হারিয়েছি নামপরিচয় পর্ব -২৫

#হারিয়েছি_নামপরিচয়
#পর্বঃ২৫
#লেখিকাঃদিশা_মনি

ফাবিহা আচমকা সবার সামনে এসে বলে,
‘এই বিয়ে হতে পারে না। আমি রিফাতের সন্তানের মা হতে চলেছি।’

ফাবিহার কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই চমকে উঠে। মেঘলা হতবাক হয়ে যায়। রিফাতের চেহারায় রাগ স্পষ্ট বোঝা যায়। সবাই আচমকা ঘটনা যাওয়া এই ঘটনায় কানাঘুষা শুরু করে। রিফাত ফাবিহাকে রাগী গলায় বলে,
‘কি বাজে কথা বলছ তুমি ফাবিহা? আজ আমাদের বিয়ে। আজকের দিনে এসে তুমি কি সব বলছ।’

ফাবিহা কেদে দেয় সবার সামনে।
‘তুমি এভাবে বিয়ে করে নিলে আমাদের সন্তানের কি হবে? তাকে আমি কিভাবে পিতৃপরিচয় দিব?’

মেঘলা হতবিহ্বল হয়ে যায়। রিফাত ফাবিহার সামনে গিয়ে তাকে শাসিয়ে বলে,
‘এসব নাটক অন্য কোথাও গিয়ে করো তুমি। এখানে তোমার এসব নাটক চলবে না।’

‘এমন কেন করছ তুমি রিফাত? তুমি নিজেও খুব ভালো করে জানো আমি নাটক করছি না। সেদিন ড্রাংক হয়ে তুমি আমার সাথে ই’ন্টিমেট হয়েছিলে। আর এই সন্তান,,,’

ফাবিহার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ তার গালে খুব জোরে একটা থা’প্পর দেয়। ফাবিহা হতবাক হয়ে মেঘলার দিকে তাকায়। কারণ থা’প্পরটা মেঘলাই দিয়েছে।

মেঘলা ফাবিহার সামনে আঙুল তুলে বলে,
‘একদম আমার স্বামীর নামে মিথ্যা অপবাদ দিবা না। আমি জানি রিফাত আর যাই করুক তোমার মতো একটা নোং’রা মেয়েকে কোনদিন স্পর্শ করবে না।’

রোজিয়াও তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে।
‘হ্যা আমার ছেলে এমন কাজ করতেই পারে। তোমাকে রিফাতের বাবা এসব নাটক করতে বলেছে তাইনা? আমি লোকটাকে খুব ভালোভাবেই চিনি। নিজের স্বার্থের জন্য উনি সব করতে পারেন। শেষপর্যন্ত কিনা নিজের ছেলের সাথে এমন বাজে একটা খেলা খেললেন ছি!’

আমিনুল হক নিজের স্বপক্ষে বলেন,
‘আমি কিছুই করিনি। এই ফাবিহা মেয়েটাই নিজের এসে আমাকে তার দূর্দর্শার কথা বলেছে। রিফাতের বাবা হিসাবে আমি এটা মানতে পারি নাই যে আমার ছেলে হয়ে ও একটা মেয়েকে ঠকিয়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করবে।’

রিফাত অধৈর্য হয়ে যায়।
‘আমি বলছি তো যে এই মেয়েটা যা বলছে সব মিথ্যা। আর ও যে এসব বলছে তার প্রমাণ কি?’

ফাবিহা নিজের চোখের জল মুছে। নিজের ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে বলে,
‘এই যে দেখুন সবাই এটাতে প্রেগ্ন্যাসির রিপোর্ট আছে। যেখান থেকে স্পষ্ট জানা যায় আমি প্রেগন্যান্ট।’

মেঘলা ফাবিহার হাত থেকে পেপারগুলো নিয়ে দেখে সে ঠিকই বলছে যে সে প্রেগন্যান্ট। মেঘলা এবার প্রশ্ন করে,
‘কিন্তু এটার কি প্রমাণ যে এই বাচ্চাটা রিফাতের?’

‘আমি জানতাম এই প্রশ্নটা উঠবে। তাই আমি প্রমাণ নিয়েই এসেছি।’

এই বলে ফাবিহা একটা ছবি দেখায় সবাইকে৷ যেখানে রিফাত ও সে খুব ঘনিষ্ঠভাবে ছিল। ছবিটা দেখার পর সবাই ফাবিহার পক্ষে ও রিফাতের বিপক্ষে কথা বলতে থাকে।

৪৯.
রিফাতকে অনেকেই অবিশ্বাস করছে। এটাতে তার বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না। কারণ রিফাতের বিশ্বাস মেঘলা অন্তত তাকে অবিশ্বাস করবে না। আর হলোও তাই। মেঘলা সবকিছু দেখার পরেও বলে,
‘আমি এসব কিছু বিশ্বাস করি না। এই ছবিটা তো ফেকও হতে পারে। আজকাল কম্পিউটারের সাহায্যে এডিট করে এমন ছবি তৈরি করা যায়। তাই এই সামান্য প্রমাণে আমি রিফাতকে অবিশ্বাস করব না।’

ফাবিহা এবার সবার সামনে অদ্ভুত কাহিনি ঘটিয়ে ফেলে। নিজের ব্যাগ থেকে একটি ব্লেড বের করে নিজের হাতে ধরে।
‘আমি জানতাম সত্যকে সবসময় এভাবে ভুল প্রমাণ করা হয়। আজ রিফাত যদি আমায় বিয়ে না করে তাহলে আমি নিজের সন্তানকে পিতৃপরিচয় দিতে পারব না। আমি এমনটা চাইনা। তাই আজ সবার সামনে নিজের জিবন দিয়ে দেবো। আমার লা’শের উপর দিয়ে তোমাদের নতুন জিবনের সূচনা ঘটুক।’

কথাটা বলে ফাবিহা ব্লেড দিয়ে একটানে নিজের হাতের অনেকখানি কে’টে ফেলে। যার ফলে স্রোতের বেগে তাত হাত দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। উপস্থিত সবাই ঘাবড়ে যায়। কয়েকজন গিয়ে ফাবিহাকে ধরে। ফাবিহা বলতেছিল,
‘আমি নিজের জন্য কিছু চাই না। শুধু নিজের সন্তানের স্বীকৃতি চাই।’

ফাবিহার এই কাণ্ডতে মেঘলা, রিফাত দুজনেই বাকরুদ্ধ। রোদেলা মেঘলার কাধে হাত রাখে।
‘বিয়েটা কি তুই করবি মেঘ? আমার তো মনে হয় মেয়েটা সত্য বলছে। যদি মিথ্যা হতো তাহলে এভাবে নিজের হাত কাট’তো না।’

‘তোরা যে যাই বল আমি রিফাতকে অবিশ্বাস করি না। আমি জানি রিফাত এমন কিছুই করেনি।’

‘বিশ্বাস ভালো কিন্তু অন্ধবিশ্বাস ভালো না বোন।’

মেঘলা আর কিছু বলে না। রিফাত অসহায় দৃষ্টিতে মেঘলার দিকেই তাকিয়ে ছিল। মেঘলা রিফাতের হাত শক্ত করে ধরে বলে,
‘দুনিয়ার সবাই আপনার বিপক্ষে যাক তবুও আমি আপনার পাশে থাকব।’

রোজিয়া মেঘলার মাথায় হাত দিয়ে বলেন,
‘অতীতের ঘটনার জন্য তোমার উপর আমার অনেক রাগ ছিল। আজ আর কোন রাগ রইল না। আমি বুঝতে পারছি আমার ছেলে তোমাকে এত কেন ভালোবাসে। কারণ তুমি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য। আমি জানি তুমি আর রিফাত মিলে সব সত্য সবার সামনে আনবে। আজ যারা আমার ছেলের দিকে আঙুল তুলছে তাদের সবার মুখ তোমরাই বন্ধ করে দিবে।’

‘আপনি দোয়া করুন যাতে তাই হয়।’

৫০.
ফাবিহা হাসপাতালে ভর্তি। তার সাথে দেখা করতে এসেছে আমিনুল হক। ফাবিহার সামনে এসেই আমিনুল হক তার প্রশংসা করে বলতে থাকে,
‘বাহ কত ভালো নাটক করলে তুমি। আমি তোমার ফ্যান হয়ে গেলাম।’

ফাবিহা শ’য়তানী হেসে বলে,
‘এতটুকু তো আমাকে করতেই হতো ডার্লিং। তুমি যখন তোমার বাচ্চার দায়িত্ব নিতে চাইছ না তখন তোমার ছেলেই সেই দায়িত্ব নিক।’

আমিনুল হক ফাবিহার মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরে,
‘চুপ। এই কথা আর ভুল করেও উচ্চারণ করবা না।’

ফাবিহা বাকা হেসে বলে,
‘যখন আমার সাথে ফূ’র্তি করছিলা তখন ম-ম ছিল না? ব্যা’টা বুড়ো ভাম। দুটো বউ আছে তাদের দিয়ে পোষায় না। এত বড় বড় বাচ্চাকাচ্চা আছে তোমার তাও তুমি,,,’

‘এই তুমি বেশি কথা বলিও না। আমি ফ্রি তে কিছু করি নি। তোমাকে টাকার ভরিয়ে দিয়েছি। আর বোঝোই তো, আমার দুই বউই বুড়ি হয়ে গেছে। তাদের দিয়ে কি আর পোষায়? আমার তো তোমার মতো মেয়েই দরকার।’

‘টাকার সাথে পেটও তো ভরিয়ে দিয়েছ। এখন এই বাচ্চার দায় কে নেবে বলো তো। সেই কারণে তোমার পরামর্শে তোমার ছেলের উপরই দায় দিলাম।’

আমিনুল হক বলেন,
‘আমি যা করেছি ভালোই তো করেছি। এমনিতেই ঐ মেঘলাকে আমার পছন্দ না। মেয়েটা অনেক ধূর্ত। ওর বাবার সাথে আমার শত্রুতা। তাই এভাবে এক ঢি’লে দুই পাখি মা’রলাম। ‘

‘ভিডিওতে আপনাদের সব কথা রেকর্ড হয়েছে কিন্তু।’

কারো গলার স্বরে দরজার দিকে তাকায় দুজনেই। আর তাতেই চমকে যায়। মেঘলা ও রিফাত এতক্ষণ সব কথা শুনেছে এবং রেকর্ডও করেছে। রিফাত খুব রেগে গেছে। তার বাবা যে এতটা নিচে নামতে পারে সেটা কখনো ভাবতে পারে নি রিফাত।

‘ছি আব্বু। তোমাকে আজ আব্বু বলতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে। তুমি কিনা,,,’

‘আমার কথা শোন রিফাত,,,’

‘ও আজ তোমার কোন কথা শুনবে না। অনেক অন্যায় করেছ তুমি এখন আর নয়। আমি ডিভোর্স চাই তোমার কাছে।’

রোজিয়া ঝাঝালো কন্ঠে চমকে যান আমিনুল ইসলাম। কিছু বলার আগেই মেহেরও রোজিয়ার তালে তাল মিলিয়ে বলে,
‘হ্যা আমিও আপনার সাথে আর সংসার করতে চাইনা। আমিও চাই আপনি আমাকে তালাক দিয়ে দেন। আমার পুরো জিবনটা আপনার জানি ন’ষ্ট হয়ে গেছে। শেষ ক’টা দিন ক’লংক ছাড়া বাচতে চাই, একটু শান্তিতে বাচতে চাই। এই শান্তিটুকু আমাকে দিন।’

আমিনুল হক দিশেহারা হয়নি যান। কি করবেন সেটা বুঝতে পারছিলেন না। ফাবিহাও একইরকম পরিস্থিতিতে পড়েছে। আচমকা আমিনুল হক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান।
রিফাত ডাক্তার ডেকে আনে। আমিনুল হককে হাসপাতালের ভর্তি করানো হয়। ডাক্তার চিকিৎসা করে বলেন,
তিনি স্ট্রোক করেছেন। সুস্থ হয়ে গেলেও এখন তাকে প্যারালাইজড হয়ে আজিবন পার করতে হবে।

তার এই অবস্থা দেখে রোজিয়া বলে,
‘এটাই আল্লাহর বিচার। যা হয়েছে একদম ভালো হয়েছে। আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না।’

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here