শুভ্ররাঙা ভালোবাসা পর্ব -২৭

#শুভ্ররাঙা_ভালোবাসা
#তানিয়া_মাহি(নীরু)
#পর্ব_২৭

” ওই ছেলে আমাকে খুব খারাপভাবে ছুয়েছে নিহান ভাই। ওই ছোয়া আমি আমার শরীর থেকে কীভাবে দূর করব বলুন তো? সবাই ক্ষতি করার জন্য আমাকেই কেন বেছে নেয়? আমি এসব কথা থানায় গিয়ে কীভাবে বলব বলুন তো? ছেলেটা আমাকে ধ*র্ষণ করতে চেয়েছিল এটা আমি নিজের মুখে সবাইকে কীভাবে জানাবো?”

পরিক্ষা শেষ করে শুভ্রতাকে নিয়ে আজ থানায় যাওয়ার কথা কারণ এই মামলার জন্য শুভ্রতার জবানবন্দি খুব প্রয়োজন। গতকাল কি হয়েছিল সেটা এখন শুভ্রতা ছাড়া কেউ বলতে পারবে না।

শুভ্রতার পরিপ্রেক্ষিতে নিহান কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ফাউজিয়া বলে ওঠে, ” তুই কি চাচ্ছিস ওই সোহেল এত বড় অপ*রাধ করে ছাড়া পেয়ে যাক? সেদিন তুই ওকে মে*রেছিলি, মানুষের সামনে মাফ চাইতে হয়েছে তাই সে নিজের রাগ কন্ট্রোলে রাখতে না পেরে এরকম একটা কাজ করেছে। নিহান ভাইয়া তো তোর সাথে আছে তাহলে তোর ভয় কীসের?”

শুভ্রতা কিছু বলে না, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে সে। ফাউজিয়া আবার বলে, ” দেখ শুভ্রতা, ওই ছেলে কাল তো ক্ষতি করতে চেয়েছিল। তুই যদি আত্মরক্ষা করতে না পারতি তাহলে হয়তো তোকে আজ এই অবস্থায় দেখতে পেতাম না। কাল তোর সাথে খারাপকিছু হতেই পারতো, কিন্তু হয় নি। কি কি হয়ছে সেটা শুধু বলবি। আমি জানি তুই পারবি। দেখ তুই যদি না জানাস তাহলে সোহেল কোন শাস্তি না পেলে পরবর্তীতে অন্য মেয়ের ক্ষতিও করবে। তোর উচিৎ এখনই তার শা*স্তির ব্যবস্থা করা। পারবি না?”

” আমি থানায় ও তোর পাশেই থাকব, তুই চাইলে। তোর কোন চিন্তা নেই। তুই শুধু জবানবন্দিটা দিবি বাকিটা আমি দেখে নিব। ওই ছেলেকে তো আমি কিছুতেই এমনি এমনি ছেড়ে দিব না। হয়তো আইন শা*স্তি দিবে নয়তো আমি।”

” আমি যাব নিহান ভাই, আমি সব জানাবো।”

ফাউজিয়া শুভ্রতাকে জড়িয়ে ধরে, বিদায় নিয়ে চলে যায়। নিহান এবার অনুমতি পেয়ে দেরি না করে শুভ্রতাকে নিয়ে থানায় রওয়ানা দেয়।
~~
” আপনার সাথে কালকে কি ঘটেছিল? একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলবেন। ”

পুলিশ অফিসারের প্রশ্নে শুভ্রতা নিহানের দিকে তাকায়। নিহান বলতে বললে শুভ্রতার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে গতকালের ঘটনা বলতে শুরু করে।

” গাড়িতে একটা মেয়েকে বসে থাকতে দেখে আমিও গাড়িতে উঠে বসে গাড়ি চলতে শুরু করে। পরীক্ষা শেষ হয়েছিল পাঁচটায়, আমার ফ্রেন্ডের সাথে কথাবার্তা বলে ভার্সিটির মেইন গেইট থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে বসি। আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে মেইন গেইটের কাছে আসতে ১০-১২ মিনিট সময় লাগে। গাড়িতে যাত্রী না হওয়ায় অনেকক্ষণ দেরি হচ্ছিল। এদিকে আমার চাচাতো বোনের বিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে অথচ গাড়ি ছাড়ছে না খুব বিরক্ত লাগছিল। ড্রাইভারকে জানাতেই ড্রাইভার বলে ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে তাহলে উনি দুজনকে নিয়েই আসবেন। আমিও রাজি হয়ে যাই কারণ আমাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। গাড়ি ছাড়তে ছাড়তে ৫:৪৫। গাড়ি ছাড়ার আগ মুহূর্তে আমি একটা পানির বোতল কিনে নেই কারণ গাড়িতেই রোজা ভাঙতে হবে সময় ছিল না। গাড়ি চলতে শুরু করে কিছুদূর যাওয়ার পরে পাশের মেয়েটা নেমে যায় আমি বাড়িতে একা। গাড়ি আবার চলতে শুরু করে কিছু দূর যেতে বাড়িতে তিনজন ছেলে ওঠে। তিনজনের মুখে মাস্ক পরা একজনকে দেখে চেনা চেনা লাগছিল। তারা তিনজন গাড়িতে উঠে বসে, গাড়ি চলতে শুরু করে কিন্তু সেটা আমার বাড়ির উদ্দেশ্যে না আবার পিছন দিকে ব্যাক করে। আমি ড্রাইভারকে চিৎকার করে বলি গাড়ি ঘুরিয়েছেন কেন?

আমাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমার পাশে বসে ছেলেটা আমার মুখে রুমাল বেঁধে দেয়। একে একে হাত দুটো বাঁধে এবং পা দুটো এক করে বেঁধে দেয়। খুব অসহায় লাগছিল নিজেকে, কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার সাথে এমন একটা ঘটনা ঘটবে আমি সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। গাড়িটা ফাঁকা রাস্তায় চলে যায় যেখানে কোন জ্যাম থাকে না। জ্যাম থাকলে তো গাড়ি থামাতে হবে আর গাড়ি থামলেই ধরা পড়ে যাবে তাই তারা গ্রামের ফাঁকা রাস্তা বেছে নেয়।

সন্ধ্যা পার হয়ে যায় গাড়ি এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে আমি কান্না করতেই আছি,শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে কিন্তু শব্দটা হয়তো কারো কানে পৌঁছচ্ছে না। যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়, সবাই তখন ইফতার করতে ব্যস্ত মসজিদে সবাই পৌঁছে গেছে বাহিরে মানুষ নেই। তিনজন মিলে গাড়ি থেকে আমাকে নামিয়ে ওই ভাঙা ঘরটায় নিয়ে যায়।

আমাকে ঘরের মেঝেতে ফেলে রেখে তিনজন বাহিরে কথাবার্তা বলতে থাকে। আমি ভিতরে মেঝেতে বসে কখনো কান্না করছিলাম আমার ভাগ্যে কি আছে সেটা ভাবছিলাম। তখন একজন ভেতরে আছে বাহিরে থেকে তোর দরজা লাগিয়ে দেয়। কাউকে ভেতরে আজকে দেখে আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। সেই ব্যক্তি তখন আমার সামনে এসে মুখের মাস্ক খুলে অট্টহাসিতে ফেটে পরে।

মাস্ক খোলার পর আমি তাকে চিনতে পারি। ওটা সোহেল ছিল। সে বলতে থাকে খুব ইচ্ছে তাই না আমাকে দিয়ে মাফ চাওয়ানো? পুরুষ মানুষকে কি মনে হয় তোর? আর সেদিন কাকে যেন এনেছিলি? সে কি আজ তোকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে?”

শুভ্রতা এতক্ষণে একটু দম নেয়। এত কথা একটানা বলা কষ্টসাধ্য। শুভ্রতাকে থামতে দেখে পুলিশ অফিসার বলে, ” তারপর? তারপর কি হলো?”

শুভ্রতা আবার বলা শুরু করে- আমাকে অসহায়ের মতো কাঁদতে দেখে মুখের বাঁধন খুলে দেয়। আমি অনুরোধ করতে থাকি যেন আমার সাথে খারাপ কিছু না করে।
সে বলে, ” আমার সাথে বাড়াবাড়ি করার সময় মনে ছিল না? ডিপার্টমেন্টে ওইদিন ওতগুলো মানুষের সামনে গায়ে হাত তুলেছিলি। তোকে আমি ক্ষমা করব?”

আমি চিৎকার করতে থাকলে সে শব্দ করে হেসে উঠে বলে, ” এই সময়ে আমার হাতে থেকে তোকে বাঁচাতে কেউ আসবে না। ”

আমি চিৎকার করে কান্না করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সে আমার মুখে, গলায় স্পর্শ করতে থাকে আমি শুধু ছটফট করে যাচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে সে বলে, ” এরকম নিস্তেজ দেহ আমাকে সুখ দিবে না, তুই চিৎকার করবি নিজেকে রক্ষার জন্য ভিক্ষে চাইবি তবেই তো মজা হবে!”

এই বলে আমার হাতের বাঁধন, পায়ের বাঁধন খুলে দেয় সে। এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সে জানতো না আমি আত্মরক্ষায় পারদর্শী। সে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই আমি পা উপরের দিকে বাঁকা করে হাটু দিয়ে ওর পু*রু*ষাঙ্গে আর তলপেটে আঘা*ত করি। সাথে সাথে ও আমার ওপর থেকে পাশে পড়ে যায়। পাশের সাথে কিছু একটা বাধতে সেটা দিয়ে ওর সারাশরীর আর মাথায় আঘাত করি আর তাতেই সোহেল সেন্সলেস হয়ে যায়। তারপর থেকে চিৎকার করে সাহায্য চাইতে থাকি। এশারের দিকে মনে হয় কেউ ঘরের দিকে আসছে তখন সাহায্য চেয়েও কোন কাজ হয় না। শরীর অসুস্থ হতে থাকে আমি এক কোণায় বসে পড়ি। তারপর জানি না কীভাবে মাঝরাতে আমাকে ওখান থেকে উদ্ধার করা হয়।”

” যাক, তাহলে আপনি ধর্ষ*ণ হন নি তাহলে,তাই না?”

পুলিশ অফিসারের এমন প্রশ্নে নিহান বলে, ” ও তো সবটা বলল, ওরকম কিছু হলে নিশ্চয়ই বলতো। ”

” স্যরি স্যার, আসলে….”

” নিজের কাজ করুন। নম্বর রেখে দিন কোর্টে দেখা হচ্ছে। এই ছেলের সর্বোচ্চ শা*স্তি আমি চাই।”

” অপরাধ অনুযায়ী সে শা*স্তি পাবে স্যার। ”

পুলিশ অফিসারের থেকে বিদায় নিয়ে নিহান আর শুভ্রতা বেরিয়ে যায়। তাদের এখন বাসায় ফিরতে হবে তার আগে নিহান সিদ্ধান্ত নেয় শুভ্রতার মন একটু ভালো করতে হবে। তাই সে বাড়ি না গিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার মনোভাব পোষণ করে। শুভ্রতা আনমনে নিহানের পাশে হাটতে থাকে।

#চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here