স্বপ্নময়_ভালোবাসা ❤ পর্ব ৮

স্বপ্নময় ভালোবাসা
রোকসানা আক্তার
||পর্ব-০৮||

বাইরে এসে আমি খানিকটা চমকে যাই।ডাইনিং-এ শুধু তুরাব ভাইয়া বসে আছেন।খালামণিকে কোথাও দেখছি না।মনে মনে কিছুটা ধাতস্থ হই।তবে এ প্রশ্নের বেশিক্ষণ সমাধান খুঁজতে হয়নি।মা কিচেন থেকে খাবার ট্রে হাতে এদিকে আসতে আসতে বলেন,

“সোফায় এসে বস,সানা।শাহিদা আসে নি।তুরাব একাই এসেছে।

মায়ের কথা শুনে তুরাব ভাইয়া সামনে ফিরে আমার দিকে তাকান।আমি যে ডাইনিং এ আসলাম উনার এতক্ষণে খেয়াল এলো। উনি খুব ক্ষীণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।আমিও আমার চোখ সরাই নি।আমিও তাকিয়ে।তবে মাথায় এই মুহূর্তে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। এত গম্ভীর,শান্ত চাহনি,নিষ্পাপ মুখখানার অধিকারী মানুষটার ভেতরে এত নীচক একটা চেহারা লুকিয়ে আছে ভাবতেই পারি না।

তারপর ধীরপায়ে উনার সামনা-সামনি না বসে সিঙ্গেল সোফায় গিয়ে বসলাম।মা বললেন,
“তুরাব খেয়ে নাও।”

তুরাব ভাইয়া মায়ের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যতার একটা হাসি দেন।তারপর হালকা মাথা ঝাঁকান।আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।একে মায়ের এমন সাদরে আপ্যায়ন না করে পেপারটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাসা ধাক্কা মেরে বের করে দেওয়া উচিত!এদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা মানায় না।আমার ভাবনার মাঝেই তুরাব ভাইয়া মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আন্টি,আমি সানার সাথে একান্ত পার্সোনাল কিছু কথা বলতে চাই।আপনার যদি….!”

লোকটির কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই মা উনার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,
“আমার সমস্যা নেই। তোমরা কথা বলো।”
বলেই মা চলে যান।আমি মাথা নিচু করে চুপ হয়ে বসে আছি।কিছুক্ষণ এভাবে নিরব কাঁটে।তারপর তুরাব ভাইয়া আমার হাতের দিকে তাকিয়ে নিজ থেকেই আগে বলেন,
“ডিভোর্স পেপারটা সাথে করেই নিয়ে এসেছো, তাই না?”

আমি আড়নয়নে উনার দিকে তাকাই। নিজেকে কথা বলতে যথেষ্ট গুছিয়ে নিয়ে খানিক হাসি দিয়ে আবার বলেন,
“ছোট্ট বেলায় তোমাকে দেখেছি।ছোট্ট বেলায় তুমি কেমন ছিলে তা আমার খেয়াল নেই।তাছাড়া ছোটবেলার কথা কারোই মনে থাকার কথা নয়।বড় হয়েও তোমাকে দেখার কখনো সৌভাগ্য হয়নি।পড়ালেখা,মায়ের চাকরি,বাবার চাকরি মাঝে যাতাকলে পিস্ট আমি।আত্মীয় বলো অথবা বাইরের মানুষ বলো কারোর সাথে ভালোভাবে তেমনটা মেশা হয়নি।তবে,বড় হবার পর থেকে মা তোমার ব্যাপারে আমায় তেমন কিছু বলেননি।এটাও ভালোভাবে বলেননি যে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল।মাস তিনেক আগে হঠাৎ তিনি আমাকে তোমার ব্যাপারে কথা তুলেন।আমি কতটা শুনামাত্র যতটাই অবাক হলাম তারচেয়েও বেশি মাত্রাতিরিক্ত মায়ের উপর রাগ হলাম!এমন একটা সিদ্ধান্ত হুটহাট যে কারোই পক্ষে মনে নেওয়া অসম্ভব!তাই আমি চাচ্ছি তোমাকে আমার কিছুদিন বুঝতে হবে,জানতে হবে!তোমাকে ভালোভাবে বুঝে উঠার পর যদি…!”

শেষ করতে দিই নি।তার আগেই আমি ধুম পায়ে দাঁড়িয়ে যাই।উনার দিকে চাক্ষুষ চোখে তাকিয়ে বললাম,
“যদি না এডজাস্ট হয় তাহলে ডিলিট,তাই তো?জীবনটাকে কি ভেবেছেন আপনি?পুতুল খেলা?যেমন চাইবেন তেমন হবে!সব জীবন অন্যের শাসনে চলে না।ওই শাসিত মানুষটার খেয়েপড়ে থাকলে তার অস্তিত্ব তার অধিকারে চলে যায় সেটা ভাববেন না।সে মানুষটারও একটা আত্মসম্মান বোধ বলে কিছু থাকে!এতটাই চক্ষুলজ্জা হীন ভাববেন না।”

আমার কথা শুনে লোকটির চোখজোড়া চড়কগাছ হয়ে যায়।আমি যে এভাবে বলব হয়তো তিনি তা কল্পনাই করেননি।হন্তদন্ত মুখে বার কয়েক শ্বাস টেনে কপালের উপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো ঠিক করে নেন।তারপর খুব দৃঢ় গলায় বলেন,

“তোমাকে এসব কেউ বলেছে?তুমি আমার কথা ভালোভাবে না শুনেই এমন গেইজ করা উচিত না।”
“কোনটা ভুল,কোনটা সঠিক ওটা এই সানাকে চেনাতে আসবেন না।আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ প্লিজ?আমি এখনই পেপারে সাইন করে দিচ্ছি আপনি চলে যান!এমন কালো চাঁদরের মুড়ে নিজেকে আর রাখতে পারছি না!”

“তার আগে আমার একটা…!”
“আমি কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না!প্লিজ?আমার আর সহ্য হয়না!একদমই না!”

বলেই পেপারটা সামনে তুলে রাখি।কলম টুকতে গেলে কলম পাইনি।ভুলেই গেলাম আসার সময় কলম সঙ্গে করে নিয়ে আসিনি।তারপর সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে দ্রুতপদে রুমের দিকে যাই।ড্রেসিং টেবিলের সামনের থেকে কলম নিয়ে ফিরে আসতেই সোফার দিকে তাকাতেই আমার চোখ আঁটকে যায়!তুরাব ভাইয়া ওখানে স্ট্রেট দু’হাত পকেটে গুঁজে দাড়িয়ে আছেন।চোখমুখে একটা কৌতূহলী ভাব।

আমি সামনের দিকে হেঁটে যেতেই তিনি অতি স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“তুমি হয়তো জানো না ইদানীং তোমাকে নিয়ে আমি খুব ভেবেছি।এ’কদিনে তোমাকে যতটা চিনলাম আমার মনের ভেতরে একটা তপ্ত অনুভূতি অনুভব করেছি।বুঝতেছি না কেন।বিচ্যুত/অবিচ্যুত এই দুয়েক নিয়ে আমি অনেকটা সন্দহানে আছি।আমার দিক দিয়ে ডিভোর্স টা মেনে নিতে এই মুহূর্তে একটু সময় লাগবে।তবে,সিদ্ধান্ত তোমার।আমি প্রেশার ক্রিয়েট করছি না।এখন আমি চলে যাচ্ছি।পেপারও তোমার কাছে রেখে গেলাম।ইচ্ছে জাগলে সাইন করে নিও,না হলে বাকিটা তোমার ইচ্ছে।ফোনে আমাকে জানিও দিও।আমি অপেক্ষা করবে।খুব অপেক্ষা!!
আর একটা কথা!আমি তোমাকে কখনো ছোট্ট চোখে দেখি নি।হয়তো আমার কথাবার্তাই ওরকম ছিল। তুমি যা বললে এখন আমার এসব কথা স্মরণ হলো।তবে বিশ্বাস করো,যেভাবে বললে ওসব আমার মাথায় কেন মনের কোণেও একচটি ভাবি নি।তবে হ্যাঁ,মনের ভাবনায় মানুষ না বুঝে নিজে যা বলে তাই ঠিক মনে করে যেমনটা আমি করেছি।এতে আমি মোটেও অত্যুক্তি হই নি।
এতে যদি আমার প্রতি তোমার মনে একটুও কষ্টের দানা বিঁধে আমি তারজন্যে তোমার কাছে আসলেই দুঃখিত।আমই’ম এক্সট্টিমলি স্যরি। ক্ষমা করে দিও আমাকে!
তাছাড়া তোমার মনে আরেকটা প্রশ্ন থেকে গেল মা কেন আসেনি।বলছি…।আমি অনেকটা প্রেশারের মধ্যে আছি তা তোমায় কাল বললাম।এমনকি আজও আমার কর্মচারীদের মনতাত্ত্বিক এবং উপস্থিতি বুদ্ধি পরিক্ষা করার তারিখ ছিল সেটা আমি ক্যান্সেল করে অন্যের উপর দিয়ে এসছি।কারণ,তোমার আর্জেন্ট তলব ছিল তাই।না আসলে তোমার কাছে আরেকটা বিভীষিকার নাম উপাধী পেতাম।আমি তা চাই না।আমার এখন ফিরতে হবে।বারংবার অফিস থেকে এখনও কল আসছে।আমায় ফিরতে হবে। ভালো থেকো।আর ওইযে পেপার।এখন সিদ্ধান্ত তোমার!”

এতগুলো এতগুলো কথা বললেন, অথচ আমি এর দানাকড়িও জবাব তুলতে পারিনি।সত্যকথা কি আমার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হয়নি।বলতে চেয়েছিলাম মানলাম আমার সিদ্ধান্ত যাই হোক,অন্তত আরেকবার ভালোভাবে পরিষ্কার করে যান আপনার কি সিদ্ধান্ত বা আপনি কি চাচ্ছেন!তা বলার আর সুযোগ হলো না।এর আগেই উনি চড়ক চড়ক চোখের সামনে দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল!!

যখন পুরোপুরি বুঝতে পারলাম এখানে মানুষটির একদমই অস্তিত্ব নেই তখন আমার চেতনার দ্বার জাগ্রত হয়।ক্ষীণ চোখে চারপাশ তাকিয়ে কপালের সিদ্ধি ঘাম হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিই।কপালের চামড়াগুলো তীব্র ভাঁজ করে সোফায় গিয়ে বসি।মা এসেই পুলকিত মুখে পেপারটি হাতে নেন।সাইন হয়নি দেখে বেশ হাসি হাসি মুখ করে বলেন,
“সানা রে তুরাব কি বললো?ও ডিভোর্স চাইছে না!?”

আমি উত্তর করতে পারি নি। ছলছল চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।মা পেপার হাতে আমার কাছে এসে বসেন।আবার বলেন,
“বললাম না তুরাব খুব ভালো ছেলে।হয়তো ও এখন অনেকটা সন্দেহবসরে আছে সম্পর্কটা ভাঙ্গবে কিনা।জানিস?ভালো ছেলেদের একটা গুণ খুব ভালো!এরা কোনোকিছু করার আগে দশবার ভাবে!”

আমার মনে এখন একটাই ভাবনা!দোষটা কার?তুরাবের নাকি খালামণির?নাকি আমার?নাকি আমার মায়ের। আর নাকি বর্তমান প্রজন্মের!

বিকেলের দিকে একটু গুঁটিয়ে শুয়ে পড়ি।এমতাবস্থায় আকাশ কল করে!আকাশের কলটা দেখে খানিক বিচলিত হই।কাল থেকে সেই বেদম রাগে আছে।দু’দিন যাওয়ার পর আমার উপর রাগ করে হয়তো আর থাকতে পারেনি।তাই বাধ্য হয়েই কল করলো।

আমি ধীর গতিতে কলটা রিসিভ করে আস্তে গলায় বললাম,
“হ্যালো?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নিরবতা বিরাজ করে।তারপর হালকা কেশে গলাটা খানিক পরিষ্কার করে দৃঢ় কন্ঠে বললা,
“কেন জানি তোর উপর রাগ করে থাকতে পারি না।তাই বেহায়ার মতো আবার কল করলাম!কেমন আছিস?মন ভালো?”

“ভালো।”
“তা আন্টি কেমন আছেন?শরীর ভালো?”
“হু।”
“ওহহহ।একটা কথা বলবো, সানা?”
“বল।”
“তুই আমার উপর রেগে?”
আমি এবার খানিকটা নড়েচড়ে বসি।ধাতস্থ হয়ে বললাম,
“কেন?”
“এই যে কেমন গোমড়া গোমড়া মুখে কথা বলছিস!”
আমি চুপ থাকি।আমার নৈঃশব্দ্যতা দেখে আকাশ কি ভাবলো জানি না।আবারও কেশে বললো,

“যাইহোক,তা প্যাকিংটা খুলে দেখেছিস?”
“কোনটা?”
এহেন প্রশ্নে আকাশের বুকের ভেতরটায় ধপ করে উঠলে।আমি যে এমন বেখেয়ালি কথা বলবো হয়তো ও ভাবেই নি।প্যাকিং দিয়েছে জানি তবে ওতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবে মনে রাখি নি,তাছাড়া মনে আসেই নি!শূন্য,উদাসীন মস্তিষ্কটা বললাম,
“আচ্ছা দেখবো।”
“ওকে।দেখে ফিডব্যাক জানাইস।খুব সুন্দর একটা ফিডব্যাক যেন হয়!আমি আশায় থাকবো।”
“আচ্ছা। ”
“তা কি করিস এখন?”
“বসে আছি।”
“ওহ।আর আমি রোগী দেখে দেখে ক্লান্ত!মাত্র ব্রেক পেলাম।”
“ওহ।”
“সানা?”
“হু।”
“একটা কথা বলি,?”
“হু।”
“তোর হাজবেন্ডের কী অবস্থা?কথা হয় তারসাথে তোর?”
অবচেতন মনেও আকাশের এহেন কথায় বড়সড় একটা বিষম খাই।বললাম,
“কথা না হলে সে স্বামী হয় আকাশ?সে কি নিঃস্বার্থ ভালোবাসবে আকাশ?”

হঠাৎ আকাশ আমার কথার মানে বুঝলো না।খানিকটা ধাতস্থ বোধ করে বললো,
“কথা না হলে সম্পর্কের মাঝে অনেকটা দূরত্ব থাকে।যে সম্পর্কে মায়া,ভালোবাসা,আবেগের এলিমেন্ট নেই বললেই চলে।একটা মহূর্তে দেখা যায় সেই সম্পর্কটার বেশিদিন টিকে না।”
“আর যদি স্বামী সরাসরি না বুঝিয়ে ইন্ডাইরেক্টলি কথায় সুদৃঢ় ব্যাক করার কথা তোলে!তখন তাকে ভালোবাসা বলে?”

“এখানে দু’টো যুক্তি দাঁড়ায়!মানুষ ভুল করে অনুতপ্ত হয়ে শুধলে যায়।আবার অনেকে ক্ষণিক শুধলানোর কথা বলে আগের সেই তীব্র আঘাত করে।এ সম্পূর্ণটাই মানুষের নিজের মন আর মানসিকতার উপর নির্ভর করে।”

আকাশের থেকে আমার সম্পর্কের মেইন পয়েন্ট আসে নি।আমার সম্পর্কটা একদম বিচিত্র।একটুখানি মিললে আবার আরেকখানি ফারাক থাকে!তবে তুরাব ভাইয়া কি আমায় সুন্দরভাবে মেনে নিয়ে আমায় যথেষ্ট শ্রদ্ধা করার কথা বললো আজ?নাকি আমার প্রতি লোলুপ মনোভাব সৃষ্টি হয়ে ক্ষণিক সময়ের জন্যে কাছে পেতে চাচ্ছে।কিছুই ত বুঝলাম না উনার কথা!আর আমার সিদ্ধান্ত?

চলবে…
(আপনাদের কি সিদ্ধান্ত এ ব্যাপারে?সানা অনেক বড় একটা পরিস্থিতির সামনে মুখোমুখি হলো ।এখানেই সে বেছে নিবে তার জীবন সঙ্গীনীকে!)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here