স্রোতধারা পর্ব -০৭

#স্রোতধারা
দ্বিতীয়_অধ্যায়
সপ্তম_পর্ব
~মিহি

হায়ার সারা শরীর কাঁপছে। সৌহার্দ্য এখনো বুঝতে পারছে না একটু আগে ঠিক কী হলো। হায়ার আকস্মিক স্পর্শে তার সর্বাঙ্গে যেন তড়িৎ চালিত হলো। সৌহার্দ্যের দিকে তাকাতে পারছে না হায়া। চোখজোড়া নমিত করে সৌহার্দ্যকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিতেই সৌহার্দ্য হায়ার হাত ধরে তাকে নিজের কাছে দাঁড় করালো।

“তুমি এখনো বাচ্চা, হায়া। হুটহাট এমন কিছু করে বসো না যার জন্য তুমি লজ্জায় আমার মুখোমুখি হতে না পারো। আমায় স্পর্শ করতে নিষেধ করছি না। ভালোবেসে তুমি যতবার আমার কাছে আসবে, আমি ততবার আবরণ হয়ে তোমায় জড়াবো।”

“ছাড়েন, রুমে যাবো।”

“একটু পর সকাল হবে ততক্ষণ এখানেই থাকি।”

“নাহ।”

হায়া চুপচাপ নিজেকে ছাড়িয়ে ঘরে প্রবেশ করলো। সৌহার্দ্য একাকী দাঁড়িয়ে রইল ছাদের কিনারা ঘেঁষে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুখকর মুহূর্তে তার ঠিক কী করা উচিত? সৌহার্দ্যের মনে হচ্ছে এই মুহুর্তটাই তার জীবনের সবচেয়ে সুখকর মুহূর্ত।

________________________

আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য খেলনা, খাবার নানান কিছুর আয়োজন করেছে স্রোত। ধারার জন্মদিনটা একটু অন্যরকম ভাবেই কাটানোর ইচ্ছে ছিল তার কিন্তু আশ্রমে গিয়ে একটা ঘটনা ঘটলো। আশ্রমে আরেক জোড়া খেলনা-পোশাক ইত্যাদি উপহার এসেছে। এভনকি একটা আস্ত কেকও পাঠানো হয়েছে। স্রোত নিজেই কেক এনেছিল। ধারা যেন বাচ্চাদের সাথে কেকটা কাটতে পারে কিন্তু অন্য কেউ একজনও নিজের জন্মদিন আশ্রমটাতেই পালন করতে চেয়েছে ভেবে আর কিছু বললো না স্রোত।

কেক কাটার সময় বিস্ময় বাড়লো স্রোতের কেননা অন্য জোড়া উপহার পাঠানো ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, তেহযীব। আজ তারও জন্মদিন এবং সে ছোট থেকেই এ আশ্রমে জন্মদিন পালন করে। স্রোত কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। তেহযীব নিজে থেকে এসে ধারার সাথে কথা বললো।

“ধারা? কেমন আছেন?”

“আলহামদুলিল্লাহ। আপনার জন্মদিন আপনি এখানে পালন করেন জানলে আমি এভাবে বিরক্ত করতে আসতাম না।”

“আরে! এভাবে বলার কিছু নেই। জন্মদিন আপনারও, আমারও। একসাথে কেক কাটা যাক।”

ধারা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লো। এর চেয়ে শুধু পারিবারিকভাবে জন্মদিন পালন করতে পারলেই সে খুশি হতো। স্রোতের বাবা-মা হঠাৎ একটা কাজে গ্রামে চলে যাওয়ায় সেটারও সুযোগ নেই এখন। মিনিট পাঁচেক ভেবে তেহযীবের সাথেই কেকটা কাটলো ধারা। সবাইকে কেক খাইয়ে স্রোতের কাছে এসে বসলো। স্রোত ধারার অস্বস্তি আন্দাজ করতে পারছিল। ধারা বরাবরই একটু ইন্ট্রোভার্ট ধরনের। তেহযীবের অতিরিক্ত মিশুক স্বভাব ধারার পছন্দ হচ্ছে না তা বুঝতে বাকি নেই তার। স্রোত বাচ্চাদের সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ধারা হালকা হেসে সমর্থন করলো তাকে। স্রোত বাচ্চাদের মধ্যে গিয়ে বসলো। ধারা দূর থেকে তা দেখতে লাগলো। বাচ্চাদের পেলে ছেলেটার আনন্দ ধরে না। এমন একটা অনুভূতি, এমন আনন্দ প্রতি মুহূর্তের জন্য স্রোতকে দিতে পারে না সে? বাবা-মা হওয়ার উপযুক্ত সময় এটাই। ভাবতেই লজ্জায় লাল হয়ে আসে ধারার গাল। স্রোতের দিকে অনিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে অনুভব করে সে, ‘ভালোবাসা থাকা মানেই জীবন পরিপূর্ণ।’

বেশ কিছুক্ষণ বাদে স্রোতেরও আর মন টিকছিল না। হায়া-সৌহার্দ্যও অন্যমনস্ক হয়ে ঘুরছিল। বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল সবাই। আশ্রমের বাচ্চাদের বিদায় দিয়ে মূল ফটকের দিকে এগোতেই তেহযীব ডাক দিল ধারাকে। স্রোত কিছুটা বিরক্ত হলো তবুও কিছু বললো না। সোনালী বর্ণের গিফট বক্স এগিয়ে দিল ধারার দিকে।

“সেদিন আমার প্রাণ বাঁচতো না যদি ঐ কেবিনে আপনারা আমাকে এলাও না করতেন। জন্মদিনের উপহার নিতে অনিচ্ছুক হলে কৃতজ্ঞতা উপহার ভেবে নিজের কাছে রাখবেন। আমার ভালো লাগবে।”

ধারা তেহযীবের মুখের উপর না করতে পারলো না। কৃত্রিম হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে উপহারটা নিল ধারা। অতঃপর আর কিছু না বলে প্রস্থান করলো।

________________________

তেহযীবের দেওয়া গিফট বক্সে একটা কাচের শো-পিচ ছিল। শো-পিচে একটা ছেলে এবং একটা মেয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শো-পিচটা বেশ ভালোই লেগেছে ধারার। বেডরুমের টেবিলের পাশে তা সাজিয়ে রেখেছে ধারা। সারাদিনের ক্লান্তিতে মাত্র বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল ধারা। আচমকা পায়ের পাতায় ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো। স্রোতকে পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে চটজলদি উঠে বসলো।

“পায়ে চুমু খাচ্ছো কেন? সরে আসো তো।”

“শসসস!” ঠোঁটে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ধারাকে চুপ থাকতে ইশারা করলো স্রোত। পকেট থেকে একটা পায়েল বের করে ধারার পায়ে পড়িয়ে দিল। ধারা হালকা হেসে স্রোতের কাছে গিয়ে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরলো। স্রোতও ধারাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করলো। ধারার চোখের কোণে জল জমতে শুরু করেছে।

“বাড়ির মানুষজন কই সব? মরছে নাকি? ভাই? ভাবী?” প্রচণ্ড চেঁচামেচির শব্দে বিরক্ত হলো স্রোত। কণ্ঠস্বর চিনতে পেরেই স্রোত আঁতকে উঠলো।

“সর্বনাশ!” স্রোত চেঁচিয়ে উঠলো।

“কী হয়েছে? কে চেঁচাচ্ছে দেখি তো চলো।”

“কে আবার? চলো দর্শন করাচ্ছি আমার দূরসম্পর্কের ফুপিজানের সাথে।”

“তোমার ফুপি আছে? আগে তো বলোনি? বিয়েতেও তো কেউ আসেনি।”

“বাবার সাথে চাচা আর ফুপির সম্পর্ক খারাপ হয়েছে অনেক বছর আগে। তারপর থেকে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। ফুপি হঠাৎ হঠাৎ তুফান হয়ে আসেন এ বাড়িতে কিন্তু আজ এত রাতে এ তুফানের আগমন কেন হলো দেখি তো চলো। আর শোনো, ফুপির একটাই মেয়ে। সে মেয়েকে তিনি এ বাড়ির বৌ করতে চেয়েছিলেন। মূলত সৌহার্দ্য ভাইয়ার বউ করতে চেয়েছিল। হায়াকে একটু ওর থেকে সাবধান করিও। চলো এখন।”

ধারা স্রোতের পিছু পিছু ঘর ছেড়ে বেরোলো। সৌহার্দ্য আর হায়াও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।

ব্যাগ হাতে ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে আছেন স্রোতের ফুপি রজনী চৌধুরী। পাশে তার মেয়ে তারা দাঁড়িয়ে। মেয়েটা ধারার বয়সী হবে। দেখতে বেশ সহজ সরল, প্রসাধনীর ছাপ নেই মুখে তবুও অন্যরকম একটা গ্লো ফুটে উঠছে চেহারায়। রজনী চৌধুরী বাঁকা দৃষ্টিতে একবার ধারা আর একবার হায়ার দিকে তাকালেন। অতঃপর স্রোত এবং সৌহার্দ্যের দিকে তাকালেন।

“এ মেয়েরা কারা? ভাই ভাবী বাড়িতে নেই দেখে তোরা এত নিচে নেমে গেলি? ছিঃ!” মুখ কুঁচকে বললেন তিনি।

“না ফুপি! ভুল ভাবছো। ধারা আমার স্ত্রী আর হায়া ভাইয়ার স্ত্রী।”

“তোরা বিয়ে করেছিস? কী বলিস? তোদের বিয়ে আর আমি দাওয়াত তো দূর খবরটুকুও পেলাম না? এত পর করে দিলি রে?”

“আহ ফুপি! সেভাবে কাউকেই ডাকা হয়নি।”

“চুপ কর! কোনো কথা বলবি না। দেখি কেমন বৌ এনেছিস তোরা। তা বৌমা, ফুপি শাশুড়ির জন্য একটু রান্না-বান্না করো তো।”

“ফুপি, এখন অনেক রাত হয়ে গেছে। সবাই ক্লান্ত। আমি তোমাদের জন্য খাবার অর্ডার করে দিচ্ছি।”সৌহার্দ্যের কথায় ভ্রু কুঁচকালেন রজনী।

“না! পরিবারের মানুষদের সার্বিক সুবিধা দেখা বাড়ির বউয়ের দায়িত্ব। দায়িত্ব পালন না করলে কিসের যোগ্য বৌমা? দেখি যোগ্যতা প্রমাণ করো।” রজনী বেশ দাপুটে স্বরেই কথাটা বললো রজনী।

“আমার মেয়ে কিন্তু অনেক ভালো রান্না করে। দেখি তোমরা ওর চেয়ে ভালো পারো কিনা।” রজনীর এ কথায় হায়া ঠোঁট টিপে হাসে। কী ভেবে যেন বলে উঠে,

“তাহলে একটা কম্পিটিশন হয়ে যাক?”

“হোক! এই তারা, যা তো তোর রান্নার জাদু দেখা।”

হায়া মুচকি হাসলো। ধারার দিকে তাকিয়ে চোখ বুঁজে তাকে আশ্বস্ত করলো। ধারা তো জানেই কী হতে চলেছে তবুও তারাকে দুর্বল ভাবছে না সে। তবে হায়ার উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে তার।

“শোন তারা, যে করেই হোক ওকে জিততে দিবি না। দরকার পড়লে যা করা লাগবে করবি।” মায়ের কথায় তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার মা কখনো শুধরাবে না।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here