লাবণ্যর সংসার পর্ব -১১

#লাবণ্যর_সংসার
#পর্ব_11
#কৃ_ষ্ণ_ক_লি

তড়িৎগতিতে উঠে বসে মেঘলা। শিউলি বেগম কে দেখে মেঘলা চিৎকার করে বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্ট গুলোকে কান্নার মাধ্যম বহিঃপ্রকাশ করে।
শিউলি বেগম সস্নেহে মেঘলাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। বেশ কিছুক্ষণ কান্না করার পর মেঘলা একটু শান্ত হয়। তবে চোখের কোণ বেয়ে নোনাপানিরা এখনও গড়িয়েই পড়তে থাকে।

—“ দেখ মা তুই অন্তত এবার সবটা মেনে নে। সবকিছুই তো ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। আমি বলি কি তুই নিবিড়কে ভুলে যা। দেখ যেটা হবার নয় সেটা নিয়ে কেনো ভাববি বল তো। তুই তোর নীজের জীবনে এগিয়ে যা। ভালো করে লেখাপড়া কর, জীবনে বড়ো কিছু একটা করে দেখা। তারপর না হয় তোর নিজের পছন্দেই হোক অথবা আমাদের পছন্দের কোনও ছেলের সাথেই না হয় বিয়ে দিয়ে দিব। সুখী হবি , একদিন তুই খুব সুখী হবি দেখিস।”

শিউলি বেগমের কথায় মেঘলার যেনো সর্ব শরীরে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠলো। চিৎকার করে বলে উঠলো,,,

—“ সুখী হব! কিন্তু আমি যে নিবিড়ের সাথে ছাড়া আর কারুর সাথে সুখী হতে পারবো না। সেটা তো তোমরা সবাই জানো। আর ভাগ্য! কিসের ভাগ্য হ্যা… কিসের ভাগ্য… আরে ভাগ্য তো তোমরাই তৈরী করেছো আমার। নিবিড় ভাইয়া বলেছিলো তো , নিবিড় ভাইয়া বলেছিলো আমাকে বিয়ে করবে কিন্তু তোমরা মেনে নাও নি। পাপা , মামু এরা মেনে নেয়নি। আমরা ভাই বোন , আমাদের বিয়ে মানতে পারবে না মামু! কেনো করলে আমার সাথে এমন?”

শিউলি বেগম স্বাভাবিক কন্ঠে বলে উঠে,,

—“ ভুল তো উনারা কিছুই বলেননি।সিদ্ধান্তও উনারা ঠিকই নিয়েছিলেন। তোদের দুজনকে একসাথে বড়ো হতে দেখেছি। ভাই বোনের মতো একসাথে খেলাধূলা করেছিস। ভাই হিসেবে বোনের দায়িত্ব পালন করেছে নিবিড়। কিন্তু এখন বড়ো হয়েছিস বলেই যে তোদের ভাই বোনের সম্পর্কটা প্রেমের হয়ে যাবে সেটা আমরা কেউ মানতে পারবো না মেঘলা। ”

—“ মামী.. মামী তুমি এই কথা বলছো? একদিন তুমি , তুমিই তো আমায় বলেছিলে নিবিড় ভাইয়ার সাথেই আমার বিয়ে দিবে। লাবণ্যর সাথে বিয়ে হওয়ার পরেও তো তুমি বলেছিলে ওই মেয়েকে তুমি তাড়িয়ে দিবে। আমাকে তোমার ছেলের বউ করে আনবে! এখন তাহলে এমন কথা কেনো বলছো তুমি? ”

—“ বাধ্য হয়েছিলাম বলতে , তা না হলে তোকে সামলাতে পারতাম না। আমার ছেলেকেও যেমন ভাবে ভালোবাসি তোকেও সেভাবেই ভালোবাসি আমি। তোদের দুজনের ভাই বোনের ভালো সম্পর্ক করতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আমার নিজের একটা মেয়ে নেই তো কি হয়েছে। তুই আমার একটা মেয়ে। কিন্তু পরে বুঝলাম তোর নিবিড়ের প্রতি আবদার, বায়না বোনের না একজন প্রেমিকার । নিবিড়ের বিয়ের দুদিন আগেও যখন তুই পাগলামি শুরু করলি তোর কথা অনেক ভাবলাম। বিয়ের দিন সারাদিন রোদ – পানিতে বসেছিলি , তোর কষ্ট দেখে মনস্থির করেছিলাম তোর কথাই রাখবো। তোর মামুর সাথে তোর জন্য ঝগড়া করেছি , অনেক কথা শুনিয়েছি। এমনকি নতুন বউ লাবণ্যর ওপর অনেক মানসিক অত্যাচার করেছি। হাজার কষ্ট হলেও তোর মুখের দিকে তাকিয়ে এইসব কিছু করেছি মেঘলা। কিন্তু আর পারলাম না জানিস তো। নিবিড় যে লাবণ্যকে ভালোবেসে ফেলেছে। তা জানার পর আমি আর তোর কথা ভাবলাম না মেঘলা। এখনও সময় আছে তুই… ”

—-“ হ্যা মেঘলা এখনও সময় আছে , আমি চলে যাচ্ছি। তুমি তোমার নিবিড় ভাইয়াকে নিয়ে সুখী হও। তোমরা একে অপরকে বিয়ে করো। ”

লাবণ্যর নির্লিপ্ত কন্ঠের আওয়াজে মেঘলা ও শিউলি বেগম দুজনেই চমকে উঠে তাকায়। লাবণ্য হাসি মুখে মেঘলার কাছে আসে।

—“ আমি জানি তোমরা দুজন দুজনকে কতো ভালোবাসো। তোমার নিবিড় ভাইয়াও তোমায় যে কতোটা ভালোবাসে তার প্রমাণ আমি কাল পেয়েছি। শুধু শুধু আমি তোমাদের পথের কাঁটা হতে চাই না। আমি চলে যাবো তোমরা দুজন দুজনকে বিয়ে করে নাও। আমি বাবা আর ফুপার সাথে কথা বলছি যতো শ্রীঘ্রই তোমাদের চার হাত এক করে দেওয়া যায়। ”

লাবণ্য চোখের পানি আড়াল করে কথাগুলো বলে পুনরায় ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে আনে।

ওখানে উপস্থিত রুমানিয়া বেগম আর নিবিড় হতবাক হয়ে যায়। রুমানিয়া বেগম লাবণ্যকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।

—“ এসব কি বলছো তুমি মা? কেনো বলছো এমন কথা? তোমাকে এই বাড়িতে নিবিড়ের স্ত্রী হিসেবে নিয়ে আনা হয়েছে। যেটা তোমার শ্বশুর মশাই আর আমরা ঠিক করেছি। ”

—“ ভুল করেছেন ফুপ্পিমা। খুব বড়ো ভুল করেছেন আপনারা। দুজন মানুষকে আলাদা করে দিয়েছেন আপনারা। ভালোবাসার মানুষের সাথে বিচ্ছেদ যে কতখানি কষ্টের তা হয়তো যাদের বিচ্ছেদ হয়েছে তারাই উপলব্ধি করতে পারে !”

লাবণ্য মুচকি হেসে কথাগুলো বলে উঠে। নিবিড় টান মেরে লাবণ্যকে নিজের কাছে টেনে আনে। হাতের বাহু চেপে ধরে চেঁচিয়ে বলে,,,

—“ কি পাগলের মতো আবোল তাবোল বকে চলেছো হুম ! পাগল হয়ে গেছো না কি? আর কি বলছো? আমি মেঘলাকে কতোটা ভালোবাসি তার প্রমাণ পেয়েছো? কি বলো কিভাবে পেয়েছো? আমি কি তোমাকে বলেছি মেঘলাকে আমি নিজের জীবনের থেকে বেশী ভালোবাসি? ”

লাবণ্য এবার তাচ্ছিল্যর হাসি হাসে,,

—“ না আপনি আমাকে বলেননি। তবে বলে দিলে হয়তো আমার কষ্ট টা একটা হালকা হতো। ”

নিবিড় আরও শক্ত করে ধরে লাবণ্যকে। লাবণ্যর চোখ ঝাঁপিয়ে নোনাপানিদের আগমন হয়।

—“ এ্যাই লাবণ্য কি পাগলের মত বকে চলেছো। তুমি তো সবটাই এখানে শুনলে। তারপরে কেনো বলছো এমন কথা। তোমাকে আমি বিয়ে করেছি, তুমি আমার স্ত্রী। আমি মেঘলাকে এখন কেনো নতুন করে বিয়ে করবো?”

—“ নিবিড় সাহেব মনে একজনকে বসিয়ে রেখে অন্যের সাথে সংসার করা যায় না বিশ্বাস করুন। আপনার মন জুড়ে তো এখনো ওই মেঘলার বসবাস। আর প্রমাণ! কাল রাতের কথা মনে করুন!”

নিবিড়ের এবার রাগের মাত্রাটা বেড়ে যায়। তাই ওখান থেকে বের করে নিজের রুমে নিয়ে যায়। লাবণ্য সাথে সাথে বিছানায় গিয়ে আছড়ে পড়ে। নিবিড় সশব্দে দরজা বন্ধ করে দেয়।

রুমানিয়া বেগম চোখ গরম করে কান্নারত মেঘলার দিকে তাকিয়ে থাকে।

—“ একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ মেঘলা তোর জন্য যদি লাবণ্যর সংসার ভেঙ্গে যায় আমি কিন্তু তোকে ক্ষমা করবো না। ”

—“ সংসার! লাবণ্যর সংসার! ওটা আমার সংসার বুঝেছো। সেই ছোটবেলায় যখন খেলনা বাটি খেলতাম , তখনই তো আমি নিবিড় ভাইয়ার সাথে সংসার পেতে ছিলাম। ওটা আমার সংসার হুম। আর লাবণ্য তো চলেই যাবে বলছে। তাহলে তো আর কোনও বাঁধা নেই। আমার নিবিড় ভাইয়া আমায় ফিরিয়ে দাও তোমরা। ”

রুমানিয়া বেগম গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে মেঘলাকে এক থাপ্পড় মারলেন। মেঘলা বিছানার চাদর খামচে ধরে কেঁদে ফেলে।

শিউলি বেগম ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তাই নিরব দর্শকের মতো মা মেয়েকে একা ছেড়ে দিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে আসেন।

—“ এবার বল তোমাকে আমি এতো ভালোবাসার পরেও তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছো। লাবণ্য কি করলে তুমি বুঝবে আমার মনের আর কোথাও মেঘলা নেই !”

লাবণ্য বিছানায় উঠে বসে নিবিড়ের চোখে চোখ রাখে।

—“ আপনার চোখ কিন্তু অন্য কথা বলছে নিবিড় সাহেব? দেখুন আমি তো সবটাই জানি তাহলে আমার কাছে কেনো লুকাচ্ছেন? আমি বলছি তো চলে যাচ্ছি। আপনারা সুখী… ”

নিবিড় লাবণ্যর গাল দুটো আচমকা ধরে ফেলে। লাবণ্য টাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পড়ে যায়।

—“ কি বলছে আমার চোখ! হুম বল কি বলছে আমার চোখ? ”

নিবিড়ের চিৎকারের আওয়াজে লাবণ্য দু চোখ বন্ধ করে ফেলে।

—“ বল ..আর কি বলছিলি কাল রাতের কথা মনে করতে? মনে আছে তো! কাল রাতে আমি তোর সাথে শুয়েছিলাম। তোর কি মনে আছে সেকথা? না কি আজকের কথা ভেবে মনে করেছিস আমি কাল মেঘলার সাথে শুয়েছিলাম! ”

লাবণ্য বুক ফাটা কষ্টে কান্নার মধ্যেও হেসে ফেলে।

—“ আপনি যদি সত্যিই মেঘলার সাথে কাল শুতেন প্রথমবারের মতোই আমার কোনও কষ্ট হতো না। কিন্তু কাল আপনি আমার সাথে থেকেও মেঘলার নাম করেছেন , মেঘলাকেই খুঁজেছেন। অন্তরঙ্গ অবস্থায় থেকে স্বামীর মুখে যদি অন্য কোনও মেয়ের নাম শুনতে হয়। তা একজন স্ত্রীর পক্ষে মৃত্যুর সমতুল্য হয়। ”

নিবিড় লাবণ্যকে ছেড়ে দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। তাহলে কি কাল রাতে আবেগে.. না না! দু হাতে নিজের মাথার চুল টেনে ধরে নিবিড়।

শিউলি বেগম ড্রয়িং রুমের সোফায় থম মরে বসে পড়েন। ভাবতে থাকেন ভবিষ্যতের কথা। লাবণ্য কি করবে! লাবণ্য কি সত্যিই সব কিছু ছেড়ে চলে যাবে!!!

চলবে ….
(বি:দ্রঃ – আগামীকাল থেকে গল্পের নতুন মোড় ☺)

(লেখায় ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমা করবেন 🙏)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here