হৃদয়_হরণী পর্ব ২+৩

@হৃদয় হরণী
#পর্ব_০২_০৩
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

আলো নিজের সেলফোন নিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালো।এখন একমাত্র হৃদয়ই পারে তাকে সামলাতে।চক্ষে জল নিয়ে আলো কল লিস্টের প্রথম নাম্বারটিতে ডায়াল করলো।দু বার রিং হতে ওপাশে রিসিভ হলো।

আলোর উদ্দেশ্য সে বললো,”হ্যালো,বল আলো।”

বন্ধুর কন্ঠস্বর শুনে আলো উত্তরহীন কাঁদতে লাগলো।কান্নার শব্দ শুনে হৃদয় ঘাবড়ে গিয়ে বললো,”আলো,তুই কাঁদছিস কেন?কী হয়েছে?”
-“হৃদয়…ও”

কান্নার বেগ এতো বেড়ে গেল যে আলো কথা বলতে পারছে না।ওদিকে হৃদয় কী হয়েছে জানার জন্য চটপট করছে।ঠোঁট কামড়ে আলো এক নিঃশ্বাসে বললো, “স্বার্থক আবার বিয়ে করেছে।”
-“কিহ?মাথা ঠিক আছে তোর?”
-“ঠিক বলছি আমি।”

আলো কেঁদেই যাচ্ছে।বান্ধবীর এমন কথায় হৃদয় বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।স্বার্থক-আলোর প্রেমকাহিনী এখনও কলেজে সবার মুখে মুখে।স্বার্থক কী করে এমনটা করতে পারে?

নিজের আশ্চর্য হওয়া থামিয়ে হৃদয় প্রশ্ন করলো,”স্বার্থক না অফিসের ট্যূরে বান্দরবান গেল?তাহলে বিয়ে?”
-“জানিনা আমি কিছু হৃদু।”

আলোর কান্না থামার নাম গন্ধ নেই।হৃদয় আবার প্রশ্ন করলো,”তোদের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিলো কোনো কিছু নিয়ে?বা টের পেয়েছিস স্বার্থক অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে?”
-“সব ঠিক ছিল।এমনকি ও এক সপ্তাহ আগে ট্যূরে যাওয়ার সময়ও।কী হয়ে গেল হৃদু..”
-“স্বার্থক তোকে কিছু বলেনি?”
-“নাহ,উল্টো মেয়েটার জন্য আমার শাড়ি নিয়ে গেল।”

হৃদয় বলার মতো কোনো শব্দ খোঁজে পেল না।তার ভাবতে হবে,প্রচুর ভাবতে হবে।কী করে স্বার্থক এমনটা করলো?কৈফিয়ত তো স্বার্থককে দিতেই হবে।

ভাঙ্গা স্বরে হঠাৎ আলো বলে উঠলো,”আমি কী করবো হৃদু?আমার বাবার বাড়ির দরজা তো দু বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।আমি কোথায় যাবো?”

গালে লেগে থাকা অশ্রু মুছে পাগলের মতো আলো বললো, “শুন হৃদু…আমি না আমি সুইসাইড করবো।তখন..তখন,”
-“পাগলামো বন্ধ কর আলো।তুই ব্যাগ গুছিয়ে নেয়,আমি নিতে আসছি তোকে।দুপুরে খেয়েছিস?”

ক্রন্দন নিয়েই নিচু স্বরে আলো উত্তর দিলো,”নাহ।”
-“যাহ,কিছু খেয়ে নেয়।আর প্লিজ নিজের অভিমানকে এক পাশে রেখে স্বার্থক কিছু বলতে চাইলে শুনিস।হুট করে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কোনো রিজন অবশ্যই থাকবে।”

আলো কিছু না বললো না।চারপাশের সবকিছু বিষাদ লাগছে তার।সবই অন্ধকার তার জন্য।আর যাই হউক,স্বার্থকের সাথে কথা বলতে পারবে না সে।
.
নুপূর তার শ্বাশুড়ির সাথে খেতে এলো।টেবিলে নিঃশব্দে খাবার খাচ্ছিলো স্বর্ণা।বাকি আর কাউকে নুপূর আশে-পাশে দেখতে পেলো না।স্বর্ণার পাশের চেয়ারটাই নুপূর বসে পড়লো।এখন আপাতত পেটকে শান্তি করতে হবে।কিন্তু অচেনা পরিবেশে এভাবে খেতে নিজেকে কেমন বেহায়া লাগছে।তবে আসমা সিদ্দিকা অতি আদরেই তার ভাতের প্লেটে মাংস তুলে দিচ্ছে।

এমন যত্নে তাকে কোনোদিন কেউ খাইয়ে দেয় নি।সে জানে আসমা সিদ্দিকা তার রুপ দেখেই এত আদর করছে কিন্তু যখন জানবে স্বার্থক বাবু তার সাহায্য করেছে মাত্র!তখনই হয়তো বাড়ি থেকে বের করে দিবেন।কত অদ্ভুত চরিত্র রয়েছে এই ধরণীতে!

খেতে খেতে নুপূরের এক পর্যায়ে আলোর কথা মনে পড়লো।ঐ মেয়েটা নাকি তার সতিন!অথচ আশ্চর্য নুপূর তাকে মোটেও সতিন ভাবতে পারছে না।তার কারণ কী?কারণটা হয়তো স্বার্থক বাবুকে সে নিজের স্বামীর আসন দিলেও মনের কোণে রাখেনি।স্বার্থকের জন্য তার মনে সম্মান ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি নেই।সন্তান জন্ম দিয়েই যে নুপূর হওয়ায় নিরুদ্দেশ হবে!কী করে জগৎ সংসারকে বুঝাবে সে এ কথা?

নুপূরের খাওয়া শেষ হলে তার শ্বশুর উপস্থিত হলো।নুপূর তাতক্ষণাত ঘামতে শুরু করলো।এই মানুষটাকে সে বড্ড ভয় পেয়েছে।স্বার্থকের মতো অত বড় ছেলে কীভাবে চড় মারলো!বাই চান্স তিনি নুপূরকেও মেরে তাড়িয়ে দিবেন নাতো!

এমন অদ্ভুত চিন্তা আসায় নুপূর নিজেকে কিছুক্ষণ বকা দিলো।তার শ্বশুর কারো সাথে কথা না বলে চুপচাপই বেরিয়ে গেলো।পেছন পেছন স্বার্থকও বেরিয়ে যেতে চাইলে তার মা থামিয়ে দিয়ে বললো,”কোথায় যাচ্ছিস আব্বা?এই গরমে কোথাও বের হতে হবে না।”
-“মা তুমি একই কথাটা বাবাকে বলে থামাতে পারলে না?”
-“আমি কেন থামাবো?যে যাওয়ার সে এমনিই যাবে।”

স্বার্থক তার মায়ের চেহেরার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না।রাগ হচ্ছে তার মায়ের উপর!কেন হচ্ছে নিজেও জানে না।তার মায়ের উপর কৃতজ্ঞ হওয়া উচিৎ।কারণ মাও যদি বিয়ের বিপক্ষে যেত তাহলে বাড়ি থেকে,আলোর কাছ থেকে বহু দূরে সরে যেতে হতো।যা সে কখনই পারতো না।

স্বার্থক তার ছোট বোনকে প্রশ্ন করলো,”আলো কোথায় দেখেছিস?”
-“ছাঁদে গিয়েছিল ভাবি।”

স্বার্থক ছাঁদে যাওয়ার জন্য ঘাড় ঘুরাতে আলোকে দেখতে পেলো।আলো তাকে দেখেও উপেক্ষা করে রুমে চলে গেলো।স্বার্থকের চেহেরাটা তার চক্ষে কাঁটার মতো ফুটছে।
.
-“আলো তুমি ব্যাগ গোছাচ্ছো কেন?”
-“হৃদয় আমাকে নিতে আসছে।”
-“পাগল হয়ে গেছ তুমি?”
-“আমি পাগল হয়েছি?আমি?আগে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে নিজেকে প্রশ্নটা করো।”
-“আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?”
-“লজ্জা করছে না তোমার স্বার্থক?প্রথম স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আবার বিয়ে করলে আর এখনও আমার সাথে ইমোশনাল কথা বার্তা বলছো?ছিঃ।ঠিক আছে;তোমার প্রশ্নের উত্তর শুনো-তুমি যখন আরেকটি বিয়ে করে বাসায় তুলতে পারো তাহলে আমিও তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি।”
-“আলো আমি পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছি।বিয়েটা করতে চাইনি….”
-“স্বার্থক প্লিজ,আমাকে একা থাকতে দাও।তুমি চলে যাও রুম থেকে।জাস্ট লিভ মি এ্যলং!”

আলো এক প্রকার ঠেলেই স্বার্থককে রুম থেকে বের করে দিলো।এখন স্বার্থক ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল শুরু করবে।ফলে আলো গলে যাবে আর কান্না করবে।সে কিছুতেই চাইছে না স্বার্থকের সামনে চোখের জল ফেলতে।তার থেকে কিছু শুনতে চায়না এখন।সবসময় স্বার্থক ভুল করে আর আলো তা মেনে নেয়।এজন্য পরে দেখা যায় বিষয়টি নিয়ে সে অনুতপ্ত নয়।কিন্তু এবার স্বার্থক কী করলো এটা?ও কী জানে না নারীর কাছে তার স্বামী অমূল্য সম্পদ।কোনো নারীই পারে না ভালোবাসের ভাগ কাউকে দিতে।স্বার্থক কী করে এমনটা করতে পারলো?আলো কিছুতেই পাত্তা দিবে না তাকে।অনুশোচনা হউক তার মধ্যে।

অনুশোচনা!এই অনুশোচনাই মানুষের খারাপ কর্মের বড় শাস্তি।যতই আইন,কঠোর শাস্তি হোক না কেন ব্যক্তির মধ্যে প্রথমে অনুশোচনা হতে হয়।তাহলে সে নিজে অনুতপ্ত হয়ে সারাজীবন কাঁদতে কাঁদতে কাটিয়ে দিবে।

.
আলো কাপড়-চোপড় ব্যাগে ভরে হৃদয়ের অপেক্ষা করতে থাকলো।খিদে তার একটুও পাইনি।বরং মনেই নেই কিছু খাওয়ার কথা।মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে।”স্বার্থক কেন দ্বিতীয় বিবাহ করলো?” সে তো সবসময় বলতো তার হৃদয় হরণী একমাত্র আলো।তাহলে এখন নুপূরকে কেন বিয়ে করলো?

নাহ!সব পুরুষই এক।তার নিজের বাবাও দুটো বিয়ে করেছে।তার মা মারা যাওয়ার দু বছর পরই অন্য এক মহিলাকে ঘরে আনেন।পরিচয় করিয়ে দেন,”আলো,উনি তোমার মা।”

আলো টের পাই বাবা’র প্রতি ঘৃণাটা তার সেদিন থেকে শুরু হয়।কিন্তু সাত বছরের মেয়েটি আস্তে আস্তে বড় হয়।সে বুঝতে পারে বাবা যে মহিলাকে বাড়িতে এনেছিল তিনি তার মায়ের জায়গায় ভাগ বসিয়েছে।এমনটা নয় যে মহিলাটি খারাপ কিন্তু ভালোও নয়।আলোকে কষ্ট দেয়নি,অন্য সৎ মায়ের মতো অত্যাচার করেনি কিন্তু আদরও করেনি।আলো একা বড় হয়েছে।একা জগতে বাঁচতে জানে।কিন্তু মাঝপথে স্বার্থকই তার সঙ্গী হলো।কী দরকার ছিল?

এত কাঁদার পরও কান্না শেষ হয়না কেন?কোথায় জমা থাকে এত কান্না?ওমনি ইমোশনে একটু আঘাত হলেও হুর হুর করে বেরিয়ে পড়ে।অসহ্য!

আলোর কর্ণের ভেসে আসলো হৃদয়ের কন্ঠস্বর।সে নিজের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এলো।আবারো মুখোমুখি হলো স্বার্থকের।আলো মুখ ফিরিয়ে নিয়ে হৃদয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।হৃদয় হলো তার খুঁটি।

হৃদয় এতক্ষণ স্বার্থকের সাথে কথা বলছিলো।শেষে বললো,”স্বার্থক,আলো কিছুদিন আমার ওখান থেকে ঘুরে আসুক।ওর মাথা ঠিক নেই এখন।”

চেহেরা শুকনো করে রাখলো স্বার্থক।আলোকে থামানোর কোনো রাস্তা তার জানা নেই।এতক্ষণ রেগে ছিলো আলো উপর আর এখন প্রচুর রাগ হচ্ছে তার নিজের উপর,নুপূরের উপর।

স্বার্থক আমতা আমতা করে আবারো বললো,”হৃদয়,তোমরা সবাই আগে প্লিজ জানো আমি বিয়েটা কেন করলাম।আমি আলোকে কতটা ভালোবাসি তোমরা জানো না?”
-“জানি বলেই তুমি এখনো বাড়িতে আছো।প্রথম স্ত্রীর মত না থাকলে ২য় বিয়ে করাটা আইন এবং ইসলাম দু’দিকেই অপরাধ।”

স্বার্থক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।এখন বাড়ির কাউকে কিছু বুঝানো যাচ্ছে।পরিস্থিতি অতন্ত্য বিগড়ে গেছে।তাই বলে আলোও?আলোও তাকে ভুল বুঝবে?কত বিশ্বাস ছিল দু’জনের সম্পর্কে!স্বার্থক একগুঁয়ে।সে ঠিক করেছে বাড়ির সবাইকে বিয়ের ব্যাপারে খুলে বলবে রাতে কিন্তু আলোকে জানাবে না।আলো তাকে অবিশ্বাস কেন করলো?

হৃদয়ের সাথে আলো বেরিয়ে গেলে স্বার্থক তাদের দিকে চেয়ে রইল।এই আলো তো সেই না যে তার অভিমান!তার বেঁচে থাকার কারণ!সোনার সংসার ছিল তাকে।প্রতিটি মুহুর্ত ছিল আনন্দে ভরা।তার কানে বাজছে আলোর হাসির আওয়াজ।সেই সাথে দুপুরের কান্নার আওয়াজ!মেয়েটা কেঁদেছে,তার কারণে কেঁদেছে।অথচ স্বার্থক কথা দিয়েছিলো তার চোখে কখনো জল আসতে দিবে না।

স্বার্থকের সব রাগ গিয়ে পড়লে নুপূরের উপর।নুপূরের জন্য আজ সব কিছু হলো।না মেয়েটা তার সামনে আসতো আর না এত কিছু হতো…।নুপূরের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,”তোমার জন্য জাস্ট আমার লাইফ হ্যাল হয়ে গেল।ষ্টুপিড গার্ল!”
.
স্বার্থক এটুকু শুনিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলো।আর নুপূর..সে হাটু গেঁড়ে বাগানে বসে কাঁদতে লাগলো।কান্না তার আজীবনের সঙ্গী।আল্লাহ কেন তার জীবনটা নরকে পরিণত করলো?সে যার জীবনেই যায় যেখানে কালবৈশাখী চলে আসে।সে কাঁদছে স্বার্থকের রাগ দেখানোর জন্য নয় কাঁদছে আলোর জন্য,স্বার্থকের জন্য।এ জীবনে আর যাই হউক আলোকে সে স্বার্থকের কাছে ফিরিয়ে আনবে।

নুপূর বিয়ে নামক সম্পর্কে পরিচিত মাত্র আর আলো বিয়ে নামক সম্পর্কে বেঁচে থাকা,ভালোবাসা!

(চলবে)

বি.দ্র:ভুলক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, বানান ভুল ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন🌼

@হৃদয় হরণী
#পর্ব_০৩
#লেখিকা_নুসরাত_জাহান_নিপু

নুপূর বাড়িতে ঢুকতে স্বর্ণা তার সেলফোন এগিয়ে দিলো।নুপূর বুঝলো না সে স্বর্ণার ফোন নিয়ে কী করবে?স্বর্ণাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে ফোন থেকে শব্দ হয়,”হ্যালো,নুপূর?”

নুপূর বুঝতে পারে তার সাথে কেউ কথা বলতে চাইছে।সে হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিয়ে কানে লাগালো।তখন ওপাশ থেকে কেউ একজন বললো,”নুপূর,আপনার সাথে আমি পার্সোনালি কিছু কথা বলবো।আশা করি আপনি শুনবেন।”

ছোট করে নুপূর ‘হু’ বললো।সে জানে ওপাশের ব্যাক্তি কে?তবুও সে জানতে চায় কী বলবে ব্যাক্তিটি?
.
এত গরমেও আলোর হঠাৎ ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো।জ্বর আসার লক্ষণ এটি।মাথা থেকে সে সার্থককে সম্পূর্ণ রুপে বের করতে চাইছে অথচ মাথা থেকে ভাবনা সরছেই না।সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেজেতে।তার মনে পড়ছে সেই দিনের ঘটনা যেদিন সার্থক তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়।

কলেজের ক্লাস শেষ করে আলো আর হৃদয় আসছিলো।তখন সার্থক এসে বলে,”হৃদয়,আলোকে বাসায় আমি ড্রপ করে দিবো।তুমি চলে যাও।”

সার্থকের এমন কথায় আলো-হৃদয় দুজনে বেশ অবাক হয়।কিন্তু সার্থকের সাথে ভালো বন্ধুত্ব থাকাই না করতে পারেনি।তার বাইকে করে বাসার উদ্দেশ্য রওনা হলে সার্থক মাঝপথে বাইক থামিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যায়।হঠাৎ গাড়ি থামাতে আলো নেমে সার্থকের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়ায়।তখন হুট করে সার্থক বলে বসে,”আই লাভ ইউ।”

সার্থকের এমন কথায় আলো ভ্যাবাচেকা খেল।সে প্রশ্ন করে,”মানে কী?”
-“অর্নাসে পড় তুমি অথচ আই লাভ ইউ’র মানে বুঝো না?”
-“বুঝবো না কেন?আমাকে কেন বলছো?”
-“যাকে ভালোবাসি তাকে আই লাভ ইউ বলবো না তো কাকে বলবো?”

আলো আগেই ধারণা করেছিল সার্থক তাকে ভালোবাসে।নারীর তৃতীয় চক্ষু খুবই কার্যকরী।তারা আগে থেকে আন্দাজ করতে পারে কোন ছেলের কী উদ্দেশ্য!

আলো উত্তরে কিছু বলেনি।ঠোঁট কামড়ে হাসি থামাতে ব্যস্ত সে।তা দেখে সার্থক রেগে বললো,”তোমার মজা মনে হচ্ছে?”

এ কথা শুনে আলো হাসি থামাতে পারলো না।খিলখিল করে হাসতে হাসতে বাইকে হেলান দিয়ে বললো,”সরি সরি,তোমার প্রপোজাল দেখে না হেঁসে পারছি না।”

সার্থক গাল ফুলিয়ে বাইকের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।আলো একসময় হাসি থামিয়ে বলে,”চলো,যাওয়া যাক।”

সার্থক বলে উঠে,”মানে?তুমি আন্সার দিবে না?”
-“কিসের আন্সার?”
-“মজা করছি আমি?”
-“তোমার ‘আই লাভ ইউ’ বলতে ইচ্ছে হলো তাই তুমি বললে আমার বলতে হবে এমন কোনো বাধ্যকতা নেই।আর এমন শুকনো প্রপোজাল তো আমি জীবনে এক্সপেক্ট করবো না।”
-“শুকনো?বৃষ্টি কোথায় পাবো আমি?”

আলো মাথায় হাত দিয়ে বলে,”হায় আল্লাহ!এখন উনি বৃষ্টি খোঁজেন,বললাম কী বুঝলো কী!”
সার্থক বাইকে উঠে স্টার্ট দিয়ে বললো,”আমার অগোছালো, অভিমানী শহরে তোমার নিমন্ত্রণ হৃদয় হরণী!”

পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় হুট করে স্টার্টে আলো সার্থকের পিঠে ধাক্কা খায়।আলো তার মুন্ড সার্থকের পিঠ থেকে আর তুলেনি।

অতীতের ডায়েরি থেকে বেরিয়ে আলো দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো।সম্পর্ক তাদের প্রথমে ছিল বন্ধু,বন্ধু থেকে প্রেমের সম্পর্ক,তারপর বিয়ে!বিয়ে অতো সহজ ছিল না কারণ দু’জনে তখন সবে পড়াশোনা শেষ করেছে আর ব্যাচমেইট।অনেক কষ্ট করে তাদের বিয়ে হয় অথচ এখন?এখন দু’জনে আলাদা!

সার্থক এতদিন অভিনয় করেছে তার সাথে,এত নিখুঁত অভিনয় যে সে কিছু টের পায়নি।কষ্ট হচ্ছে আলোর নিজের ভাগ্যের উপর!আচ্ছা সার্থক কী নুপূরকে ভালোবাসে?ধুর,ভালোবাসে বলেই তো বিয়ে করলো আর মেয়েটি প্রেগন্যান্ট!

আলো খুব কাঁদছে কিন্তু সেই কাঁদায় কোনো জল নেই।বিরক্ত সে নিজের উপর কাঁদতে কাঁদতে।

তখনই হৃদয় চা নিয়ে তার রুমে আসলো।এক পলক তাকিয়ে আলো চায়ের কাপ নিলো।

হৃদয় স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,”কাঁদতে ইচ্ছে করলে কেঁদে নে।”

আলো ভ্রু কুঁচকে বন্ধুর দিকে তাকালো।কিছু না বলে নিঃশব্দে চায়ে চুমুক দিলো।হৃদয় আবারো বললো,”বিজ্ঞান কী বলে জানিস?কান্না পেলে অনেকটা আবেগি হয়ে কাঁদুন,কারণ এতে করে কাঁদার ফলে সৃষ্ট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে স্ট্রেস হরমোন এবং টক্সিন থাকে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।মূলত কান্না শরীরকে এক প্রকার বিষমুক্ত করে ফেলে।পাশাপাশি এন্ডরফিন হরমোন তৈরি হয় যা মনকে সতেজ করে তুলে আর ভালো অনুভব হয়।”

আলো কটমট করে হৃদয়ের দিকে তাকালো।এই সময় কী বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করার?

আলো তার উপর রাগ ঝাড়ার আগে কক্ষে হৃদয়ের স্ত্রী প্রবেশ করলো।তখন হৃদয়ের স্ত্রী তাসনিন বললো,”কী হয়েছে?”

হৃদয় মৃদু হেসে বললো,”কই কিছু না।আলোকে কাঁদার উপকারিতা শেখাচ্ছিলাম।”

আলো আঙ্গুল দেখিয়ে বললো,”চুপ।তুই একটা কথাও বলবি না।”তারপর তাসনিনের উদ্দেশ্য বললো,”কাকিমা ঘুম থেকে উঠেছেন?”
-“নাহ,আম্মাকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছে।এখন জাগবে না।”
-“ঘুমের ওষুধ কেন দিলে আবার?”
-“হৃদয় তোমাকে আনতে যাওয়ার পর আম্মা চিৎকার চেঁচামেচি করে তাই নার্স ইনজেকশন দেয়।”
-“ওহ।”
-“তোমার কথা বলো,কী সিদ্ধান্ত নিলে?”

তাসনিনের প্রশ্ন আলো চুপসে গেল।কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি সে এখনো।কী সিদ্ধান্তই বা নিবে?

তখন তাসনিন বললো,”বাই চান্স,তুমি ডিভোর্সের কথা ভাবছো না তো?”
.
আসমা সিদ্দিকা নুপূরকে খোঁজছেন সন্ধ্যা থেকে।অথচ মেয়েটার দেখা নেই।বাগানেও দু-তিন দেখে এসেছেন।শেষে তিনি স্বর্ণাকে জিজ্ঞেস করলে স্বর্ণা উত্তরে জানায় সে জানে না।সন্ধ্যা পেরিয়ে নিশি নামতেই তার দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল।তিনি অতি দ্রুত কথাটি স্বামীর কানে তুললো।কিন্তু শারদ বিপরীত কোনো ইঙ্গিত দিলো না।বাধ্য হয়ে তিনি বললেন ছেলেকে।

এদিকে আলোর চলে যাওয়ায় সার্থকের মন মরা,মায়ের কথা সে কানেই তুললো না।কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই চেঁচামেচি শুরু হলো বাবা-মায়ের ঘর থেকে।সার্থক গিয়ে তাদের কথোপকথন শুনলো।

শারদ অত্যন্ত রেগে বললেন,”আশ্চর্য কথা বলছো তো তুমি আসমা।ঐ মেয়ে কোথায় উধাও হলো সেটা আমি জানবো?”

একই স্বরে আসমা সিদ্দিকা বললেন,”তোমরাই নুপূরের কিছু একটা করেছ।নাহলে ও কে খোঁজে দেখছ না কেন?”
-“আসমা,বাড়াবাড়ি করো না।আলো প্রতি তোমার সব অন্যায় মেনে নিয়েছি বলে ভেবো না ঐ মেয়ের প্রতি গোমার আদর মানবো।”
-“তোমার বউমার যেতে ইচ্ছে হয়েছে গিয়েছে,বাপের বাড়ি তো নাই।পর পুরুষের বাড়ি গিয়ে উঠলো।”

এই পর্যায়ে সার্থক কথা বললো,”মা,বাজে কথা বলো না।”

আসমা সিদ্দিকা বিছানায় বসে আঁচলে মুখ ঢেকে কেঁদে কেঁদে বললেন,”আমি তো বাজেই বলি।গর্ভবতী বউটা যে কোথায় গেল,তার খবর নেই।”

মায়ের এমন কথায় সার্থকের টনক নাড়া দিলো।নুপূর কী সত্যি বাড়িতে নেই?

সে দৌঁড়ে বোনের রুমে গেল।সরাসরি স্বর্নাকে প্রশ্ন করলো,”নুপূর কোথায়?”
-“জানিনা।”
-“পুরো বাড়ি দেখেছিস?”
-“মা দেখেছে।”
-“কখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না?”

স্বর্ণা উত্তর দিলো না।সে ভাইয়ের দিকে দু’টো চিঠি এগিয়ে দিলো।সার্থক ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,”এসব কী?”

স্বর্ণা কথা বলা অর্থহীন মনে করলো।সে চিঠি দুটো ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিলো।স্বর্ণার মতে বেশি কথা বলা কণ্ঠনালির জন্য ক্ষতিকর।
.
‘সার্থক বাবু,

আপনি আমাকে এই ঢাকা-শহরে এনেছেন তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।আমি যদি শুরুতে জানতাম আপনার স্ত্রী আছে তাহলে মরে গেলেও আপনাকে বিবাহ করতাম না।আমি আমার বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে বিবাহ করেছি কিন্তু আমার বাচ্চার জন্য আপনাদের সম্পর্ক নষ্ট হউক আমি চাইনা।আপনি আসার সময় যখন গাড়িতে বলেছেন আপনার স্ত্রী আছে তখন আমি জানতাম এমন প্রলয় অবশ্যই হবে।কোনো নারীই চায় না নিজের সতিন আসুক।আপনি বলেছেন আপনাদের সম্পর্কে বিশ্বাস দৃঢ়।কিন্তু আমাকে বিবাহ করে আপনি বিশ্বাস ভেঙ্গেছেন।তাহলে আলো দিদি কেন বিশ্বাস করবে?যেটা আপনি প্রথমেই ভেঙ্গে ফেলেছেন।দিদি যদি আরেকজন পুরুষকে বিয়ে করতো তাহলে আপনার চিন্তা-ভাবনা কেমন হতো ভেবে দেখুন।

আপনার দ্বারা আমি নিজের শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়েছি।আমার থাকার জন্য সু-ব্যবস্থা করেছেন তিনি।ভাববেন না আপনি, আমি আমার স্বামীর কাছে ফিরে যাচ্ছি।আমি তার থেকে এই জন্মে পালিয়েই থাকবো।শুধু আপনার কাছে একটাই অনুরোধ আমার সন্তানের পিতার জায়গায় আপনার নাম লিখে দিবেন।ও কে আমি একটা সুন্দর জীবন দিতে চাই যার জন্য এত যুদ্ধ!আশা করি আপনি আর আলো দিদি আমার কথাখানা রাখার চেষ্টা করবেন।

গত তিনদিনে আমার জীবনে তুফান নিয়ে এসেছিলাম আমি।গ্রামের লোকজন কখনো আমার খোঁজ করলে জানিয়ে দিবেন আমি ভালো আছি,ভালো থাকবো।অপর চিঠিটা আলো দিদিকে দিলে আমার খুব উপকার হবে।”

ইতি,
নুপূর
.
ঘড়ির কাঁটা রাত দু’টো ছুঁই ছুঁই।আলো ঘুমানো প্রস্তুতি নিচ্ছে।শরীরটা কেমন হালকা লাগছে।গা-টাও গরম।বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।সার্থককে ডিভোর্স দেওয়ার কথা সে কল্পনাতেও ভাবেনি।কিন্তু যদি সত্যি দেখা যায় সার্থক নুপূর মেয়েটার সাথে সংসার করছে তাহলে তালাকই দিবে।

চোখে হালকা ঘুম আসতেই কলিং বেল বেজে উঠলো।এতরাতে কে আসলো ভেবে আলো আশ্চর্য হলো।পরক্ষণে সে ড্রয়িং রুম থেকে সার্থকের গলার আওয়াজ পেলো।আলোর বিস্ময় আকাশ ছুঁই ছুঁই!এতরাতে সার্থক এখানে কেন এলো?

হৃদয় আলোকে উঁচু স্বরে ডাকলো।আলো ভেবে পেলো না সে কী করবে?সার্থকের সাথে কথা বলবে না ঘুমের ভান ধরে এড়িয়ে যাবে?

(চলবে)

বি.দ্র:বানান ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন,ভুলক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন🌼

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here