শুভ্র বর্ষণ পর্ব ৫

#শুভ্র_বর্ষণ
#প্রভা_আফরিন
#পর্ব_৫

হালিমা কাজে এসেছে আজ দুইদিন পর। বৃষ্টির ছুতোয় গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলো। এলাকায় এসেই শুনলো মিহার বিয়ে হয়ে গেছে। কানে পৌছানো মাত্রই তড়িঘড়ি করে এ বাড়ি চলে এসেছে। মিহা ধোয়া বাসনগুলো টেবিলে রাখছিলো। হালিমা এসেই চিলের গলায় কথা বলা শুরু করলো। সে কথা বললে আশেপাশের তিন বাড়ি মাইক ছাড়াই শোনা যাবে। মিহাকে দেখেই বললো,

“আফামনি আপনে নাকি বিয়া কইরালাইছেন?”

মিহা হাসলো হালকা। মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। শিরীন বেগম রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে বললো,
“শুনেই তো এসেছিস। তা আবার জিজ্ঞেস করার কি আছে?”

হালিমা গালে হাত ঠেকিয়ে নিজে নিজেই বলে,
“আমারতো বিশ্বাসই হয় না। একদিনেই হইয়া গেলো?”

“সেই কথা ছাড়। দুইদিন আসিস নি কেনো?”

হালিমা এবার পড়নের ওরনাটা কোমড়ে প্যাচাতে প্যাচাতে বললো,
“আর কইয়েন না। আমার মামাতো বইনের মাইয়া জুলি। মাত্র এইটে উঠছে। হাত পায়ে বড় হইয়ে গেছে তাত্তাড়ি। এলাকার বদ পোলারা নজর দেয়। হের লাইগ্যা বিয়াডা দিয়া দিলো। দিন কালতো ভালা না। যদি কেউ ক্ষতি কইরা দেয় পরেতো আর পার করন যাইবো না। আমারে দাওয়াত দিছিলো। গিয়া বুঝাইলাম এতো জলদি বিয়া দেওন ভালা না। আর কয়ডা দিন দেহো। হেরা কি আর আমার কথা হুনে? গেরামে যেইডা চলে আরকি। দিয়া দিলো। আমার আর কি খাইয়া আইলাম দাওয়াত।”

হালিমার কথা শেষ হতেই মিহা হেসে ফেললো। প্রতিবার না বলে গ্রামে যাওয়ার পরই এমন একটা গল্প নিয়ে আসে সে। হালিমা মিহাকে সরিয়ে দিয়ে বাসনগুলোতে হাত লাগালো। শিরীন বেগম বললো,

“হয়েছে? আষাঢ়ে গল্প শেষ হলে এসো মাছ কাটবে। সকালে এনেছে নরম হয়ে যাবে।”

“আষাইঢ়্যা গল্প লাগে আপনের? থাক কি আর কমু। তয় খালা ভালা কথা মনে পড়লো। এইখানে আহনের সময় তানিয়ার মায় ডাইক্কা জিগাইলো আফামনির কথা। কয় আনোয়ারের ভাগ্নীরে এমন চুপে চাপে বিয়া দেওনের কারন কি? কিছু ঘটাইছে নাকি যে তাড়াহুড়া কইরা বিয়া দিলো?”

কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে গেলো। সাধারন পারিবারিক একটা আয়োজনকে নিয়েও মানুষের এতো সন্দেহ? মিহা মন খারাপ করে ফেললো। হালিমা আবার বললো,

“তয় আমিও কম যাই না। আমাগো মিহা আফামনি কতডা ভালা এইডা সবাই জানে। কইয়া দিছি, হগলরে নিজের মাইয়াগো মতো জানি না ভাবে।”

শোভা কাছেই ছিলো। কথাগুলো শুনে উঠে এসে মিহাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“এইসব ফালতু মানুষের কথায় ভুলেও মন খারাপ করবে না আপু। নিজের মেয়েতো অন্যের সাথে পালায় তাই সবাইকে তেমনই ভাবে। আমার কুকুরদের দিয়ে আজ ওদের বাড়িতে হামলা করবো।”

“দরকার নেই। ওসব মানুষদের ধারেকাছেও যাবে না কেউ। সাধারন বিষয়কেও অতিরঞ্জিত করতে ছাড়ে না এরা।” শিরীন বেগম বকতে বকতে রান্না ঘরে ঢুকে গেলো। মানুষ আজকাল সামান্য বিষয়ও সাধারন ভাবে নিতে জানে না। সবসময় অন্যের দোষ খোজা লাগবেই।

____________

মিহার ইদানীং ভাল্লাগে না রোগে ধরেছে। কিছুই ভালো লাগে না। মনে হয় যেন সবকিছু নেতিয়ে আছে। নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে। আগের রুটিন সব বদলে গেছে। সেখানে স্থান নিয়েছে মন খারাপেরা। প্রতিদিন ভার্সিটি যাওয়া আর হয় না। মামার সাথে বসে আড্ডা দেওয়া হয় না। বই পড়তে ভালো লাগে না।সবকিছুতে কেমন মলিনতা ছেয়ে আছে। এই সব বদলের কারন নিশান্ত। সেই যে বিয়ের পরদিন সকালে গেলো পুরো সপ্তাহে আর এলো না। মুঠোফোনে দুমুঠো ভাব আদান প্রদানে মিহার মন ভরে না।

নিশান্তের মনে ও ঠিক ঢুকতে পারছে না। সামনা সামনি কথা না হলে কি আর মন বোঝা যায়? শোভা বেশ কয়েকবার এই নিয়ে কথা বলেছে। নিশান্তকেও জানাতে চেয়েছে মিহার মন খারাপগুলো। কিন্তু সমস্যাটা হলো লজ্জা। মিহা লজ্জা পায় নিজেকে প্রকাশ করতে। নিশান্ত বোধহয় খুব পরিশ্রমের পর বাড়ি যায়। তাকে মন খারাপের কথা বলে বিচলিত করতে মায়া হয় বড্ড।
আজ বৃহস্পতিবার। কাল নিশান্তের অফিস বন্ধ। মিহা মনে মনে চাইছে নিশান্ত আসুক। একটা পুরো দিন ওর সাথে কাটাক। কিন্তু সে আজ সারাদিনে একবার কল পর্যন্ত দেয়নি। মিহা অবশ্য দিয়েছিলো। এই কয়দিনে মনে পড়লেই নিশান্তকে ফোন দিয়েছে সে। কথাও হয় অল্প স্বল্প। তবে আজ ফোন রিসিভ করে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে কেটে দিয়েছে নিশান্ত। তারপর আর খবর নেই। এতো এতো মন খারাপ নিয়ে থাকা যায়?

“চলো হাটতে বের হবে। খোলা পরিবেশে মন ভালো হয়ে যাবে। মিমদের বাড়ির পেছনের ঝোপে বিড়ালের ছয়টা নতুন বাচ্চা হয়েছে। এখনো চোখ ফোটেনি। তোমায় দেখাবো চলো। ছানাপোনাদের দেখে মন ভালো না হয়ে যাবে কোথায়।”

শোভা মিহাকে ঠেলতে লাগলো যাওয়ার জন্য। মিহা ভাবলো অনেকদিন বের হওয়া হয় না। আজ একটু নাহয় শোভার মতো উড়া যাক। দুজনে বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে। সময়টুকু মিহার খুব ভালো কাটলো। শোভার পাগলামি দেখে হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা মিহার। কে বলবে এই মেয়ের বয়স আঠারো পেরিয়েছে।
বাড়িতে ফিরেই মিহা বাগানে ঢুকলো। নতুন ফুলের কুড়ি দেখা যাচ্ছে অনেক। যে পরিমান বৃষ্টি হয় তাতে এখন আর পানি দেওয়ার দরকার পরছে না। পরিবেশে মাটির সোদা গন্ধ বিরাজমান। ঘাসগুলো বৃষ্টির ফলে আরো সবুজ হয়ে উঠেছে যেন।বেলীফুলের গাছের দিকে তাকিয়ে রইলো মিহা। ফুল নেই। নিশান্তের দেওয়া সেই ফুলের মালাটা মিহা এখনো সযত্নে রেখে দিয়েছে বইয়ের ভাজে। এটা তার স্বামীর থেকে পাওয়া প্রথম উপহার। যদিও ওর বাগানেরই ফুল। তাতে কি? মালাটায় নিশান্তের ছোয়া রয়েছে, যত্ন রয়েছে সেটাইতো আসল। ফুলতো উপলক্ষ মাত্র।

নীল আকাশে সিদুর রাঙা মেঘের ঘনঘটা। সূর্য মহাশয় বিশ্রামে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তার কমলা আভায় শেষ বিকেলটুকু মাখামাখি। মাখামাখি শোভাও। শোভা ছাদে উঠে কানে হেডফোন গুজে গান শুনছে। গুনগুন করে গাইছেও। ওর মতো নির্ঝঞ্ঝাট, সুখী মানুষ বোধহয় এই মুহূর্তে কেউ নেই। গুনগুন করতে করতেই চোখ গেলো ইংলিশ আন্টির বাড়ির দিকে। ওদের বাড়ির ছাদ থেকে ইংলিশ আন্টির বাড়ি স্পষ্ট দেখা যায়। বাড়ির সামনে টফি বসে আছে। আপন মনে লেজ নাড়াচ্ছে। দূর থেকে কিভাবে যেন শোভাকে দেখতে পেলো সে। দেখা মাত্রই ডেকে উঠলো। শোভা হাত দিয়ে ঘুষি দেওয়ার মতো ইশারা করলো। তা দেখে টফি এবার আরো জোরে ডাকতে শুরু করলো। শোভা নিচে নেমে এসে টফির কাছে গিয়ে হাটু গেড়ে বসলো। বললো,

“তোর বাড়ির প্রতিটা ব্যক্তির হওয়ার কথা ছিলো এক। কিন্তু ভাগ্য দোষে হয়ে গেছে আরেক। তোর শিয়াল হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু হয়ে গেলি কুত্তা। ইংলিশ আন্টির জোকার হওয়ার কথা ছিলো হলো না। আর তোর ওই নাক উঁচু, বজ্জাত, দাম্ভিক লোক রিয়াদ, ওর হওয়া উচিৎ ছিলো সাপ। কিভাবে সাপের মতো শান্ত দৃষ্টিতে অপমান করে চলে যায় দেখছিস? এই বাড়িটা চিড়িয়াখানা হওয়ার যোগ্যতা রাখে বুঝলি।”

টফি দাত বের করে তাকালো শোভার দিকে। শোভার কথা যে ওর পছন্দ হয়নি তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। ভাগ্যিস টফি বাধা আছে। নাহয় আজ শোভার চৌদ্দ ইঞ্জেকশনের কাজ বেধে যেত।
শোভা বসা থেকে উঠতেই রিয়াদের সামনে পড়লো। বাহিরে থেকে আসছে সে। ভাগ্যিস দেরিতে আসলো। কথাগুলো শুনে নিলে কি হতো?
টফি রিয়াদকে দেখেই যেন নালিশের সুরে ডাকাডাকি শুরু করে দিলো। রিয়াদ ভ্রু কুচকে শোভার দিকে তাকিয়ে বললো,

“টফি রেগে আছে কেনো? তুমি কি করেছো ওকে?”

শোভা বললো,
“আমি আবার কি করবো? আপনার টফিকে আপনিই জিজ্ঞেস করে নিন।”
শোভা আর দাড়ালো না। ছুটে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলো। বেশ হয়েছে। আজ মুখের ওপর কথা বলেছে। সবসময় খালি অন্যকে উপেক্ষা করে। হুহ।

___________

রাত নয়টা বাজে। সবে রাতের খাবার শেষ করলো সবাই। মিহা তেমন কিছুই খেতে পারলো না। ওর পরিবর্তন গুলো সবারই চোখে বাজছে। হয়তো বুঝতেও পারছে। তবে এই নিয়ে কেউ কিছু বললো না। আনোয়ার সাহেব উদাসী মিহাকে দেখে জানতে চাইলো মন খারাপের কারন। আজকাল তেমন গল্প করা হয় না মেয়েটার সাথে। ব্যবসার কাজ গুছিয়ে আনছেন বলে ফিরতে রাত হয়। মিহা একটা হাসি দিয়ে কাটিয়ে দিলো মামাকে।

ঘরে এসে পুনরায় মোবাইল চেইক করলো। কোনো কল বা ম্যাসেজ নেই। তার কি একটুও সময় হলো না কথা বলার? থাক আর বলবেই না কথা। ফোন বন্ধ করে ড্রয়ারে রেখে দিলো। হাতের কাছে থাকলেই বার বার চেইক করতে ইচ্ছে করবে। মিহা একটা বই নিলো পড়বে বলে। শোভা কোলে বালিশ নিয়ে এলোমেলো চুলে এসে ধপ করে মিহার বিছানায় শুয়ে পড়লো। মিহা ওকে দেখে বললো,

“আমার বিছানায় কি করিস?”

“ঘুমাবো।”

“হঠাৎ এখানে ঘুমাবি যে?”

“বিয়ে হয়ে গেছে বলে কি এখন তোমার রুমে আমার যায়গা হবে না? বাচ্চা একটা মেয়ে আমি। কতই বা বয়স। রাতে একা একা ভয় পাই। তুমি পর হয়ে গেছো বিয়ে হয়ে। যাও থাকবো না গেলাম আমি।”

শোভা মন খারাপের ভান ধরে উঠে যেতে নিলে মিহা চুল টেনে ধরলো।

“হয়েছে আর ঢং করতে হবে না। ঘুমা এখানে। তবে মাঝরাত অবদি যেন মোবাইলের আলো না দেখতে পাই। তাহলে কিন্তু জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলবো তোকে আর তোর মোবাইলকে বলে দিলাম।”

শোভা ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নেড়ে শুয়ে পড়লো। মিহা হাতের বইটা রেখে লাইট অফ করে বিছানায় এলো। একটা ঘুম দরকার। মনটা যদি তাহলে একটু হালকা হয়।
বালিশে মাথা দিয়ে বাতাসে একটি বিষাদের নিশ্বাস ছড়িয়ে দিলো মিহা। সেই নিশ্বাসে একটা মন খারাপের কথা মিশে গেলো। মনে মনে আওড়ালো,

“আপনি নিষ্ঠুর। বড্ড নিষ্ঠুর।”

শোভার ঘুমের মধ্যে হাত পা ছোড়াছুড়ির অভ্যাস নতুন নয়। আগে মিহা এবং শোভা একই সাথে ঘুমাতো। মিহা ঘুমের মাঝে বেশ কয়েকবার সজাগ পেতো শোভার হাত পা ছোড়াছুড়ির জন্য। ঘুমের মাঝে বিড়বিড় করে কত কথা যে বলে। মিহার মাঝে মাঝে খুব হাসি পায়। সবার আদরে মেয়েটার আর শুধরে ওঠা হলো না।

আজও ঘুম ভেঙে গেলো মিহার। পেছন থেকে শোভা ওকে জড়িয়ে ধরেছে। পাশ ফিরে শোভাকে ছাড়াতে গেলেই আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ওর কাধে মুখ গুজলো। মিহার সারা শরীর কেপে উঠলো। এক লহমায় বুঝে গেলো মানুষটা শোভা নয়। তার উষ্ণ নিশ্বাসে মিহার হাত পা হিম হয়ে গেলো। ও নড়ে উঠতেই মানুষটা ঘুম জড়ানো কন্ঠে মিহার গলায় ঠোঁট ঠেকিয়ে আদো আদো ভাষায় বললো,

“ঘুমাতে দাও বউ। খুব ক্লান্ত আমি। মান অভিমান কালকের জন্য তোলা রইলো।”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here