সে এক মনগড়া প্রেমকাব্য পর্ব -০১

বিয়ের কয়েক ঘণ্টা আগে জানতে পারলাম শ্রাবণের আগেও একটা বিয়ে হয়েছিল, তার প্রথম স্ত্রী এখন সাত মাসের সন্তানসম্ভবা। বাড়ির পরিবেশ অনেকটা থমথমে। শ্রাবণ অনেকক্ষণ ধরে অস্বীকার করলো কথাগুলো কিন্তু লাভ হলো না। লুকোতে পারলো না নিজের সত্যিটা। আমার ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠলো একটা লোক স্ত্রী-সন্তান রেখে আবার বিয়ের পিড়িতে কী করে বসতে রাজি হয়, তাও আবার নিজের বৈবাহিক জীবনের পরিচয় লুকিয়ে। সাতগ্রামের লোক জানে আজ আমার বিয়ে, তালুকদার মীর সাহেবের একমাত্র নাতনী মীরা তালুকদারের বিয়ে আজ। এ বিয়ে ভাঙলে আমার ভবিষ্যতের কী হবে আমি জানিনা। আমাদের বংশে বিয়ে ভেঙে যাওয়া মানে আজীবনের জন্য বন্দিত্ব বরণ।

বেশ ছোটবেলা থেকেই আমাকে আমার দুঃসম্পর্কের এক ভাই পছন্দ করতেন। তিনি বোধহয় সুযোগটা পেয়ে গেলেন এবার। তড়িৎ গতিতে বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করলেন আমার দাদামশাইয়ের সামনে। দাদামশাই এক সিদ্ধান্তের মানুষ তবে আমার প্রতি তার ভালোবাসা আজীবনের তরে অসীম। আমায় একান্তে ডাকলেন তিনি।

-‍ “মীরা! তুমি শুধু তালুকদার বংশের প্রদীপ নও, তুমি আমার কলিজার এক টুকরো। তোমার বাবার কালো ছায়ার এক অংশটুকুও আমি মাড়াতে দেইনি তোমায় আর না তোমার মায়ের অভিশপ্ত নিয়তি। রূপম তোমায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। তুমি কী বিয়েটা করতে চাও?”

– “দাদামশাই, আমি এই বিয়েটা না করলে আপনি কী আমার উপর নারাজ হবেন?”

– “বিয়েটা তোমার, সিদ্ধান্তও তোমার। আমার নারাজ হওয়ার তো কিছু নেই, মীরা।”

– “দাদামশাই, আমি রূপম ভাইকে বিয়ে করতে পারবো না। আপনাকে লুকিয়ে আমি একটা ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আমার শহরের একটা কলেজে এডমিশন হয়েছে, আমি পড়তে চাই সেখানে।”

– “তোমায় এতটা স্বাধীনতাও দিইনি আমি। তুমি এ বাড়ি থেকে কেবল বিয়ের পরেই বেরোবে, তার আগে না।”

বিয়েটা ভেঙে গেল। রূপম ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বেশ তাচ্ছিল্যের সুরে বলে গেলেন, “এ মেয়ের ভাগ্যে বর জুটবেনা বলে গেলাম।” আমি হাসলাম। যারে ভালোবাসা যায়, তারে বুঝি অভিশাপও দেওয়া যায়? রূপম ভাইয়ের কয়েক বছরের ভালোবাসা আমার একদিনের প্রত্যাখ্যানে ঘৃণায় রূপ নিতে সময় লাগলো না। দাদামশাই নির্বাক, আমার সিদ্ধান্তে তিনি মোটেও বিচলিত নন। তার ভয় অন্য জায়গায়। ঐ যে আমি শহরে যেতে চেয়েছি, আমার সে আবদার পূরণে নিজের অপারগতা ভেবেই দাদামশাই বিচলিত। আমার অবশ্য অত মাথাব্যথা নেই, আমার পড়াশোনা যে শীঘ্রই বন্ধ হতে যাচ্ছিল তার আভাস আমি বহুপূর্বেই পেয়েছিলাম।
_______________________

আজ ঘোর অমাবস্যা।
ছাদে ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। এ আঁধার রাতের কিছুটা কালচে ভাব বোধহয় আমার জীবনেও জুড়ে রয়েছে। বারেবারে নিয়তির পরিহাসে আমার জীবনে কেবলই কালো অধ্যায়গুলোই রচিত হয়। শ্রাবণ, পুরো নাম সুলতান খান শ্রাবণ, ছোট কাকা পছন্দ করেছিলেন ছেলেটাকে আমার জন্য কিন্তু ছেলে যে এতকিছু লুকিয়ে বিয়ে করতে এসেছিল তা কেউই জানত না। আমার ভাবতেই অবাক লাগে কী হত যদি আমি বিয়ে করে ঐ বাড়িতে যেতাম। শেষ পর্যন্ত সতীনের সংসার করতে হত! কী সর্বনাশা কথা! অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে অনেকটা অভিযোগের সুরে বললাম,”আমার স্বপ্ন পূরণ করবে না তুমি, তাই না? বেশ তো। আমি আর স্বপ্নই দেখবো না। সবকিছু তছনছ হতে দেখতে আর ভালো লাগে না আমার।”

কথাটা ভাবতেই ভাবতেই সামনে তাকাতেই খেয়াল করলাম এক লোক চুপিচুপি আমাদের বাড়ির দিকে আসছে। নির্ঘাত চোর-ছ্যাঁচড় হবে। আজ বাড়িতে দাদামশাই আর ছোট কাকী ছাড়া কেউ নেই। বিয়েতে আসা সমস্ত মানুষজন সন্ধ্যের মধ্যেই বাড়ি ছেড়েছেন। কাউকেই না খেয়ে যেতে দেননি দাদামশাই। আমার বিয়ে ভাঙার পরপরই কাকা ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন। তিনি আর সারারাতে ফিরবেন না। সারারাত আফসোস করতে করতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবেন। অতঃপর সকালে আমাকে এসে বলবেন,”ছোট মা, আমায় মাফ করে দে রে।” তারপর আবার মাথা নিচু করে চলে যাবেন। অদ্ভুত পাগলাটে রকমের স্বভাব ছোট কাকার।

সে যাই হোক, আমি নজর দিলাম চোরটার দিকে। এখন চেঁচানো উচিত নাকি আগে চোরটাকে ধরবো? দেখি চোরটা কী করে। চোরটা বেশ সন্তর্পণে আমার ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো। ঘুটঘুটে অন্ধকার আমার ঘরটাতেও। চোরটা দরজা পেরোতেই আমি তার হাতদুটো পিছমোড়া করে ধরলাম। লাভ হলো না, তার এক ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে বাড়ি খেলাম সুইচবোর্ডের পাশে দেয়ালে। কোনরকমে লাইট জ্বালাতেই বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে “রূপম ভাই…” শব্দটুকুই বেরোলো। রূপম ভাই কী কারণে এত রাতে আমার ঘরে আসার দুঃসাহস দেখালেন তখনো আমি তা অনুধাবন করতে পারিনি। তবে তার রুদ্রমূর্তি আর অগ্নিচক্ষু আমাকে অনেক কিছুই জানান দিচ্ছিল। ভয়ে তটস্থ হয়ে চেঁচানোর জন্য মুখ খুলতেই রূপম ভাই মুখ চেপে ধরলেন। আমার ভীতি বোধহয় সত্যি হলো। কিছু বলার আগেই তিনি আমার গালে সজোরে থাপ্পড় দিয়ে বললেন,”খুব বাড় বেড়েছে না তোমার? তোকে বিয়ে করার জন্য এতকিছু করলাম আর তুই? তুই আমায় প্রত্যাখ্যান করলি? এত দেমাগ? দেমাগ ছুটাবো আমি তোর। মেরে আধমরা করে ফেলে গেলেও তোর দাদামশাই আমার কিচ্ছু করতে পারবে না, বুঝলি?”

রূপম ভাই দরজা লাগানোর জন্য উদ্যত হতেই আমি হাতের কাছে থাকা ফুলদানিটা দিয়ে সজোরে আঘাত করলাম তার মাথায়। ফুলদানি ভেঙে দু-টুকরো হলো। রূপম ভাই ধপ করে মেঝেতে পড়লেন। রক্তে ভিজে উঠলো মেঝে। আমার হাত-পা ঘামতে শুরু করেছে। আমি কী রূপম ভাইকে মেরেই ফেললাম? চিৎকার করতে গিয়ে মনে হলো বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। দিশেহারার মতো এদিক-ওদিক হাত ছোঁড়ায় আশেপাশে অনেক কিছু পড়ে ভেঙে যেতে লাগলো। একটু বাদেই দাদামশাই ছুটে এলেন, সাথে ছোট কাকীও। রূপম ভাইকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে দাদামশাই আমার দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন আমি ঠিক আছি কিনা।

– “কী হয়েছে ওর আর ও এত রাতে এ ঘরে কেন এসেছিল?”

– ” দা..দাদা..মশাই। ও…ও আমায়..”

– “চিন্তা করো না, বেঁচে আছে তবে তোমার এখানে থাকা নিরাপদ নয়। রূপমের বন্ধুত্ব মোটেও ভালো লোকদের সাথে নয়, বড়সড় ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে। আমি ওকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। ছোট বৌ, কোথায় তোমার বর? আজহারকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসতে বলো। ও যতদ্রুত সম্ভব মীরাকে শহরে রেখে আসুক।”

– “কিন্তু বাবা, মীরা শহরে কোথায় থাকবে?”

– “আপাতত কয়েকদিন ওর নানাবাড়িতে। পরে আমি গিয়ে নিয়ে আসবো।”

– “দাদামশাই, আমি তাহলে কলেজে ভর্তি হই? হোস্টেলে থাকতে পারবো আমি।”

– “আমি জানি তুমি অনেক কিছুই পারবে কিন্তু এখনো সময় আসেনি। কলেজে ভর্তি হতে চাইলে হও তবে আমি যখন তোমায় ফিরিয়ে আনতে যাবো, ঠিক তখনি তোমায় ফিরতে হবে।”

– “বেশ।”

আমার মনে হলো একমুহূর্তে আমার জীবনের সবকিছু উল্টেপাল্টে গেল। একটা দিনের ব্যবধানে আমার জীবনে দেখা দিল আকাশ-পাতাল তফাত।

কাকা আসলেন ভোরের দিকে। কাকী সব বোঝালেন তাকে। রূপম ভাই এখনো হাসপাতালে, জ্ঞান ফেরেনি। সকাল হলেই লোক জানাজানি হবে। আমার নিয়ে যাওয়ার মতো তেমন কিছু নেই, সামান্য কিছু কাপড়। আট বছর পর আজ আবার মায়ের মুখোমুখি হবো আমি। মায়ের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? আচ্ছা, মা কী আগের মতো আদর করবে আমায়? নাকি দূরে সরিয়ে রাখবে?

জল্পনা-কল্পনার পাট চুকিয়ে কাকার সাথে শহরের উদ্দেশ্য বের হলাম। তখনো আবছা অন্ধকার চারিদিকে। গাড়ি করে বাস স্ট্যান্ড অবধি যেতে হবে, তারপর ৭টার বাসে করে শহরে। আমার মা নামক মানুষটাকে আমি খুব বেশি ভালোবাসতাম। তাই হয়তো আমার ভাগ্যটাও তার মতো খারাপ হতে গিয়েও হয়নি। মাঝে মাঝে মনে হয় বাবাকে কখনো সামনে পেলে নিজ হাতে খুন করতাম। এতটা রাগ আমার তার প্রতি। একটা মানুষ ঠিক কতটা খারাপ হতে পারে তা আমি ঐ লোকটার মাধ্যমে বুঝেছি।

বাসে উঠার পর বারবার পিছু ফিরে যেতে ইচ্ছে হলো। গ্রামের ঐ ঘ্রাণ, নিস্তব্ধতা ফেলে যেন আমি কোনো এক কোলাহলের স্রোতে গা ভাসাতে যাচ্ছিলাম। বড্ড শুন্যতা অনুভব হচ্ছিল কিন্তু কিছুই করার ছিল না।

____________________________________________________

– “এত বছর বাদে এ বাড়িতে কেন তোমায় পাঠানো হয়েছে আমি জানতে চাই না। এসেছো যখন, যথেষ্ট আপ্যায়ন তোমায় করা হবে। এসো ভেতরে।”

– “নানুমনি, আসলে…”

– “তুমি এ বাড়ির মেয়ে কিন্তু তোমার সাথে যিনি আছেন তিনি আমার মেয়ের জীবন নষ্টকারী লোকের ভাই। তাকে আমি এ বাড়ির চৌকাঠে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারবো না। তিনি যেন এখান থেকেই ফিরে যান।”

কাকা কিছু বললেন না। আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করে চলে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। বাড়িটা নিস্তব্ধ। নানুমণি, মা আর খালামণি ছাড়া এ বাড়িতে কেউ থাকে না। মামা বিদেশে পড়তে গিয়ে বিয়ে করে ওখানেই সেটেলড হয়েছেন। খালামণি এবার ভার্সিটিতে পড়ছে। মা এখনো ঘর থেকে বেরোননি। আমার মুখ সহ্য করতে পারবেন তিনি? মায়ের ঘরের সামনে পা রাখলাম। দরজা হালকা খুলতেই ওপাশ থেকে একটা কাচের গ্লাস এসে পড়লো আমার পায়ের কাছে। নানুমণি দৌড়ে এলো সেখানে। আমি ঠিক কী করবো বুঝে উঠতে পারলাম না।

#সে_এক_মনগড়া_প্রেমকাব্য
সূচনা_পর্ব
~মিহি

[ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here