হৃদয় এনেছি ভেজা পর্ব -০৪+৫

#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [০৪]

–“নিকাব রাণী?”
অস্ফুট স্বরে আওড়ালো সাবিয়া। সাবিয়ার চোখ-মুখ জুড়ে অস্বাভাবিক বিস্ময়। যেন সে বিশ্বাস-ই করতে পারছে না। তরী তখন এসাইনমেন্ট করতে ব্যস্ত। সাবিয়ার জবাবে শুধু অল্প স্বরে “হুঁ” বললো।

সাবিয়া তার পড়া ছেড়ে উঠে এসে তরীর সম্মুখে বসলো। অতঃপর বললো,
–“ওই ভাইয়াটা তোমাকে এই নামে ডাকলো কেন আপু? আমার কাছে তো বড্ড অস্বাভাবিক লাগছে। কেমন অদ্ভুত নাম। এই নামগুলো তো মানুষ তাদের প্রিয়জনকে সম্বোধন করে। তবে কী…”

তরী চোখ রাঙিয়ে চাইলো সাবিয়ার দিকে। সাবিয়া এতে অপ্রস্তুত হয়। মিনমিনিয়ে বললো,
–“ভুল বুঝো না আপু। আমি এমনি এমনি-ই বলেছি!”

–“এবারই শেষ। আর যেন এসব না শুনি সাবিয়া। যা হয়েছে বলেছি। পরবর্তীতে এসব মুখেও আনবি না!”

সাবিয়া মুখটা ফ্যাকাসে করে মাথা নাড়ালো। অতঃপর আবার বিছানা ছেড়ে চেয়ারে গিয়ে বসলো। তরীর এসাইনমেন্ট করতে গিয়ে সেই মুহূর্তের কথা মনে করলেও সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুপি আসলেন হাতে মোবাইল নিয়ে। মোবাইল থেকে চেনা, পরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে আসছে। সাবিয়া এবং তরী চটজলদি মাথায় ওড়না জড়ালো। ফুপি মুখে টানা হাসি দিয়ে বললো,
–“নেন ভাইজান। আপনার মায়েদের সাথে কথা বলেন।”

সাবিয়া পড়া ছেড়ে তরীর পাশে গিয়ে বসলো। তরী হাতে মোবাইল নিতেই দুই বোন একসাথে সালাম দিয়ে উঠলো। ফোনের ওপাশ থেকে আকবর সাহেব সালামের উত্তর নিয়ে কুশল বিনিময় করলেন মেয়েদের সাথে। তরী বললো,
–“নবীর দেশে গিয়ে আপনাকে বড্ড স্নিদ্ধ লাগছে আব্বা।”

আকবর সাহেবের অধরে তৃপ্তির হাসি ফুটলো। চোখে জ্বলজ্বল ভাব ফুটিয়ে বললো,
–“তাই নাকি মা? আমি বড়োই ভাগ্য নিয়ে জম্মিয়েছি যে আমার আল্লাহ্’র ঘর আমি ছুঁতে পেরেছি। পবিত্র বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েছি। এ আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। তা তোমরা বলো। কেমন আছো? কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?”

তরী অধরে হাসি ফুটিয়ে বললো,
–“না আব্বা। আমরা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ফুপি তো সবসময় আছে-ই।”

–“যাক, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ্’র ভরসায় তোমাদের রেখে এসেছি। তিনি-ই রক্ষা করার মালিক।”

সাবিয়া পাশ থেকে বললো,
–“আম্মা কোথায় আব্বা?”

আকবর সাহেব বললেন,
–“একটু ওয়াশরুমে গিয়েছে। ওই দেখো, ফিরেছে!”
এরপর মায়ের সাথেও কতক্ষণ গল্প করলো ওরা। এর মাঝে সৌদিতে এশারের আযান দিয়ে দিলো। তাই আকবর সাহেব কল কেটে দিলেন। কল বিচ্ছিন্ন করার আগে বলেছেন, শীঘ্রই ফিরবেন তারা।

————————–
সিদাত বাড়ি ফিরে বাবার সাথে-ই খেলো। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সিদাত নিজের রুমে না গিয়ে অন্য এক রুমে এলো। রুমটিতে হালকা আলো জ্বলছে। নিভু নিভু আলো৷ সিদাত বিছানার কোণায় এক ছায়া মূর্তি দেখলো। সিদাত তার দিকে চেয়ে লাইট জ্বালালো। ছায়ামূর্তিটি আঁতকে উঠে পিছে ফিরে চাইলো। সিদাত তাকে দেখে হালকা হাসলো। ফিরোজা খাতুন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বিছানায় আরেকজনকে দেখা যাচ্ছে। সে শয্যাশায়ী। সিদাত শুকনো হাসি দিয়ে বললো,
–“এভাবে আঁধারে না থেকে আলো জ্বালিয়ে-ই তো মায়ের সাথে কথা বলতে পারেন ছোটো মা!”

ফিরোজা খাতুন অপ্রস্তুত হলো। একপলক সিদাতের মায়ের দিকে চেয়ে বললো,
–“আমার আঁধারে-ই ভালো লাগে আব্বু। তুমি বসো। আমি যাচ্ছি!”

সিদাত একপলক তার মায়ের দিকে চেয়ে বললো,
–“মায়ের খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?”

ফিরোজা আলতো হেসে বললো, “হুঁ।”
সিদাত এবার ফিরোজা খাতুনের দিকে চেয়ে বললো,
–“আপনি খেয়েছেন তো ছোটো মা?”

সিদাতের এরূপ প্রশ্নে ফিরোজা খাতুন মাথা নিচু করে ফেললো। অর্থাৎ তিনি এখনো খাননি। সিদাত ফিরোজার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো,
–“না খেয়ে রুমে যাবেন না ছোটো মা। এটা আমার অনুরোধ।”
ফিরোজা খাতুন ঘাড় কাত করে বললো,
–“তুমি যেমন বলবে।”

ফিরোজা চলে যেতে নিলে সিদাত পিছুডাক দিলো। বললো,
–“আগামীকাল সাইফ ভাইয়ার জন্যে পাত্রী দেখতে যাবেন ছোটো মা। সঙ্গে ফুপি এবং মামা যাচ্ছেন। আপনার যাওয়াটা অসম্ভব জরুরি। তাই তৈরি হয়ে থাকবেন!”

ফিরোজা থমকে গেলো। বড়ো বড়ো চোখে সিদাতের দিকে তাকালো। বিস্ময়ের সাথে বললো,
–“আমি..?”

সিদাত হাসলো। হেসে মায়ের দিকে তাকালো। মায়ের চোখ জোড়া পিটপিট করছে। সব শুনছে তার মা। সিদাত হাসি বজায় রেখে বললো,
–“কাম অন ছোটো মা। আজও এই পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন? মায়ের পরপর আপনারও অধিকার আছে এ বাড়িতে, আমাদের ওপর। অনেক তো এভাবে কাটালেন। আর কত? এখন অন্তত স্বাভাবিক হন!”

ফিরোজা খাতুন স্বাভাবিক হওয়ার বদলে আরও অস্বাভাবিক হয়ে গেলো। চোখ ফেটে অশ্রু গড়ালো তার। ছেলেটা তার পেটের সন্তান না হয়েও কতটা কাছে টেনে নিয়েছে। এ জগতে এত ভালো মানুষ কী আদৌ আছে? কই, আজ অবধি তো সাঈদ সাহেব স্বাভাবিক হলেন না। তাহলে ছেলে কেন মাটির মতো হলো? ফিরোজা খাতুন চলে গেলো। সিদাত তার মায়ের পাশে বসলো। তার মা এখন চোখ বুজে আছে।

সিদাত মায়ের এক হাত তার মুঠোতে আগলে নেয়। এই সময়টা একমাত্র তার এবং তার মায়ের জন্য বরাদ্দ। তার আর-জে হওয়ার পেছনে তার মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। মা ছোটোবেলায় সবসময় বলতো,
–“রাজনীতি ভালো নয় বাবা। রাজনীতি হচ্ছে আতঙ্কের পেশা। তোমার বাবাকে কত করে বোঝালাম কিন্তু সে রাজনীতিকে পেশা নয় নেশা বানিয়ে ফেলেছে। বড়ো ছেলেটাকেও সেই পথে হাঁটাচ্ছে। তুমি বরং আমার বলা পথে হাঁটো বাবা। তোমরা আমার প্রাণ। সব প্রাণেদের এভাবে বিপদে ফেলতে চাই না। দুনিয়াতে অনেক শান্তির পেশা আছে। তুমি শান্তির যেকোনো পেশা বেছে নাও। আমি কোনো বারণ করবো না। শুধু তুমি সুরক্ষিত থাকো।”

মায়ের কথার খুব মান্য করে সিদাত। বাবাকে সেভাবে কাছে পেত না। কিন্তু দুই ভাইয়ের পাশে মা-ই সবসময় ছিলো। ধরে ধরে সব শিখিয়েছে। নৈতিকতা শিখিয়েছে। বড়ো হওয়ার পরও দুজনের কেউ ভুল করলে কান মলে দিতো। দিনগুলো কত রঙিন ছিলো। কিন্তু একটা ঝড় এসে সব উলোট পালোট হয়ে গেলো। তার মা নিস্তেজ হয়ে পরে গেলো বিছানায়। কত চিকিৎসা করিয়েছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য।

এসব আকাশ পাতাল ভেবে সিদাত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অতঃপর মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
–“মা। তুমি চিন্তা করো না। আমি, ভাইয়া, বাবা সবাই ভালো আছি। সুস্থ আছি। বাবা জানালো আগামীকাল সাইফ ভাইয়ার জন্যে পাত্রী দেখতে পাঠাবে। দেখো, ফিরোজা মা তোমার জন্যে লক্ষী ছেলের বউ এনে দিবে। আমিও তোমার মতো লক্ষী কাউকে নিজের বউ করে আনবো। কথা দিচ্ছি মা। বাবা এবং ফিরোজা মায়ের ওপর পূর্ণ আস্থা আছে আমার!”

মায়ের তরফ থেকে কোনো জবাব এলো না। আসার নিশ্চয়তাও নেই। তাও সিদাত মায়ের সাথে কথা বলে আলাদা শান্তি পায়। সিদাতের হঠাৎ ইচ্ছে করলো গত রাতের মেয়েটির কথা জানাতে। তাই আর দেরী করলো না। বলতে লাগলো,
–“জানো মা। এক অতীব সুন্দর পরিবারের খুব পর্দাশীল মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে। গতকাল আমাকে কেউ একজন নেশা করিয়েছিলো। এরপর আমি ভুলবশত অনয়ের ফ্ল্যাটে না গিয়ে তার ফ্ল্যাটে ঢুকে পরি। জানো, অনয় বলেছে সেই মেয়ে নাকি আমায় ছুঁয়েও দেখেনি। আমি অচেতন হয়ে মেঝেতে পরে ছিলাম। ভাবতে পারছো? আজ যখন তাকে নামহীন ডাকলাম, সে জবাব না দিয়ে চলে গেলো। এরপর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। অদ্ভুত না? সে নাকি গত রাতে অনয়কেও মুখ দেখায়নি, মুখে ওড়না দিয়ে রেখেছিলো।”

সিদাতের কথাগুলো কথা শুনতেই সিদাতের মা হঠাৎ চোখ মেলে তাকালো। সিদাত অবাক হয়ে গেলো। সে তো ভেবেছিলো তার মা ঘুমিয়ে গেছে। মা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। সিদাত মাকে সামলিয়ে বললো,
–“মা, শান্ত হও। তুমি কী রাগ করেছো কোনো অচেনা মেয়ের কথা মুখে আনায়?”

সিদাতের কথা শুনে আরও জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সিদাত মাকে ধরে ফেললো এবার৷ উৎকন্ঠা হয়ে বললো,
–“রাগ করোনি?”

সিদাতের মা হঠাৎ শান্ত হতে শুরু করলো। এর মানে সে রাগ করেনি। সিদাত তার মায়ের চোখ জোড়ায় গভীর মনোযোগ দিলো। কিন্তু কিছু বুঝতে পারছে না। সিদাতের মা প্যারালাইজড। এজন্য হাত, পা, ঘাড় নাড়ানোর শক্তি তার নেই। তবে সে শুনতে পারে, চোখ মেলে তাকাতে পারে। চারদিকে চোখ বুলাতে পারে। সিদাত মায়ের দিকে চেয়ে বললো,
–“তুমি খুশি হয়েছো?”

সিদাতের মা পলক ফেললো। এর মানে হচ্ছে “হ্যাঁ”। সিদাত অবাক সুরে বললো,
–“একদম নয় মা। একদম নয়। আমি জানি তুমি কী ভাবছো। আমি প্রেমে পরিনি। তুমি আর অনয় একদম ঠিক করছো না আমার পেছনে লেগে!”

————————
বেশ কিছু দিন পর আজ তরী সিদ্ধান্ত নিলো ভার্সিটি যাবে। এজন্য সাবিয়াকে আগে মাদ্রাসায় দিয়ে এসে বাস স্টেন্ডে এসে দাঁড়ালো তরী। বাস আসলেই সে বাসে উঠলো। বাস জিনিসটা তরীর জন্যে বড্ড অস্বস্তিকর। এখানে নানান পুরুষ মানুষ থাকে। সকলের মেজাজ, মানসিকতাও ভিন্ন। এজন্য তরীর জন্যে দম বন্ধকর অবস্থা হয়। কিন্তু সেও উপায়হীন। ভার্সিটি এদিক থেকে বেশ দূর হয়ে যায়। বাস ছাড়া সিএনজি পেলেও রিজার্ভে ভাড়া বেশি নেয়।

তরী দুটো খালি সিট পেলো। সেখানের জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসলো। পাশের খালি সিটের দিকে চেয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মনে-প্রাণে দোয়া করলো যেন কোনো মহিলাই তার পাশে এসে বসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সিদাতের সাথে বাসে দেখা হলো। পুরো বাসে একটাই সিট খালি। তাও তরীর পাশের সিট। ওদিকে হেল্পার ঠেলে ঠেলে যাত্রী বাসে ঢোকাচ্ছে। তরী মাথা তুলে তাকাতেই সিদাতকে দেখতে পেলো। সিদাত তরীর পাশে বসতেই নিচ্ছিলো ওমনি তরীর দিকে চোখ যায় সিদাতের। তরীর চোখ গুলো দেখেই সে চিনে ফেললো। অতঃপর অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
–“তুমি নিকাব রাণী না?”

তরী কিছু বললো না। বরং বিব্রত হয়ে জানালার দিকে ঘেঁষে বসলো। তরীর আচরণে সিদাত কিছু একটা আঁচ করতে পেরে বসলো না। সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তরীর পাশের সিট আগলে। তরী অবাক হয়ে চাইলো সিদাতের দিকে। তরীর বিস্ময় ভরা নজর দেখে সিদাত আলতো হেসে বললো,
–“থাক, তোমার পাশে বসে তোমায় বিব্রত করতে চাই না। এমনিতেই তুমি আমার ধন্যবাদ পাওনা আছো!”

সিট খালি দেখে দুয়েকজন বসার জন্যে এগিয়ে এলো। কিন্তু সিদাত যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ সুবিধা করতে পারছে না। এজন্যে একজন তো প্রায় বিরক্ত হয়েই বললো,
–“সমস্যা কী আপনার ভাই? নিজেও বসছেন না আবার আমাদেরও বসতে দিচ্ছেন না কেন?”

সিদাত সেই লোকটির উদ্দেশ্যে বললো,
–“সিট আমি বুকিং করেই রেখেছি। দরকার পরলে ডাবল ভাড়া দিবো। তাও আমি দাঁড়িয়েই থাকবো। আপনাদের কোনো সমস্যা?”

লোকগুলো তর্ক করলো। সিদাতও তাদের ত্যাড়া জবাব দিলো। সবকিছু তরী নীরবে দেখলো। অদ্ভুত ছেলে। তার জন্যে কী না তর্ক করছে? অবিশ্বাস্য!

©লাবিবা ওয়াহিদ#হৃদয়_এনেছি_ভেজা – [০৫]

সিদাতের সারা পথ তর্ক এবং দাঁড়ানোর মধ্যেই কাটলো। আর তরী নীরবে সিদাতের কান্ড দেখছিলো। কন্ডাক্টর সিদাতের থেকে ডাবল ভাড়া পেয়ে আর কিছু বলেনি৷ যখন তরীর ভার্সিটির সামনে এসে বাস থামে তখন তরী সন্তর্পণে বাস থেকে নেমে যায়। সিদাতও তরীর পিছু পিছু নামে। সিদাত ভার্সিটির সামনে নেমে এক গাল হেসে বললো,
–“আমার ধন্যবাদটা পুষিয়ে দিলাম।”

তরী থমকে দাঁড়ালো। পিছে ফিরে সিদাতের চোখে চোখ রাখলো। সিদাত থমকে যায়৷ চেয়ে রয় সেই আঁখিদ্বয়ে। ওই চোখ জোড়ায় কিছু একটা আছে, যা সিদাতকে চুম্বকের মতো টানে। হৃদপিন্ডের ওঠা-নামা বাড়িয়ে তোলে। তরী সিদাতের দিকে দুই ধাপ এগিয়ে খুবই শান্ত, শীতল গলায় বলে,

–“এক, ‘ধন্যবাদ’ নয়। আমাকে আপনার “স্যরি” বলা উচিত ছিলো। কারণ, আপনি রাত-বিরেতে আরেকজন মেয়ের ঘরে মাতাল অবস্থায় ঢুকে পরেছেন। আর দুই এত তর্কে লিপ্ত না হয়ে অন্য সিট থেকে একজন মহিলাকে আমার পাশে বসিয়ে দিতে পারতেন।”

এই কথাটুকু বলে তরী লম্বা লম্বা কদম ফেলে ভার্সিটির ভেতরে চলে গেলো। আর সিদাত হতবুদ্ধি হারিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। সিদাতকে এক্সপ্লেইন করার মতো কোনো সুযোগ-ই দিলো না তরী। কীভাবে সিদাতকে বোকা বানিয়ে চলে গেলো! সিদাত ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে রিকশা নিতে যাবেই এমন সময় দুজন মেয়ে এগিয়ে বেশ খুশি হয়ে বললো,
–“আপনি আর-জে সিদাত ফারহান না?”

সিদাত স্মিত হেসে বললো, “জি।”

মেয়ে দুজন তার সাথে ছবি তুলে চলে গেলো। আর সিদাত একটি সিএনজি রিজার্ভ করে কোথাও চলে গেলো। আজ ছন্নছাড়া হয়ে একা একা পুরো শহর ঘোরার ইচ্ছে আছে।

আজ সাইফ চাচ্ছিলো সিদাতকে তার মায়েদের সাথে পাত্রীদের বাসায় পাঠাতে। কিছু কারণ বশত সেদিন পাত্রী দেখতে যাওয়া হয়নি। পাত্রীর মা অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি ছিলো। এজন্যে সাঈদ সাহেব কিছুদিন সময় নিয়েছিলেন। সাইফ সিদাতকে সেখানে যেতে বলায় সিদাত এক কথায় না করে দেয়। সাইফ এমনিতেও প্রচন্ড জেদী এবং নাছোড়বান্দা স্বভাবের। এজন্যে সাইফ তার কোনো কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বেঁকে বসেছিলো। কৌশলে সিদাতের বাইকের চাবিও সরিয়েছে। যাতে করে সিদাত সাইফের কথা শুনতে বাধ্য থাকে। নয়তো এই বাইকের চাবি সে পুরো এক সপ্তাহেও দিবে না। সিদাতও বাইকের পরোয়া না দিয়ে ভাইয়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। এসব মেয়ে দেখতে যাওয়াতে সিদাত একদমই আগ্রহী নয়। কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়। নিজের জন্যে হলে মানা যায়, তাই বলে বড়ো ভাইয়ের জন্যে? অসম্ভব ব্যাপার।

সিদাতের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে তরীর কথাগুলো। কন্ঠ তার চোখের মতোই নরম, স্নিগ্ধ, মোহনীয়। কিছু কন্ঠস্বর আছে না, একবার শুনলে বারবার শুনতে ইচ্ছে হয়? তরীর কন্ঠস্বরও সিদাতকে সেরকম অস্থির করে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি মাত্রায় অস্থিরতা কাজ করছে তরীকে উত্তর দিতে না পারায়। এজন্যে সিদাত পকেট থেকে ফোন বের করে হাতে নিলো। মোবাইলের নোট প্যাডে গিয়ে নিজে নিজেই উত্তর লিখলো,
–“এইযে, নিকাব রাণী। তুমি তো আমায় ভুল বুঝলে। বাসে তখন খুব ভীড়। এমন অবস্থায় কোনো মহিলাকে অনুরোধ করে আমার সিটে বসতে বললে হয় আমার সিট অন্য জনের দখলে চলে যেত নয়তো সেই মহিলার সিট। তাহলে লাভের লাভ কী হতো? কিছুই না। তার চাইতে বরং সিট খালি থাকুক, আমিও নাহয় দাঁড়িয়ে-ই থাকবো। আর সে-রাতে আমার হুঁশ ছিলো না। স্ব-জ্ঞানে এই ধরণের কাজ আমি কখনোই করতাম না। তবে তুমি যদি চাও, ঠিক আছে তাহলে আমি ‘স্যরি’। স্বল্পভাষী নিকাব রাণী!”

এটুকু টাইপিং করে ক্ষান্ত হলো। চেপে থাকা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলে আবার সেই লেখাগুলো কেটে দেয় সে। ফোনে বারবার সাইফের কল আসছে। সিদাত চুপ করে দেখে ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিলো।
সিএনজি ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো,
–“কোথায় যাবেন স্যার?”

সিদাত সিটে পিঠে এলিয়ে বাইরে চেয়ে আনমনে বললো,
–“চলতে থাকুক সিএনজি। আজ শহর ঘুরতে ইচ্ছে করছে।”

————————–
সাঈদ সাহেব চোখে চশমা পরে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছেন। তার সামনের মূর্তির মতো বসে আছে সাইফ। হাত দুটো মুঠিবদ্ধ করে হাঁটুর কাছে শক্ত করে চেপে বসে আছে। পা জোড়া কাঁপছে কেন যেন। বাবার ভয়েই বোধহয়। সাঈদ সাহেব মুখখানা যেরকম গম্ভীর করে আছে, তাতে সাইফ কিছুটা দমে আছে। মিনিট পাঁচেক পরপর সাঈদ সাহেব পত্রিকা রেখে চোখের চশমা খুললেন। সাইফ সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা নড়েচড়ে বসলো। সাঈদ সাহেব হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
–“বিয়ে নিয়ে তোমার কোনো আপত্তি আছে সাইফ?”

সাইফ আমতা আমতা করে বললো,
–“না, বাবা। নেই। তবে..”
সাইফ থেমে গেলো। সাঈদ সাহেব ডান দিকে মাথা মৃদু এলিয়ে ভ্রু কুচকে চাইলো ছেলের দিকে। অতঃপর থমথমে গলায় বললো,
–“তাহলে? কাউকে পছন্দ করে রেখেছো?”

সাইফ তাতেও “না” জানায়। সাঈদ সাহেব বললেন,
–“সব ঠিক থাকলে মাঝে আবার “তবে” আসে কেন? কেন এমন আচরণ করছো? অবশ্যই সত্য বলবে। তুমি জানোই, আমি মিথ্যে পছন্দ করি না।”

সাইফ বিব্রত হয়ে বললো,
–“আমার বিয়েতে আপত্তি নেই বাবা। তবে আমি চাই, যাকে স্ত্রী করবো তাকে আগে আমার পছন্দ হোক, তার ব্যবহার-আচরণ সব বিবেচনা করেই আমি আমার স্ত্রী বেছে নিবো। আর কিছু না বাবা!”

সাঈদ সাহেবের মুখশ্রী জুড়ে থাকা গম্ভীর ভাব মিলিয়ে যেতে শুরু করে। তিনি আলতো হেসে বললো,
–“সেটা তো অবশ্যই আমার বড়ো আব্বু। সব দেখে-শুনেই তোমার স্ত্রী নির্বাচন হবে। চিন্তা করো না। এখন বড়ো’রা যা করছে তা করতে দাও। সিদাতকে এদিকে টেনো না। ও তোমার ছোটো। তবে মনে রেখো, তোমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছুই হবে না। সব তোমার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। তোমার বিয়েটা তোমার মায়ের ইচ্ছেতে হচ্ছে। তাই মাকে নিরাশ করো না!”

শেষ কথাগুলো বলে সাঈদ সাহেব চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বাবার কথা শুনে সাইফ কিছুটা দমে গেলো। অধরে অধর চেপে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থেকে বললো,
–“বাবা, আমি আসছি!”
সাঈদ সাহেব অনুমতি দিলেন। সাইফ সোজা চলে গেলো তার মা অর্থাৎ জয়ার ঘরে। সাঈদ সাহেব ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে আপনমনে শুধালো,
–“কেন আমাকে প্রতিনিয়ত পোড়াচ্ছো জয়া? আমি তো তোমাকে নিয়েই দিব্যি ছিলাম। তাহলে তুমি কেন আমায় তোমার থেকে দূরে সরিয়ে দিলে? ফিরোজাকে আর ঠকাতে পারছি না। কাঁধে থাকা পাপের বোঝা দিনকে দিন ভারী হচ্ছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। একটুও বুঝলে না তুমি আমাকে? আমাকে বাধ্য করলে আগুনে ঝাপ দিতে! কেন?”

————————
রাজনীতি নিয়ে তরীর মামা রাজিবের খুব বেশি-ই আগ্রহ। তার ফেসবুক ভর্তি বিভিন্ন নেতাদের ব্যানার ছবি দিয়ে। সে বোধহয় ফেসবুক চালানো শিখেছেই এসব কীর্তি করার জন্য। সুদূর জামালপুর থেকেও সাঈদ সাহেবকে নিয়ে তার ভীষণ চর্চা। সাঈদ সাহেবের বড়োই অন্ধভক্ত সে। সাঈদ সাহেব এবং তার দুই ছেলের প্রসংশা বার্তা সবসময় তার ঠোঁটে ঝুলে থাকে। যখন তখন যার তার সাথে সেসব ছেড়ে দেয়। তরী মামাকে নিয়ে মনে মনে ভীষণ বিরক্ত। ফেসবুকে প্রবেশ করলেই মামার ওসব আপলোড করা ব্যানারের ছবি চোখের সামনে ভাসবে। কখনো না দেখা সিদাতকেও মামার এসব ছবির মাধ্যমেই দেখেছে। তবে বিরক্তির ব্যাপার এটা না। ব্যাপার হচ্ছে যতবার আপলোড করবে ততবার তরীকে মেসেজ করে বলবে,
–“ভাগনি, সুন্দর করে লাইক মেরে আসো তো। আমি পুস্ত দিছি!”

পোস্ট বানানটা সবসময় “পুস্ত” লেখা থাকে। মামা গুরুজন মানুষ। তরী চাইলেও তাকে এড়িয়ে চলতে পারে না, তার অবাধ্যও হতে পারে না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই মামার বদ্ধ পাগলামি সে নীরবে গিলে নেয়। এখনো একই ভাবে গিলে নিলো। আজকের ব্যানারে সাইফ রয়েছে। সাবিয়া তো মাঝেমধ্যে মামার লেখা ভুলভাল বানান পড়ে খুব হাসে। যখন আবার শুদ্ধ বানান দেখা যায় তখনও সাবিয়া হেসে হেসে বলে,
–“নির্ঘাত এগুলা মৌসুমি আপু টাইপ করেছে।”

তরী চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মৌসুমি মামার একমাত্র মেয়ে। বড়ো ছেলে একজন ছিলো। কিন্তু কোনো এক মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। যেদিন ছেলে পরিবার ছাড়লো সেদিন-ই মামা রাজিব ঘোষণা দিলো, আজ থেকে তার কোনো ছেলে নেই। তার ছেলে মৃ*। মৌসুমি আপু এখন বিয়ের উপযোগ্য। মামাও তাই পাত্র খুঁজতে ব্যস্ত।

©লাবিবা ওয়াহিদ
~[ক্রমশ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here