হৃদপিণ্ড পর্ব ৫

#হৃদপিন্ড
#জান্নাতুল নাঈমা
#পর্ব-৫

মুসকান এক ঢোক গিলে ইমনের মুখের দিকে তাকালো। ইমনের গম্ভীর মুখ, সেই সাথে ড্রেসআপ পুরোই কালো,কালো কোর্ট, কালো প্যান্ট,কালো সানগ্লাস, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি সব মিলিয়ে ইমনকে তাঁর সুন্দর মুখো গুন্ডা লাগলো। কপাল, গালের কিছু অংশ,হালকা গোলাপি ঠোঁট জোরা দেখে সৌন্দর্যের আভাস পেলেও গম্ভীর কন্ঠ সেই সাথে শারীরিক গঠন,দেখে তাঁর মনে হলো আস্তো এক গুন্ডা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
চট করে বিছানা থেকে ওঠে বললো আমারে বাড়ি দিয়া আসেন। আমি এই ঢাকা শহড়ে থাকমু না।
এইখানকার সব মানুষ ই গুন্ডা, সব মাইনসের কথাও গুন্ডা গুন্ডা। একটাও ভালা মানুষ নাই এক আপা পাইছিলাম হেও হারাই গেছে।
ইমন মুসকানের এমন কথা শুনে হকচকিয়ে গেলো সেই সাথে রেগেও গেলো।
তোমাকে এখানে থাকতে কে বলেছে,,,
আর সব মানুষ গুন্ডা মানে,তাঁর মানে তুমি আমাকেও মিন করছো,,,হাউ ডেয়ার ইউ।
মুসকান ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো।
ইমন মুসকানের মুখোমুখি হয়ে রাগি লুক নিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো তাঁর মানে আমাকেও গুন্ডা বলছো,,,
মুসকান একটু পিছিয়ে গেলো আর বললো হ আপনেও গুন্ডা, কেমন কইরা চান,কেমন কইরা কথা কন।
ইমন এক পা এক পা করে এগিয়ে জিগ্যেস করলো আমি গুন্ডা,মুসকান এক পা এক পা করে পিছিয়ে দেয়ালে ঠেকে গেলো।
ঢোক গিলে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো আপনিও ভুড়িওয়ালার মতো খারাপ লোক,কেমন কইরা চান, কেমন কইরা কথা কন,কেমন কইরা ভয় দেখাইতাছেন।
ইমন দেয়ালে মুসকানের এক হাত শক্ত করে চেপে ধরে বললো আমি ভুড়িওয়ালা লোকের মতো,,,
মুসকান হাতে ব্যাথায় আহ করে ইমনের রাগি চোখের দিকে তাকালো কাল রাতের কথা মনে পড়তেই এক ঢোক গিলে চোখ দুটো বন্ধ করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো না একটু ভিন্ন আপনি,,,
ইমনের হাত নরম হয়ে এলো মুসকানের ভয়ার্ত মুখ টা দেখে, তাঁর কথা শুনে বাঁকা হেসে বললো একটু না,আমি মানুষ টা পুরোটাই ভিন্ন, শুধু ভুড়িওয়ালা নয় প্রত্যেকটা মানুষ থেকেই আমি আলাদা।
ইমন চৌধুরী এক পিস ই রয়েছে এই পুরো পৃথিবীতে।
আর সেটা একদিন তুমি নিজের মুখে স্বীকার করবে।
আমার সাদা মনে তুমি যে লাল রঙের ছোঁয়া দিয়েছো।
বুকের বা পাশটা রক্তাক্ত করেছো তাঁর দায়ভার সারাজীবন নিতে হবে তোমায়,,
মুসকান এক ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে চেয়ে রইলে,
তাঁর চাহনীতে স্পষ্ট সে কিছু বুঝেনি।
ইমন মুসকান কে ছেড়ে ধমকের স্বরে বললো, বাড়ি যামু, বাড়ি যামু করছো, কোথায় যাবে।
মুসকান কেঁপে ওঠলো ইমনের ধমকে।
ইমন মুসকানের দিকে চেয়ে আবারো ধমকের স্বরে বললো বাড়ি গেলে যদি আবার তোমার বাবা তোমাকে কোন ভুড়িওয়ালার কাছে বেঁচে দেয়,
আঁতকে ওঠলো মুসকান, ভয়ে তাঁর গলা শুকিয়ে গেলো।
ইমন একটু ঝুঁকে মুসকানের মুখোমুখি মুখ নিয়ে বললো ভুড়িওয়ালার থেকে এই গুন্ডা টা ঢেড় ভালো,
গতোদিনে যেহেতু গুন্ডাটা তোমার কোন ক্ষতি করেনি, সামনের দিনগুলোতেও করবে না। বলেই চোখ মারলো,,,
পরোক্ষনেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বললো নিচে খাবাড় আছে খেয়ে রুমে চুপচাপ থাকবে। তোমার ভালো আপা বিকালেই এসে যাবে। বলেই ফাইল হাতে নিয়ে বডি স্ট্রেটকাঠ করে দাঁড়িয়ে সোজা বেরিয়ে পড়লো।
মুসকান আগামাথা কিছুই বুঝলো না। ফ্লোরেই বসে পড়লো।
আর ভাবতে লাগলো,এইখানে থাকবার কইলো,এইখানে ক্যান থাকমু। আবার ভাবলো আমারেতো কেউ ভালোবাসে না, বাড়ি গেলেও তো আম্মা আমারে কথা শুনাবো,আব্বা অসন্তুষ্ট হবো।তাইলে কই যামু আমি।
আমারে কি এইখানে থাকতে দিবো,,,নিজের আব্বাই থাকতে দিলো না খাওয়া, পড়া নিয়া খোঁটা দিতো। এইখানে কে আমারে দেখবো কে আমারে খাওন,পড়ন দিবো। ভালো আপায় নাকি আবো,তাঁর কাছে একটা কাজ চামু। আমিতো সব কাজ পারি।
আম্মার সব কাজ তো আমিই কইরা দিছি। কাজ কইরা খামু।

,
সন্ধ্যার দিকে সায়রী বাসায় ফিরলো সুপ্তি কে নিয়ে।
মাম্মাম তুমি রুমে যাও আমি আসছি,
সুপ্তি বললো আমিও যাবো মাম্মা,নিউ গার্ল কে দেখবো আমি।
সায়রী হেসে বললো ও বাবা আমার মাম্মাম নিউ গার্লের কথাও যেনে গেছে।
সুপ্তি ঘাড় নাচিয়ে, চোখ বাঁকিয়ে বললো হেতো,,,আমি সব জানি।
সায়রী সুপ্তিকে নিয়েই মুসকান যে রুমে সেই রুমে গেলো। গিয়ে দেখতে পেলো মেয়েটা হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে।
সায়রী বললো কি ব্যাপার মুসকান মুখ ভাড় কেনো?কেমন আছো তুমি?
মুসকান এক লাফে বিছানা থেকে নেমেই সায়রীর সামনে গিয়ে বললো আপাগো বাঁচান আমারে।
সুপ্তি হা করে পিছিয়ে গেলো, গোল গোল চোখ করে মুসকানকে দেখতে লাগলো।
সায়রী ভ্রু কুঁচকে মুসকানের কাঁধে ধরে বললো কি হয়েছে,,,
আপা আমার খুব ভয় লাগতাছে আমারে দিয়া আসেন আপা, আমি এই গুন্ডার শহড়ে থাকমু না।
সায়রী হকচকিয়ে গেলো গুন্ডা মানে সে কি কে গুন্ডা কোথায় গুন্ডা,,,
সুপ্তি গুটি গুটি পায়ে এসে মুসকানের হাত নাড়িয়ে বললো সব সিনেমাতেই ভিলেইন থাকে তুমি জানোনা।
মুসকান নিচে তাকাতেই দেখতে বললো একটি কিউট পিচ্চি মেয়ে, সাদা ফ্রক পড়া মাথায় সাদা ফুলওয়ালা ব্যান্ড, গাল দুটো গুলুমুলু। চোখ দুটো টানা টানা। মুসকানের মুখে হাসি ফুটে ওঠলো সুপ্তির গালে আলতো করে ধরে বললো এইটা তো সিনেমা না, এইটা হইলো বাস্তব জীবন।
সুপ্তি খুবই নম্রভাবে বললো তুমি জানো না বাস্তব জীবন থেকেই সিনেমা তৈরী হয়। সায়রীর দিকে তাকিয়ে বললো তাইনা মাম্মা, তুমিই তো বলো মানুষের জীবন থেকেই, মানুষের জীবনের ঘটে যাওয়া ভালো -মন্দ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তো সিনেমা তৈরী করা হয়।
সায়রী মেয়ের কথায় মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো ইয়েস মাম্মাম ইউ আর রাইট,,,
মুসকান অবাক চোখে চেয়ে রইলো এইটুকুন মেয়ের এতো পাকা পাকা কথা শুনে।
সায়রী বললো মুসকান কি হয়েছে বলোতো।
ইমন কি কিছু বলেছে,,,
মুসকান বললো আপা আমার খুব ভয় লাগতাছে,ঐ লোকটা কেমন কইরা চায়,কেমন কইরা কথা কয়।
সায়রী হেসে ফেললো,ঐ লোকটা ওভাবেই কথা বলে,ওভাবেই চায় তাঁর এই এটিটিওট দেখে কতো মেয়ে ফিদা জানো,,,
মুসকান ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো,
সায়রী বুঝলো সে কিছু বুঝতে পারেনি তাই বললো ঐ লোকটার ব্যাক্তিত্ব এমনই বাইরে থেকে খুবই শক্ত, কিন্তু ভিতরটা খুবই নরম এবং খুবই ভালো মনের একজন মানুষ।
সুপ্তি বললো মামাই তো খুব ভালো, মামাই ইজ দ্যা বেষ্ট ম্যান।
সায়রী বললো মাম্মাম তুমি রুমে যাও ড্রেস চেঞ্জ করো গিয়ে আমি তোমার এই আন্টির সাথে কথা বলেই আসছি,,,
সুপ্তি বললো ওকে মাম্মা আমি ফ্রেশ হয়ে এসে নিউ আন্টির সাথে অনেকক্ষন গল্প করবো।
সায়রী মুসকানের দিকে চেয়ে বললো মেয়েটা আমার নতুন কোন মানুষ দেখলেই বড্ড খুশি হয়, আর চলে গেলে বড্ড মন খারাপ করে।
মুসকান কিছু বললো না। সায়রী মুসকান কে বিছানায় বসিয়ে জিগ্যেস করলো তুমি যদি চলে যেতে চাও তোমায় দিয়ে আসবো আমরা,কিন্তু তোমার সাথে যদি আবার একি ঘটনা ঘটে তখন কি হবে।
মুসকান ভয়ার্ত চোখে মুখে সায়রীর দিকে তাকালো।
আবার চোখ নামিয়ে মন খারাপ করে বললো তাইলে এখন আমি কই যামু,কার কাছে যামু।
সায়রী যেনো এমন কোন প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিলো।
সাথে সাথে বলে ফেললো কেনো তুমি এখানে থাকতে পারো।
মুসকান অবাক হয়ে বললো এইখানে থাকমু, এমনি এমনি আমারে কেউ খাওন, পড়ন দিবো?
সুন্দরমুখো গুন্ডা কেমন করে,বলেই মুখ ভাড় করলো মুসকান।
সায়রী চোখ বড় বড় করে বললো সুন্দরমুখো গুন্ডা মানে কে ইমন,,,
মুসকান মাথা নিচু করে ফেললো।
সায়রী মুখ চিপে হেসে ফেললো।
সায়রী বললো কি চাও তুমি, তোমাকে জোর করা হবে না, তুমি যা চাও তাই হবে।
মুসকান চোখ তুলে তাকালো আর বললো আপা আমারে একটা কাজের ব্যবস্থা কইরা দেন,আমি সব কাজ পারি,রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া সব।
সায়রীর বড্ড মায়া হলো এই টুকু মেয়ে পড়াশোনা করবে, আনন্দে উল্লাসে জীবন কাটাবে, সে কিনা কাজের জন্য এভাবে অনুরোধ করছে।মা নেই বাবার নিষ্ঠুরতার জন্য মেয়েটাকে আজ এই পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
সায়রী বললো তাহলে তো তুমি এখানেই থাকতে পারো। সুন্দর মুখো গুন্ডার তো এমন একজন লোকেরই প্রয়োজন, যে তাঁর কাপড়চোপড় ধুয়ে দিবে,তাঁর খাবাড় তৈরী করে দিবে, সায়রী মুখ চিপে হেসে বললো অফিস থেকে এসে রেষ্ট নেবে যখন তখন কেউ এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে।
মুসকান অবাক চোখে তাকালো সে তো সব পারবে কিন্তু অমন গুন্ডার মতো মানুষের মাথা টিপবে কি করে। যদি না করে তাহলে কি কাজটা দেবে না,,,
সব চিন্তা করে মুসকান বললো পারমু আমি।
সায়রী বড় বড় করে চেয়ে বললো সত্যি,,,
মুসকাম বললো হ পারমু।
সায়রী মনে মনে ভাবলো ইমনের বলা সেই কথাটা
“সায়রী আমি যাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছি সেই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে,,
তাই আমি কাউকে আঁকড়ে ধরে আর বাঁচতে চাইনা সায়রী।
যাকে ভরসা করে যার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান দেখে আমরা তাদের ওপর ভরসা করি তারাই এক সময় আমাদের আবার কাঁচকলা দেখিয়ে চলে যায়।
নিজেকে কখনো কারো কাছে দূর্বল করার মতো বোকামি আমি আর করতে চাইনা।
আর না এই বাচ্চা মেয়েটার কাছে আমি দূর্বল হবো।
মেয়েটার একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার, তুই ওকে বুঝিয়ে এখানে রাখার ব্যবস্থা কর বাকিটা আমি দেখবো। আর তুই যেই আশার কথা বললি সেটা আমি করতে পারিনা, তাহলে অনেক বড় অন্যায় হয়ে যাবে। কারন ওর তুলনায় আমার এইজ অনেকটাই বেশী, ও যখন ম্যাচিওর হবে, বুঝতে শিখবে তখন কিন্তু আমার মতো বুড়োকে মোটেই পছন্দ করবে না। এখন বুজালে হয়তো কাজ হবে বাট সমস্যা হবে ভবিষ্যতে।
সায়রী বললো দেখ মেয়েটা একদম ই সহজ-সরল।
গ্রামের মেয়ে, তুই তো শহড়ের স্মার্ট মেয়েদের সহ্য করতে পারিস না। তাদের মধ্যে তোর আলাদা রাগ ক্ষোপ আছে, আর এই মেয়েটাকে তুই বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজের মতো তৈরী করে নিতে পারবি।
ইমন বাঁকা হেসে বললো আমি কোন আশার আলো দেখতে চাই না। শুধু এইটুকু বলবো একটা নিরীহ-অসহায় মেয়েকে সহায়তা কর। এছাড়া সুপ্তির ও একজন খেলার সাথী হয়ে যাবে। ফাঁকা বাড়িতে একজন মানুষ পেয়ে যাবো আমরা।
আর তোর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবি। বাসায়ই পড়াশোনা করবে শুধু এক্সাম দিবে পড়াশোনার বিষয়টা তুই দেখবি।
সায়রী বললো তাহলে কি ওকে গ্রামে ফিরিয়ে দিবি না। এখানেই রেখে দিবি।
ইমন বললো যদি ওর কোন শুভাকাঙ্ক্ষী পাই তো ফিরিয়ে দিবো। তুই ওর সাথে কথা বলে বুঝার বা জানার চেষ্টা করবি, তেমন কেউ আছে কিনা।
ঝরের মতো আমার জীবনে চলে এসেছে,হয়তো সারাজীবন থাকার জন্যই, আবার খনিকের জন্যও হতে পারে। দেখাই যাক না কি হয়।
সায়রী কথা গুলো ভেবেই মনে মনে বললো যাক মেয়েটার কথা শুনে মনে হয়না পরিবারে তেমন কেউ আছে যার কাছে যাবে। যেহেতু কাজ চাইছে তাঁর মানে মেয়েটার সত্যি আপন বলতে কেউ নেই।

,
শুরু হয়ে যায় মুসকানের নতুন জীবন,,
শুধু মুসকানের না ইমনের সাদামাটা জীবনটায় ও যেনো রং তুলির ছোঁয়া পড়ে।
বহুবছর পর আজ ইমন তৃপ্তি সহকারে খাবাড় খেয়েছে। মুসকান নিজের হাতে সব রান্না করে ইমন কে বেড়ে খাওয়িয়েছে। ইমন গম্ভীর মুখে সব খেলেও খাওয়ার শেষে যখন মুসকান পায়েস এগিয়ে দিলো। বুকের ভিতরটা তাঁর অজানা ভালো লাগায় ভরে ওঠলো।
সত্যি গ্রামের মেয়েরা খুব লক্ষী হয়, এরা শহড়ের আলো বাতাস পায়নি বলেই হয়তো এতো সুন্দর প্রানখুলে কথা বলতে পারে,মন দিয়ে ভালোবেসে সব কাজ করতে পারে। কাজের লোকরা কাজের খাতিরে দায়িত্ববোধ থেকে রান্না করে আর এই মেয়েটা বোধহয় ওর সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে মন-প্রান দিয়ে রান্নাটা করেছে। ইমন কয়েক চামচ পায়েস মুখে দিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন রয়েছে, মুসকান একটু পর পর কাজের ফাঁকে ইমনের মুখের দিকে তাকাচ্ছে জানার জন্য যে রান্নাটা কেমন হয়েছে।
ইমন হালকা কেশে ওঠলো,,,
মুসকানের বুকের ভিতরটা ডিপডিপ করতে শুরু করলো, কানটা বোধ হয় ইমনের মুখের কাছে ধরে রাখার মতো করে তাক করলো যেই প্রশংসা করবে অমনি তাঁর কানে পৌঁছে যাবে প্রশংসা মাখা কথাগুলো। কিন্তু মুসকান হতাশ হলো যখন ইমন ওঠে চলে গেলো। মনটা খারাপ করে ইমনের যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।
সুপ্তির এক্সাম থাকায় সায়রী তাঁকে নিয়ে চটজলদি বেরুচ্ছিলো, কিন্তু থেমে গেলো মুসকান এর মুখ ভাঁড় দেখে।
কি হলো মুসকান মুড অফ কেনো,,,
মুসকান মন খারাপ করে সায়রীর দিকে চাইলো।
সায়রী ইশারা করে বললো মন খারাপ কেনো?
মুসকান কাছে গিয়ে বললো আপা খাওন ভালো হয়নাই,,,
সায়রী মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে দু আঙুল ভাঁজ করে বললো খুব টেষ্টি ছিলো, মনে হলো মায়ের হাতে রান্না খাচ্ছি।
সুপ্তি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে রসালো মাখা গলায় বললো ইয়াম্মি,,,
সায়রী হেসে ফেললো।
মুসকান মুখ ভাঁড় করেই বললো তাইলো ওনি কিছু বললো না কেন?
সায়রী ভ্রু কুঁচকালো বললো ইমন???
মুসকান মাথা নাড়াতেই সায়রী মুসকানের সামনে এসে গাল টেনে বললো আহারে বনু ওনি এমনই। বাট ওনারও খুব ভালো লেগেছে। সব খেয়েছে তো তাইনা তার মানে ওনার ও ভালো লেগেছে।
ও এমনি কারো প্রশংসা জিনিসটা ওর মুখ দিয়ে বের হয় না।
সুপ্তি গাড়িতে বসো, মুসকান

আসছি সাবধানে থেকো।
ইমন রেডি হয়ে নিচে নামতেই দেখতে পেলো মুসকান থালা বাসন গুলো মাজছে।
তাই মনে মনে ভাবলো ওকে শুধু রান্নার দায়িত্ব টাই দেওয়া উচিত বাকি সব কাজের লোকরা করবে। আজি দুটো কাজের লোক ঠিক করতে হবে। যারা সর্বক্ষন সময় দিতে পারবে, মাসে ভালো সেলারিও দিয়ে দিবো এতেই হবে। বাচ্চা মেয়েটা কে এতো খাটানো ঠিক হবে না। যেহেতু রান্না টা ভালো পারে তো ওর হাতের রান্নাই খাবো। বাঁকা হেসে ইমন নিচে নেমে মুসকান কে বললো দরজাটা লাগিয়ে দিতে মুসকান বাধ্য মেয়ের মতো তাই করলো।
পরেরদিন সায়রী মুসকানকে নিয়ে তাঁর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলো। স্কুল শেষে ভালো ভালো শপিংমলে গিয়ে শপিং করিয়ে দিলো। এবার সায়রীর নেক্সট মিশন হলো মুসকানের ভাষা ঠিক করা। শহড়ের অতি আধুনিকতার ছোঁয়া না আনলেও যতোটা প্রয়োজন ততোটা করতেই হবে।
সায়রী একটা মেয়ে হয়ে একটা ছেলের চোখের ভাষা ঠিক বুঝতে পেরেছে। সায়রী এটাও বুঝতে পারছে ইমন বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছে তা নয়তো এতটা ভাবতো না এই মেয়ের জন্য। বয়সটাই তো আর ফ্যাক্ট হতে পারে না । পৃথিবীতে ইমন চৌধুরীই প্রথম তাঁর বয়সের তুলনায় অনেক টা কম বয়সের মেয়ের প্রেমে পড়েছে এমনটাও না। ভালোবাসা যে কোন বয়সেই যে কারো প্রতি আসতে পারে।

বেশ কয়েকটা দিন চলে গেছে। মুসকান কে তেমন কিছু করতে হয়না। সকাল -বিকাল রান্নাটাই করতে হয়। দুপুরে কেউ বাসায় থাকেনা। রাতে সুপ্তি আর মুসকান কে সায়রী পড়তে বসায়,সেই সাথে মুসকান কে সায়রী অনেক কিছুও শিখিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছে।
ইমন যতো রাতেই বাসায় ফিরুক না কেনো মুসকান জেগে থাকে, কারন তাঁকে সায়রী এই দায়িত্ব টাই দিয়েছে। সে দায়িত্ব টা খুব ভালো করেই পালন করছে। ইমনের প্রতি তাঁর যতটা ভয় আছে তাঁর থেকেও হাজারগুন বেশী শ্রদ্ধাও তৈরী হয়েছে।
কিন্তু ইমন কখনো হাসে না,গুমরা মুখো হয়ে থাকে এই বিষয় গুলা তাঁর ভালো লাগেনা। তাঁর ঐ ছোট্ট মনে ইচ্ছে জাগে এই মানুষ টা হাসলে কেমন লাগে??
এই মানুষ টা প্রান খুলে কথা বললে কেমন লাগে??
ইচ্ছে গুলো ইচ্ছেতেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে তাঁর ।

,
রাত এগারোটা বাজে ড্রয়িং রুমে বসে মুসকান পড়াশোনা করছিলো। ইমন এসে কলিং বেল বাজাতেই মুসকানের মনটা প্রফুল্লতায় ভরে গেলো। ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলো, ইমন বরাবরের মতোই মুখে গম্ভীর্য ভাব এনে ভিতরে প্রবেশ করলো। মুসকান দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে ঘুরতেই দেখতে পেলো আজ ইমন উপরে যায় নি। সোফায়ই ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছে টাই টা খোলা, চুলগুলো উষ্কখুষ্ক, দাঁড়ি গুলোও কেমন অগোছালো লাগছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। মুখটা বেশ শুকনো লাগছে প্রতিদিনের তুলনায় আজ যেনো বেশীই ক্লান্ত ইমন।
মুসকান ধীর পায়ে কাছে এসে বললো আপনি ফ্রেশ হন আমি খাবাড় বাড়ছি,,,
ইমন এক চোখ বাঁকা করে মুসকানের দিকে তাকালো, মৃদু হেসে বললো বাহ ভাষাটা জব্দ করে ফেলেছো।
মুসকান বেশ লজ্জা পেলো সেই সাথে খুশিও হলো তাঁর ভাষার জন্য হলেও ইমন একটু হেসেছে।
ইমন বললো সমাজ যেমন পরিবর্তনশীল, তেমন মানুষও পরিবর্তন শীল। সময়ের সাথে সাথে মানুষ গুলোর মাঝেও কেমন পরিবর্তন চলে আসে।
এই যেমন তুমিও পরিবর্তন হয়ে গেছো কিছুদিনের ব্যবধানেই।
মুসকানের কেমন একটা লাগলো, ইমন কখনো প্রশংসা করেনা কিন্তু এটা কি করলো সে ঠিক বুঝে ওঠতে পারলো না। তাঁর ছোট্র মস্তিষ্কে এমন কঠিন কথা বুঝার কথাও না।
ইমন চট করে ওঠে উপরের যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।
মুসকান অবাক চোখে তাঁর যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।আর ভাবলো লোকটা যেনো কেমন,,,

,
রাত একটা ছুঁই ছুঁই মুসকানের প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছিলো ইমনের খাওয়া শেষ হতেই সব গুছিয়ে ঘুমানোর জন্য নিজের রুমে পা বাড়াতেই ইমন পিছন ডাকলো মুসকান,,,
মুসকান তাকাতেই ইমন গম্ভীর গলায় বললো আমার মাথাটা প্রচন্ড ধরেছে মাথাটা টিপ দাও তো চলো।
ইমন নিজের বিছানায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো। আজ তাঁর দাদীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলো আর সেখানে দাদী কান্নাকাটি বাজিয়েছিলো। শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালোও না। দাদীর একটাই কথা মরার আগে তোর সুখের সংসার দেখে যেতে চাই। একটা বিয়ে করনা দাদু ভাই। এ বাড়িতে চলে আয় না দাদু ভাই। এই বাড়িতে শ্বাস নেওয়াও অনেক কঠিন রে ভাই,কারো সাথে কারো মিল নেই, কেউ কারো সাথে মন খুলে দুটো কথা বলে না কেউ কাউকে সময় দেয়না। সবাই যার যার মতো ব্যাস্ত। সবসময় অশান্তি, ছেলেমেয়েদের ঝামেলা, নাতি -নাতনীদের বিশৃঙ্খলা আর ভালো লাগে না। এখানে চলে আয় না দাদু ভাই আমার দম বন্ধ লাগে এখানে দম বন্ধ লাগে। দেখিস মরে গেলে আফসোস করবি এই বুড়িটার জন্য।
দাদী যখন বিয়ের কথা বলেছিলো এবার আর দাদীকে সে ইগনোর করেনি বা রেগেও যায় নি। সর্বপ্রথম মুসকানের কথাই তাঁর মনে পড়েছে।
কিন্তু এটা কি আদেও সম্ভব,,,
মুসকানের আলতো হাতের স্পর্শ মাথায় পড়তেই ইমনের পুরো বুক সহ মাথা কেমন শীতলতায় ভরে গেলো। মুসকান তাঁর নরম হাতে আলতো করে ইমনের মাথা টিপে দিচ্ছে,,,
ইমন চোখ বন্ধ করে সেই আলতো ছোঁয়া উপভোগ করছে। পরোক্ষনেই ভাবলো নাহ এটা হয়না।
এসব কি করছি আমি কোন পথে আগাচ্ছি। মুসকান যখন বুঝতে পারবে অবশ্যই আমাকে ইগনোর করবে। আর কয়েক বছর পর অবশ্যই সে চাইবে না এমন বয়স্ক একটা লোকের সাথে থাকতে।
তাহলে কেনো আমি মেয়েটাকে নিজের কাছে রেখে দিচ্ছি, কেনো ওকে নিয়ে এতো ভাবছি। ইমন চোখ খুলে তাকালো ঝট করে ওঠে বসলো,মুসকানের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো ঘুমে চোখ ওঠাতে পারছে না তবুও কষ্ট করে বসে তাঁর মাথা টিপে দিচ্ছে। প্রচন্ড রাগ হলো ইমনের চিৎকার করে বলে ওঠলো চলে যাও,,,
মুসকান কেঁপে ওঠলো ভয়ে, ঘুমটা ছেড়ে গিয়ে তাঁর পুরো শরীর সহ মাথা কাঁপতে লাগলো। ভয় চোখে ইমনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো ইমনের চোখ দুটো লাল বর্ন ধারন করেছে। রাগে ঘমঘন শ্বাস নিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ এমন রাগের কারন কি, আমি কি ভুল করলাম কিছু।
ইমন আবারো এক ধমক দিয়ে বললো কি হলো চলে যাও এখান থেকে সাথে সাথে মুসকান কেঁপে ওঠলো সেই সাথে একটু পিছুতে যেয়ে বিছানা থেকে পড়ে যেতে নিতেই চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললো। বুঝতে পারলো দুটো হাত তাঁর হাত দুটো আঁকড়ে ধরে হেচকা টান দিলো। মুসকান সাথে সাথে ইমনের গায়ের ওপর গিয়ে পড়লো।
মুসকান ভয়ে ক্রমাগত কেঁপেই চলেছে। ইমনের বুকটাও ধকধক করছে মুসকান কে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো এতো কেয়ারলেস কি করে হতে পারো।
মুসকান ইমনের শক্ত করে ধরা হাত ছাড়াতে গিয়েও পারলো না।

চলবে…….
ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here