রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব -০১

“আমি কখনো মা হতে পারবো না এটা জেনেও কি আপনি আমাকে বিয়ে করতে চাইবেন মিস্টার আহান??”

আরশি বেশ নম্রতার সাথে শান্ত গলায় কথাটা বললো টেবিলের সামনে বসে থাকা আহানকে। আরশির শান্ত গলায় এমন একটা কথা শুনে চমকে উঠলো আহান। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে। আহানের বিস্ময়কর চাহনি দেখে আরশি মুচকি হাসলো। আহানের নিস্তব্ধতা বলে দিচ্ছে আরশির করা প্রশ্নের উত্তর কি হবে। আর সেটা ভেবেই মুচকি হাসছে আরশি। এতদিন তো বেশ ভালোবাসি ভালোবাসি বলে জান দিয়ে দিচ্ছিলো আহান। কিন্তু আজ যখন আরশির মা হতে না পারার ব্যর্থতার কথা শুনলো তখনই সে নিশ্চুপ হয়ে গেল। এটাই কি ছিল তাহলে আহানের ভালোবাসা যা কি না আরশির এই ব্যর্থতার কাছে হার মেনে গেল!!!

আরশি ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবারও শান্ত গলায় বললো-

“আমার এই ব্যর্থতার কারনেই আমি আপনার ভালোবাসার ডাকে সাড়া দেইনি। আশা করছি এখন থেকে আর আমার ভার্সিটির সামনে এসে ভালোবাসার দাবী করবেন না। ভালো থাকবেন মিস্টার আহান। আজ উঠছি।”

কথা গুলো বলেই আরশি দাঁড়িয়ে গেল চেয়ার ছেড়ে। কিছুটা দূরে বসে থাকা কাসফিয়া’কে হাতের ইশারায় আসতে বললেই রেস্টুরেন্টের সদরদরজার দিকে গম্ভীরভাবে পা এগিয়ে নিল। আহান এখনো আগের মতোই চুপ করে বসে আছে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরশির যাওয়ার দিকে।

কাসফিয়া দ্রুত পা ফেলে আরশির কাছে আসলো। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতেই কাসফিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরশির দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললো-

“আশু!! কেন এমন করলি বল তো!! শুধু শুধু কেন আহানের ভালোবাসাকে উপেক্ষা করছিস??”

কাসফিয়ার কথা হাঁটা থামিয়ে দিল আরশি। পাশ ফিরে কাসফিয়ার দিকে ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে বললো-

”তোর কাছে এটা ভালোবাসা মনে হলো কাসফি??”

কাসফিয়া ছোট করে উত্তর দিলো-

“তা নয়তো কি!”

আরশি শান্ত গলায় বললো-

“এটা যদি সত্যিকারের ভালোবাসা হতো তাহলে আমার ব্যর্থতার কথা শুনে আহান নিশ্চুপ হয়ে যেত না। আমার মা হতে না পারার ব্যর্থতার কাছে আহানের ভালোবাসা ফিকে পরে গেছে কাসফি।”

আরশির কথায় কাসফিয়া কিছুটা রেগে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো-

“তুই বার বার ব্যর্থতার কথা কেন বলছিস আশু?? তোর মা হতে পারার সম্ভাবনা কম তা-ই বলে এই না যে তুই কখনো মা হতে পারবি না!!”

আরশি কিছু না বলে চুপচাপ করে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলছে। এসব কথা শুনলে হুটহাট করে গাম্ভীর্যপুর্ণ হয়ে ওঠে আরশি। আজ থেকে দু’বছর আগে আরশি জেনেছিল তার মা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আর সেই সময় থেকেই নিজেকে ব্যর্থ মনে করে আসছে আরশি। তবে ডক্টর বলেছে আরশির মা হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিন্তু একদমই কম আর ঝুঁকিপূর্ণ। ডক্টর এই কথা বললেও আরশির কাছে মনে হয় সেটা শুধু মাত্রই তার জন্য মিথ্যা আশ্বাস ছিল। আরশির এই কথা তার পরিবারের কেউ জানে না। শুধু তার ছোট বেলার ফ্রেন্ড কাসফি জানে। এই মেয়েটাই আরশির সব সুখ-দুঃখের সঙ্গী। ওরা দুজন সব সময় একে অপরের পাশে ছিল আর এখনো আছে। কিন্তু এই দু’বছরে আরশির মধ্যে এসেছে খানিকটা পরিবর্তন। যে মেয়েটা আগে প্রেম ভালোবাসা নিয়ে নানানরকম জল্পনাকল্পনা করতো সেই মেয়েটাই আজ কাল ভালোবাসা দেখলে এড়িয়ে যায়। এড়িয়ে যায় বল টা ঠিক হবে না কারন যারাই ভালোবাসার দাবি নিয়ে আরশির কাছে এসেছে তাদেরকেই আরশির ব্যর্থতার কথা বলেছে। তবে একটা ব্যাপার আরশির কাছে খুব হাস্যকর মনে হয়, আরশি যে কয়েকজন ছেলেকেই তার ব্যর্থতার কথা বলেছে তারা পরবর্তীতে আর কখনো ভালোবাসার দাবি নিয়ে আরশির সামনে আসেনি।

কাসফিয়া মলিন মুখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে আরশির কাছে গিয়ে পাশাপাশি হাঁটা শুরু করলো। কাসফি কথা ঘুরানোর জন্য মুখে হাসি টেনে আরশির দিকে নরজ দিয়ে উল্লাসিত কন্ঠে বলে উঠলো-

“দেখে নিস একদিন এক রাজকুমার আসবে যে কি-না সব জেনে শুনে তোকে পাগলের মতো ভালোবাসবে। তোকে তার রাজকুমারী বানিয়ে রাখবে।”

কাসফিয়ার কথায় আরশির ভ্রু জোড়া কুচকে এলো। সরু চোখে কাসফিয়ার দিকে তাকিয়ে বিরক্তি মাখা কন্ঠে বললো-

“এটা আমাদের জীবন, এটা কোনো রূপকথার গল্প না। আর বাস্তব জীবনে কোনো রাজকুমার কিংবা রাজকুমারী হয় না। ওইসব ভালোবাসা শুধু কল্পনাতেই মানায়। তাই দয়া করে তোর এইসব বাচ্চামো কথাবার্তা অফ কর।”

কাসফিয়া গাল ফুলিয়ে মিনমিন করে বললো-

“সেটা না হয় পরেই দেখা যাবে।”

আরশি কাসফিয়ার এক হাত জড়িয়ে ধরে হাঁটতে হাঁটতে বললো-

“হয়েছে রে কাসফি আর গাল ফুলিয়ে থাকিস না। এখন তাড়াতাড়ি চল বাসায় যেতে হবে তো। প্রচন্ড গরম লাগছে।”

কাসফিয়া কিছু বললো না আরশির সাথে তাল মিলিয়ে হেঁটে চলছে। এই মেয়ের সাথে কোনো কথা বললে সেই কথার দাম পাবে বলে কখনো মনে হয়নি কাসফিয়ার। এই মেয়েটা সপ্ন দেখতেই ভুলে গেছে। দু’বছর আগেই তার কল্পনার জগৎ হারিয়ে গেছে। আরশির অগোচরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো কাসফিয়া।

——————

গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়। ভাপসা গরমে অতিষ্ঠ প্রায় মানুষজন। সূর্যের গরম তাপে রাস্তা-ঘাট এমনকি রাস্তার পাশের ছাউনির বেঞ্চি গুলোও আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত শরীররে দু’জন বাসের অপেক্ষা করছে। আরশি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও কাসফিয়া অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে অধৈর্য হয়ে পরেছে। কাসফিয়া অস্থিরতা সাথে আরশির উদ্দেশ্যে বললো-

“আশু রে বোনু আমার….আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো!! বাস কখন আসবে বল না!”

আরশি বিস্মিত হয়ে দেখছে কাসফিয়াকে। নিজের ছোট্ট মস্তিষ্কে প্রশ্ন জেগে উঠলো, ‘মেয়েটার ধৈর্য শক্তি এত কম কেন? মেয়েদের তো প্রচুর ধৈর্য্যশীল হতে হয়!!’ পরক্ষণেই আরশির মন প্রশ্নের উত্তর হিসেবে জানিয়ে দিল- ‘হোক না অস্থির, অধৈর্য্য এ-সব বাচ্চামিতেই কাসফিকে বেশ মানায়।’

আরশি নিজের ভাবনা গুলো মনে চাপা দিয়ে চোখমুখ কুচকে বিরক্তি প্রকাশ করে বললো-

“তোর কি মনে হয় এই শহরের সব বাস আমার পারসোনাল প্রপার্টি?? বাস কখন আসবে না আসবে এইসব কি আমাকে আগে থেকে জানিয়ে দেয় না-কি!!”

আরশির কথায় কাসফিয়া চুপসে গেল। আসলেই তো আরশি কিভাবে জানবে বাস কখন আসবে!!

———————

এই গ্রীষ্মের সময় ভরদুপুরে বাসে জার্নি করা কোন যুদ্ধ করা থেকে কম না। আর তা যদি হয় লোকাল
বাস তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই! আরশি আর কাসফিয়া বাসে বসার সিট না পেয়ে চরম পর্যায়ের বিরক্তি ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাসে। দুজনেরই বেশ কষ্ট হচ্ছে এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জার্নি করতে। কিন্তু এতো গরমে বাহিরে দাঁড়িয়ে অন্য বাসের জন্য অপেক্ষা করার থেকে একটু কষ্ট করে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যাওয়াই তাদের কাছে বুদ্ধিমানের কাজ মনে হচ্ছে।

হঠাৎ করে খুব জোরে বাস ব্রেক কষলো। কাসফিয়া বাসের সিট ধরে নিজেকে সামলাতে পারলেও আরশি নিজের তাল সামলাতে পারলো না। সামনের দিকে ছিটকে পরার সাথে সাথেই ডান হাত দিয়ে কাসফিয়ার হাত আঁকড়ে ধরলো আর বাম হাতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পুরুষালি দেহ বিশিষ্ট মানুষটার শার্টের বুকের দিকটা খামচে ধরলো। আর আরশির কপাল গিয়ে ঠেকলো লোকাটার ওষ্ঠ দ্বয়ের সংযোগস্থলে। আচমকা আরশির কপালে নরম কিছুর স্পর্শ অনুভব করতেই মানুষটার কাছ থেকে বিদ্যুৎ ঝটকায় খাওয়া মতো পেছনে ছিটকে সরে গেল। আরশির কাছে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে একদমই কষ্ট হয়নি। অস্বস্তি আর লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতেও পারছে না। তাড়াতাড়ি করে কাসফিয়ার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বাস থেকে মাথা নিচু করেই নেমে গেল। কি থেকে কি হয়ে গেল এইটা!! আরশির মাথা পুরোই ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। বাসে সবার সামনে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হবে এটা ভাবাই যেন দুঃস্বপ্ন থেকে কম কিছু নয় তার কাছে। বাস থেকে নেমেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাস এতক্ষনে চলে গেছে কিন্তু আরশির ঘোর এখনো কাটছে না।

কাসফিয়া বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে। কাসফিয়ার রসগোল্লার মতো করে রাখা চোখ গুলো যেন এখনই টুপ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কাসফিয়ার কাছে মনে হচ্ছে এটা তার মনের ভ্রম অথবা হ্যালুসিনেশন। কাসফিয়া কিছু না ভেবেই আরশির কবজির কিছুটা উপরের দিকে একটা চিমটি কাটলো।

চলবে…

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ১
#Saiyara_Hossain_Kayanat

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here