স্নিগ্ধ গাংচিল পর্ব -১১

#স্নিগ্ধ_গাংচিল
#নাজমুন_বৃষ্টি
#পর্ব_১১

আদ্রিন ক্লাসে স্যার-রূপে ঢুকার কিছু-সময় পর শিক্ষার্থীদের পরিচয় পর্ব নেওয়া শুরু করলো। একে একে পরিচয় দিতে দিতে মুনের পাশে ইরার পালা আসলো। ইরা তো হাসি হাসি মুখ করে এক দৃষ্টিতেই তাকিয়ে আছে স্যার-রূপে আদ্রিনের দিকে। এদিকে পরিচয় দেওয়ার পালা আসছে সেই খবর তার নেই। ইরার এমন-ভাবে স্যারকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ক্লাসের সবার দৃষ্টি এখন ইরার দিকে। মুন মাথা নিচু অবস্থায় ইরাকে হাতের কনু দিয়ে ধাক্কা দিতেই ইরার হুশ ফিরলো। আশেপাশে তাকিয়ে সে লজ্জায় মাথা নিচু করে উঠে পরিচয় পর্ব দিলো। এরপর মুনের পালা আসতেই মুন দাঁড়ালো। সে ভেবেছিলো আদ্রিন তাকে ভুলেনি কিন্তু তার ভাবনার মাঝে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে আদ্রিন মুনের পরিচয় দিতে বলল। মুন এক রাশ অভিমান নিয়ে তার পরিচয় দিলো। আদ্রিন এমন ভাব করলো, অন্য সব স্টুডেন্টের মতো মুনকে সে আজই প্রথম দেখলো। মুন ভেবে পায় না, একটা মানুষ এতো তাড়াতাড়ি কাওকে ভুলে যেতে পারে!
এরপর যথারীতি নিয়ম অনুসারে আদ্রিন ক্লাস শেষ করে বিদায় নিল।

——————

দেখতে দেখতে কেটে গেল এক মাস। রিফাত কাজের সূত্রে ঢাকার বাইরে একটা প্ল্যাট নিয়ে একা থাকে। মূলত কাজ থেকেও বেশি সে একাই থাকতে চায়। এইবার আফজাল শেখ পাঠায়নি তাকে, রিফাত নিজেই এমন পরিকল্পনা করে পরিবার থেকে দূরে চলে এসেছে। অপরাধ-বোধ জেগে উঠে সবসময়। প্রীতির সাথেও ঠিকঠাক মন থেকে কথা আসে না। এখন বুঝতে পারছে রিফাত, প্রীতি অর সাময়িক মোহ ছিল। আর প্রীতিকে এতো করে চাওয়ার কারণ হচ্ছে প্রথমবার চাওয়াতে পাই না, তাই এর প্রতি আকর্ষণীয় কাজ করেছে রিফাতের।

~মানুষ যদি কোনো জিনিস একবার চাইতেই সাথে সাথে পেয়ে যায় – সেটার প্রতি কোনো আকর্ষণীয়-বোধ থাকে না। আর যদি কোনো সস্তা জিনিস’ বারবার চাইতে হয়, হোক সেটা কোনো সস্তা জিনিস তাহলে সেই সস্তা জিনিসটার’ই প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করে ;পরবর্তীতে ওই বারবারে চাওয়া সস্তা জিনিসটাই দামি মনে হয়। তখন একবারে পাওয়া দামি জিনিসটা থেকে বারবার করে চাওয়ার পর পাওয়া সস্তা জিনিসটার মূল্য বেড়ে যায় মানুষের কাছে কারণ দামি জিনিসটা একেবারেই পেয়ে গিয়েছে কিন্তু সস্তা জিনিসটা একবারে পায়নি তাই তো সেটাই পাওয়ার জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠে।’~
রিফাতের ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। মুনকে একবার চাইতেই পেয়ে গেল তাই এর মূল্য বুঝতে পারেনি কিন্তু প্রীতিকে প্রথমে না পাওয়ার ফলে এর প্রতি আকর্ষণবোধ বেড়ে গিয়েছিলো। রিফাতের এখন কোথাও শান্তি শান্তি লাগে না। প্রীতির সাথেও ভালোভাবে কথা হয় না, দুয়েকটা কথা না পারতে বলে। ইদানিং প্রীতিও আর আগ-বাড়িয়ে রিফাতের সাথে কথা বলে না। তার আচরণ রিফাতের কাছে সুবিধার মনে হচ্ছে না। তবুও রিফাত সেদিকে আর মাথা দিল না, সে যথা-সম্ভব নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকতে চায়।

——

মুনও নিজেকে অনেক গুছিয়ে নিয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি একটা পার্ট-টাইম জব নিয়ে নিজের খরচ নিজে চালিয়ে ফেলে। প্রতিদিন সময় করে পরিবারের সাথে কথা বলা, নিজের ভার্সিটির ক্লাসের পড়াশোনা আর জব – সবমিলিয়ে ব্যস্তটায় দিন কেটে যাচ্ছে মুনের। এতো এতো ব্যস্ততার মাঝে অতীতটা ভুলতে চেষ্টা করছে মুন। কিন্তু আসলেই কী ভুলা যায়! রাত হলেই তিক্ততা-মিশ্রীত অতীতটা তার চোখে হানা দেয়। তবুও ভুলার চেষ্টায় আছে মুন।
ভার্সিটিতে আদ্রিন স্যারের ক্লাস সপ্তাহে মাত্র দুইটা। কারণ উনি এই টিচিংটা শখের বশে নিয়েছে তাই সবসময় সময় দিতে পারে না। সবসময় বিজনেসের কাজে একেক-জায়গায় থাকে।
মুনের তো ইচ্ছে করে এই মানুষটার মাথা ফাটিয়ে দিতে। ‘হু, যত্তসব শখের বশে টিচিং করে না-কি মেয়েদের নিজের চেহারা দেখাতে আসে!’ মুন আপনমনেই বিড়বিড় করে গালি দেয় মানুষটাকে। যতবারই মানুষটা ক্লাসে ঢুকবে সব মেয়েদের এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখে মুন আপনমনে বিড়বিড় করে এই গালিটা দেয়, এই বিড়বিড় করার জন্য মুনকে অনেকবার মানুষটা সম্পূর্ণ ক্লাসে সবার সামনে শাস্তি দিয়েছে। মুন ক্যান্টিনে আড্ডা দেওয়ারত অবস্থায় সবার সাথে হাসা-হাসি করার কারণে অনেকবার বিনা কারণে শাস্তি দিয়েছে। প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো মুনের ভীষণ কিন্তু এখন সয়ে গেছে। এখন আর রাগ হয় না মানুষটার উপর। কেন জানি এক অন্যরকম মায়া জমে গেছে মানুষটার প্রতি। ভার্সিটির সব স্টুডেন্টই মানুষটাকে ভারী পছন্দ করে। হয়ত মানুষটা’ই মায়াই ভরপুর। সবমিলিয়ে মুনের ম্যারিল্যান্ডের দিনগুলো সুন্দর-ভাবে চলে যাচ্ছে।

———–
দেখতে দেখতে আরো কয়েক মাস গড়িয়ে গেল। বসন্তের দিন এখন। ম্যারিল্যান্ডের বসন্তের দিনগুলো ভারী সুন্দর।
সেদিন ভার্সিটিতে আদ্রিনের ক্লাস ছিল না। মুন ভার্সিটি থেকে ফিরেই দেখল বড়ো বাবা মেসেজ পাঠিয়েছে। ক্লাসে থাকায় মুন কল ধরতে পারেনি। যার কারণে আফজাল শেখ মেসেজ পাঠিয়েছে, একটু সময় নিয়ে কলটা ধরার জন্য। কিন্তু মুনের মোবাইল ব্যাগে থাকার কারণে মেসেজটা চোখে পড়েনি। বড়ো বাবার এমন ইমার্জেন্সি মেসেজ করার কারণ মুন বুঝতে পারলো না। কারণ মুন সময় করে রাতের একটা সময় পরিবারের সাথে কথা বলে। কালকেও রাতেও বলেছিলো আর আজকে রাতেও বলার কথা। কিন্তু এর মাঝে এমন কী হয়ে গেল যে বড়ো বাবা এত্তো কল করেছে।
মুন ব্যাগ রেখে কল ব্যাক করতেই বড়োবাবা অপর-পাশ থেকে কিছু বলতেই মুনের হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেল। মুন বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। পাশে ইরা বসেছিল, মুনের এমন রিঅ্যাকশন দেখে সে মোবাইলটা হাতে তুলে নিলো। মুনের দু’চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। ইরা কিছু বুঝতে না পেরে মোবাইল কানে নিয়ে আফজাল শেখের সাথে কথা বলে জানতে পারল মুনের মা হাসপাতালে ভর্তি। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। সকালে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।

ইরা মোবাইল রেখে মুনকে আশ্বাসের সুরে বলল,’আন্টির কিছু হবে না দেখিস। তুই চিন্তা করিস না।’

মুন কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল,’এই মা’ই আমার দুনিয়ায় সবচেয়ে আপন। বাবা মরার পর মা কোনোরকম অপূর্ণতা রাখেনি আমার। আমার যেভাবেই হোক, দেশে ফিরতে হবে।’

-‘তুই দেশে যাবি?’

-‘দেশে না যাওয়া ছাড়া আমি শান্তি হতে পারবো না। হয়ত আর নাও ফিরতে পারি এখানে। মায়ের আগে আমার আর কিছুই নই। মা সুস্থ হলে মায়ের সাথেই থেকে যাবো আমি।’

ইরা মন খারাপ করে বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। তার মা নেই, তাই সে মায়ের কদর বুঝে। বাবা কোনোকিছুর অপূর্ণতা না রাখলেও মায়ের পূর্ণতা ভালোভাবে চাইলেও করতে পারেনি। ইরা হয়তোবা বাবার সামনে হাসিখুশি ভাবে থাকতো কিন্তু দিন শেষে রাতে মায়ের কথা মনে পড়ে। চাইলেও সবকিছু বাবাকে বলা যায় না। এই যে এখন, ইরা প্রতিরাতে পার্টিতে যায়- যদি মা বেঁচে থাকতো তাহলে হয়ত যেত না। কারণ প্রথম যেদিন ইরা পার্টিতে গিয়েছিলো সেদিন বাসায় কেউ ছিল না, এরপরই সাহস বেড়ে প্রতিদিন যাওয়া শুরু করেছিল। বাবা সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে রাতে ঘুমালে আর কিছুর খবর থাকে না কিন্তু যদি মা থাকতো! তাহলে তিনি হয়ত সবসময় বাসায় থেকে ইরার সঙ্গ দিতো। ইরাও মায়ের সঙ্গ পেয়ে গভীর রাতে পার্টিতে যাওয়ার দুঃসাহস করতো না। মা থাকলে ইরার জীবনটা আজ হয়ত অন্যরকম হতো!

ইরা কী বুঝে বলে উঠল,’তোর সাথে আমিও যাবো আন্টিকে দেখতে। আমি বাবার সাথে কথা বলে এখনই ইমার্জেন্সি দুইটা টিকেটের ব্যবস্থা করছি। বাবা পারবে। কারণ উনি সবসময় বিজনেসের কাজে একেক দেশে যাতায়াত করে তাই।’

মুন চোখ মুছে ইরাকে জড়িয়ে ধরলো। এই মেয়েটা তার জন্য অনেক করেছে। আজ-কাল এমন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। নিজের কাছের মানুষগুলোই আজ-কাল ধোঁকা দেয় অথচ এই মেয়েটা স্বার্থ ছাড়া সবসময় পাশে ছিল।


রাতের ফ্লাইট মুন-ইরার। মুন তো কেঁদে-কেটে অবস্থা খারাপ। ইরার বাবা মেয়েকে মুনের সাথে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তিনিও মনে করেন মুনকে এই দুর্বল অবস্থায় একা এই দেশ থেকে পাঠানো উচিত হবে না। আর মেয়েও কয়েকদিন নিজের মাতৃভূমি থেকে ঘুরে আসুক। তিনি ইরাকে শর্ত জুড়ে দিলেন, কোনো দুষ্টমি যেন না করে। ইরাও হাসিমুখে মেনে নিলো সব। ইরা নিজের কাপড় গুছিয়ে, মুনের গুলো সহ গুছিয়ে দিলো। এতো এতো ব্যস্ততার মাঝে রিক-সিমিদের একবার কল দিয়ে বলল ইরা তাদের দেশে যাওয়ার কথা। ইরা-মুনকে এয়ারপোর্টে বিদায় দেওয়ার জন্য তারা তিনজন এসেছিলো। মুন একে একে সবাইকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিলো ম্যারিল্যান্ড থেকে। রিক-সিমিরা মন খারাপ করে মুন-ইরাকে বিদায় দিল। এই ভিনদেশে এতো ভালো মনের বন্ধু পাবে মুন কল্পনাও করেনি। অবশেষে সবাইকে বিদায় দিয়ে প্লেনে উঠে পড়ল মুন-ইরা। প্লেন নিজের দেশের উদ্দেশ্যে ছাড়তেই মুন জানালা দিয়ে শেষবারের মতো ম্যারিল্যান্ডকে একবার দেখে নিলো। সে জানে না আর আসবে কী না এখানে! ইরা মুনের হাতের উপর হাত রেখে আশ্বাস দিল।

#চলবে ইন শা আল্লাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here