রংধনুর রঙ কালো পর্ব ১

#রংধনুর_রঙ_কালো
১.

” যে আপনাকে খুন করতে চায় সে অপরিচিত কেউ নয়। বরং আপনার সবচেয়ে পরিচিত, সবচেয়ে কাছের মানুষ আপনার স্বামী, মি. ইলহান মাহদীই আপনাকে খুন করতে চাইছে। আমার কথা বিশ্বাস করুন অরিন!”
অরিন বুক পাজরে সুক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করলো। কিন্তু সেটা সামনে থাকা ব্যক্তিকে বুঝতে না দিয়ে তীক্ষ্ণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালো। অন্বয় সামান্য হেসে বললো,
” দেখুন, এইভাবে তাকাবেন না। আমাকে এক্সপ্লেইন করতে দিন। জানি বিষয়টা আপনার জন্য পেইনফুল। আমার নিজেরই বলতে কষ্ট হচ্ছে। প্রথমে আমিও আপনার মতো অবাক হয়েছিলাম..”
অন্বয়কে কথা শেষ করতে না দিয়েই অরিন উঠে দাঁড়ালো এবং দাঁত-মুখ খিচে বললো,
” এইটা বলার জন্যই কি আমাকে ডাকা হয়েছে? এতোদিনে এই ইনভেস্টিগেশন করেছেন আপনি? এখন আমার মনে হচ্ছে আপনার কাছে সাহায্য চাওয়াটাই সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।”
অন্বয় আশ্চর্য হয়ে গেল অরিনের রাগ দেখে। মেয়েটি পুরো কথা শোনার আগেই চেচিয়ে উঠছে। স্বামীর প্রতি বিশ্বাস থাকা ভালো কিন্তু অন্ধবিশ্বাস না। অন্বয় শান্ত-স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
” কাম ডাউন, আগেই এতো হাইপার হওয়ার কিছু নেই। আমাকে বলতে দিন। আমি জানি আপনি আপনার স্বামীকে প্রচন্ড ভালোবাসেন আর বিশ্বাস করেন। কিন্তু অরিন, এইটা টুয়েন্টি ওয়ান সেনচুরি।
আজ-কালকের যুগে বাবা-মা’র প্রতিও বিশ্বাস রাখা যায় না। সেই জায়গায় স্বামী! এমন অনেক কেইস দেখেছি যেখানে স্ত্রীদের কাছে হাসব্যান্ডরা ফেরেশতা সেজে থাকে। কিন্তু অপরাধের জগতে তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট জানোয়ার আর কেউ নেই।”
” এক্সকিউজ মি, হোয়াট ডু ইউ মিন?”
অরিনের চোখেমুখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। অন্বয় মুচকি হাসলো।
” বিশ্বাস ভালো, কিন্তু অন্ধবিশ্বাস না। আপনিই একমাত্র মহিলা যে টুয়েন্টি ওয়ান সেনচুরিতে এসেও হাসব্যান্ডকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন। এককথায় দেবতা ভেবে পূজো করেন।”
অন্বয়ের কটাক্ষ-বানে অরিন ক্ষোভে ফেটে উঠলো।
” আপনি এগুলো বলার কে? আমার স্বামীকে আমি পূজো করলেও আপনার তাতে কি?আপনি তার সম্পর্কে যা ইচ্ছা বানিয়ে বলবেন আর আমিও বিশ্বাস করবো? আপনি ভাবলেন কি করে?”
অরিন জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। আর কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে। অন্বয় ঠান্ডা কণ্ঠে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো,
” আমি জানি, আমি যা বলছি তা বিশ্বাসযোগ্য না। কিন্তু কিছু কিছু সত্যি আসলেই অবিশ্বাস্য হয়। সেই অবিশ্বাস্য সত্যিগুলো আমরা মেনে নিতে পারি না। হয়তোবা মানতেও চাই না। সত্যিটা জানার পর আমাদের মনে হয়, মিথ্যে নিয়েই তো ভালো ছিলাম। সত্যি উন্মোচন করতে কেনো গেলাম? এইটাও ঠিক সেরকমই একটা সত্যি।”
অন্বয়ের চোখে আত্মবিশ্বাস ঝলমল করছে। সে আগেও এই কথা বহুবার বলেছিল। কিন্তু তখন বলতো সন্দেহের বশে। এখন পুরো আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে শুরু করেছে। এটা উপলব্ধি করেই অরিন প্রায় স্তব্ধ হয়ে বসলো। অরিনের কাছে কথাটা জঘন্যতম অপবাদ।ইলহান খুন করতে চায়? তাও অরিনকে? যে মেয়েটিকে পাওয়ার জন্য সে একসময় পাগলের মতো তড়পেছে। নিজের জীবন দিয়ে হলেও অরিনের অপমানের প্রতিশোধ নিতে দ্বিধা করেনি। অরিনের ক্ষমা পাওয়ার জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করতে থামেনি। এইসব তো বিয়ের আগের ঘটনা। বর্তমানে ইলহান মাত্র দুইঘণ্টা অরিনের কণ্ঠ না শুনলেই পাগল হয়ে যায়। চব্বিশ ঘণ্টা অরিনকে চোখে হারায়। অরিনের নিঃশ্বাসের শব্দ না শুনলে, তাকে জড়িয়ে না ধরলে ইলহান শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। বিদেশ যাওয়ার আগের দিন বাচ্চাদের মতো কি পাগলামিটাই না করেছিল ইলহান। সেই সহজ-সরল ইলহান অরিনকে খুন করতে চাইবে? ব্যাপারটা রসিকতা ছাড়া আর কি? যদিও বিদেশ যাওয়ার পর এই ছয়মাসে ইলহান অনেকটাই বদলে গেছে। আগের মতো বাচ্চামো, পাগলামো আর করে না। তাই বলে অরিনকে খুন করে ফেলার মতো অধঃপরিবর্তনও তার হয়ে যায়নি! এটা অসম্ভব কথা! অন্বয় বলতে শুরু করলো,
” দেখুন মিসেস অরিন, আপনার ভাষ্যমতে আপনাকে অনেকদিন ধরে গাড়িটি ফলো করছে। আপনি রোজ ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় এবং আসার সময় পেছনে গ্রে কালার এই গাড়িটি দেখতে পাচ্ছেন। গাড়ির মালিকও খুব সন্দেহজনক। পোশাক-আশাক ভয়ংকর। অতঃপর দুইটি দূর্ঘটনা ঘটলো। তাও একটার পর আরেকটা। আমরা নিশ্চিত হলাম আপনাকে খুন করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সেই খুনীকে খুঁজে বের করার লক্ষ্যেই আমি তদন্ত শুরু করেছিলাম। আর যেটা পেয়েছি, তা অবশ্যই দুঃখজনক এবং ভয়ংকর। আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, ঘাম হচ্ছে!”
অন্বয় টিস্যু দিয়ে গলা, ঘাড় মুছে প্রজেক্টরটা ভালোমতো অরিনের দিকে তাক করলো। গ্রে রঙের গাড়িটির ছবি দেখা যাচ্ছে। অন্বয় একটু নড়েচড়ে বসলো। ডেস্ক টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কাপড়ে মোড়ানো জিনিস বের করে টেবিলের উপর রাখলো। তারপর আবার কথা শুরু করলো,
” সেদিন গ্রামের বাড়িতে আপনাকে গুলিবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। দূর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা যায়নি। তবুও সন্দেহবশত সেদিনের ওই দূর্ঘটনার পর থেকে আমি এই গাড়িটাকে অনুসরণ শুরু করি। গাড়ির মালিক একজন বিদেশী। ডিওচেইসে একটা খালি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে প্রায় একমাস যাবৎ তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। যেদিন থেকে আপনার এই সমস্যা শুরু হয়েছে একদম সেদিনই বাংলাদেশে এসেছেন এই আগন্তুক। এটা সবচেয়ে বড় পয়েন্ট। আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি সে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহর থেকে এসেছে। যেখানে আপনার হাসব্যান্ড বর্তমানে থাকেন। আপনি হয়তো ভাবছেন আপনার হাসব্যান্ড লেখাপড়ার জন্য মেলবোর্ন সিটিতে প্রবাসীদের মতোই কষ্টে বসবাস করছেন। কিন্তু তিনি আসলে প্রবাসী না। অস্ট্রেলিয়া তাঁর নিজস্ব রাষ্ট্র। তিনি ওইখানকার সিটিজেন।মেলবোর্ন সিটিতে তার নিজস্ব একটা ট্রিপ্লেক্স বাড়ি আছে। একটা বলছি কেনো? অগণিত আছে। তিনি সেখানে অঢেল সম্পত্তির মালিক। অস্ট্রেলিয়ার ধনী ব্যক্তিদের রেংকিং করা হলে তার অবস্থান দ্বিতীয় বা তৃতীয়তে থাকবে। আপনি কি বুঝতে পারছেন? একজন স্টুডেন্ট হয়ে তিনি কিভাবে এতো পয়সা উপার্জন করছেন? ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে আশ্চর্যজনক।”
অরিন চুপ করে রইল। শুধুমাত্র এই কারণে ব্যারিস্টার অন্বয় সাহেব ইলহানকে সন্দেহ করছে? কিন্তু অরিন জানে আসল ঘটনা। যা অত্যন্ত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয়। এই কথা অন্বয়কে জানানো যাবে না। কিন্তু না জানালেও ঘটনা ঝামেলাপূর্ণ রূপ ধারণ করবে। এজন্যই হয়তো বলে, ডাক্তার বা উকিলের কাছে সবসময় সত্য প্রকাশ করা উচিৎ। কিন্তু অন্বয় তো শুধু একজন দায়িত্বশীল উকিল নয়। সে আর কিছুদিন পর অরিনদের পরিবারের সাথেও জড়িয়ে যাবে। পেশায় সে একজন ব্যারিস্টার। লন্ডন থেকে ডিগ্রী অর্জন করে মাত্র কিছুদিন আগেই দেশে ফিরেছে। বয়সে তাগড়া যুবক। অন্বয়ের শ্যামবর্ণের চেহারাটিতে অদ্ভুত এক জৌলুস বিরাজমান। খুব আহামরি কিছু না। অতি সাধারণ ছোট চোখ, চিকন নাক,পাতলা ঠোঁট। তবুও কোথায় যেনো একটা অসাধারণত্বের ছোঁয়া আছে। মানুষটার অনেককিছুই পারফেক্ট। লম্বায় বরাবর ছয়ফুট। শরীরের গঠন-আকৃতিও যথেষ্ট ভালো। পাত্র হিসেবে একদম পছন্দের তালিকার শীর্ষে রাখা যায়। অরিনের শ্বশুরমশাই জনাব শায়িখ আহমেদের কাছে অন্বয়ের অবস্থান শীর্ষেই আছে। তিনি মেয়ের জামাই হিসেবে ভীষণ পছন্দ করেছেন অন্বয়কে। সবকিছু ঠিক থাকলে কয়েক মাস পরই অরিনের ননদ শ্যানিনের সাথে অন্বয়ের এনগেজমেন্ট হয়ে যাবে৷ কিন্তু বিষয়টা অস্বস্তিকর হলেও সত্যি যে, অরিনের ইদানীং মনে হয় অন্বয়ের শ্যানিনের প্রতি আগ্রহ কম। সে বরং অরিনের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী। এইটা কি শুধুই অরিনের মনের ভুল? অন্বয় কাপড় দিয়ে মোড়ানো টেবিলের সেই জিনিসটি অরিনের সামনে ধরলো। অরিন কৌতুহলে প্রশ্ন করলো,” কি?”
” জিনিসটা খুলে দেখুন। তার আগে একগ্লাস পানি খেয়ে নিতে পারেন। কারণ আপনি এখন প্রচন্ড অবাক হতে চলেছেন। আপনার গলা শুকিয়েও যেতে পারে।”
অরিন ভ্রু কুচকে খপ করে অন্বয়ের হাত থেকে জিনিসটা নিল। কোনো চামচ বা ছুড়ি মনে হচ্ছে। অরিন কাপড় সরিয়ে আসলেই চমকে উঠলো। প্রায় সাত-আটমাস আগে সুন্দর দেখতে ধারালো এই ছুড়িটা সে সুপারশপ থেকে শখ করে কিনেছিল৷ তারপরদিনই ইলহান আর সে লংড্রাইভে সিলেট গিয়েছিল। ইলহান গাড়িতে অরিনকে সারপ্রাইজ হিসেবে কেক দিয়েছিল যেটা সে নিজের হাতে বাসা থেকে বানিয়ে এনেছিল। কিন্তু ছুড়ি আনতে ভুলে যায় সে। তখন অরিন তার পছন্দের ছুড়িটিই কেক কাটার জন্য বের করে। ইলহান ছুড়িটি নিয়ে বলেছিল, এখন থেকে এটি তার কাছেই থাকবে৷ সে উপহার হিসেবে কেক এনেছে আর অরিন ছুড়ি এনেছে। কাটাকাটি। তাছাড়া যেই জিনিস অরিনের পছন্দ হয় সেটা ইলহানের আরও দ্বিগুণ পছন্দ হয়। কত স্মৃতি মিশে আছে এই ছুড়ির সাথে। কিন্তু এই ছুড়ি ব্যারিস্টার অন্বয় শিকদার কোথায় পেলেন? অরিনের প্রশ্ন করার প্রয়োজন হলো না। অন্বয় নিজেই বললো,
” গতকাল আপনাকে কিডন্যাপিং এর চেষ্টা করা হয়েছিল। আমি যদি সঠিক সময়ে খবর না পেতাম আর নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে কিডন্যাপারদের ফলো না করতাম তাহলে আজকে এই ছুড়ির আঘাতেই আপনার মৃত্যু হতো।”
অরিন এতোটাই আঁতকে উঠলো যে তার হাত থেকে ছুড়ি পড়ে গেল। অন্বয় ছুড়িটা মেঝে থেকে উঠিয়ে এপাশ-অপাশ ভালো করে দেখতে দেখতে বললো,
” আপনাদের একটা কাপল ফটোতে আমি এই ছুড়িটির ছবি দেখেছিলাম। এ ধরণের ডিজাইনওয়ালা ছুড়ি খুব এক্সেপশনাল হয়। তাই ডিজাইনটা আমার মনে গেঁথে ছিল। গতকাল রাতে অন্ধকারে দেখেও চিনতে ভুল হয়নি।”
অরিন থেমে-থেমে বললো,
” তার মানে আপনি এই ছুড়ি কিডন্যাপারদের কাছ থেকে পেয়েছেন?”
” এক্সেক্টলি।”
অরিন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে মনে হয়। অন্বয় এবার খুব বড় প্রমাণ দেখিয়ে ফেলেছে। যা অরিনের ভরসার জায়গাটুকু ভেঙে গুঁড়ো করার জন্য যথেষ্ট। অন্বয় অরিনকে ধরে চেয়ারে বসতে সাহায্য করলো। গ্লাসে ঢেলে পানি খেতে দিল। তার মাথায় হাত বুলাতে নিয়েও থেমে গেল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। অরিনের করুণ অবস্থা অন্বয়ের ঠিক সহ্য হয় না। কিন্তু তার কিছু করার নেই। সত্যি যতই ভয়ংকরী হোক, মানতে হবেই। অন্বয় বললো,
” আমার কথা আপনার বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। আমি বলছি না আপনার স্বামীকে সন্দেহ করুন। একই ধরণের ছুড়ি কিডন্যাপারদের কাছে থাকতেই পারে। তারাও হয়তো তাদের সরঞ্জামাদির ব্যাপারে খুব শৌখিন। শখ-আহ্লাদ বলতে তাদেরও কিছু আছে। তাই সুন্দর ছুড়ি দিয়ে তারা ভিক্টিম খুন করে। শখ বলে কথা!”
অরিন আঁড়চোখে তাকাতেই অন্বয়ের মুখে হাসি ফুটলো।
” কিডিং করার জন্য স্যরি। আমি শুধু আপনাকে একটা বিষয় বুঝাতে চাইছি। মনে কোনো সন্দেহ রাখবেন না। আগে নিজে যাচাই করুন। পরামর্শ হিসেবে আমি আপনাকে বলবো, অস্ট্রেলিয়া চলে যান। আপনার স্বামীর কাছে গিয়ে তাকে হাতে-নাতে ধরুন। তবে হ্যাঁ, তাকে কোনোভাবেই আগে থেকে জানিয়ে যাওয়া চলবে না। গিয়ে একদম সারপ্রাইজ দিবেন। দেখবেন নিজেও খুব বড় একটা সারপ্রাইজ পেয়ে গেছেন। তখন আপনার আমার কথা বিশ্বাস করার প্রয়োজন হবে না। আপনি নিজেই আমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য উঠে-পড়ে লাগবেন।”
” কি বলতে চাইছেন?”
” আমার ধারণা ইলহান মাহদী পরনারী আসক্ত। আপনার অগোচরে বিদেশে তিনি অসংখ্য মেয়ের সাথে মেলা-মেশা করছেন। আর আপনি তার সরিষা পরিমাণও আঁচ করতে পারছেন না।”
অরিন ক্ষীপ্ত কণ্ঠে গর্জন করলো,” হোয়াট? কারো নামে এতো বড় এলিগেশন আনার আগে..”
” বললাম তো, আমার কথা বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। আপনি যাচাই করুন। প্রয়োজন হলে আজকেই আমি আপনাকে ভিসার ব্যবস্থা করে দিবো। পাসপোর্ট তো আপনার আছেই। আপনি আগামীকালই চলে যান অস্ট্রেলিয়া। তারপর সব ক্লিয়ার হবে।”

মেলবোর্নে এখন সুন্দর সকাল। পরিপাটিভাবে সাজানো গাছ-পালা আর সবুজ কার্পেটের মতো আবৃত বাগানটি সূর্যের নরম সোনালী আলোয় সোনালী ঝলমলে হয়ে উঠেছে। অসম্ভব পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর এই শহরটি ভোরের মায়াবী রূপে নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে অবলীলায়। ইলহান সচরাচর এতো ভোরে ঘুম থেকে জাগে না। আজকে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে গেছে। ইলহান বিছানা থেকে নেমে আসার পাঁচমিনিট পরই সোফিয়া ঘুমো ঘুমো চেহারা নিয়ে ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। আহ্লাদী স্বরে বললো,
” বেইবি!”
ইলহান নির্লিপ্ত। হাতে কফিমগ নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে সে। সোফিয়া সামনে এসে ইলহানের হাত থেকে মগটা নিয়ে চুমুক দিল। ইলহান কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বললো,
” তোমার সমস্যা কি সোফিয়া? আমি উঠে এসেছি বলে তোমাকেও আসতে হবে? তুমি ঘুমাচ্ছো না কেনো?”
” সারারাত তো দু’জনেই জেগেছিলাম। আমার ঘুম প্রয়োজন হলে তোমারও ঘুম প্রয়োজন। এসো তুমিও আমার সাথে ঘুমাও।”
সোফিয়া হাত টানলো ইলহানের। ইলহান জোর করে হাতটা ছাড়িয়ে বললো,
” আমার ঘুম আসছে না।”
ইলহানের নিষ্ঠুর প্রত্যাখ্যানে সুন্দরী সোফিয়ার মুখ যেনো কালো মেঘের আবরণে ঢেকে গেল। ইদানীং ইলহান খুব অবহেলা করছে তাকে। তাদের সম্পর্ক প্রায় পাঁচবছরের। চারবছর ধরে তারা লিভিং রিলেশনশীপে আছে। একই সাথে, একই বাড়িতে, ঠিক বিবাহিত দম্পতির মতো। মাঝখানে ইলহান দুইবছরের জন্য বাংলাদেশে নিরুদ্দেশ হয়েছিল। বাংলাদেশী এক কৃষ্ণকলিকে বিয়েও করেছে সে। এতে সোফিয়ার তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ ইলহানের বউ সোফিয়ার রূপের ধারে-কাছেও আসতে পারবে না। তাই তাকে নিয়ে ঈর্ষা করা সোফিয়ার মতো আগুন সুন্দরীকে মোটেও শোভা পায় না। ইলহান মেয়েটিকে বিয়ে করেছিল একটা চ্যালেঞ্জে জেতার জন্য। সে জিতেছে। কাহিনী এখানেই শেষ। ইলহানের বউ এখন তার বাংলাদেশী মা-বাবার সেবা যত্নের কাজে নিয়োজিত। আর ইলহান পুনরায় ফিরে এসেছে সোফিয়ার কাছে। তবে আজ-কাল সোফিয়ার মনে হচ্ছে, ইলহান বিয়ে করার পর একটু হলেও বদলেছে। আগে সারাক্ষণ সোফিয়ার সাথে চিপকে থাকতো। আহ্লাদী কথা-বার্তায় কান খেয়ে ফেলতো। আর এখন কথাই বলতে চায় না। কি হয়েছে ইলহানের? সোফিয়া বিমর্ষ মন নিয়ে ইলহানের সামনে দাঁড়ালো। তার গাল স্পর্শ করে বললো,
” এনি প্রবলেম? তুমি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত বেইবি? প্লিজ আমার সাথে শেয়ার করো।”
” আমার এখন কথা বলতে ভালো লাগছে না সোফি৷ তুমি কি আমাকে একটু একা থাকতে দিবে?”
ইলহানের এমন অনুরোধে সোফিয়া ভেতর থেকে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেলেও উপরে হাসার চেষ্টা করলো।
” ঠিকাছে, তুমি রিলেক্স করো। আমি ট্যারেসে যাচ্ছি। ভালো লাগলে তুমিও এসো।”
সোফিয়া চলে যাওয়ার পরই ইলহান মোবাইল হাতে নিল অরিনকে ফোন করার জন্য। যেই স্বপ্নটা দেখে তার ঘুম ভেঙেছে সেটা এখনই অরিনকে জানাতে ইচ্ছে করছে। অস্ট্রেলিয়ায় এখন ভোর হলেও বাংলাদেশে নিশ্চয়ই মধ্য দুপুর! অরিনের নাম্বারে ফোন করে পাওয়া গেল না। ওর সিম বন্ধ দেখাচ্ছে। ইলহান চিন্তিত হয়ে মেসেঞ্জারে ফোন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তখনই দরজায় কারো করাঘাত শোনা গেল। ইলহান বিরক্তিতে ভ্রু কুচকালো। এই ভোরবেলা কে ডিস্টার্ব করতে এসেছে? সোফিয়াকে সে ডাকতে নিচ্ছিল দরজা খোলার জন্য। বাসায় কোনো সার্ভেন্ট নেই। সবাইকে ছুটিতে রাখা হয়েছে। ইলহানের একা থাকতে ভালো লাগে আজ-কাল। কাউকে সহ্য হয় না।পারলে সে সোফিয়াকেও ঘর থেকে বের করে দেয়। সোফিয়া তো এখন ছাদে। এর মানে ইলহানকেই দরজা খুলতে হবে। বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এখন কলিংবেল বাজানো শুরু করেছে। ইলহান দরজা খুলে এতোটাই চমকে গেল যে হাতের ফোনটা পর্যন্ত ফেলে দিল। বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে উচ্চারণ করলো,
” অরিন তুমি!”

চলবে

-Sidratul Muntaz.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here