শুভ্ররাঙা ভালোবাসা পর্ব -০৬

#শুভ্ররাঙা_ভালোবাসা
#তানিয়া_মাহি(নীরু)
#পর্ব_০৬

” সাহিল স্যার হ*ট না?”
শুভ্রতার কথায় জিহ্বায় কামড় দেয় শাকিরা। মাত্রই সে পিছন থেকে দৌঁড়ে আসছিল শুভ্রতার সাথে ক্যান্টিনে যাবে বলে। কাছাকাছি আসতেই শুভ্রতার আজগুবিমার্কা কথা শুনে কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করছে তার। ফাউজিয়া তো হাটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। শাকিরা টানাপায়ে তাড়াতাড়ি শুভ্রতার কাছে এসে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ায়।

” তোর মুখে কি কিছু বাধে না শুভ্রতা?”

” কেন আমি আবার কি বললাম?”

ফাউজিয়া এবার নরমস্বরে বলে, ” স্যারকে কেউ হ*ট বলে শুভ্রতা?”

” ওমা হ*টকে হ*ট বলব না?”

” স্যারকে যদি ভালো লাগে বড়জোর বলতে পারিস স্যার সুন্দর। স্যারের সাথে কি এসব শব্দ যায় বল?”

অসহায়ের মতো মুখ করে কথাটা বলে শাকিরা। শুভ্রতা এবার তার কাছাকাছি এসে বলে, ” কে যেন আমার ভাইকে বলেছিল?”

শুভ্রতার কথা শুনে ফাউজিয়া শাকিরার দিকে তাকায়। সে এবার আরও বেশি অসহায়বোধ করছে। সে বন্ধু বানাতে পারে না ঠিক আছে কিন্তু কপালে এমন মেয়েবন্ধু জুটবে! তার বাবার বলা কথাটা এবার কানে বাজতে থাকে, ” সবসময় খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলবি মা, একা থাকবি তবু খারাপ বন্ধু বানাবি না। মাথায় রাখবি সঙ্গদোষে লোহা ভাসে।” তবে এবার শুভ্রতার সঙ্গ ছেড়ে দেওয়া উচিৎ? পরক্ষণেই মন বলে ওঠে, ” শোন ফাউজিয়া, কাউকে হ*ট বললেই কেউ খারাপ হয়ে যায় না। শুভ্রতাকে ছাড়লে তুই আর ওর মতো বন্ধু পাবি না।”

” ওটা তো আর স্যার না। স্যারকে কেউ হ*ট বলে? ভালো হয়ে যা শুভ্রতা। ছি, কি সব বলিস তুই, সময় থাকতে ভালো হয়ে যা।”

” আমার বাপের কড়া নির্দেশ ভালো হওয়া যাবে না। ভালো হলেই মানুষ পেয়ে বসবে। দেখিস না খারাপ মানুষের সাথে কেউ লাগতে আসে না? খারাপ মানুষকে সবাই ভয় পায়। ভালো মানুষকে সময় সুযোগ পেলে সবাই বাঁশ দেয়, আইকাওয়ালা,আছোলা, গিরাসহ সব ধরণের বাঁশ।”

” তোর সাথে কথা বলা মানেই ভুল করা।”

শাকিরার কথা শুভ্রতা খুব একটা পাত্তা না দিয়ে বলে, ” তোর আবার কি হলো ফাউজিয়া?”

” কিছু না। কিছু খেতে যাবি না? ক্লাশ শুরু হয়ে যাবে আবার।”

” হ্যাঁ চল। ”

তিনজন হাটা শুরু করে দেয় ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে।হাটতে হাটতে ফাউজিয়া এবার আগ্রহ নিয়ে বলে ওঠে, ” তুই গত দুইদিন আসিস নি কেন? জানিস এই ক’টা দিনে আমার বাজে অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন কেমন যেন ক্লাশে তুই না থাকলে একা একা লাগে। প্রতিদিন ক্লাশে আসবি, কলেজ বাঙ্ক দেওয়া একদম উচিৎ না, বড়সড় কারণ না থাকলে বাদ দেওয়াও উচিৎ না।

” কেন বেইব মিস করছিলে?”

শুভ্রতার এমন উদ্ভট উদ্ভট শব্দ শুনে ফাউজিয়ার কেমন একটা লাগে। শুভ্রতার অনুপস্থিতি বা চুপ থাকা তার আরও খারাপ লাগে। এই প্রথম কেউ তার সাথে এতটা মিশেছে নিজে থেকে। দুজন মিলে ভালো সময়ও কাটায়। ক্লাশে আসলে দুজন সময় পেলেই পড়া নিয়ে বসে যায়। গত দুইদিন শুভ্রতা ক্লাসে না আসায় ভীষণ একা একা লেগেছে তার।
শুভ্রতা আবার বলে ওঠে, ” কোথায় হারিয়ে গেলি?”

” তোর নম্বরটা আজ দিবি। ”

” আচ্ছা নিস, এখন চল ক্ষিধে পেয়েছে।”

কথাটা বলেই শুভ্রতা ফাউজিয়ার হাত ধরে টানতে টানতে ক্যান্টিনের দিকে চলে যায়। গরম গরম সিঙ্গারা আর তেতুলের সাথে ঝাল মেশানো টক, উফফ! কিছুতেই হাতছাড়া করা চলবে না।

শুভ্রতা আর শাকিরার বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় চারটা পয়ত্রিশ। বাড়ি থেকে ভার্সিটি প্রায় একঘণ্টার পথ। অনেক কষ্ট করে যাতায়াত করতে হয় তাদের। তাই তারা দুজন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সপ্তাহে তিনদিন ক্লাশ করবে, দুই দিন ক্লাশে যাবে না আর শুক্রবার, শনিবার এমনিতেই ছুটি। ফাউজিয়ার বাড়ি কাছে হওয়ায় সে প্রতিদিন যাবে আর পড়া জানিয়ে দেবে তাদের। আজ বেশি দেরি হয়েছে কারণ শাকিরা রায়হানের জন্য একটা শার্ট, ওয়ালেট কিনে নামপরিচয় লুকিয়ে কুরিয়ারে পার্সেল করে পাঠাতে গিয়েছিল। এসব দেখলে শুভ্রতার পুরোনো কথা মনে হয় ইমতিয়াজ যখন ঢাকা ছিল, সে কতকিছু কিনে কিনে যে তাকে পাঠিয়েছে! ওসব ভাবলেই যেন বুকে ব্যথা করে তার৷ তাই আর সে ইমতিয়াজের কথা ভুলে থাকতে চায়, কঠিনভাবে ভুলে যেতে চায় তাকে তবু কিছু কিছু সময় মনে হা*না দেয় সে, খুব বাজেভাবে।

শুভ্রতা বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে কলিংবেল চাপছে। মিনিট পেরিয়ে গেলেও কেউ দরজা খুলছে না। বারবার সুইচ চাপতে থাকে সে। মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে স্নিগ্ধা এসে দরজা খুলে দেয়।

” এতবার বেল বাজছে তাও দরজা খুলছিস না কেন? এই সময়ে কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলি নাকি?”

” আমি গোসলে ছিলাম। তোমার বেল বাজানো শুনে তাড়াতাড়ি আসতে হলো। ”

” হয়েছে হয়েছে সর এখান থেকে। আর এই যে ব্যাগটা ধর, তাড়াতাড়ি প্লেটে বেড়ে রুমে দিয়ে যাবি আমার খুব গরম লেগেছে গোসল করব।”

স্নিগ্ধা ভালো করে ব্যাগটা পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারে ব্যাগের ভেতরে বিরিয়ানির প্যাকেট আছে। খুশিতে তার চোখমুখ চিকচিক করে ওঠে।

” তুমি যাও আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি। মরিচ নেবে তো তাই না?”

” হ্যাঁ দুইটা দিবি। মা কই?”

” নামাজে। তুই পড়বি না? তাড়াতাড়ি যা।”

” আচ্ছা তুমিও যাও ফ্রেশ হও।”

শুভ্রতা নিজের রুমে চলে যায়। স্নিগ্ধাও বিরিয়ানির প্যাকেটগুলো নিয়ে টেবিলে রেখে নিজের রুমে চলে যায় আসরের নামাজ আদায় করতে।

সন্ধ্যায় আয়েশা বেগম শুভ্রতার পছন্দের নাস্তা বানাচ্ছিলেন। মেয়েটাকে কয়েকদিন ফুরফুরে মেজাজে দেখা যাচ্ছে। ভেতরের কষ্টটা হয়তো একটু কমতে শুরু করেছে। তিনি নাস্তা বানাচ্ছিলেন আর শুভ্রতা সেখানে এক কোণায় বসে একটু একটু করে খাচ্ছিল। দিনরাত কান্না করতে থাকা মেয়েটাকে এভাবে যে এত জলদি এত খুশি দেখতে পাবে সেটা আশা করেন নি। যদিও শুভ্রতা নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে সক্ষম নইলে তিন বছরের এত কষ্ট লুকিয়ে রাখে!
আয়েশা বেগম একটা প্লেটে কিছু নাস্তা সাজিয়ে স্নিগ্ধাকে ডাকেন। স্নিগ্ধা বই বন্ধ করে রান্নাঘরে চলে আসে। কয়েকদিন পরই তার পরিক্ষা শুরু হবে তাই পড়ার চাপ অনেক। সে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়।

” কি হয়েছে বলো, ডাকছো কেন?”

” প্লেটটা তোর বড়মাকে দিয়ে আয়, মেয়ে দুইটা এসব পছন্দ করে।”

” তুমি এটার জন্য ডেকেছো? আমি পড়ছিলাম। আপুকে বলো। আমি পারব না।”

শুভ্রতা হাতের ফোনটা রেখে বলে, ” যা তুই পড় গিয়ে আমি নিয়ে যাচ্ছি। নেহাকে পাঠিয়ে দেব, দুজন একসাথে পড়বি।”

” আচ্ছা ঠিক আছে।”

শুভ্রতা এবার আয়েশা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে, ” মা ওর ফোনটা নিয়ে নাও, পড়ার সময় ফোন দিবে না একদম।”

” আমিই দিয়ে যাচ্ছি, আমি সত্যিই পড়ছিলাম। তোমার মতো বসে বসে ফোন টিপছিলাম না।” বলেই স্নিগ্ধা ওখান থেকে নিজের রুমে চলে যায়।

আয়েশা বেগম নাস্তার প্লেটটা শুভ্রতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ” তাড়াতাড়ি চলে আসিস মা।”

শুভ্রতা মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আয়েশা বেগম বাকি কাজগুলো সারতে থাকেন।

রাবেয়া বেগম কারো সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। রুমের বাহিরে থেকে শুভ্রতা ‘বড়মা’ বলে ডাকতেই বাহিরে তাকিয়ে শুভ্রতাকে দেখে এগিয়ে আসেন। ফোনের ওপাশের মানুষকে একটু হোল্ড করতে বলেন। তারপর শুভ্রতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

” দেড় মাস কম সময় না, আজ এই প্রথমবারের মতো এসে বড়মাকে ডাকা হচ্ছে?”

শুভ্রতা অভিমানী গলায় বলে, ” তুমি গিয়েছিলে আমাকে দেখতে? তুমি যেতে পারতে না বলো?”

” ওহ আচ্ছা শেষে দোষ আমার কাধেই এসে পড়ল?”

” তো পড়বে না?”

” আচ্ছা আচ্ছা। কি আছে প্লেটে?”

” মা নাস্তা পাঠিয়ে দিল আবিরা আপু আর নেহার জন্য। তুমি কারো সাথে কথা বলছিলে?”

” হ্যাঁ নিহান কল দিয়েছে প্রায় দুই সপ্তাহ পর। ওর ওখানে তো তেমন ফোনে কথা বলার সুযোগ নেই। তুই কথা বলবি? এই নে ধর তুই নিহানের সাথে কথা বল আমি ওদের নাস্তা দিয়ে আসছি।”

” না, না বড়মা……”

শুভ্রতাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে প্লেটটা হাত থেকে নিয়ে ফোনটা শুভ্রতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। সে এখন কি করবে! এতদিন পর ওই মানুষটার সাথে কথা বলতে হবে ভেবেই যেন গা শিউরে উঠছে তার। সে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা কানে নেয়। অস্ফুটস্বরে বলে,

” আসসালামু আলাইকুম। ”

ওপাশটা কিছুক্ষণ নিরব, দুইটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলার শব্দ পাওয়া গেল। তারপর কেউ নিম্নস্বরে সালামের জবাব দিয়ে জিজ্ঞেস করল,” কেমন আছিস? ”

” এই তো আলহামদুলিল্লাহ, আপনি কেমন আছেন নিহান ভাই?”

শুভ্রতা একটু স্বাভাবিক হয়েই প্রশ্নটা করল। যদিও ওপাশের মানুষটা কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিয়ে কথা বলছে তবুও শুভ্রতা স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছে যেরকম শুভ্রতাকে সবাই চিনতো ঠিক সেরকম হওয়ার চেষ্টায় আছে সে। মনে ভয় নিয়ে একটা প্রশ্ন সে করে বসলো,

” বিয়ে কবে করছেন নিহান ভাই? আপনার ট্রেইনিং এর আর কতদিন বাকি? বাড়ি ফিরে আমাদের জন্য ভাবি এনে দিতে হবে না?”

” বিয়েটা সেই মানুষের ওপর নির্ভর করছে যাকে আমি চাই। সে যেদিন চাইবে সেদিনই ভাবি পেয়ে যাবি।”

নিহানের কথাটা শুভ্রতা বুঝতে পারলো না। কেমন দুমুখো শোনালো কথাটা! তাই সে অন্য কথা তুলল আর মনে মনে বড়মা আসার অপেক্ষা করতে থাকল সে।

রাবেয়া বেগম মেয়ের রুমে দেরি করছেন যেন নিহান শুভ্রতার সাথে একটু কথা বলতে পারে। প্রায় পাঁচ মিনিট পর শুভ্রতা নিজেই আবিরার রুমের দরজায় এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ায়। রাবেয়া বেগম শুভ্রতাকে দেখে ডাক দিয়ে পাশে বসতে বলে। শুভ্রতা গিয়ে ফোনটা এগিয়ে দেয় আর বলে,

” আমি তোমার ছেলের সাথে কি কথা বলব? নাও কথা বলো আমি বাসায় যাই বাবা চলে আসবে।”

” শুভ্রতা তোর সাথে আমার কথা আছে।”

আবিরা কথাটি বলেই শুভ্রতার দিকে এগিয়ে আসে। দুজন একসাথে কাছাকাছি দাঁড়াতেই রাবেয়া বেগম ফোনে কথা বলতে বলতে রুম থেকে চলে যান। আবিরা শুভ্রতাকে হাত ধরে টেনে বিছানায় বসে।

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here