#অবহেলিত_স্ত্রীর_প্রতিশোধ
পর্ব_০৪
লেখক~ 𝐒𝐭𝐨𝐫𝐲 𝐨𝐟 𝐘𝐞𝐚𝐬𝐢𝐧 𝐍𝐞𝐞𝐥
রুপালীর শেষ কথাগুলো যখন বাতাসে মিলিয়ে গেল, তখন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এলো। এটা কোনো সাধারণ নীরবতা ছিল না, এটা ছিল এমন এক নীরবতা যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের ভেতরের ভাঙনকে খুব স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছে, অথচ মুখে কোনো শব্দ আনতে পারছে না।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রুপালী আর এপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াসিনদের মধ্যে তখন আর শুধু দেয়াল ছিল না, ছিল এক অদৃশ্য ইতিহাস, যা আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
ইয়াসিন ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল, তার চোখে এখন আগের সেই আত্মবিশ্বাস নেই, যেটা দিয়ে সে একদিন স্ত্রীর প্রসব বেদনার মুহূর্তে তাকে তালাবদ্ধ করে রেখে গিয়েছিল। এখন সেই চোখে শুধু প্রশ্ন, আর সেই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেই জানে না। সে বুঝতে পারছিল, যে সিদ্ধান্ত তারা সেদিন নিয়েছিল, সেটা ছিল কোনো মুহূর্তের রাগ নয়, বরং ছিল একটি সম্পর্কের চূড়ান্ত ভাঙনের শুরু, যেটা তারা নিজেরাই বুঝতে পারেনি।
রহিমা বেগম একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর বুকের ভেতর এখন আর সেই কঠোরতা নেই, যেটা দিয়ে তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার বদলে এসেছে এক ধীর, গভীর অস্বস্তি। তিনি জীবনে বহু মানুষকে ছোট করেছেন, বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, তিনি যাকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করেছিলেন, সেই মানুষটাই ছিল এই পরিবারের সবচেয়ে শক্ত ভিত।
রেসমিকা দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার দৃষ্টি স্থির নয়। তার হাতে থাকা ব্যাগটা এখন আর গর্বের প্রতীক নয়, বরং ভারের মতো লাগছে। সে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে, যেন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা খুঁজছে, কিন্তু কোনো রাস্তা নেই, কারণ বাস্তবতা কোনো বিলাসভ্রমণের মতো সহজভাবে শেষ হয় না।
ভেতরে রুপালী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কোলে শিশু, যার নিঃশ্বাস এখন শান্ত, নিয়মিত, যেন সে কোনো যুদ্ধের খবরই জানে না। কিন্তু তার মায়ের ভেতরে যে যুদ্ধটা শেষ হয়েছে, সেটা এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলোর একটি। রুপালীর চোখে কোনো অশ্রু নেই, কোনো চিৎকার নেই, কোনো ভাঙা কণ্ঠ নেই, শুধু এক অদ্ভুত স্থিরতা, যেটা দীর্ঘ কষ্টের পর আসে।
সে ধীরে ধীরে দরজা থেকে একটু পিছিয়ে এলো, তারপর খুব শান্তভাবে বলল, “তোমরা এখন যেতে পারো।”
এই কথাটা ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে লুকানো ছিল একটি সম্পূর্ণ জীবনের সমাপ্তি।
ইয়াসিন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার মুখে হাজার শব্দ ছিল, কিন্তু কোনো শব্দই বের হলো না। সে প্রথমবার বুঝতে পারল, কিছু ভুল শুধরানোর জন্য দেরি হয়ে গেলে, ক্ষমা চাওয়াও অর্থহীন হয়ে যায়।
ঠিক সেই সময় আইনজীবী আবার সামনে এগিয়ে এলেন। তার হাতে থাকা ফাইলটা তিনি একটু ওপরে তুলে ধরলেন, যেন তিনি শুধু আইনের কথা বলছেন না, বরং বাস্তবতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন।
তিনি বললেন, “এই মুহূর্ত থেকে আপনারা যদি এখানে অবস্থান করেন, সেটি অবৈধ গণ্য হবে। মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনো প্রবেশ, অবস্থান বা ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।”লেখক মিস্টার ইয়াসিন নীল।
রহিমা বেগম একবার মুখ তুললেন। তার চোখে এখন আর রাগ নেই, আছে এক ধরনের অবিশ্বাস। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “এটা তো আমার ছেলের ঘর ছিল…”
কিন্তু আইন কখনো সম্পর্ক দেখে না, আইন দেখে কাগজপত্র, স্বাক্ষর, আর অধিকার।
রুপালী এই কথাটা শুনল, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না। সে শুধু শিশুটিকে একটু ঠিক করে ধরল, যেন তার পৃথিবী এখন শুধুই এই ছোট্ট প্রাণটা। গাড়ির শব্দ আবার শোনা গেল। বাইরে অপেক্ষা করা গাড়িটা এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। রুপালী একবারও পেছনে তাকাল না।
সে জানত, কিছু দৃশ্য পেছনে রেখে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত।
গাড়িতে উঠতে উঠতে সে শুধু একবার বলল, “আজ থেকে এই অধ্যায় শেষ।” তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না, ছিল শুধু সমাপ্তির স্বীকৃতি।
গাড়ি যখন চলতে শুরু করল, তখন ইয়াসিন দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ গাড়ির পেছনে আটকে আছে, কিন্তু সেই গাড়ি আর তার জীবনের কোনো অংশে নেই। সে প্রথমবার বুঝতে পারল, সম্পর্ক ভাঙা মানে শুধু মানুষ চলে যাওয়া নয়, সম্পর্ক ভাঙা মানে নিজের ভেতরের সমস্ত পরিচিত পৃথিবী অচেনা হয়ে যাওয়া।
রহিমা বেগম ধীরে ধীরে পিছিয়ে এসে গাড়ির পাশে বসে পড়লেন। তার চোখে এখন কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, শুধু এক অদ্ভুত ক্লান্তি।
রেসমিকা ফিসফিস করে বলল, “এটা তো ঠিক হচ্ছে না…”
কিন্তু এই বাক্যটা আর কারও ভেতরে কোনো আশার আলো জ্বালাতে পারল না।
দিনগুলো এরপর খুব দ্রুত বদলাতে শুরু করল।
রুপালী নতুন করে তার জীবন গুছিয়ে নিচ্ছিল। তার জন্য এটা প্রতিশোধের গল্প ছিল না, এটা ছিল নিজের অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনার গল্প। সে বুঝে গিয়েছিল, ভালোবাসা যদি সম্মান না দেয়, তাহলে সেটা সম্পর্ক নয়, সেটা শুধু একটি দীর্ঘ ধৈর্যের শাস্তি।
অন্যদিকে ইয়াসিনের জীবন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল।
সে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি যে একদিন যাকে সে নিয়ন্ত্রণ করত, আজ সেই মানুষটাই তার জীবনের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।
সে বারবার ফোন করেছিল, বার্তা পাঠিয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই উত্তর ছিল নীরবতা।
এই নীরবতা তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল।
কারণ নীরবতা কখনো ব্যাখ্যা দেয় না, নীরবতা শুধু সত্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
রহিমা বেগম এই পরিবর্তনটা সবচেয়ে কঠিনভাবে গ্রহণ করছিলেন।
তিনি জীবনে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি যেখানে তার কথা কেউ শুনছে না। কিন্তু এখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।
একদিন রাতে তিনি একা বসে ছিলেন। চারপাশে নিস্তব্ধতা। তার মনে পড়ছিল রুপালীর মুখ, সেই প্রসব বেদনার মুহূর্ত, সেই দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ।
তিনি প্রথমবার খুব ধীরে বললেন, “আমি কি ভুল করেছিলাম?” এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ছিল না।
কারণ জীবনে কিছু ভুল এমন হয়, যেগুলোর উত্তর পাওয়ার জন্য দেরি হয়ে যায়। এদিকে রুপালী তার শিশুকে নিয়ে নতুন এক জীবনে অভ্যস্ত হচ্ছিল। তার ভেতরের ভাঙন এখন ধীরে ধীরে শক্তিতে রূপ নিচ্ছিল।
সে আর আগের মতো অপেক্ষা করছিল না, সে আর কারও অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল না। সে বুঝে গিয়েছিল, নিজের জীবনের দরজা বন্ধ করা সহজ, কিন্তু খুলে নিজের মতো করে নতুনভাবে দাঁড় করানোই আসল শক্তি।
এক সন্ধ্যায় সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শিশুটি ঘুমিয়ে আছে। তার ফোনে একটি পুরনো নাম আবার ভেসে উঠল। ইয়াসিন। এইবার সে ফোন ধরল না।
কারণ কিছু অধ্যায় শুধু শেষ হয় না, কিছু অধ্যায় মুছে ফেলা লাগে। সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমি আর সেই মানুষটা না।” তার কণ্ঠে এবার কোনো কষ্ট ছিল না, ছিল এক সম্পূর্ণ রূপান্তর।
#চলবে..?





