স্বপ্ন সারথী পর্ব -০১

#স্বপ্ন_সারথী (প্রথম পর্ব)।

বুয়েটে ভর্তি হতে না পেরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন‍্যাশনাল রিলেশনে অনার্স শুরু করলাম, খানিকটা দুঃখবোধ নিয়েই। তারপরও চোখে স্বপ্ন, ভালো ফলাফল করে বিসিএস বা কোন বিদেশী উন্নয়ন সংস্হায় চাকুরী নিবো। কিন্তু কিসের কি? সেকেন্ড ইয়ারে উঠতে না উঠতেই বাবা বাসায় বিয়ের পাত্র নিয়ে হাজির, আমাকে না কি বিয়ে করতে হবে!

রাশেদ, আর্মির ক‍্যাপ্টেন। প্রকৃতি প্রদত্ত আমার সৌন্দর্যটাই কাল হলো। গেলো মাসে আমার খালাতো বোন সালমার বিয়ের অনুষ্ঠানে সে বর পক্ষের একজন। সাজগোজ করা এই আমাকে তার ভীষণ পছন্দ হলো। খোঁজ নিতে নিতে ঘটক নিয়ে একেবারে আমাদের বাসায় হাজির। আর গর্ভনমেন্ট ল‍্যাবরেটরী স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক আমার বাবা আব্দুল আলী, এ পাত্র পেয়ে বেজায় খুশি। ফৌজির সাথে না কি তার একান্ত কথোপকথনও হয়েছে, এরপর থেকে বাবার গো এই ছেলেকেই বিয়ে করতে হবে।

বান্ধবীদের অনেকেই আমার বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে শুনে যারপরনাই খুশি। তার উপর ছেলে আর্মির তাগড়া জোয়ান সুদর্শন এক অফিসার, খিলক্ষেতে নিজেদের বাসা। বান্ধবীরা আমার আসন্ন বাসরের কল্পনায় ওরা নিজেরা যতোটা না উত্তেজনায়, আমি ঠিক ততোটাই বিরক্ত। আমার বরাবরই স্বপ্ন লেখাপড়া শেষ করে, ভালো কিছু করা। সেকেন্ড ইয়ারেই বিয়ে, আমার সেই আশাটাতে যে গুড়ে বালি বেশ বুঝে নিলাম।

বাবা শিক্ষক হলেও প্রচলিত ধ‍্যান ধারণার বাইরের ছিলেন না। ভালো পাত্রের কাছে পাত্রস্হ বা কন‍্যা দায় মুক্তি, কারণ যেটাই হোক আমার আপত্তি থোরাই না কেয়ার করে এরপর বিয়ের আয়োজন করে ফেললেন। তাইতো ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেকটা বাধ‍্য হয়েই রাশেদ কে আমার “কবুল” বলা। জীবনের আরেকটি অধ‍্যায়ের শুরুটা কিন্তু মোটেও সুখকর অনুভূতির ছিলো না।

রাশেদের শত চেষ্টা সত্বেও, বিয়ের বাসরের আগ পযর্ন্ত আমি ওর সাথে কথা বলিনি। সত‍্য বলতে কি, রাশেদ আমার কাছে তখনো পযর্ন্ত ভিলেনই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্ছ্বাসে ভরা যৌবন, সদ‍্য গড়ে উঠা বন্ধু মহল। আড্ডা, সিনেমা, কবিতা, বিতর্ক। আর মাহিন বা সোহেলের মতো সহপাঠী রোমিওদের আমার পিছনে ছোক ছোক করা। ভালোই লাগছিলো। বেশ স্বপ্নের একটা জীবন ফেলে আমাকে এখন থেকে আর্মির বউ হয়ে, সংসার আর পার্টি নিয়ে ব‍্যস্ত থাকতে হবে। আসন্ন বোরিং জীবনটার কথা ভেবেই আতংকিত ছিলাম।

তবে বাসর রাতেই কিন্তু রাশেদ আমাকে আতংকমুক্ত করে দেয়। অত্যন্ত মেধাবী এই ফৌজি কিভাবে যেনো আমার ভাবনাগুলোকে বুঝে গিয়েছিলো। আমাকে আমার মতো পড়াশোনা আর জীবন চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেওয়াটায় বুঝলাম, এই লোককে আসলেই বিশ্বাস করা যায়।

রাশেদের সাথে কথোপকথনের কিছু সময় পর থেকেই কিন্তু ছেলেটাকে আর অপরিচিত বলে মনে হয় নি। নিজে থেকেই আমাকে সহজ করে নিলো। আর বাসর রাতে আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন‍্য ওর পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে একটা নেকলেস পড়িয়ে দেয়। এমনিতেই বিয়েতে ওদের পরিবার থেকে ভারী গয়নার সেট পেয়েছিলাম, অতিরিক্ত এই গলার হারটা বউয়ের জন‍্য লুকিয়ে কেনা। শুনেই মনে মন বললাম “হাউ সুইট”। এরপর থেকে মৃত্যুর আগ পযর্ন্ত রাশেদ কিন্তু নিয়ম করে প্রতি এনিভার্সেরিতে আমাকে স্বর্ণের কিছু উপহার দিয়ে গেছে। আমার প্রতি ছেলেটার থাকা অকৃত্রিম ভালোবাসা নিঃসন্দেহে প্রশ্নাতীত।

কাহিনীর এই পর্যায়ে এসে হয়তো অনেকেই খানিকটা হোচট খেয়েছেন। উৎসুক মনে প্রশ্ন। রাশেদ বিয়ের কতো বছর পর মারা গেলো? কিভাবে? আমার বতর্মান অবস্হাই বা কি? ধৈর্য ধরুন, কাহিনীতে একে একে সব কিছুই বলে যাবো। আমার জীবনটা যে সত‍্যই বর্ণিল, আকর্ষণীয় এক উপন‍্যাস। এই ছোট্ট জীবনেই এতো কিছু ঘটে যাওয়া আর তা সামলিয়ে বার বার ঘুরে দাড়ানোটার গল্পটাতে অনেকেরই প্রশংসা পাই। কিন্তু লোকে বুঝতে পারে না, জীবনে সংগ্রামী হয়ে বেঁচে থাকার মূল মন্ত্রটা যে বারো বছর আগে রাশেদই আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে। তাইতো দক্ষ সৈনিকের মতোই আমি এক অকুতোভয় জীবন যোদ্ধা।

এই যে দেখুন, আপনাদের সাথে অন‍্য বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছি গল্পটা যেনো কোথায় গিয়ে থেমেছিলো। ও হ‍্যাঁ, মনে পড়েছে, বাসর রাতে রাশেদের দেওয়া আশ্বাস আর ভালোবাসার অংশটুকুতে। পৃথিবীর সবচাইতে দ্রুত প্রেম মনে হয় আমার আর রাশেদেরটাই। বাসর রাতের দ্বিপ্রহরের মধ‍্যেই আমি স্বেচ্ছায় নিজেকে ফৌজির পেশি বহুল শরীরের কাছে আত্মসমর্পণ করালাম। ওর ভীষণ যত্ন ও ভালোবাসায় নেওয়া জীবনের প্রথমবারের আদরটাতে কিন্তু একটুও কষ্ট পাইনি। নিজেকে মনে হয়ছিলো পরিপূর্ণ একজন, এরপর থেকেই প্রেমময় জীবন সঙ্গী পাওয়ার আনন্দে বিভোর থাকলাম।

অনেকেই হয়তো বলবেন, সব স্বামীরাই বিয়ের প্রথম প্রথম এরকম প্রেম ভালোবাসায় গদ গদ থাকে। তারপর আস্তে আস্তে তাদের আসল রূপ বের হয়। অশান্তি, অবহেলা, দূর্ব‍্যবহার, পরকীয়া আর সর্বোপরি কষ্টের সংসার জীবনটাকেই বেশিরভাগ নারীকে মেনে নিতে হয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এক বিন্দুও মিথ‍্যা বলছি না। আমাদের বারো বছরের সংসারে, আমার প্রতি রাশেদের ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি, বরঞ্চ বেড়েছে। হ‍্যাঁ, আমাদের মধ‍্যেও মান অভিমান ঝগড়া ঝাটি হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই এগুলো আমাদের ভালোবাসাকে বাড়িয়ে দিয়ে গেছে বহু গুন।

একটা উদাহরণ দেই, বিয়ের তৃতীয় বছরের কোন একদিনের কথা। রাগ করে আমি ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম বলে সে টানা আঠারো ঘন্টা পানি পযর্ন্ত ছুঁয়ে দেখেনি। আচ্ছা আপনারাই বলেন এরপর কি কোন মানুষের সাথে আর কথা না বলে থাকা যায়!

শুধু আমার সাথের রিলেশনেই না, পরিবার বা প্রফেশনেও সততা ও বিশ্বাসের জন‍্য রাশেদের সুনাম ছিলো। তাইতো ওর মৃত্যুর এতো বছর পরও, অনেক মানুষই ওর কথা মনে রেখেছে। লোকজনকে খুব সহজেই আপন করে নেওয়ার তীব্র সম্মোহনী ক্ষমতার এই লোকটা, এখনো আমার মতো আরো অনেকের প্রাত‍্যহিক প্রার্থনায় আছে।

মূল গল্পে ফিরি, বাসর রাতের পর থেকে চলমান বৈবাহিক জীবন। আমি অসম্ভব ভাগ‍্যবতী একজন, খুব ভালো একটা পরিবারের ছেলের বৌ হতে পেরেই। আমার শ্বশুর সদ‍্য রিটায়ারমেন্টে যাওয়া একজন ব‍্যাংকার, শাশুড়ি স্হানীয় একটা স্কুলের শিক্ষক। তাদের দুই ছেলে মেয়ের মধ‍্যে বড় জন মেয়ে। বিয়ে হয়েছে অনেক বছর আগে। তাইতো একমাত্র ছেলের বউকে নিজের মেয়ে করে নিতে তাদের খুব একটা কষ্ট হলো না। আমি শিক্ষকের মেয়ে, গুরুজনদের কিভাবে সন্মান করতে হয় পরিবার থেকে শিখে এসেছি। তাইতো সব মিলিয়ে শ্বশুর বাড়িতে মানিয়ে নিতে আমার খুব একটা সমস্যা হয় নি। আর সবচাইতে বড় কথা, স্বামী বা শ্বশুর বাড়ির সবাই আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ায় আকুন্ঠ সমর্থনটায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়িয়ে দিলো বহুগুন।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, বিয়ের সময় রাশেদ আটাশ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। সাভার ক‍্যান্টনমেন্টে পোস্টেড ইনফেন্ট্রির অফিসারের ঐ সময় খিলক্ষেত -সাভার -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক‍্যাম্পাস- নানান ডেটিং স্পটে আমাকে নিয়ে তার দৌড়ঝাপ। তীব্র প্রাণ শক্তিতে ভরপুর এই লোকটার সাথে টিনেজদের মতোই প্রেম চালিয়ে গেলাম বিয়ের পর টানা দুই বছর। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে যাই এদিক ওদিক। আর সেই সাথে পড়াশোনাও চলছে পুরোদমে। ভার্সিটি শেষ করে মাঝে মধ‍্যে সাভার ক‍্যান্টনমেন্টে ওর মেসে রাত যাপনগুলো যেনো জীবনে আরেকটি বাসর রাত হয়েই আসে।

অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার দিন দশেক আগে থেকে শরীর প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেলো। বমি, মাথা ব‍্যথা, দূর্বলতা। প্রেগন‍্যান্সির লক্ষণগুলো স্পষ্ট। আশংকা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে টেস্ট করতে পাঠালেন। এমনিতে পরিকল্পনায় ছিলাম, কিন্তু মনে পড়লো কিছুদিন আগে সাভারের মেসে উত্তেজিত সৈনিকের অরক্ষিত ভালোবাসাটার কথা। তখনই কিন্তু আমার মনে সন্দেহ জেগেছিলো।

পরবর্তী দিন ফলো আপ ভিজিটে ডাক্তারের কাছে গেলে, টেস্ট রেজাল্ট দেখে নাটক সিনেমার মতো বলে উঠলেন “সুখবর, আপনি মা হতে যাচ্ছেন।” কথাটা শুনেই শরীরে শিহরণ জাগলো, তীব্র আনন্দে। কিন্তু পরক্ষণেই সামনের সপ্তাহ থেকে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা কথাটা মনে পড়ে যায়। এরই মধ‍্যে সর্বোচ্চ ফলাফল করার লক্ষ্য নিয়ে প্রিপারেশন নেওয়া। হঠাৎ এই অসুস্থতাটা পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল ব‍্যাঘাত আনতে পেরে, এই ভাবনা থেকে খুব একটা উচ্ছ্বসিত হতে পারলাম না।

মন খারাপের অনুভূতি নিয়ে চুপ করে ডাক্তারের পরামর্শ শুনে যাচ্ছি, পাশে বসা রাশেদের হাতটা হঠাৎই অগোচরে আমার হাতে। ওর দিয়ে যাওয়া আলতো মৃদু চাপে মুহূর্তেই ভীষণ সাহসী হয়ে গেলাম। আত্মবিশ্বাসী এই আমার মনে হলো, পরীক্ষা আর মাতৃত্ব দুটোই সামাল দিতে পারবো, দিতে হবে। রাশেদ যে সবসময় পাশে আছে, আমার স্বপ্ন সারথী হয়ে।

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here