সেই মেয়েটি আমি নই পর্ব -০২

সেই মেয়েটি আমি নই
.
২য় পর্ব
.
টেবিলে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, কই মাছ ভুনা, লাল শাক আর ডাল এনে রেখেছে তুলি।
ঘুম থেকে উঠে তাকে শাড়ি পরতে দেখে এমনিতেই ইশতিয়াকের মেজাজ ফুরফুরে হয়ে আছে। এখন খাবার টেবিলে গিয়ে তার মন ভালো হওয়ার উপলক্ষ যেন আরেকটা বেড়ে গেল। আজ দিনটা এতো সুন্দর কেন? আজ কি বারবার মন ভালো হওয়ার ঘটনা ঘটবে? কই মাছ ভুনা তার ভীষণ পছন্দের খাবার। ভাজা কই মাছে একটু ঝোল বেশি হতে হবে, ভেসে থাকবে ফালি-ফালি করা কাঁচা মরিচ। লবণ বেশি হতে হবে, যেন একদম লাগিয়ে খেতে না হয়। বাটির দিকে তাকিয়েই মনে হচ্ছে সবকিছু ঠিকঠাক। জিভে জল চলে এসেছে। অন্যদিন সে ডালে লালশাক মিশিয়ে নিয়ে শখ করে খায়। সঙ্গে থাকে কাঁচামরিচ আর লেবু। কিন্তু আজ এসব অবহেলিত।
দু’দিন আগে এই টাটকা কই মাছগুলো ইশতিয়াকদের গ্রামের বাড়ি থেকে এসেছে৷ তার মা পাঠিয়েছেন এখানে। কারণ সবাই জানেন ইশতিয়াক কই মাছ ভুনা ভীষণ পছন্দ করে।

তুলি চেয়ার টেনে না বসে ইশতিয়াকের আগ্রহ নিয়ে খাওয়া দেখে ঠোঁট টিপে হাসছে। সেটা চোখ এড়ালো না তার।

– ‘আরে তুমি এই সময় আবার এভাবে হাসছো কেন? আমাকে আজ মেরে ফেলবে না-কি তুলি?’

তুলি চেয়ার টেনে বসে হাতের মুঠোয় থুতনি ঠেকিয়ে বললো,

– ‘কিভাবে হাসলাম?’

– ‘ঠোঁট টিপে।’

– ‘তো কি হয়েছে?’

– ‘খাওয়ার সময় এত ব্যখ্যা করতে পারবো না তো, অন্যদিন বলবো।’

তুলি নির্লিপ্ত চেহারায় বললো,

– ‘কাকে বেশি ভালোবাসেন, কই মাছ না-কি আমাকে?’

– ‘মহিলা মানুষের অদ্ভুত চিন্তাভাবনা, তোমাকে ভালোবেসে যা করি, কই মাছকে কি তা করতে পারবো? তোমার যা আছে কই মাছের কি তা আছে?’

তুলি ফিক করে হেঁসে আবার নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

– ‘তবুও বলুন।’

– ‘হ্যাঁ জানি তো, মহিলা মানুষের “তবু্ও” আরেকটা আছে। কই মাছকে খাওয়া যায় তোমাকেও কি খাওয়া যাবে?’

– ‘আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন?’

– ‘কিভাবে?’

– ‘কেমন রেগে রেগে।’

– ‘তুমি খাও তো।’

– ‘না খাব না।’

– ‘তাহলে এভাবে তাকিয়ে থেকো না।’

– ‘কেন?’

– ‘এভাবে তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি লাগে।’

– ‘বলেন কি? কেন?’

– ‘এভাবে তাকালে যে অস্বস্তির লাগে জানো না?’

– ‘না তো।’

– ‘তুমি ধরো একা একটা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ। তোমার দুই হাতে কোনো ভ্যানিটিব্যাগ নেই, কলম নেই। মানে হাতকে ব্যস্ত রাখার কিছুই নেই । আশেপাশে তাকিয়ে দেখে দেখে যাওয়ার মতো বিশেষ কিছু নেই। এই পরিবেশে তুমি হাঁটছো, আর কেউ খানিক দূর থেকে বসে তোমাকে দেখছে। এবং সেটা তুমি বুঝতে পারছো। তখন কেমন লাগে জানো? এক ধরনের অস্বস্তিবোধ হয়। মানুষকে বিব্রত করার জন্য আগে এগুলো করতাম।’

– ‘মানুষকে না, বলুন মেয়েদেরকে একা পেলে এভাবে দেখতেন।’

ইশতিয়াক তাকিয়ে দেখে তুলির মুখময় দুষ্টু হাসি ছড়িয়ে আছে। সে শাসানোর ভঙ্গিতে বললো,

– ‘এই তুমি কি খাবে না?’

– ‘একটু আগেই বললাম তো খাব না।’

– ‘খাবে না কেন?’

– ‘এমনিই।’

– ‘চুপ, খাও তাড়াতাড়ি।’

তুলি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললো,

– ‘হাত কাঁটা।’

– ‘বলো কি! কিভাবে?’

– ‘এইতো আমার সতীন কই মাছগুলোকে কাঁ*টতে গিয়ে বুড়ো আঙুল কেঁ*টে গেল।’

– ‘এই জন্য খাচ্ছ না?’

– ‘হু, ভাবছিলাম আপনি খাইয়ে দেবেন। কিন্তু কই মাছ দেখে তো দিন-দুনিয়া ভুলে গেছেন।’

ইশতিয়াক পুরুষালি গলায় হেঁসে উঠলো। তার হাতের প্লেট নিয়ে গেল তুলির পাশের চেয়ারে।

– ‘চলো এক প্লেটেই খাই। আমি নিজে এক লোকমা খাব, তোমাকে দেবো এক লোকমা।’

– ‘জি না, আপনার খাওয়ায় সমস্যা হবে, থাক পরে খাওয়াবে। না হয় আমি চামচ দিয়ে খাই।’

– ”দুটি দেহ একটি মন’ বলে প্রেমিক মহলে একটা কথা আছে না?’

– ‘হুম।’

– ‘আমাদের দু’টি মুখ, একটি পেট।’

তুলির কাঁচভাঙা হাসিতে পুরো ঘর ভরে উঠলো।
ইশতিয়াক এক লোকমা ভাত বাড়িয়ে দিল ওর দিকে। তুলি ইচ্ছা করে ভাত মুখে নিয়ে দাঁত দিয়ে মৃদ চাপ দিয়ে ওর আঙুল ছাড়লো।

– ‘আশ্চর্য তুমি ভাতের সঙ্গে আমার আঙুল খাবে না-কি?’

– ‘কেন কি হয়েছে?’

– ‘কা*মড় দিচ্ছিলে যে।’

– ‘কা*মড় দেবো কেন আপনাকে? আমি বাচ্চা না-কি?’

ইশতিয়াক নিজে এক লোকমা খেয়ে ওর দিকে আবার বাড়িয়ে দেয়। তুলি এবার আরেকটু তীব্র করলো দাঁতের চাপ।
অস্ফুটে ‘উফ’ করে ছাড়িয়ে নেয় ইশতিয়াক।

– ‘আবার!’

– ‘কি?’

– ‘আমি মুখে ভাত দিয়ে যখন বের করে আনতে যাই, তখনই তুমি একটু চাপ দিয়ে দিয়ে আঙুল আনতে দিচ্ছ।’

– ‘আরে না, আমার মুখ ছোট, আর আপনার হাত হা*তির মতো মোটা।’

– ‘হাতির হাত থাকে? আ*জাইরা কথা না বলে চুপচাপ খাও তো।’

– ‘পানি দেন।’

– ‘তোমার কাছেই তো, নিজে খাও।’

– ‘না আপনিই যখন কষ্ট করে খাওয়াচ্ছেন, আপনি পানিও খাওয়ান।’

ইশতিয়াক টেবিলে প্লেট রেখে পানি ঢেলে নিজ হাতে ওকে খাওয়াচ্ছে। তখনই তুলি বিষম খেয়ে ওর পুরো পাঞ্জাবিতে পানি ফেলে ভিজিয়ে দিল। ইশতিয়াক গ্লাস রেখে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বললো,

– ‘ইচ্ছা করে এমন করলে কেন?’

– ‘কি ইচ্ছা করে করলাম?’

– ‘তোমার মোটেও কাশি আসেনি অথচ ইচ্ছা করে পাঞ্জাবি ভিজিয়ে দিয়েছো।’

– ‘অযথা অপবাদ দেবেন না তো, আমি ইচ্ছা করে এমন করিনি।’

– ‘হইছে তাড়াতাড়ি খাও, পাঞ্জাবি চেঞ্জ করতে হবে আমার।’

খাওয়া-দাওয়ার পর তুলি টেবিল পরিষ্কার করে এসে দেখে ইশতিয়াক পাঞ্জাবি চেঞ্জ করে নিয়েছে। এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। তুলি পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠে গাল চেপে ধরে বললো,

– ‘স্যরি।’

ইশতিয়াক আয়নার দিকে তাকিয়েই বললো,

– ‘কেন?’

– ‘আমি ইচ্ছা করে ভিজিয়ে দিয়েছি।’

আয়না থেকে ঘুরে তুলির মুখোমুখি হয়ে বললো,

– ‘এমন করলে কেন?’

তুলি ফিক করে হেঁসে বললো,

– ‘আপনার বাড়ির সবাই আমাকে বুঝিয়েছেন, আপনি না-কি খুব বদমেজাজি, হুটহাট প্রচন্ড রেগে যান। তাই আমি যেন একটু বুঝে-শুনে মানিয়ে চলি। কিন্তু এতদিন থেকে রাগের কিছুই দেখছি না৷ তাই আজ হুট করে রাগানোর দুষ্টুমি মাথায় চাপলো। অথচ রাগেননি একটুও, ফেইল হয়ে গেলাম।

– ‘ও তাহলে এই ঘটনা, ঠিক আছে রেডি হয়ে যাও, বের হই।’

দু’জন সাড়ে তিনটার দিকে বের হয়ে পড়ে। রিকশা নিয়ে ছুটে চলে যায় ইট কংক্রিটের কর্মব্যস্ত শহরকে পেছনে ফেলে। রাস্তায় প্রচুর ধুলোবালির কারণে বিরক্ত হয়ে উঠে দু’জনই। কিন্তু সকল ক্লান্তি-বিরক্তি কেটে যেতে সময় লাগলো না, তারা ক্রমশই এক টুকরো সবুজের জগতে ঢুকে পড়ছে। উপর শুভ নীল আকাশ আর সবুজের প্রান্তরে হারিয়ে যাবার হাতছানি। খানিক পর তারা পৌঁছে যায় দিয়াবাড়ির বটতলায়।

তুলি মুগ্ধ হয়ে বললো,

– ‘সুন্দর না? বিশাল বটগাছের দুইপাশে রাস্তা গেছে।’

– ‘এই জায়গাটার নামই বটতলা। এখানে অনেক নাটকের শুটিং হয়। ভাগ্য ভালো থাকলে তোমার তাহসান বাবুকেও পেয়ে যেতে পারো।’

– ‘ধ্যাৎ, একদিন বলেছিলাম সেটা মনে রাখছেন।’

আরেকটু সামনে গিয়ে দেখা গেল মরা নদী। এটি তুরাগ নদীরই একটি শাখা।

ইশতিয়াক আঙুল দিয়ে দেখালো,

– ‘এইযে নদীর দুই পাড় সংযোগ করছে সেতু, এটার উপরে উঠলে আঁকা-বাঁকা নদীর, নজরকাড়া সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে। আমি অনেক আগে এসেছিলাম কয়েকবার। সেখান থেকে দেখা যায় পরিত্যক্ত নৌকা। জাল ফেলে মাছ ধরছে জেলেরা।’

– ‘চলো যাই।’

– ‘রোদ যাক, পরে গেলে ভালো লাগবে।’

রিকশা বিদায় করে তারা চলে এলো লেকের পাড়ে, লেকের বাঁধানো পাড়। উদাস হয়ে বসে থাকা ছাড়াও পা চালিত নৌকা নিয়ে ঘুরছে মানুষ।

নদীর পাড় ঘেঁষে ছোট ছোট দোকান। একটায় বসে চা দিতে বলে হাতমুখ ধুয়ে নিল তারা। চা এনে দিল ছোট্ট একটা ছেলে। তুলি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নদীতে বোট দেখে ফিসফিস করে বললো,

– ‘চড়বো আপনার সঙ্গে।’

ইশতিয়াক মুচকি হেঁসে কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বললো,

– ‘আমি থাকতে নৌকা চড়বে কেন?’

তুলি দাঁত কটমট করে তাকিয়ে উরুতে ঘুসি মারলো একটা।

ইশতিয়াক ছোট্ট ছেলেটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো,

– ‘বোট ভাড়া কত?’

– ‘ঘণ্টায় দুইশো টেকা, বেশি দূরে যাইয়েন না। আর এইখানে আবার বোট ভিড়াবেন আইসা।’

– ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

দু’জন চা খেয়ে দোকানে কথা বলে বোটের দিকে গেল। পা দিয়ে কিভাবে প্যাডেল দিয়ে চালাতে হবে দেখিয়ে দিল ছেলেটি। দু’জন বোটে উঠে চড়তে গিয়ে মনে হলো হাসের পিঠে বসে আছে তারা। বোট দেখতেও অবিকল হাসের মতো। টলটলে সচ্ছ পানি। উপরে নীল আকাশ। নদীর পাড়ে চা-ফুসকার দোকান। তুলি ডাক শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,

– ‘ওয়াও বিমান এত কাছ দিয়ে যাচ্ছে যে।’

– ‘হ্যাঁ এখানে এলে এই দৃশ্য দেখা যায় প্রায়ই। কিন্তু সমস্যা হলো আমি তো বোট চালাতে পারছি না ভালোভাবে। বিমান তো আমাদের উদ্ধার করবে বলে মনে হয় না।’

তুলি চেহারা বিকৃত করে বললো,

– ‘তাহলে মাঝখানে এলো কিভাবে নৌকা?’

– ‘প্রথম ধাক্কা আর বাতাসে এসেছে। এখন ঢেউয়ের সঙ্গে এদিক-ওদিক যাচ্ছে।’

তুলির ফোনটা বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখে সেই নাম্বার৷ কেটে দিল পলকে।

– ‘কি হলো রিসিভ করলে না যে।’

– ‘অপরিচিত নাম্বার।’

তুলির ভেতরে ভেতরে বোকামির জন্য নিজের উপরেই প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে।

–চলবে—-
সেই মেয়েটি আমি নই
লেখা: জবরুল ইসলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here