হাতটা রেখো বাড়িয়ে পর্ব -২৭+২৮

পর্ব ২৭+২৮
#হাতটা_রেখো_বাড়িয়ে
#পর্ব-২৭
Writer: ইশরাত জাহান সুপ্তি

সকাল বেলা। সবাই বসে আছে নাস্তার টেবিলে। ডিম ভাজি, ডাল ভুনা, আর গরম গরম রুটি তে মজে আছে তারা। শাহেদ আর আজিজ সাহেবের খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। ঠিক সেই সময় ধারা হঠাৎ খাবার ফেলে দৌঁড়ে বেসিনের দিকে ছুটে গেলো। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। ধারা বমি করছে। হঠাৎ করে কি হলো তার? আসমা বেগম মেয়ের পিঠে হাত বুলাতে লাগলেন। ধারা একটু নিজেকে সামলিয়ে পর্যুদস্ত চেহারায় চেয়ারে বসলো। আসমা ধারার কপালে গলায় হাত লাগিয়ে দেখলেন। জ্বর নেই। অন্য কোন অসুস্থতার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। তবুও এমন হলো কেন বুঝতে পারলেন না। আসমা বলল, ‘কিছুই তো ঠিকমতো খাইতে পারলি না। আবার একটু পরে খাইয়া নিস।’
ধারা মাথা নেড়ে বলল, ‘না, আমি খেতে পারবো না। খাবারে কেমন যেন গন্ধ লাগে।’

আসমা ঝট করে জমিরন বিবির দিকে তাকালেন। ধারা আস্তে আস্তে উঠে রুমের ভেতর চলে গেলো। জমিরন বিবি আসমাকে বললেন,
‘বউ, তোমার মাইয়া তো মনে হয় পোয়াতি হইছে।’
কথাটা শাহেদ আর আজিজ সাহেবের মাথায় বাজ ফেললো। শাহেদ বলল,
‘আম্মা, আপনি কিসব কথা বলেন?’
জমিরন বিবি খেঁকিয়ে উঠে বললেন,
‘ক্যা? আমি কি কিছু বুঝি না। সব কি খালি তোরাই বুঝোস? আমার চোখ কখনো ভুল দেহে না। ও’র লক্ষণ সব আগের তনেই আমার ঠিক লাগতাছিলো না। এহন যা বোঝা গেলো ও’র পেটে বাচ্চাই আইছে।’

শাহেদ আর আজিজ সাহেবের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠলো। তারা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। সেদিন সারাটা দিন তাদের অস্থিরতায় কাটতে লাগলো। আসমা মেয়ের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে যেই উত্তর পেলো তাতে সেই সন্দেহ আরো পাকাপোক্ত হয়ে গেলো৷ তারা মেনেই নিলো ধারা প্রেগন্যান্ট। আজিজ সাহেব এবং শাহেদের মুখ একদম ভোঁতা হয়ে রইলো। ধারার ভীষণ হাসি পেলো। রুম থেকে উঁকিঝুকি দিয়ে সে তাই দেখতে লাগলো। শাহেদ ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা অস্থির হয়ে পায়চারী করতে করতে বলল,
‘এটা কি হলো? আমি মানতেই পারছি না।’
আজিজ সাহেব চেয়ারে থম মেরে বসে আছেন। জমিরন বিবি পাশ থেকে বলে উঠলেন,
‘মাইয়া বিয়ার পর সাড়ে তিন মাসের মতোন জামাইয়ের ধারে ছিল৷ অস্বাভাবিক কিছু তো না। না মানতে পারার কি আছে?’

শাহেদ আজিজ সাহেবের কাছে গিয়ে বলল,
‘ভাইজান, এখন কি হবে?’
তারপর আমতা আমতা করে কিছু বলতে চাইলে তার কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে আজিজ সাহেব দ্রুত বলে উঠলেন,
‘চুপ! তোমার মাথা ঠিক আছে? এখন কি এর জন্য পাপ মাথায় নিবো আমরা! আল্লাহ যখন দিছে এই বাচ্চা আমরা ফেলতে পারি না। যার জন্ম হওয়ার তার তো হতেই হবে।’

‘তাহলে এখন কি করবেন? ধারাকে আবার ঐ ছেলের কাছে পাঠাবেন?’
এই প্রশ্নের উত্তরে আজিজ সাহেব চুপ করে রইলেন। তার হঠাৎ নিরবতা শাহেদের পছন্দ হলো না।

বাড়ির পরিবেশ অস্বাভাবিক থাকলেও ধারার অনুকূলেই রইলো। সবাই নিরব থাকলেও মনে মনে কি সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে তা যেন স্পষ্টই পরিস্ফুট হতে লাগলো। ধারা সারাদিন কিছু না খেয়ে বিছানায় শুয়ে রইলো। আর আজিজ সাহেব আর শাহেদের কপাল থেকে চিন্তার ভাঁজ সরলো না।

পরদিন সকাল বেলা হুট করেই জমিরন বিবির শরীর ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। এদিকে বাড়িতে কোন পুরুষ নেই। সবাই সকাল সকাল বেড়িয়ে গেছে। ধারা আর আসমা কি করবে কিছু বুঝতে পারলো না। এদিকে জমিরন বিবির হাত পা ও ভীষণ ঠান্ডা হয়ে আসছে। ধারা বারবার মালিশ করে দিতে লাগলো। হাসপাতালে নেওয়া দরকার। আজিজ সাহেব আর শাহেদ কারো নাম্বারেই ফোন ঢুকছে না। ধারা দৌঁড়ে রাস্তার মাথায় গেলো। গাড়ির কোন দেখা নেই। সময়ও কেটে যাচ্ছে। কোন উপায়ান্তর না পেয়ে ধারা শুদ্ধকে ফোন দিলো। কিছুক্ষণ পর শুদ্ধ দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সেখানে উপস্থিত হলো। এসে জানালো গতকাল বিকেল থেকে ঝড় বৃষ্টি হওয়ায় সারারাত কারেন্ট না থাকায় একটা অটোতেও চার্জ নেই। কারেন্ট না আসার আগ পর্যন্ত কোন অটো পাওয়া যাবে না। সে নিজেও খুব কষ্ট করে একজনের কাছ থেকে বাইকে লিফট নিয়ে অর্ধেক পথ এসেছে। আর বাকি পথ দৌঁড়িয়ে। হাসপাতাল এখান থেকে ভালোই দূরে। কি করে জমিরন বিবিকে এখন হাসপাতালে নেওয়া যায় এটাই সবথেকে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। ধারা বারবার আতঙ্কিত হয়ে জমিরন বিবির মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। জ্ঞানহীন জমিরন বিবি নিথর হয়ে পড়ে আছেন। শুদ্ধ ধারার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘তুমি চিন্তা করো না ধারা। একটা না একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
শুদ্ধ আবারো কোন গাড়ির খোঁজে বেড়িয়ে পড়লো। খানিক বাদে ফিরে এলো একটা ভ্যান নিয়ে। ধারা যখন দেখলো সাথে কোন চালক নেই তখন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘কার ভ্যান এটা?’
শুদ্ধ বলল, ‘আমি জানি না। রাস্তার পাশে সেই সকাল থেকে দাঁড়া করা ছিল। কোন মানুষ দেখতে পাইনি। আমি পাশের একটা দোকানদারকে বলে রেখে নিয়ে এসেছি। আসল মালিক আসলে সে জানাবে ইমারজেন্সির জন্য নেওয়া হয়েছে।’
‘ভ্যানচালক না থাকলে এটা চালাবে কে?’
‘আমি চালাবো। ধারা এতো কথা বলার এখন সময় নেই। দাদীকে এখন আগে হাসপাতালে নিতে হবে।’

এরপর শুদ্ধ নিজে ভ্যান চালিয়ে জমিরন বিবিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। সাথে গেলো আসমা আর ধারাও। হাসপাতালে গিয়ে বাঁধলো আরেকটা বিপত্তি। ডাক্তার জানালো জমিরন বিবির প্রেশার অত্যন্ত লো হয়ে গেছে। পাশাপাশি তার শরীরে রক্ত অনেক কম। রক্ত দিতে হবে। এদিকে তার রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ। পাওয়া খুবই দুস্কর। ধারা আর আসমা চিন্তিত বোধ করলো। শুদ্ধ ওষুধ কিনতে গিয়েছিল। এসে যখন শুনলো রক্তের কথা তখন সবাইকে আশ্বাস দিয়ে জানালো তারও রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ। চিন্তার কোন কারণ নেই। এরপর ডাক্তার রক্ত নেওয়ার ব্যবস্থা করলো। শুদ্ধ জমিরন বিবিকে রক্ত দিল। একটু আশ্বস্ত বোধ করলো সবাই। ডাক্তার জানালো চিন্তার আর কোন কারণ নেই। বিকেল নাগাদই জমিরন বিবিকে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবে তারা। দুপুর হয়ে এলে শুদ্ধ গিয়ে বাইরে থেকে কিছু খাবার কিনে এনে আসমা আর ধারাকে দিলো। আসমা শুধু একটু পর পর শুদ্ধকেই দেখতে লাগলো। ধারা এক বিন্দুও মিথ্যা বলেনি ছেলেটাকে নিয়ে। এই ছেলেটার সবকিছুই মুগ্ধ করার মতো। আসমা ভীষণ স্বস্তি বোধ করলো। তার মেয়ে আসলেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে একটু একলা সময় দেওয়ার জন্য আসমা উঠে কেবিনের ভেতর চলে গেলো। ধারা আর শুদ্ধ রয়ে গেলো বাইরে। পাশাপাশি বসা। ধারা ছলছল চোখে শুদ্ধ’র দিকে তাকিয়ে বলল,
‘থ্যাংক্স!’
শুদ্ধ ধারার দিকে কিছুক্ষণ সরু চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কিসের থ্যাংক্স? আমার আর তোমার মধ্যে কোন থ্যাংক্সের জায়গা নেই। আমি তোমার জন্য কিছু করবো না তো কে করবে? হুম? তোমার উপর আমি কখনোই কোন সমস্যা আসতে দিবো না। একবার বলেছি না! আমি সবসময় তোমার পাশে আছি। সবসময়! কখনো নিজেকে একা ভাববে না। আমরা দুজন মিলেই তো এক।’

ধারা আর কিছু বলতে পারলো না। একটা প্রশান্তির ছাপ নিয়ে শুদ্ধ’র কাঁধে মাথা রেখে বসে রইলো। এই দৃশ্য কেবিনের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলো আসমা। তার মনে এতোদিন যতটুকুও বা খুঁত খুঁত ভাব ছিল সব একদম দূর হয়ে গেলো। তার চোখেও হঠাৎ কেন যেন পানি চলে এলো। খুশির জল।

বিকেল বেলা জমিরন বিবিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। তার শরীর এখন খানিকটা ভালো। শহরে গাড়ির কোন অভাব নেই। শুদ্ধ একটা অটো ঠিক করে আসমা আর জমিরন বিবিকে পাঠিয়ে দিলো। আর বলে দিল এর পরের অটোতেই ধারা শুদ্ধ আসছে। ভ্যানের আসল মালিক দুপুরে এসে তার ভ্যান নিয়ে গেছে। শুদ্ধও সাথে অনেকটা বকশিশ দিয়ে দিয়েছে তাকে। অটোর অপেক্ষায় শুদ্ধ আর ধারা যখন হাসপাতালের বাইরে তখন শুদ্ধ হঠাৎ করে কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল,
‘ও…একটা কথা। আমার কিন্তু কানে এসেছে আপনার বাড়িতে আপনি কি বলেছেন। কিভাবে সম্ভব? আমি তো নির্দোষ।’
ধারা একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে শুদ্ধ’র হাতে মৃদু বারি দিয়ে বলল, ‘উফ! এটা কি সত্যি নাকি? আমি তো নাটক করেছি। আর নাটকটা কাজেও লেগেছে। সবাই সত্যি বিশ্বাস করে ফেলেছে। আর আমার মনে হয় আমাকে খুব শীঘ্রই আপনার কাছে পাঠিয়ে দেবে। সব কিন্তু আমার অভিনয়ের দক্ষতার জন্যই। আমি যে কি ভালো নাটক করেছি আর সবার মুখের অবস্থা যা দেখার মতো ছিল না!’
ধারা হাসতে লাগলো। শুদ্ধ সিরিয়াস হয়েই বলল,
‘ধারা, আপনি এটা ঠিক করেননি। এভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে….
শুদ্ধ আর কিছু বলতে পারলো না। তার আগেই তাদের পেছন থেকে আজিজ সাহেব হুংকার ছেড়ে ডেকে উঠলেন, ‘ধারা!’
ধারা কেঁপে উঠে পেছনে তাকালো। সাথে শুদ্ধও। আজিজ সাহেব এখানে কিভাবে আসলো? শাহেদ আর আজিজ সাহেব গিয়েছিলেন আজ এক রাজনীতি সংক্রান্ত মিটিংয়ে। এর জন্যই তাদের ফোন বন্ধ ছিল। মিটিং শেষে বিকেলে বাড়ি ফিরে কাউকে না দেখে পাশের বাসা থেকে জানতে পারে তার মা অসুস্থ হওয়ায় তাকে সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সেকারণেই তারা সরাসরি এখানে চলে আসে। আর এসে ধারাকে শুদ্ধ’র সাথে দেখে রাগান্বিত মুখে এগিয়ে আসতেই ধারার কথাগুলো শুনতে পান। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ধারার হাত খপ করে ধরে বলেন,
‘তোমার এতো বড় সাহস নাটক করে তুমি আমাদেরকে বোকা বানাও! আবার মানা করা সত্ত্বেও তুমি এই ছেলের সাথে দেখা করো!’

আজিজ সাহেব ভীষণ ক্ষেপে আছেন। ধারা আতঙ্ক স্বরে কিছু বলতে চাইলে আজিজ সাহেব তার সুযোগ না দিয়ে ধারাকে টেনে নিয়ে একটা অটোতে বসিয়ে স্টার্ট দিতে বলেন। পরিস্থিতি খুবই বেগতিক হওয়ায় শুদ্ধও সাথে সাথে অন্য অটোতে ধারাদের বাড়িতে যায়। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আজিজ সাহেব ধারার হাত ছেড়ে দিয়ে বলেন,
‘তুমি এতো বড় মিথ্যা কথা বলতে পারো আমি স্বপ্নেও ভাবেনি। তুমি এতোটা নিচে নেমে গেছো ধারা!’

ধারা অঝোরে কাঁদতে লাগলো। চেঁচামেচি শুনে আসমা দ্রুত রুম থেকে বেড়িয়ে এলো। ততক্ষণে শুদ্ধও পৌঁছে গেছে সেখানে। শাহেদ ক্ষুব্ধ হয়ে শুদ্ধ’র দিকে তাকালো। আজিজ সাহেব বলতে লাগলেন, ‘তুমি প্রেগন্যান্টের নাটক করে ঐ ছেলের কাছে ফিরে যেতে চেয়েছো! আমাদের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছো! যাও তাহলে চলে ও’র কাছে। আমাদের সাথে তোমার আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। আমরা ভুলে যাবো আমাদের একটা মেয়ে ছিল।’

ধারা কাঁদতেই লাগলো। শুদ্ধ’র সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু করতে হচ্ছে। আজিজ সাহেবের সাথে শাহেদও যুক্ত হলো। রুঢ় থেকে রুঢ় কথা শোনাতে লাগলো ধারাকে। আজিজ সাহেব বললেন,
‘তোমার ভালোর জন্যই এসব করছিলাম। কিন্তু বুঝলে তো আর না। বুঝলে কারটা? ঐ ছেলেরটা। একটা পতিতার ছেলের জন্য তোমার এতো টান! কে শিখিয়েছে তোমায় এসব? ঐ ছেলে? অবশ্য একটা পতিতার ছেলের থেকে আর বেশি কিই বা আশা করা যায়।’

শুদ্ধ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো। এতো চেঁচামেচি শুনে ধারাদের প্রতিবেশিরা বাড়ির বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগলো। আজিজ আরো অনেক কথা বলতে লাগলেন,
‘পতিতার ছেলের স্বভাব চরিত্র আর কতই বা ভালো হবে। যতোই সেসব থেকে দূরে থাকুক না কেন শরীরে আছে তো সেই পতিতার রক্তই। নষ্ট রক্ত।’

ধারা শক্ত হয়ে বলে উঠলো, ‘বাবা! আপনি আমাকে এতক্ষণ যা বলার বলেছেন। দোষ আমি করেছি, মিথ্যা আমি বলেছি৷ আপনি আমাকে বলবেন। আমার স্বামীকে আপনি এভাবে বলতে পারেন না।’

আজিজ সাহেব বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। ধারা বলতে লাগলো,
‘বারবার শুদ্ধকে পতিতার ছেলে পতিতার ছেলে বলে কি বোঝাতে চান বাবা? আপনি এটা কেন ভুলে যান, শুদ্ধ যদি পতিতার ছেলে হয় তাহলে আপনার মেয়েও একটা পতিতার ছেলেরই স্ত্রী। আমার স্বামীর পরিচয়ই এখন আমার পরিচয়। তার সম্মানই আমার সম্মান। তার নামের সাথে যতো বদনাম যোগ হবে সব আমার নামের সাথেও হবে। আপনি সবার সামনে এইসব কথা বলে শুধু তাকে ছোট করছেন না, আপনার মেয়েকেও করছেন। শুদ্ধ কখনো চুপচাপ নিজের অসম্মান সহ্য করার মতো ছেলে না। সে নিজেকে যেমন বিশ্বাস করতে জানে তেমন নিজেকে নিজে সম্মানও করতো জানে। সে স্পষ্ট কথার ছেলে। তবুও আজ আপনি তাকে এতো খারাপ খারাপ কথা বলার পরেও সে কেন চুপ করে আছে জানেন বাবা? কারণ সে আমাকেও সম্মান করে বলে। আমার পরিবারকে সম্মান করে বলে, আপনাকে সম্মান করে বলে।’

বলতে বলতে ধারা আবারও কেঁদে ফেললো। বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি আমার ভুল হয়েছে। শুদ্ধও আমাকে সেটাই বলছিল। সে আমাকে এসব করতে শিখিয়ে দেয়নি বাবা। সে কখনো ভুল কিছু করে না। আমি বাধ্য হয়ে এই মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছি। কারণ আমি অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছি এই দোটানার মধ্যে থাকতে থাকতে। আমি শুদ্ধকেও ছাড়তে পারবো না আর আপনাদের সাথে চিরদিনের মতো সম্পর্ক ছিন্নও করতে পারবো না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি পারছি না আর আপনাদের এই বিরোধ সামলাতে। আসলে আমার না এখন মরে যাওয়া উচিত। তাহলেই আর দুজনের মধ্যে একজন বেঁছে নেওয়ার চক্করে আটকা থাকতে হবে না।’

শুদ্ধ ধারাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে গম্ভীরমুখে বলল, ‘এসব কি কথা আপনি বলছেন ধারা? আচ্ছা ঠিকাছে। প্রয়োজনে আমরা আলাদা হয়ে যাবো। দোটানা কেটে যাবে। একটা দিক অন্তত ঠিক হয়ে যাবে। তবুও আপনি এসব ভাববেন না।’

ধারা ও’র বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘দেখেছেন বাবা, শুদ্ধ কখনো আমাকে ছাড়ার কথা বলেনি। আমি মারাত্মক ভুল করার সময়ও বলেনি, আপনাদের এতো এতো অপমানেও বলেনি। বলল কখন? যখন আমার কোন ক্ষতির কথা শুনলো। আমাকে ছেড়ে দেওয়ার কষ্টের চাইতে আমার ক্ষতি হবার কষ্ট তার কাছে বেশি তীক্ষ্ণ।’
একটু থেমে ধারা নিচের ঠোঁট কামড়ে খুব কষ্ট করে বলল, ‘সে আমাকে খুব ভালোবাসে বাবা। আমিও তাকে খুব ভালোবাসি। আমরা দুজন একসাথে খুব সুখে থাকবো। বাবা….বাবা, আমাকে তার কাছে যেতে দিন।’
ধারা আকুতির সাথে একবার বাবার হাত ধরলো আবার পরক্ষণেই বাবার পা পেঁচিয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
‘আমাকে হাসিমুখে যেতে দিন বাবা। আমি আমার পরিবার আর স্বামী দুটোকেই চাই। আপনি তো আমার ভালো চান তাই না বাবা, আমি সেখানেই ভালো থাকবো। পায়ে পড়ি বাবা, যেতে দিন।’

ধারার অবস্থা দেখে শুদ্ধ’র চোখে পানি চলে এলো। জমিরন বিবি অনেকক্ষণ ধরেই রুম থেকে সবার কথাগুলো শুনছিলেন। তার গায়ে জোর নেই। বিছানা থেকে উঠতে কষ্ট হয় তাই আসতে পারছিলেন না। ধারার আকুতি শুনে আর না এসে পারলেন না। আস্তে আস্তে উঠে দেয়াল ধরে ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেন,
‘আজিজ!’

শাহেদ কাছে গিয়ে ধরতে যাওয়ার জন্য বলল,
‘আম্মা, আপনি আবার উঠে আসতে গেলেন কেন? আপনি অসুস্থ।’
জমিরন বিবি শাহেদের হাত না ধরে বললেন,
‘অসুস্থ তবুও তো বাড়ি ফিরা প্রত্তম আমারে দেখতে গেলি না। তোরা বইলি তোগো মান সম্মানের হিসাব কষতে।’
এই বলে জমিরন বিবি শুদ্ধকে ডেকে বললেন,
‘নাত জামাই, আমারে নিয়া একটু ঐ চেয়ারে বসাও তো।’
শুদ্ধ হাত ধরে জমিরন বিবিকে চেয়ারে বসালো। জমিরন বিবি বসার পর বললেন,
‘আজিজ, এই যে আমারে এহন ভালা দেখতাছোস এইয়া কার লেইগা জানোস? এই যে পতিতার পোলা কইয়া চিল্লাইতাছোস যারে হের লেইগাই। বউ আমারে সব কইছে। তোরা কেউ আছিলি না সেই সময়। তোরা তো ছিলি তোগো ক্ষমতার পেছনে। এই পোলাই ছুইটা আইসা আমারে হাসপাতালে নিয়া গেছে। তাও আবার কেমনে জানোস? ভ্যান চালাইয়া। নিজে চালায় নিয়া গেছে। আর তোরা হইলে কি করতি? তোগো ইজ্জত যাইতো গা ভ্যান চালাইলে। তোরা থাকতি তোগো মান সম্মানরে লইয়া। কিন্তু এই পোলা হেয়া ভাবে নাই। হের কাছে জীবন বাঁচানি আগে। আর কি জানি কইলি তহন? নষ্ট রক্ত! আমার শরীর আজকে বহুত খারাপ হইয়া পড়ছিলো। আমার নাত জামাই আমারে রক্ত দিছে। নষ্ট রক্তের লেইগা তোরা সম্পর্ক রাখবি না। তোর মায়ের গায়েও তো তাইলে এহন সেই নষ্ট রক্ত। এহন কি তোরা তোগো মায়রেও ফালায় দিবি। রক্তের আবার নষ্ট পঁচা কি রে? আল্লাহ দেয় নাই এই রক্ত? কালকে ধারার বাচ্চার কথা শুইনা কইলি আল্লাহ যহন বাচ্চা দিছে তহন আমরা ফেলতে পারবো না। এই ছেলেরেও তো আল্লাহই বানাইছে। তাইলে ওয় আলাদা হইলো কেমনে? জাত পাত দিয়া কিছু হয় না রে আজিজ। মানুষটাই আসল। এই ছেলে হীরার টুকরা। হারাইতে দিস না। আমরা তো সব আমগো মাইয়ার লেইগাই করতে চাই। মাইয়া যেনে ভালো থাকবো হেই খানেই আমগো শান্তি। চোখ থিকা ঐ পর্দা ডা খোল।’

অনেক কথা বলে ফেলায় জমিরন বিবি হাঁপিয়ে উঠলেন। মায়ের কথার প্রভাব আবার না আজিজ সাহেবের উপর পড়ে এই জন্য শাহেদ দ্রুত কিছু তাকে বলতে চায়। আজিজ সাহেব এতক্ষণ একদম চুপ করেই ছিলেন। শাহেদকে ‘ভাইজান’ বলে মুখ খুলতে দেখেই ধমকে উঠে বললেন,
‘তুমি চুপ থাকো! তোমার কথাতেই আমার মাথা খারাপ হয়েছিল।’

এরপর তিনি ধারার দিকে তাকালেন। মেয়েটা এখনও কেমন পায়ে ধরে বসে আছে। তার হঠাৎ ভীষণ মায়া হয়। আজিজ সাহেব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কখনো আবেগী কথাবার্তা বলেননি। তাই তার বলতে খুব সমস্যা হলো। খুব সময় নিয়ে তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে শুধু এতটুকুই বলতে পারলেন,

‘মন দিয়ে স্বামীর সংসার করিস।’

ধারা তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।

#পর্ব-২৮
Writer: ইশরাত জাহান সুপ্তি

শুদ্ধ সেদিন রাতটা সে বাড়িতে কাটিয়ে তার পরেরদিন সকালেই ধারাকে নিয়ে রূপনগর ফিরে এলো। আজিজ সাহেব সন্তুষ্ট মনেই মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের বিদায় দিয়েছেন। বাড়ি ফিরতেই ধারার মন জুড়িয়ে গেলো। আজ কতদিন পর সে দেখতে পেলো সেই প্রিয় বাড়ির দৃশ্য। সবকিছু এখনও সেই মায়া ময়, স্নিগ্ধ। সেই ছোট্ট দোচালার ঘর। টিনের বারান্দা। বাড়ির সামনের হাস মুরগীর খোঁয়াড়। পাশ দিয়ে সারি বেঁধে লাগানো সুপারি গাছ। পুকুরের স্বচ্ছ টলমল জলে সাঁতরে বেড়াচ্ছে শুভ্র রাঁজহাসের দল। পাশের বাড়ি থেকে নাজমা ভাবির হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। ধারা চোখ বন্ধ করে প্রাণভরে সবটা শুষে নেয় যেন। খোদেজা আর চুমকি শুদ্ধ আর ধারাকে বাড়ির উঠোনে দেখেই একপ্রকার দৌঁড়ে ছুটে আসে তাদের দিকে। অনেকদিন পর মায়ের মতো শ্বাশুড়ি খোদেজার দেখা পেয়ে ধারা সর্বপ্রথম তাকে জড়িয়ে ধরে। খোদেজা ছলছল চোখে বলে,
‘এসেছো বউ! আমি রোজ তোমার লেইগা রাস্তার ধারে পথ চাইয়া থাকতাম। এই বুঝি কোনদিন মাহতাব তোমারে নিয়া আসে। কাল রাতে যহন শুদ্ধ ফোন দিয়া বলল তোমারে নিয়া আসার কথা, আমি কি যে খুশি হইছিলাম। তোমারে ছাড়া এই বাড়ি যে খালি খালি লাগে মা।’

ধারা আবেগ্লাপুত গলায় বলল,
‘হুম মা এসেছি। নিজের বাড়ি ছেড়ে বেশিদিন কি আর দূরে থাকা যায়!’

চুমকি ছটফট করে ধারার হাত ধরে বলল,
‘নতুন ভাবী, তোমাকে যে আমার কতো মনে পড়ছে এই কয় দিন জানো! তুমি না থাকলে একদমই এখন আর ভালো লাগে না। এভাবে আর কখনো বেশিদিন থাকবা না ঠিকাছে?’

ধারা হাসিমুখে মাথা দুলায়। শুদ্ধ একটু আদুরে গলায় বলে উঠে,
‘আম্মা, এখন কি তোমার বউ পাওয়ার খুশিতে এদিকেই দাঁড়ায় থাকবা? পা ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে তো! তোমার ছেলের দিকেও একটু তাকাও।’

খোদেজা মজার ছলে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
‘তোরে আর কি দেখমু? তোরে তো রোজই দেখি। আজকে বউ অনেকদিন পর আইছে এখন খালি বউরে দেখমু।’

শুদ্ধ মেকি অভিমানের গলায় বলল,
‘বাহ! ভালো। বউ পেয়ে ছেলের প্রতি এতো অবহেলা! আচ্ছা ঠিকাছে। আমিও কয়দিনের জন্য কোথাও থেকে আসি। তারপর যদি আমার কদর সবার হয়!’

খোদেজা বলল, ‘হইছে হইছে এখন আর ঢং করা লাগবো না। তোরা ভেতরে গিয়া বস। চুমকি ওগো লেইগা দুই গ্লাস শরবত বানায় দিস।’

রুমে এসেই ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো শুদ্ধ। ধারা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলো। শুদ্ধ শুয়ে শুয়েই বলল,
‘যাওয়ার সময় তো বাবা তোমাকে এক কাপড়েই নিয়ে গেলো। আসার সময় এতো বড় স্যুটকেস আনলে কিভাবে? টানতে টানতে দফা রফা হয়ে গেছে আমার।’

ধারা বলল, ‘আরে! আমার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ছিল ওখানে। সে সব কিছুই একসাথে গুছিয়ে নিয়ে এসেছি।’

‘প্রয়োজনীয় জিনিস তাহলে আগে আনো নি কেন?’

‘কি জানি! হয়তো তখনও এই ঠিকানাই পারমানেন্ট সেটা খেয়ালে আসেনি।’

‘এখন মনে হয়?’

এই কথার উত্তরে ধারা কিছু বলল না। শুদ্ধ’র কাছে বিছানায় বসে আস্তে ধীরে বলল,
‘আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না, সত্যিই সব কিছু ঠিক হয়ে গেছে। আমরা আবার একসাথে হতে পেরেছি। সব কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে।’

শুদ্ধ শোয়া থেকে উঠে বসে বলল,
‘স্বপ্ন না ম্যাডাম, সত্যি। এই যে আপনার সামনে আমি বসে আছি। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন।’

ধারা শুদ্ধ’র মজার মধ্যে না ঢুকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল,
‘ভর্তি পরীক্ষাটা না দিয়ে তোমাকে আমি খুব আঘাত করেছি তাই না?’
শুদ্ধ সেই কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ধুর! তোমাকে আমি বলেছি না সেই কথা আমি কবেই ভুলে গেছি। তুমি এরপর অনেক কিছু করেছো। এতেই আমি অনেক সন্তুষ্ট। নিজে নিজে গিয়ে সাবজেক্ট চয়েজ দিয়ে ন্যাশনালে ভর্তি হয়েছো। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে যে তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছো। আর ধারা ন্যাশনাল বলে মন খারাপ করো না। শিক্ষার জন্য একটা ভালো প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ, অপরিহার্য নয়। চেষ্টা আর পরিশ্রম যদি পরিপূর্ণ থাকে তাহলে তুমি ন্যাশনালে পরেও সেসব অর্জন করতে পারবে যেটা ইউনিভার্সিটি থেকে হয়। আর আমি তো বলেছি, সবকিছুতে সবসময় আমি তোমার পাশে আছি। তোমাকে আমি কোনকিছুতেই পিছিয়ে থাকতে দিবো না।’

ধারা শুদ্ধ’র হাতের উপর হাত রেখে বলল,
‘জানি। এটা আমি খুব ভালো করেই জানি। জানো, একটা সাধারণ মেয়ে সমাজের নিয়ম রীতি, মানুষের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির জন্য অনেকটা দূর্বল হয়েই থাকে। একটা মেয়েকে ছোট থেকেই তার স্বামীর উপর সব কিছু ছেড়ে দেওয়ার মতো করেই সবসময় বড় করা হয়। এমতাবস্থায় কোন মেয়ে যদি ভালো স্বামী পায় তাহলে এর থেকে সুন্দর তার জীবনে আর কিছু হয় না। একটা ভালো স্বামী একটা মেয়ের জন্য তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। যে তাকে সবসময় সাপোর্ট করবে, তার স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখবে, তার ইচ্ছা অনুভুতিকে গুরুত্ব দিবে। সর্বোপরি তার নিজস্ব সত্তাটার সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেবে। ভালো মানুষ হতে পারলেও সবাই ভালো স্বামী হতে পারে না। কিন্তু তুমি পেরেছো। তুমি ভালো মানুষ আর ভালো স্বামী দুটোই। আজ যদি আমার ভাগ্যে আর সাধারণ পাঁচটা মেয়ের স্বামীর মতোই স্বামী পড়তো তাহলে তো বোঝাই যাচ্ছে আমার সাথে কি হতো? কিন্তু এমনটা হয়নি। আমি তোমার মতো স্বামী পেয়েছি। তুমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার।’

শুদ্ধ’র চোখে মুখে একটা প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠলো। সে মিষ্টি হাসির সাথে বলল,
‘জানো ধারা, আমার জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের মতো এটাও অনেক বড় অর্জন। দুনিয়াশুদ্ধ মানুষের কাছে ভালো হয়েও কোন লাভ নেই যদি একটা পুরুষ তার স্ত্রীর কাছেই ভালো না হতে পারলো। হাদীসেও তো আছে, সেই পুরুষই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আজকে তুমি আমাকে আমার জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ সার্টিফিকেট টা দিলে।’

শুদ্ধ ধারার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, ‘স্বামী স্ত্রীকে একে অপরের পরিপূরক বলা হয় কেন? কারণ তারা দুজন মিলে আসলে এক। তাদের দুজনের অর্ধেক অর্ধেক অংশ মিলেই একটা বেটার ভার্সন হয়। একটা পরিপূর্ণ অংশ। এখন যদি আমার একটা অংশ (স্ত্রী) পিছিয়ে থাকে তাহলে আমি কিভাবে সামনে আগাবো? আমাকে তো তাকে নিয়েই এগোতে হবে তাই না! একসাথে। হাতে হাত মিলিয়ে। আমরা দুজন মিলেই তো এখন এক। যখন আপনি পিছিয়ে যাবেন তখন আমি হাত বাড়াবো। আর যখন আমি পিছিয়ে যাবো তখন আপনি হাত বাড়াবেন।
তবেই না আমরা যেতে পারবো সামনে! হতে পারবো জীবনে সফল।’

ধারা আর কি বলবে ভেবে পায় না। শুধু একদৃষ্টিতে শুদ্ধ’র দিকে তাকিয়ে থাকে। সত্যিই তার চিন্তা ভাবনার কোন তুলনা হয় না। তার সব কথাই মুক্তোর মতো সুন্দর। কিছুক্ষণ এভাবেই নিশ্চুপে কাটার পর হঠাৎ শুদ্ধ ধারার কাঁধে হাত উঠিয়ে দিয়ে বলে,
‘আচ্ছা ধারা, তোমার মাথায় এই প্রেগন্যান্টের কথাটা বলার আইডিয়া কিভাবে এলো?’
ধারা উৎফুল্ল হয়ে বলতে নিলো,
‘ও… সেইটা? সেটা তো আমি দাদীর…..

ধারা আর বলতে পারলো না। শুদ্ধ নিজের মতো করে বলতে লাগলো, ‘এটা তো মিথ্যাই ছিল, না? আর এদিকে আমি তো ভেবেছিলাম….

ধারা সরু চোখে তাকিয়ে দ্রুত বলে উঠলো,
‘কি ভেবেছিলে?’

শুদ্ধ একটা ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে বলল,
‘আমি ভেবেছিলাম আপনি না আবার আমার ঘুমন্ত আমিটার সুযোগ নিয়ে…..

ধারা শুদ্ধ’র হাতটা ও’র কাঁধ থেকে সরিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে আবার বিছানায় ফেলে বলল,
‘তুমি ভীষণ পাজী।’

শুদ্ধ শোয়া থেকে উঠতে উঠতে বলল,
‘আচ্ছা! বউয়ের মন না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ছুঁয়েও দেখলাম না। আর আমি এখন পাজী হয়ে গেলাম? এমন কঠিন পণ নেওয়া হাজবেন্ড আর কোথাও পাবে?

ধারা কিছু না বলে চলে যেতে লাগলে শুদ্ধ পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,
‘তুমি তোমার পানিশমেন্ট কিন্তু এখনও পূরণ করলে না। সময় কিন্তু যাচ্ছে মানে দ্বিগুণ থেকে দ্বিগুণ হচ্ছে।’

ধারা সেদিন নিজ হাতে সব রান্না করলো। খোদেজাকে পাশেও ঘেঁষতে দিলো না। শুদ্ধ রইলো পাশে। একপ্রকার জোর করেই, সাহায্যের নাম করে। যতটুকু না সাহায্য করলো তার চাইতে বেশি জ্বালালো। একটা হাত পাখা নিয়ে জোরে জোরে বাতাস করতে লাগলো। মাটির চুলার রান্না। আগুনের তাপে ধারার মুখ এমনিতেই হয়েছিল রক্তিম। তার উপরে শুদ্ধ’র হাত পাখার বাতাসে তার বেঁধে রাখা চুলগুলো সামনে দিয়ে বারবার চোখের উপর এসে পড়ছিল। ধারা একবার গরম চোখে তাকায়। শুদ্ধ চুপ করে গিয়ে আবার পরক্ষণেই সেই একই কান্ড শুরু করে দেয়। কখনো আবার ধারার কেটে রাখা তরকারী লুকিয়ে রাখে। ধারা রাগ হয়, শুদ্ধ মজা পায়। ধারার রাগে টুমটুমে মুখটা দেখতে তার বেশ লাগে।

একসময় এভাবেই তাদের মিষ্টি খুনসুটি চলতে চলতে রান্না শেষ হয়। তারপর দুপুরে খাওয়াও। অনেকদিন পর সবাই একসাথে মাদুর বিছিয়ে খেতে বসে। অনেকদিন পর সেই পুরনো সুন্দর মুহুর্তগুলো কাটিয়ে ধারার চোখ আবারও অশ্রুসিক্ত হয়। জীবন সুন্দর। খুব সুন্দর।
__________________________________________

রাতের বেলা। শুদ্ধ রুমে এসে দেখে কেউ নেই। ধারাকে ফোন লাগায়। একটুপর ফোন রিসিভ করে ধারা ঘুমু ঘুমু গলায় বলে,
‘হ্যালো, আমি নিচে মা আর চুমকির সাথেই ঘুমিয়ে পড়েছি।’

শুদ্ধ দ্রুত বলে উঠে, ‘মানে কি?’

‘মানে কিছুই না। তুমি এতো রাত করে বাইরে ছিলে কেন? আমার একা একা ভয় লাগছিল তাই মার সাথে ঘুমিয়ে পড়েছি। আর এখনো মানে বুঝতে না পারলে পুকুর পাড়ে আসো।’

শুদ্ধ আর কিছু বলবে তার আগেই ধারা ফোন কেটে দিল। অগত্যা বিভ্রান্ত মুখেই শুদ্ধকে পুকুর পাড়ে যেতে হলো। গিয়ে দেখলো ধারা সেই বাঁশের মাচার উপর একটা আকাশী রঙের শাড়ি পড়ে পা উঠিয়ে বসে আছে। শুদ্ধ অবাক হয়ে কাছে গিয়ে বলল, ‘তুমি না বললে তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো? এতো রাতের বেলা একা একা এখানে কি করছো? আমি তো প্রথমে দেখে কোন পেত্নী ভেবে বসেছিলাম।’

ধারা খুব ভালোভাবেই বুঝলো শুদ্ধ তাকে ক্ষেপাচ্ছে। তাই সেই ফাঁদে না পড়ে বলল,
‘পেত্নীই যখন ভেবেছিলে তাহলে আসলে কেন? পেত্নী যদি ঘাড় মটকে দিতো?’

শুদ্ধ ধারার পাশে বসতে বসতে বলল,
‘এতো সুন্দরী পেত্নী কাছ থেকে দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। আজ হঠাৎ শাড়ি পড়লে যে!’

ধারা স্মিত হেসে বলল,
‘আলমারি গোছানোর সময় হঠাৎ সামনে এলো তাই আর লোভ সামলাতে পারিনি। পড়ে নিয়েছি। জানো, এই বাড়ির মধ্যে আমার সবচাইতে প্রিয় জায়গা কোনটা? এই পুকুর পাড়টা। রাতের বেলা এখানে বসতে যে আমার কি ভালো লাগে! আজকেও দেখো একদম গোল একটা চাঁদ উঠেছে আকাশে। কত সুন্দর!’

শুদ্ধ তাকিয়ে দেখলো, আসলেই সুন্দর। চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে চারদিকে। পুকুরের পানি চিকচিক করছে সেই শুভ্রতার ছোঁয়ায়।

শুদ্ধ বলে উঠলো, ‘আজকে তোমার ঘুম পাচ্ছে না? এমনিতে তো সন্ধ্যা হতে না হতেই ঘুমের জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকো।’

‘না পাচ্ছে না।’

‘পড়তে বসালেই পেতো।’

ধারা বিরক্তির সাথে শুদ্ধ’র দিকে তাকায়। সে কতো সুন্দর করে আজ সেজেছে। কিন্তু শুদ্ধ তাকে কেমন লাগছে সেটা তো একবারও বলছেই না। আরও উল্টো কথা বলছে। যখন দেখলো শুদ্ধ’র সেদিকে কোন হুঁশ ই নেই তখন নিজ থেকেই বলল, ‘আমি আজকে সম্পূর্ণ একা একা শাড়ি পড়েছি।’

শুদ্ধ আড়চোখে ধারার দিকে তাকালো। মেয়েটা আজকে খুব করে সেজেছে যেন। এবং এই মুহুর্তে শুদ্ধ’র মুখ থেকে কি শুনতে চাইছে সেটাও খুব করে বুঝলো সে। তবুও বলল না। প্রিয়সীকে আরেকটু ক্ষেপিয়ে দেওয়ার জন্যই বলল,
‘হুম বুঝতে পারছি। এজন্যই তো পেত্নী বলেছি।’

ধারা মুখ ভার করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো। ধারা সত্যি সত্যি রাগ করেছে ভেবে শুদ্ধ তৎক্ষনাৎ কানে হাত দিয়ে আস্তে করে বলল,
‘সরি! তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।’
ধারা নিজের হাসি সংযত করে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘শুধু সরি বললেই সব মাফ হয়ে যায় নাকি?’

শুদ্ধ মুখ ঝুলিয়ে বলল, ‘তাহলে আর কি করতে হবে?’

ধারা বলল, ‘উঠে দাঁড়াও। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই জায়গাটুকুর মধ্যে আকাশের তারা গুনে আমাকে বলো। এটাই তোমার পানিশমেন্ট।’

শুদ্ধ করুন মুখে বলল, ‘সত্যি করতে হবে?’

‘হুম।’

কি আর করার শুদ্ধ বউয়ের রাগ ভাঙাতে পুকুরের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তারা গুনতে থাকে। ধারা ঠোঁট চেপে হেসে আস্তে আস্তে শুদ্ধ’র পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ হাত উঁচু করে তারা গোনার পর শুদ্ধ মাথা চুলকে ঈষৎ হেসে বলে, ‘এভাবে তারা গুনতে থাকলে তো আমার সারাজীবন এখানেই কেটে যাবে ধারা।’

শুদ্ধ হাসতেই তার গালে টোল পড়ে। ধারা দু পা উঁচু করে এক প্রকার লাফিয়েই শুদ্ধ’র গালে একটা চুমু দিয়ে উঠে। শুদ্ধ অবাক হয়ে তাকায়। ধারা বলে, ‘আমি আমার পানিশমেন্ট উহ্য রাখি না।’

কথাটা বলেই একটা রহস্যময়ী হাসি দিয়ে শুদ্ধ’র অবাকের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়ে ধারা এক ধাক্কায় শুদ্ধকে পুকুরে ফেলে দিলো। তারপর নিজেও আস্তে আস্তে নেমে গেলো পুকুরে। শুদ্ধ’র হতভম্ব দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে, বুকে প্রেমের জোয়ার ভাসিয়ে দিয়ে একদম তার কাছাকাছি চলে গিয়ে অধরে অধর ছোঁয়ালো। জোনাকিরা ঘুরে ঘুরে আলো ছড়ালো। ফুলেরা বাতাসে সুগন্ধী মিশিয়ে দিলো
আর নির্লজ্জ চাঁদও বেহায়া দৃষ্টিতে পড়তে লাগলো এক যুগলের ভালোবাসার গল্প।

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here