হবে কি আমার পর্ব -১২

#হবে-কি-আমার(2)💞
#writer_Ruhi-mondal
#পর্ব_12

“ভালোবাসি বরবাবু!”

পুরো ঘরে নিভু নিভু মোমবাতি জ্বলছে।তার সুন্দর মনকাড়া লালচে আলোয় দুজনের মুখ মায়াবী লাগছে।এক আলাদা সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে আশপাশে। জানালার পর্দা সরানো সেখান থেকে জোৎস্নার সুন্দর একফালি আলো খাটের উপর পড়ছে।অনু সেই আলোতেই তার সামনে থাকা তার ব্যক্তিগত ব্যাক্তিটির বুকে হাত ভাঁজ করে তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে মনের কথা বলল, কথাটা কর্ণগুহতে পৌঁছাতেই খানিকটা চমকে উঠে ‘অরিন্দম’ কিন্তু নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখলো সে। চোখ জোড়া বন্ধ করেই ঘুমের নাটক করে থাকল,এ মেয়েকে সে এত সহজে বুঝতে পারবে না। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়।

অনু কথাটা বলে অরিন্দমের লাল অধরে চুমু দিয়ে বসে। অরিন্দম কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তার বুক দ্রিম দ্রিম করে উঠলো কেমন মৃগী রুগীর মত কাঁপতে লাগলো সে। অনু তাকে ছেড়ে নিজ বালিশে এসে চোখজোড়া বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। অরিন্দম বুকে হাত দিয়ে চোখ খুলে তাকালো কিছুক্ষণ ওপরে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থেকে পাশে শুয়ে থাকা অনুর দিকে তাকায়, অতঃপর সে দেখল অনু গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে, অদ্ভুত এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরলে কি করে? অরিন্দম উঠে বসে। তার বিষ্ময় কাটছে না সে অনুর হাত ধরে ঝাকিয়ে বলল,
___এই ওঠো। এক্ষুনি কি করলে তুমি?

অনু পিটপিট করে তাকালো। অরিন্দমের বিষ্ময় ভরা মুখ দেখে তার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে সে নিজের হাসি দমিয়ে বলল,
___কি হলো আপনার এমন ভাবে চিৎকার করছেন কেন?
অরিন্দম বোকার মত প্রশ্ন করে বলল,
__তুমি একটু আগে আমার সাথে কি করলে?

অনু চোখমুখ কুঁচকে বলল,
___”আমি আপনার সাথে আবার কি করব! আমি তো ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়ে ছিলাম। আপনি তো আমাকে ফিরিয়ে আনলেন। এবার প্লিজ আমাকে ঘুমাতে দিন। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি জানিনা আপনার সাথে কে কি করল। বলে অনু আবার বালিশে মাথা দিয়ে অন্য দিকে মুখ করে হাসতে হাসতে চোখ বুঝে নিল। অরিন্দম এখনো আশ্চর্য হয়ে আছে এই মেয়ে এত সহজে কিভাবে মিথ্যা বলতে পারে। সে তো স্পষ্ট ফিল করেছে। কিন্তু এই মেয়েটা এক কথায় নাকচ করে দিল। সত্যিই কি মেয়েটা পাগল নাকি। এসব ভেবে অরিন্দম আবার নিজের মাথা চুলকাতে লাগল কারণ এই মেয়েটা একটু আগেই চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় করেছিল।বলেছিল,

আপনি এমন কেন করলেন কেন সব এমন ভাবে ওলট পালট করে দিলেন? আপনি পারলেই তো সমস্ত কিছু সামলে নিতে পারতেন। বিয়ে করলেন কেন? আমার সমস্ত কিছু শেষ হয়ে গেল। মামী আমাকে আর ভালোবাসবে না। আমি মানি না এ বিয়ে।

অরিন্দম বেশকিছুক্ষণ ধরে তাকে বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু মেয়েটা শুনছেই না।তাই সে এবার একটু জোরেই বলল,

______ এসব কি বলছো তুমি,আর যা বলছো তার মানে জানো তো, তুমি? বিয়ে মানি না মানেটা কি? যা হয়েছে তাতে আমি নিজেকে দায়ী করছি কিন্তু তাই বলে বিয়ে মানি না এমন বলো না প্লিজ। দেখো তুমি তো নিজেই আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে! তাই না!

অনু ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
____চেয়েছিলাম বিয়ে করতে কিন্তু এত বড় অপবাদ নিয়ে না! মামী কতটা কষ্ট পেয়েছে আপনি দেখেছেন। আপনি মামী’কে বোঝাতে পারতেন। কেন রাজি হয়ে বিয়ে করে নিলেন আপনি? মামীর রাগের মাথায় বলা কথায় রাজি হয়ে বিয়ে করলেন কেন?

অরিন্দম এগিয়ে গিয়ে অনুকে জড়িয়ে ধরতে যায় অনু ছিটকে সরে যায়। অরিন্দম থামলো না সে যেকোনো উপায়ে মেয়েটাকে শান্ত করবে! কাল রাত থেকে মেয়েটা একটাও কথা বলেননি। যার রাগ এখন দেখাচ্ছে। অরিন্দম দুহাতে অনুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বোলাতে থাকে। তনুশ্রী তাকে বলে দিয়েছে অনু রেগে গেলে সে আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যায় তাকে সামলানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে একেবারে পাগলের মত আচরণ করে অরিন্দম তা বুঝেই এতক্ষণ মেয়েটাকে ঠান্ডা মাথায় বোঝাচ্ছিল। কিন্তু অনু এখন সত্যি সত্যি আউট অফ কান্ট্রোল হয়ে পড়েছে, অরিন্দম তাকে বুকে চেপে ধরে বলল,
__আই প্রমিস সব ঠিক করে দেব শান্ত হোও!

অনু একটু ক্লান্ত হয়ে এলো সে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। অরিন্দম তা দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেললো।
চোখ বুঝিয়ে কাল রাতের কথা মনে করতে লাগলো।
________

অলকা দেবী অনুরাগে কে ডাকতে অনুরাগ তার কাছে যায় অলকা দেবী তাকে আর অরিন্দম কে রুমে ডাকলেন। অরিন্দম চমকালো কিন্তু কিছু বললো না তার জন্য সমস্ত কিছু হয়েছে সে একটা সুযোগ চাইছিল অলকা দেবীকে বুঝিয়ে বলার জন্য আর এইটাই মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে তাই অরিন্দম অনুরাগের সাথে অলকা দেবীর রুমে যায় তাদের তিনজনের মধ্যেই মিনিট দশেক কথা হয় অতঃপর কিছুক্ষণ পর তিন জনেই রুম থেকে বেরিয়ে আসে। অরিন্দম ধম মেরে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরের সবার চোখেমুখ চিন্তার ছাপ ছিল ভিতরে কি কথা হলো তারা কেউ জানে না। অতঃপর অলকা দেবী গম্ভীর গলায় বললেন,

___আজ এই মণ্ডপে আর একটা বিয়ে হবে! অনুরাগ সমস্ত কিছু ব্যবস্থা কর।

ওনার মুখে এই কথা শুনে সকলে আশ্চর্য হয়ে অলকা দেবীর দিকে তাকাল। তিনি মন্ডপের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বললেন,
____অরিন্দম তোমাকে আমি একটা সুযোগ দিচ্ছি তুমি কি অনুকে বিয়ে করতে চাও? যদি রাজি থাকো তাহলে এই মণ্ডপে তোমার আর অনুর বিয়ে দেবো।

অনু চমকে উঠে মামীর দিকে তাকালো। সে অরিন্দম কে বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু মামীকে এমন ভাবে কষ্ট দিয়ে নয়। সে মামীর দিকে এগিয়ে গিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তিনি কড়া গলায় বললেন,
___”আমি অরিন্দম ছাড়া কারো কথা শুনতে চাই না।”
তনুশ্রী উনাকে আগেই বলেছি অরিন্দমের কথা আর তিনি পরে ভেবে দেখবেন বলেছিলেন কিন্তু এখন তিনি তাদের বিয়ে দিতে চান। অলকা দেবী অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
__আমি একবারই সুযোগ দিই। জোর করছি না! তোমাকে সমস্ত কিছু জানিয়েই বলছি। যদি রাজি থাকো। বলো?

অরিন্দম কিছুক্ষণ বিষয়টা নিয়ে ভাবে সে রাজি না হওয়ার কোন কারণ দেখছে না। সে এই মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু এমন ভাবে না। তবুও অজ্ঞাত তাকে এমন ভাবে বিয়ে করতে হবে অতঃপর বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। অনু শব্দ করে কেঁদে উঠলো সে এখন বিয়ে করতে চায় না। তবুও তার বিয়েটা হয়ে যায়। আর সমস্ত দায়িত্ব অনুরাগের ওপর ছিল সে অনুর জন্য খুশি হলেও এই সিচুয়েশন পড়ে খুব খারাপ লাগছে তার। বিয়ের সমস্ত কাজ করে পুরোহিত মশাইকে সিঁদুরে প্যাকেট থেকে কৌটা বার করে তা খুলে দিতে গিয়ে অসাবধানতায় তার হাতে অর্ধেক সিঁদুর মাখা মাখি হয়ে যায়। নিয়ম মাফিক মন্ত্র পড়ে অরিন্দম অনুর সিঁথিতে সিঁদুর রাঙিয়ে দেয়। অনু কেঁপে কেঁপে কেঁদে ওঠে তার কান্না দেখে তিশা নিজেও কেঁদে ফেলে। বিয়ে শেষ হতে অনু মামী’র সামনে গেলে তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। তা দেখে অনু কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে নিচে বসে যায় অনুরাগ তাকে সামলাতে তার পাশে গিয়ে বসে। সারা রাত ওভাবেই কেটেছে। অনু মাথা ব্যাথা চোখ মুখ শুকিয়ে আসে তিশা তাকে জোর করে মাথা ব্যাথার মেডিসিন দেয়। সকাল হতে অলকা দেবী দুই মেয়েকে বরণ করে বিদায় জানান কিন্তু অনুর সাথে কথা বলেন না। দুই মেয়ে তাকে জড়িয়ে অঝোড়ে কেঁদেছে। মহেশ বাবু অরিন্দমের হাত ধরে বলেছেন,অনুর খেয়াল রাখতে। পাগলি মেয়ে সে। যখন তখন আবোল তাবোল বকে। সে যেন তাকে মানিয়ে নেয়। অরিন্দম আশ্বস্ত করে বলে সে সব সামলে নেবে।

কলকাতায় নিজ বাড়িতে যখন ফিরল তখন দুপুর ছিল। অনুকে রাস্তায় তনুশ্রী জোর করে কিছু খাইয়ে দিতে সে বেঘোড়ে ঘুমিয়ে যায়। যখন ঘুম ভাঙ্গলো নিজেকে অরিন্দমের রুমে পায়। চারিদিকে সুন্দর মোমবাতি দিয়ে সাজানো ছিল। অরিন্দম তাকে খুশি করার জন্য একটু রুমটাকে সাজিয়ে ছিল। অনু তা দেখে খুশি হলেও মামীর কথা মনে হতে সমস্ত কিছু অসহ্য লাগে। মা না থাকলে ও সে মামীর শাসন ভালোবাসা সব পেয়েছে। তাকে কষ্ট দিয়ে নিজেকে অপরাধী লাগছিলো তার। অরিন্দম কে দেখে জমে থাকা প্রতিবেশীর রাগ সে তার ওপর তোলে।আর অরিন্দম মুখ বুজে সহ্য করে কিন্তু এখন যে পারছে না সামলাতে সকাল থেকে তার সাথে কথা বলেনি অনু। অরিন্দম ও একটু টেনশনে আছে কারণ গ্রামে তার ও ফ্যামিলি আছে তার কাকা কাকিয়াকে সে কি জবাব দেবে। তার মা-বাবা নেই দু’বছর আগে এক্সিডেন্টে মারা যায় তারপর থেকে কাকা কাকি তাকে মা বাবার শ্রেয় দিয়ে আসছে উনারা বিয়ে করতে বললে অরিন্দম বলেছে এখনো কয়েক বছর পর সে বিয়ে করবে কিন্তু হুট করে বিয়ে করে নেওয়ায় সবার রিয়াকশন কি হবে সে সেটাই ভাবছে।

অনু অরিন্দমের বুক থেকে সরে বলল,
__আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাবো।

অরিন্দম তার গালে হাত রেখে বলল,
___কিছু খেয়ে নেবে চল!

অনু এক ঝটকায় হাত সরিয়ে গটগট পায়ে খাটের কাছে গিয়ে ধরাম করে শুয়ে পরে! ওর এমন শোয়া দেখে অরিন্দম তাজ্জব বনে যায়। বোকার মত অনুর দিকে তাকিয়ে রইল। এমন ভাবে কেউ খাটে শোয় সে আজ প্রথমবার দেখল। কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে অগত্যা সে আর কিছু না বলে অনুর পাশে চুপটি করে শুয়ে রইলো।

কি অদ্ভুত তারা দুজন দুজনকে ভালোবাসে কিন্তু এখন এমন ভাব করছে যেন অরিন্দম তাকে নিজের ইচ্ছায় শুধুমাত্র একতরফা ভালোবেসে বিয়ে করেছে কিন্তু এমনটাতো নয় মূলত তার থেকে বেশি অনু অরিন্দম কে ভালোবাসে বেশি কিন্তু পরিস্থিতি মানতে অনুর একটু সময় লাগবে হয়তো। এসব কথাই ভাবতে ভাবতে অরিন্দম ঘুমিয়ে পড়ে।
________

কিন্তু অনুর হুট করে তাকে কিস করায় সে কিছুটা ভড়কে যায়। পাশ ফিরে অনুর দিকে তাকালো আবার। না সে এখনও উল্টো পাশে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছে। অরিন্দম চোখ জোড়া বন্ধ করলো। সে ক্লান্ত প্রচুর একটু ঘুমাতে চায়। আস্তে আস্তে সে ঘুমিয়ে যায়।

অনু পিছন ফিরে অরিন্দমের দিকে তাকালো অরিন্দম ঘুমিয়ে আছে দেখে অনু আবার তার পাশে সরে এলো। অরিন্দমকে গভীর ভাবে দেখতে লাগলো, হলুদ ফর্সা মুখে হালকা চাপ দাড়ির মধ্যে লাল ঠোঁট বিশিষ্ট সুদর্শন পুরুষ, ভ্র যুগল মোটা। অনু হাত বাড়িয়ে অরিন্দমের উস্কখুস্ক চুলগুলো নাড়িয়ে দিলো, অতঃপর সে মুচকি হেসে মাথা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে অরিন্দমের বুকে মুখ গোঁজে আর একটু আগের ঘটনার জন্য সে অনুতপ্ত হতে লাগলো সে কার রাগ কার ওপর তুলেছে। কিন্তু এই ছেলেটা তাকে কিছুই বলেনি। কেমন সব কামলি ভাবে তাকে শান্ত করেছে। অনু মুচকি হাসলো সে যাকে চেয়েছিল তাকে যেমন ভাবেই হক পেয়েছে। সে খুশি খুব খুশি। শুধু মামীর কাছে গিয়ে তাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে নিজের ট্যাকনিক উইজ করে তাকে মানিয়ে নেবে। অরিন্দম কে পেয়ে সে সমস্ত কষ্ট ভুলতে পারে। অনু মাথা তুলে এগিয়ে গিয়ে অরিন্দমের গালে আবার চুমু দিয়ে বুকে মুখ গুঁজে দেয়। অরিন্দম সব বুঝলো তবুও চোখ খুললো না শুধু দুহাতে অনুকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরলো!

#চলবে

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here