হৃদয় এনেছি ভেজা পর্ব -০৬+৭

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [০৬]

সিদাত অফিস থেকে বেরিয়েই দেখলো সাইফ তার গাড়ি নিয়ে অফিসের সামনে বসে আছে। সাইফকে এই সময়ে দেখে সিদাত চাপা হাসলো। নিজে বাইকের চাবি নিয়ে আবার নিজেই নিতে এসেছে। সাইফ যে কোন ধাতু দিয়ে তৈরি সেটা একমাত্র উপরওয়ালাই ভালো জানে।

সিদাত আর না দাঁড়িয়ে গুণগুণ করতে করতে ফন্ট সিটের দরজা খুলে উঠে বসলো। কাঁধের কালো কুচকুচে ব্যাগটা পেছনের সিটে অবহেলায় ছুঁড়ে ফেলে বললো,
–“বাইকের চাবি নিয়ে এখন আবার দরদ দেখাচ্ছো ভাইয়া?”

সাইফ গাড়ি ঘুরিয়ে ব্যস্ত স্বরে বললো,
–“কেন জানিস না, আমার দরদ সবসময়-ই একটু বেশি!”

সিদাত হাসলো। দুই ভাই নীরবতা পালন করলো। এর মাঝে সিদাত হঠাৎ বলে ওঠে,
–“মেয়ে পছন্দ হয়েছে?”

মেয়ের কথা শুনে সাইফের বিরক্তিতে কপাল কুচকে গেলো। বললো,
–“বয়ফ্রেন্ড থাকা মেয়েকে আমার একদম পছন্দ না। আমি আমার মতো ফ্রেশ কাউকে চাই!”

সিদাত ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,
–“খুঁজো। খুঁজলেই পাবে!”

সাইফ কোণা চোখে সিদাতকে পরখ করে কপালে ভাঁজ ফেললো। অতঃপর আবার রাস্তার দিকে চেয়ে মিনমিন করে বললো,
–“এত হাসিস না। আমার মতোই কপাল ফুটো হবে তোর!”
–“কিন্তু আমার মনে হয় না!”

সাইফ অস্ফুট স্বরে বললো,
–“কেন মনে হয় না?”
সিদাত হলদে পথে চেয়ে আনমনে বললো,
–“জানি না ভাইয়া। তবে মন বলে!”
সিদাতের কথা শুনে সাইফ ঠাট্টা মশকরা করলো। তবে সিদাত মোটেও রাগ করলো না। বরং ভাইয়ের সাথে নিজের নামে আরও দুই এক শব্দ জুড়ে দিয়ে নিজের বদনাম করলো। সাইফ হাসি থামিয়ে বলে,
–“নিজের বদনাম করতেও মুখ কাঁপে না?”

সিদাত চাপা হাসলো শুধু। কিছু বললো না। পপরমুহূর্তেই সিদাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে জানালার কাচে মাথা এলিয়ে দিলো। চোখ জোড়ায় ব্যথা, যন্ত্রণা লেপ্টে আছে। সঙ্গে রয়েছে বিষণ্ণতার রেশ।

আজ শো-তে কোনো এক মা-ছেলে এসেছিলো। তাদের সংগ্রাম, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্প শুনে তার চোখ জ্বলজ্বল করছিলো। বক্ষখানা ব্যথায় মুঁচড়ে যাচ্ছিলো। বারবার শয্যাশায়ী মাকে মনে পরছিলো। তার মা-টাও কেন ওনার মতো হলো না? মায়ের অনুপস্থিতির ব্যথা পৃথিবীর কোনো জিনিস কী আদৌ ভুলাতে পারে? আজ যে সিদাত না চাইতেও নিজের মাথায় মায়ের মমতার হাত বুলানোর জন্যে বড্ড লোভী হয়ে পরেছে। অবশ্য এই লোভ প্রায় প্রতিদিন-ই হয়। কিন্তু মায়ের কাছে এই ধরণের আবদার করে মায়ের মন ভেঙে দিতে চায় না। সিদাত জানে, তার মা এই কঠিন ব্যাধির কারণে আকাশসম আফসোস, বিতৃষ্ণা বুকে গেঁথে রেখেছে। যা তার মাকে প্রতিনিয়ত পোড়ায়, ভীষণরকম পোড়ায়।

বাড়ি ফিরে সিদাত সোজা মায়ের ঘরে চলে গেলো। ফিরোজা খাতুন তার মাকে খাওয়ানো শুরু করেছে সবে। সিদাত মৃদু গলায় ফিরোজা খাতুনের উদ্দেশ্যে বললো,
–“আজ মাকে আমি খাইয়ে দিবো ছোটো মা। আপনি বরং খেয়ে নিন।”

ফিরোজা পিছে ফিরে সিদাতের মুখপানে চাইলেন। বড্ড শুকনো লাগছে মুখখানা! ফিরোজা কথা বাড়ায়নি। চলে গেলেন তিনি। সিদাত খুব যত্ন করে মাকে খাইয়ে দিয়ে সব গুছিয়ে রাখলো। মায়ের দিকে তাকাতেই দেখলো নির্বাক চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। সিদাত আলতো হেসে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
–“আজ আবার সেই মেয়েটির সাথে দেখা হয়েছে জানো মা? তবে মজার ব্যাপার হলো আমি আজও তার নাম জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি!”

বলেই সিদাত হাসতে লাগলো। জয়ার চোখজোড়া হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠলো। যেন সে আগ্রহী সিদাতের কথা শুনতে। সিদাতও সেটা আঁচ করতে পারলো। এজন্য ভেতরের কষ্ট গুলো মাকে বুঝতে না দিয়ে সে তরীর সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা সব একে একে বলতে লাগলো। জয়াও আগ্রহী হয়ে সব শুনছে। সিদাতের কেন যেন মনে হলো নিকাব রাণীকে নিয়ে তার মায়ের আগ্রহের শেষ নেই৷ গল্প শুনতে শুনতে জয়া ঘুমিয়ে গেলো। সিদাত মায়ের কপালে চুমু এঁকে দিয়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসলো।

বের হতেই দেখলো বাড়ি নীরব, সুনশান। তাও খাবার টেবিলের এক চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে ফিরোজা খাতুন। হয়তো-বা সিদাতের জন্যেই। সিদাত দেয়াল ঘড়ির দিকে চাইলো। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে বারোটা পেরিয়ে গেছে। ফিরোজা খাতুনও ক্লান্তহীন বসে আছে। সিদাত এগিয়ে গেলো ফিরোজার কাছে। সিদাতকে নজরে এলে ফিরোজা শুকনো হেসে বললো,
–“তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম বাবা। খাবার বাড়বো?”

সিদাত কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে ইতিবাচক মাথা নাড়ালো। ফিরোজা খাতুন উঠে দাঁড়ালেন। ব্যস্ত হয়ে ছুটলেন রান্নাঘরে। সিদাতও কিছুক্ষণ পরপর রান্নাঘরে হাঁটা দিলো। ফিরোজা খাতুন সিদাতকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বললো,
–“আরেহ! টেবিলে গিয়ে বসো। গরমে দিয়ে রান্নাঘরে কী করছো বাবা?”

সিদাত কোনো প্রতি উত্তর না করে ফিরোজার সামনে মাথা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
–“একটু হাত বুলাবেন ছোটো মা। একটু মমতার জন্যে ভীষণ ব্যাকুল হয়ে আছি। মাকে তো বলতে পারবো না। এজন্য আপনাকে বলছি। যদি একটুখানি কষ্ট লাঘব হয়।”

——————–
তরীর আজ ঘুম আসছে না কেন যেন। এজন্য তরী শোয়া ছেড়ে উঠে রান্নাঘরে চলে গেলো। রাত-বিরেতে চা খাওয়ার অভ্যাস আছে তার। এজন্য দেরী না করে চুলোয় পানি বসিয়ে দিলো। একমনে চেয়ে রইলো পাতিলের মধ্যে। কিছু একটা খোঁজার বৃথা চেষ্টা করছে সে। কী যেন একটা ভেবে তরী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ফুপির রুমে চলে গেলো। দরজা আলতো ফাঁক করে ফুপিকে পরখ করে নিলো। অতঃপর তরী আবার রান্নাঘরে এসে চা বানিয়ে নিজের রুমে চলে এলো। টেবিলের ওপর থেকে টেবিল ল্যাম্প আর তরীর গোপন কিছু সরঞ্জাম নিয়ে বারান্দায় হাঁটা দিলো। চা-টা আগেই বারান্দায় রেখে এসেছে।

সব ঠিক করে তরী মেঝেতে বসে চা-টা হাতে নিলো। ধোঁয়া ওঠা চায়ে হালকা ফুঁ দিয়ে শব্দের সাথে চুমুক দিলো। সঙ্গে সঙ্গে তরীর সর্বাঙ্গ জুড়ে প্রশান্তির রেশ ছেয়ে গেলো। সে চা টি হাতের নাগালের বাইরে রাখলো। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে তরী হাতে খাতা-পেন্সিল তুলে নিলো। গভীর রাতে সে তার পছন্দের কাজ করবে। তরী স্কেচ করতে শুরু করে দিলো। ছোটো থেকেই তরীর আঁকা-আঁকি নিয়ে বড্ড আগ্রহ। ছোটো থেকে স্বপ্ন দেখেছে একসময় সে চারুকলা নিয়ে পড়বে। নিজের অদম্য সখকে পূরণ করবে। কিন্তু স্বপ্ন পূরণে বাঁধা এলো বাবার কাছ থেকে।

বাবা আকবর সাহেব একদম পছন্দ করেন না ছবি আঁকা। কারণ ছবি আঁকা মানেই মানুষ আঁকতে হবে। অথচ তরী তার বাবাকে আশ্বস্ত করেছিলো সে কখনোই মানুষের প্রতিরূপ আঁকবে না। কিন্তু তার বাবা তাকে বোঝালো। আকবর সাহেব যা মেনে চলেন তা দুনিয়ার মানুষ মানে না। চারুকলায় ভর্তি হলে অবশ্যই, অবশ্যই মানুষের প্রতিরূপ আঁকতেই হবে। এখনকার মানুষজনদের কাছে এগুলো ব্যাপার না। এজন্য আকবর সাহেবের নিষেধাজ্ঞা তরী নীরবে মেনে নেয়। কিন্তু সখ, স্বপ্ন কোথাও না কোথাও তো থেকেই যায়। তাই তরী প্রায় রাতে ঘুম না আসলে বারান্দায় বসে স্কেচ করে। স্কেচবুক এবং পেন্সিলগুলো তরী অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে কিনেছে।

এখন তরী একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ এবং তার নিচে দিয়ে কৃষ্ণচূড়ায় রাঙানো পথের স্কেচ করছে। যদিও রঙহীন ছবিটায় বোঝা যাচ্ছে না এটা আদৌ কোনো কৃষ্ণচূড়ার গাছ কী না। তবে তরী কৃষ্ণচূড়ায় রঙও দিবে না। থাকুক নাহয় কিছু সাদা-কালো ছবি। সব ছবিতে রঙের ছোঁয়া লাগবেই, এটা তরী মানতে পারে না। এই সাদা-কালো ছবিও তরীকে চমৎকার ভাবে শান্তি দেয়।

তরী যখন ছবি আঁকতে ব্যস্ত তখন কেউ তার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে ছিলো। তরী বুঝেও উঠতে পারলো না পথের সোডিয়াম আলোর নিচে এক অবয়ব দাঁড়িয়ে। সেই অবয়ব সিদাত। বিষণ্ণ চিত্তে আর ভালো লাগছিলো না দেখে সিদাত অনয়ের কাছেই আসছিলো। হঠাৎ দোতলার দিকে নজর যেতেই দেখলো সেখানে একটি মেয়ে বসে আছে। যদিও চেহারা আবছা, তবে সিদাতের কেন যেন মনে হলো এটা তরী৷ এজন্যে সে সেখানে-ই থমকে দাঁড়িয়ে রইলো। চেহারা আবছা আলোয় বোঝা না গেলেও সিদাত ভালো করেই দেখলো তার হতে কলম চলছে। হয় কিছু একটা লিখছে নয়তো ছবি আঁকছে। যেকোনো কিছু একটা হতেই পারে। সিদাত তরীর বারান্দা থেকে বেশি দূরে নয়। খুবই নিকটে।

হঠাৎ তরী সেটা রেখে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলো। অসাবধান বশত তরী অপর হাতে ধরে রাখা ল্যাম্পের আলো তরীর মুখের ওপর গিয়ে পরলো। সিদাত তরীর মোহময় মুখখানা দেখে থমকে গেলো। ল্যাম্প সরে যাওয়ার পরেও সিদাত সেদিকেই চেয়ে রইলো। মুগ্ধতার রেশ কাটছে না। মনে হচ্ছে যেন কতকাল এই মুখখানা দেখার জন্যে তৃষ্ণার্ত ছিলো। অথচ পরিচয় মাত্র সাত দিনের। সাত দিনের মধ্যে দু’দিন দেখা হয়েছে। সিদাত অনুভব করলো তার বক্ষঃস্থলের বড়ো পাথরটা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। ভেতরের দহন ধুঁয়ে সেখানে ভেজা কাঁদা – মাটির মতো অনুভব হচ্ছে।

©লাবিবা ওয়াহিদ#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [০৭]

সিদাত অনয়ের ফ্ল্যাটে এসে সারা-দিন ঘুমিয়ে কাটালো। গত রাত ঘুম হয়নি তার অস্থিরতায়। অনয় সিদাতকে ফ্ল্যাটে রেখে অফিস গেছে। মোটামুটি ভালো পর্যায়েই চাকরি করছে অনয়। অনয়ের বাবা-মাও গ্রামে থাকে। অনয় চাকরির খাতিরে শহরেই থাকছে। সে মেসে থাকতে পারতো। কিন্তু মেসের পরিবেশের কারণে অনয় মেসে যাওয়ার সাহস করেনি। এছাড়াও সিদাতের কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে।

অনয়ের ফ্ল্যাটে শুধু অনয় একা নয়, সিদাতও থাকে। অর্থাৎ দু’জন ভাগাভাগি করে আর কী। এ-কারণে দুজনেই ভাগ করে ভাড়া দেয়। সিদাত ঘুমিয়ে উঠলো দুপুর বারোটায়। কোনো রকমে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিলো। রেডি হওয়া শেষে অনয়ের ফ্ল্যাট থেকে বেরোতেই তরীর মুখোমুখি হলো। তরী সবেই দরজা খুলে বের হলো। হাতে বালতিভর্তি ভেজা জামা-কাপড়। তরী সিদাতকে দেখে অপ্রস্তুত হয়। সঙ্গে সঙ্গে মুখে ওড়না টেনে লম্বা, লম্বা পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়। আর হতভম্ভ সিদাত তখনো একই জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে রয়। ঘুম থেকে ওঠে প্রথমেই তরীর চোখ জোড়া দেখতে পেলো। দিনটা কী আজ ভালো যাবে?

আনমনে হেসে ফেললো সিদাত। পরমুহূর্তে হাসি থামিয়ে নিজের গালে আলতো করে চড় মারলো। বিরক্তিতে কপাল কুচকে মিনমিন করে বললো,
–“রাতে না ঘুমিয়ে মাথাটা পুরোই গেছে।”

সিদাত অনয়ের ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে দিলো। অনয়ের কাছে এক্সট্রা চাবি আছে। সিদাত তার চাবিটা পকেটে পুরতে পুরতে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। নামতে গিয়ে বারবার গত রাতের ঘটনা মনে পরে যাচ্ছে। তরীকে দেখে সিদাতের বিষণ্ণ মন ফুরফুরে হয়ে গেলেও এক অজানা অস্থিরতা, মুগ্ধতা সে অনুভব করছিলো। যার কারণে সে ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি।

গতকাল সিদাত অনয়কে একপ্রকার জোর করে ঘুম থেকে উঠিয়ে অস্থির চিত্তে জিজ্ঞেস করেছিলো,
–“এই অনয়। বল না, নিকাব রাণীর নাম কী?”

অনয় তখন কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে চোখ বদ্ধ অবস্থায় জড়ানো কন্ঠে বলেছিলো,
–“জানি না তো বাল! সর তো। ঘুমোতে দে।”

বলেই অনয় আবার ঘুমিয়ে পরে। আর অস্থির সিদাতের অস্থিরতা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। গতকালকের এসব কাজের জন্যে সিদাত বড্ড লজ্জিত। না জানি, অনয় আবার তাকে কী ভেবে বসে। যেভাবে বদ্ধ পাগলের মতো আচরণ করেছিলো। তবে এখন মনে হচ্ছে তরীর নাম জানার দরকার নেই। তার “নিকাব রাণী” সম্বোধনেই মেয়েটাকে বড্ড মানায়।

তরী ছাদে এসে রেলিঙের কাছে গিয়ে উঁকিঝুঁকি দিলো। এই বদ ছেলেটার সাথে এত ঘন ঘন দেখা কেন হয় তরী বুঝতেই পারে না। সিদাতের বাহিক্য রূপ দেখে মোটেও বিশ্বাস হয় না যে এই ছেলে সেদিন তারই বাসায় মাতাল অবস্থায় পরে ছিলো। “মাতাল” শব্দটা মনে এলেই তরীর নাক জ*ঘন্য ভাবে কুচকে যায়। অথচ গলার স্বর দেখো। কথা বলায় হেব্বি পটু। তরীর জানা নেই সিদাতের পেশা কী। তবে সাবিয়ার থেকে এটুকু জেনেছে সিদাত রাজনীতিতে নেই। অবশ্য রাজনীতিতে থাকলে তো আগে-পিছে ক্তু চ্যালারা থাকতো। এই লোক আবার একাই হেঁটে-খেলে বেড়ায়।

এসব নানান ভাবনা ভাবা শেষে নিচে তাকাতেই দেখলো সিদাত বেরিয়ে গেছে। তরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বালতিভর্তি জামা-কাপড় এক এক করে রশিতে টাঙিয়ে দিতে শুরু করলো। আজ অবশ্য তরী ভার্সিটি যায়নি।

——————
সিদাতের আজ বেশ তাড়া। সে বক্ষের বোতাম লাগাতে লাগাতে দ্রুত পায়ে সাইফের ঘরে ছুটলো। সাইফ কলে কথা বলছে। সিদাত চট করে সাইফের কান থেকে মোবাইলটা নিয়ে কল কেটে দিলো। সাইফ এমন অবস্থায় অস্ফুট স্বরে বললো,
–“আরেহ! আমার জরুরি কল ছিলো!”

সিদাত সেসব না শুনে বললো,
–“আমার বাইকের চাবি দাও ভাইয়া। আজ আমাএ ইমার্জেন্সি শো আছে। প্লিজ!”

সাইফ সিদাতের কথায় পাত্তা না দিয়ে বললো,
–“সাত দিনের সবে একদিন ফুরিয়েছে৷ এখনো ছয় দিন বাকি!”

সিদাত কতক্ষণ চুপ করে চেয়ে রইলো সাইফের দিকে। সাইফ সিদাতের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে আবার কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। সিদাত এই সুযোগে বিছানার পাশের ছোটো বক্সের উপর থেকে চাবিটা নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,
–“হ্যাভ এ গুড ডে ব্রাদার!”

সিদাতের হাতে নিজের গাড়ির চাবি দেখে সাইফ কথা বলা অবস্থায় উচ্চস্বরে “সিদাত” বলে ডেকে ওঠে। কিন্তু সিদাত শুনলে তো। সাইফ শূন্য দরজার দিকে চেয়ে মিনমিনিয়ে বললো,
–“আজ আমার সর্বনাশ হলো! এখন কার গাড়ি নিয়ে বের হবো? সিদাতের বাইক নিয়ে? ওহ গড!”

শো শেষ করতেই অনয়ের কল এলো। সিদাত তখন সবে আরামদায়ক চেয়ারে গা এলিয়েছে। সিদাত অনয়ের কল রিসিভ করে ভারী গলায় বললো,
–“হ্যাঁ বল।”

অনয় বললো,
–“মেয়েটার নাম বোধহয় তরী। তালা খোলার সময় শুনতে পেয়েছিলাম! কেউ যেন ডাকছিলো।”

সিদাত তড়িৎ সটান মেরে বসে। নড়েচড়ে বললো,
–“তুই না সেদিন বললি ও বাড়িতে দুটো মেয়ে। হতেও তো পারে ছোটো বোনের নাম তরী?”

অনয় ঠোঁট কামড়ে বললো,
–“হতেও পারে।”

সিদাত নিরাশ হয়ে বললো,
–“ফোন রাখ!”

অনয় চট করে বললো,
–“এই থাম। তোর মন কী খাচা ছেড়ে বেরিয়েছে নাকি বন্ধু?”

সিদাত থতমত খেয়ে বললো,
–“মানে?”

–“মানে বুঝো না? কাল থেকে নিজে অস্থির হচ্ছো সাথে আমাকেও পাগল করছো। এসব কিসের লক্ষণ আমি জানি না বুঝি?”

বলেই অনয় ফোনের ওপাশ থেকে অট্টহাসিতে ফেটে পরলো। হাসি কোনোরকমে থামিয়ে আবার বললো,
–“মন পাখি এত দ্রুত উড়ান দিবে, তা তো কল্পনাও করিনি বন্ধু। তাহলে মেনে নে, আমি-ই জিতেছি!”

সিদাত মানতে পারলো না। সে খুব রাশভারী গলায় বললো,
–“কচু জিতেছিস। একটু কিউরিওসিটিকে তুই প্রেমে রূপ দিচ্ছিস, আমি তো…”

সিদাতকে মাঝপথে থেমে যেতে দেখে অনয় ঠাট্টা করে বললো,
–“আমি তো কী? বল বল!”

সিদাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
–“বন্ধুত্ব করতে চাই। আর কিছু না!”

——————–
তরী দীর্ঘক্ষণ চারুকলার ক্লাসরুম গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মোটা একটি বই বক্ষে জড়িয়ে নির্নিমেষ চেয়ে আছে সেই ক্লাসগুলোতে। নির্বাক, হতাশায় ভরপুর চাহনি। চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা কাঁধে ঝুলিয়ে এবং হাতে সরঞ্জাম নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছে। তাদের মধ্যে কারো, কারো হাতে রঙ লেগে আছে। তরী সেসবই পর্যবেক্ষণ করলো। ভেতরটা কেমন শূন্য, শূন্য লাগছে। যেন মেঘ জমছে। তরী চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে এলো। মাঠের এক পাশ কাটিয়ে যেতেই কিছু মেয়ের হাসা-হাসি শুনতে পেলো। মেয়েগুলো ছেলেদের গায়ে ঢলে পরছে। তরীর এতে গা গুলিয়ে এলো। একে তো ছেলেদের মতো পোশাক পরেছে, কোনোরকম লজ্জাবোধ নেই। তার উপর পরপুরুষের স্পর্শে নিজেদের স্মার্ট দাবী করে। যা সত্যি-ই তরীর কাছে ভীষণ অপছন্দের।

তরী বুঝতে পারলো ওদের হাসা-হাসি তাকে নিয়েই। আজ নতুন না, প্রায়-ই ওরা তরীকে নিয়ে হাসা-হাসি করে। তার পর্দা, বোরকা নিয়ে বিদ্রুপ করে, বিশ্রী কটাক্ষ করে। যা তরীকে ভীষণ রকম বিব্রত করে। তরী তাদের পাশ কেটে গেলে-ই একটা মেয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বলে,
–“ওই দেখ, আমাদের হালাল আপা যাচ্ছে। সালাম আপা, আপনার জন্যে বোরকাময় শুভেচ্ছা।”

ছিঃ। কতটা বিশ্রী এবং নিচু তাদের মানসিকতা। তরী তখনো এসব নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয় না। তর্ক করা তরীর স্বভাবে নেই। সে নীরবে আজীবন বলে গেছে, “ব্যবহারে বংশের পরিচয়।”
তারা তাদের অসভ্য আচরণকে প্রতিনিয়ত সভ্য বলে আখ্যায়িত করছে। তবে তরী এবারও কিছু বললো না। চলে আসলো। এই মেয়ে দুটো জ্বালাতন করছে গত বছর থেকে। প্রথম বর্ষে কোনো ঝামেলা হয়নি। দ্বিতীয় বর্ষের মাঝামাঝিতে মেয়ে দুটো তরীর পাশে এসে বসেছিলো। এবং কোনো ভণিতা ছাড়াই বলেছিলো,
–“এইযে, তোমার মুখের ওই নিকাবটা খুলো দেখি। তোমাকে দেখবো। কী লুকাচ্ছো আমাদের থেকে?”

ব্যাপারটা ভীষণ অস্বস্তিকর এবং বিব্রতকর ছিলো। তরী সামনে তাকিয়ে দেখেছিলো দুটো ছেলে অদ্ভুত নজরে তার দিকে চেয়ে আছে। তরী গত দেড় বছরে বুঝে গিয়েছে মেয়ে দুটোর স্বভাব-চরিত্র। এজন্যে সেদিন তরী কোনো উত্তর না দিয়ে ব্যাগ নিয়ে অন্য সিটে গিয়ে বসে পরে। সেই ব্যাপারটা তাদের ভাষায় “ইগো”-তে গিয়ে লেগেছে। এজন্য সেই সময় থেকে এখন অবধি তারা নানান ভাবে তরীকে ছোটো করার চেষ্টা করে।

তরী ভার্সিটির বাইরে আসতেই সিদাতকে দেখতে পেলো। পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে। তরী হতবাক। সিদাত তরীর দিকে চেয়ে চমৎকার হাসি দিয়ে বললো,
–“তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম নিকাব রাণী! তোমার কী এক মিনিটের সময় হবে?”

তরী চোখ পাকিয়ে চাইলো সিদাতের দিকে। সিদাত চাহনিতে একরাশ ব্যাকুলতা ফুটিয়ে তুলেছে। তরী চোখ নামিয়ে সিদাতকে অগ্রাহ্য করলো। সিদাতকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিতেই সিদাত “তরী” বলে ডাকলো। তরী থমকালো। সবার্ঙ্গে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো। তরী যেন একদমই আশা করেনি সিদাত তার নাম ধরে ডাকবে। তরীকে থমকে যেতে দেখে সিদাতের বুঝতে বাকি রইলো না নিকাব রাণীর নাম “তরী!”

এই কয়েক দিনে সিদাত তরীর নীরব ভাষা বুঝতে শিখেছে৷ নিজের অজান্তেই। তরীকে থেমে যেতে দেখে সিদাত এক মুহূর্ত দেরী না করে প্রস্তাব দিলো,
–“আমার নীরব বন্ধু হবে নিকাব রাণী?”

~[ক্রমশ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here