মানুষের উচিত আখিরাতের জন্য কিছু করা৷

শাওন চৌধুরীর বাহু অনেকটা সহজলভ্য করে আটকানো। নিধি শাওন চৌধুরীর দিকে ঘুরতেই শাওন চৌধুরীর মুখটা ভেসে উঠল৷ এলোমেলো কেশ৷ বলতে ইচ্ছা করছে ছেলে তোর এলোমেলো কেশ, আমায় করেছে পা/গ/ল৷ নিজের অজান্তেই লজ্জা পেয়ে গেল৷ বিভোর তন্দ্রায় মগ্ন৷ নিধি আস্তে করে শাওনকে ধারণা দিল৷ তবুও চোখের পাতা থেকে তন্দ্রা দূর হলো না৷ কি বলে ডাকবে বুঝতে পারছে না? নাকি ধাক্কায় দিয়ে যাবে। নিধি আর একটু জোরে ধাক্কা দিল। শাওন নড়েচড়ে উঠে৷ নিধি কোমল মায়াবী কন্ঠে বলল,

“ঘুমাতে হবে না৷ উঠেন একসাথে নামাজ পড়ব৷ তারপর না হয় ঘুমিয়ে নিবেন৷

শাওন চৌধুরী ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল,

“প্লিজ পিচ্চি একটু ঘুমাতে দাও৷ রাতে ঘুমাতে পারিনি। দুই নয়ন ভরে তোমায় দেখছি৷ কই স্বামীকে একটু আদর করবে? তা নয় ঘুমের বারোটা বাজাতে আসছে৷”

নিধি কর্কশ গলায় বলল,

“এখনই উঠবেন৷ নামাজ পড়ে আবার ঘুমাবেন৷ আপনাকে ঘুমাতে মানা করিনি৷ এক সাথে দু’জন নামাজ পড়ব৷ মুসলিম জাতির নামাজ গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়৷ নামাজ পড়লে মন ভালো হয়ে যায়।

শাওন আর ঘুমাতে পারল না৷ নিধি আদেশে উঠে পড়ল৷ নিধি বুঝতে পারল শাওনের প্রতি একটু অধিকারবোধ জন্ম নিয়েছে৷ আগে ছিলনা এমন অধিকার। তবে কি বিবাহের পবিত্র বন্ধন অধিকার দিয়েছে? অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
____________________

নিধির ক্লাস শুরু হয়ে গেছে৷ প্রথম থেকেই চলছে ভালো করার প্রবল ইচ্ছা৷ ইচ্ছা এবং আত্মবিশ্বাস মানুষকে সাফল্যের দুয়ারে নিয়ে আসে৷ নিধিকে আগের মতোই শাওন চৌধুরী মেডিকেল দিয়ে যান৷ আসার সময় নিধি রিক্সা ধরে চলে আসে৷ এখন নিধির অনেক বন্ধু হয়ে গেছে৷ তাদের সাথেই হেঁটে হেঁটে নিধি বাড়ি ফিরছে৷ বন্ধুদের মাঝে দু’জন ছেলে বন্ধু৷ আর নিধি ছেলের বন্ধু দু’জনের সাথেই ফিরছে৷ কারণ তাদের বাসা শাওন চৌধুরীর বাসার পাশাপাশি। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা নামে৷ শাওন চৌধুরী অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে নিধিকে নিতে যাচ্ছি। ইচ্ছা ছিল নিধিকে নিয়ে টিএসসিতে সময় কাটাবে৷ ছেলেদের সাথে দেখে শাওনের মন খারাপ হয়ে যায়৷ সাথে নিধির উপর অনেক রাগ৷ ইচ্ছাটা ধামাচাপা পড়ে। শাওন চৌধুরী নিধির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শাওনকে দেখে নিধি শুকনো ঢুক গিলে৷ শাওন ক্ষোভ নিয়ে বলল,

“নিধি এখানে তোমার বয়ফ্রেন্ড কোনটা? যে ছেলে তোমার হাত ধরেছে সেই নিশ্চয় তোমার বয়ফ্রেন্ড অন্যজন বেস্ট ফ্রেন্ড।”

নিধি ভয়ে ভয়ে বলল,

“তারা আমার ভালো বন্ধু৷ দু’জনই বেস্টফ্রেন্ড। আমার কোন বয়ফ্রেন্ড নেই৷”

শাওন কিছু বলল না৷ নিধি তাদের বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসল৷ দু’জনের মাঝে কোন কথা নেই৷ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে৷ বাড়িতে আসার পর শাওন নিধির সাথে একটা কথাও বলেনি৷ নিধি শাওনের অবহেলা মেনে নিতে পারছে না৷ খুব খারাপ লাগছে৷ আজ শাওন নিধির রুমে আসেনি৷ ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁই ছুঁই। রাতের শেষ প্রহর শুরু তবুও দেখা মিলল না শাওনের। এখনও শাওন আসেনি। লোকটা তো নিধির সাথেই ঘুমান৷ আজ কেন এখনও আসছেন না? নিধি নিজেই শাওন চৌধুরীর রুমের দিকে কদম ফেলল। শাওন বারান্দায় বসে এক মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে৷ নিধি ক্ষোভ সহিত রাগ নিয়ে বলল,

“সমস্যা কি? এখানে বসে বসে কি ভাবছেন? আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে৷ আপনি রুমে আসেননি কেন? আপনাকে ছাড়া আমার ঘুম হয়না৷”

শাওন চৌধুরী যেন এমনটাই আশা করেছিল নিধির কাছে৷ নিধি কি তার কাছে আসবে? আজও কি নিধি এ সম্পর্কে খুশী? শাওন নিজের উত্তর পেয়ে যায়৷ হৃদয়ে বয়ে যায় আনন্দের অনুভূতি। মুচকি হেঁসে জবাব দিল,

“বাহ! পিচ্চি রাগ করতে জানে। ভালোবাসার কথা বলতে পারে না৷ রাগ নিয়ে হুকুম করতে থাকে। বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে কথা বলতে পারে। ধ্বনিতে ঝিলের জলের ধ্বনি ভেসে আসে৷ কিন্তু স্বামীর সাথে কোনদিন ভালো করে কথা বলেনা৷ আবার স্বামী ছাড়া ঘুম আসেনা৷ বন্ধুদের বুকে ঘুমালেই পারো৷ আমার কি কোন দরকার আছে? আমার তো কোন জায়গায় নেই পিচ্চির মনে।”

শাওনের কথা নিধির রাগ দ্বিগুণ হলো৷ তেড়ে আসে শাওনের দিকে৷ তার আগেই শাওন নিধির হাত ধরে নিজের কোলে বসায়৷ নিধি রাগ নিয়ে বলল,

“আমার বন্ধু থাকতে পারে না! আপনি কি আমাকে সন্দেহ করছেন? আমার বর থাকতে আমি তাদের সাথে ঘুমাতে যাব কেন? আর বর না থাকলেই কেন যাব? তাদের বুকে একমাত্র জায়গা তাদের বউয়ের৷ চলার পথে দুই একজন ছেলে বন্ধু থাকবে৷ আমি কি কখনও জানতে চেয়েছি, আপনার পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মেয়ে কেন? ছেলে রাখলেন না কেন? কেন আমার বেলায় এমন করেন? তারা শুধু আমার ভালো বন্ধু৷ তাদের নিয়ে খারাপ কথা বললে আমি আপনাকে খু’ন করে ফেলব৷”

শাওনের বুঝতে অসুবিধা হলো না নিধি খুব রেগে আছে৷ তার রাগের কারণ একটু অবহেলা এবং বন্ধুদের সাথে তুলনা করা৷ ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে সামান্য অবহেলা অন্ধকার নিয়ে আসে। নিধির ছেলেবন্ধু আছে তা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই৷ মাথা ব্যথা ছিল একটা ছেলে নিধির হাত ধরেছিল৷ যা মেনে নিতে পারিনি শাওনের মস্তিষ্কের নিউরন। তাই নিজের মনকে দূরে করে শান্ত রেখেছে৷ রাগের মাথায় কিছু করে ফেললে পিচ্চির মনে খারাপ প্রভাব পড়বে। শাওনের জবাব না পেয়ে নিধির আরও রাগ হলো। কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই শাওন নিধির ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটে আবদ্ধ করে নেয়৷ এমন ঘটনা ঘটতে পারি নিধি ভাবতেই পারিনি৷ নিমিষেই নিধির রাগ জলে পরিণত হয়৷ মনের মাঝে সুপ্ত শীতল হাওয়া বয়ে গেল৷ আঁখি বুঝে নিল৷ শাওন ঠোঁট জোড়া ছেড়ে দিতেই নিধি শাওনের বুকে মুখ লুকাল৷ শাওনের মুখের দিকে তাকাতেই অনেক লজ্জা করছে৷ শাওন নিধিকে লজ্জা দেওয়ার জন্য বলে উঠল,

“মুগ্ধ আমার থেকে কিছু মুহুর্তের ছোট হয়েও বাবা হয়ে যাবে কিছু দিনের মাঝে৷ আমি কবে বাবা হবো? আমি কি আদৌও বাবা ডাক শুনতে পারব? আমাদের ঘর আলো করে কবে আসবে ভালোবাসার প্রতীক।”

নিধি কোন জবাব দিল না৷ জবাব হিসেবে শাওনের বুকে কা”ম”ড় বসিয়ে দিল৷ শাওন বুঝতে পারল খুবই রেগে আছে সাথে লজ্জা। কিছু না বলে নিধিকে পাঁজা কোলা করে রুমে নিয়ে আসে৷ নিধিকে বিছানায় শুইয়ে দিল৷ সাথে সাথে নিধি দুই হাত দিয়ে মুখ ঠেকে নিল৷ শাওনের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি। শাওন নিধির মুখ থেকে হাত সরিয়ে দিল৷ নিধি কাঁপা কাঁপা ঠোঁটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নিধি শাওনের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে আঁখি বন্ধ করে ফেলে৷ শাওন নিধির কপালে আলতো করে ঠোঁট জোড়া স্পর্শ করে অট্টাহাসি দিয়ে বলল,

“ভয়ের কিছু নেই লজ্জাবতী লতা৷ আমি বাঘ নয়৷ আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব না৷ আমি যে আমার লজ্জাবতীকে খুব ভালোবাসি। এমন কোন কাজ করব না যার জন্য তোমার ক্যারিয়ারে সমস্যা হয়৷”

নিধি শাওন চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে মনে মনে বলল,

“আপনি আমার চিন্তার থেকেও অনেক ভালো৷ তবুও কেন জানি আপনার অতীত আমার সামনে বার বার আসে? চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই হিংসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া রুপ৷ আপনার সাথে কেন খারাপ ভাবে পরিচয় হলো৷ আল্লাহ কেন আপনার সাথে আমাকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দিল৷ যার জন্য বারবার নিজেকে ছোট মনে হয়৷”
______________________

হসপিটালের করিডরে বসে তসবিহ পাঠ করছেন শায়লা চৌধুরী এবং মাধবীর মা৷ আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া মাধবী যেন সুস্থ থাকে। আল্লাহ যেন মাধবীকে সুস্থ রাখেন৷
মুগ্ধ হসপিটালের সামনে মসজিদে নামাজ পড়ছেন। মাধবীর জন্য মুগ্ধ নামাজ, রোজা সব রেখেছেন৷ যেন মহান আল্লাহ তায়ালা মাধবী এবং তার অনাগত সন্তানকে ভালো রাখে৷ মাধবীর সকল কাজে পাশে ছিল৷ তাদের দেখে বলতে ইচ্ছা করে প্রতিটি মেয়ে যেন এমন স্বামী পায়৷ মাধবীও মুগ্ধকে অনেক ভালোবাসে৷ কখন কি লাগবে সবকিছু দেখাশুনা করছে শাওন। অপারেশন থিয়েটার থেকে ডক্টর বের হয়ে হাসিমুখে বললেন,

“মা ও সন্তান দু’জনই ভালো আছে৷ আপনারা কিছুক্ষন পরেই রোগীর সাথে দেখা করতে পারবেন। রোগীকে অবজারভেশন শিফট করা হবে৷ তখন দেখা করতে পারবেন৷”

সকলের মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল৷ দুইজন নার্স দুইটা বাচ্চা নিয়ে আসেন৷ সবার চোখ আকাশপ্রাণে৷ মুগ্ধর জমজ ছেলে বাচ্চা হয়েছে৷ হাসি যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল৷ একটা বাচ্চা শায়লা চৌধুরীর কোলে দিলেন। অন্যটা নিধির মায়ের কোলে দিলেন৷ খুশিতে চোখ থেকে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মুগ্ধ দৌড়ে এসে তার দুই ছেলেই কোলে তুলে নিল৷ কপালে ঠোঁট স্পর্শ করল৷

মাধবীর মেজর অপারেশন হওয়ায় সুস্থ হতে একটু সময় নিচ্ছে। সকলের আদরের হয়ে উঠেছে মাধবী এবং তাদের সন্তানরা৷ সবার মুখে ফুটেছে হাসির রেখা৷ বাড়িতে কাজ করা তিথিও অনেক খুশি৷ হসপিটাল থেকে বাড়িতে যায়না৷ সব সময় দুই বাবুকে কোলে নিয়ে থাকে৷ তার মনে জায়গা করে নিয়েছে নিষ্পাপ শিশু৷ নিষ্পাপ শিশুর দিকে তাকালেই ভালোবাসা জন্ম নেয়৷

আবার ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে শায়লা ভিলা৷ আজ মাধবীকে বাড়িতে নিয়ে আসা হচ্ছে৷ বাড়িতে মেহমানের আনাগোনা চলছে৷ অনেক মানুষ চলে আসছে নতুন সদস্যদের মুখ দেখতে৷ আজ তাদের নাম রাখা হবে৷ আল্লাহর নামে আকিকা করে তাদের নাম রাখা হবে৷ এতিমখানায় বাচ্চাদের জন্য পাঞ্জাবি এবং খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ বাড়ির আনাচে কানাচে খুশীর জোয়ার বয়ে যাচ্ছে৷ খুশীর জোয়ার দ্বিগুণ করছে নিষ্পাপ শিশুদের আগমন৷

চলবে…….

ভুলত্রুটিগুলো মার্জনীয় দৃষ্টিতে দেখবেন৷ পাঠকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো জমজ বাচ্চাদের নাম৷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here