স্মৃতিতে তোমার বন্দনা পর্ব ১৯

#স্মৃতিতে_তোমার_বন্দনা
#পর্ব_১৯
#Saji_Afroz
.
.
পরশ তার মা বাবাকে সব খুলে বললো ।
পরশের কথা শুনে তার মা বলে উঠলেন-
খুব ভালো করেছিস ওদের এখানে নিয়ে এসে । ফ্ল্যাটটা এমনিতেই পড়ে আছে ৷
-আমি কি ওদের ভেতরে আনবো?
-আনবি মানে? এখনো আনিস নি?
-না ।
-তুইও না পরশ! যা এখুনি যা ।
.
পরশের সাথে শফিউল আহম্মেদও এগিয়ে আসলেন । ট্রাক ভর্তি তাদের জিনিসপত্রও চলে এসেছে । পরশ তাদের নিয়ে ভেতরে আসলো ।
ফ্ল্যাটটা দেখে চমকে উঠলেন আফিয়া জান্নাত । বেশ বড়সড় একটা ফ্ল্যাট । এই ফ্ল্যাটের ভাড়া দিবে কি করে তারা!
পাশে দাঁড়ানো শফিউল আহম্মেদের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন-
এটা ছাড়া কি আর কোনো ফ্ল্যাট আছে আপনাদের?
-না নেই । এটা করেছি । কেনো জানেন?
-কেনো?
-ছেলেরা সম্পত্তির জন্য ঝামেলা করলে আমরা বুড়োবুড়ি দুটো যেনো এখানে থাকতে পারি ।
.
কথাটি রসিকতার সুরে বলে হেসে উঠলেন তিনি।
আফিয়া জান্নাত বললেন-
অপর ছেলের কথা জানিনা । তবে আপনার এই ছেলে আপনাদের সাথে কোনো ধরনের ঝামেলা করবেনা এটা আমি নিশ্চিত । যে ছেলে অন্যের জন্য এতো ভাবে, সে ছেলে নিজের মা বাবার সাথে কিছু করতেই পারেনা ।
.
এদিকে ছোঁয়া ও নয়নতারার সাথে বাসা গোছাতে ব্যস্ত পরশ । ছোঁয়া বললো-
আমরা গুছিয়ে নিবো । আপনি আমাদের সাহায্য করেছেন, এখন আবার কাজ করছেন ।
-তাতে অসুবিধে কিসের?
-আপনার কষ্ট হচ্ছে ।
-এতো বেশি কথা কেনো বলো তুমি ছোঁয়া! মন দিয়ে কাজ করোতো ।
.
নয়নতারার হঠাৎ তার ফোনের কথা মনে এলো । এতোক্ষণ যাবৎ ব্যাগ থেকে ফোনটা বেরই করেনি সে । প্রয়োজনেও কেউ ফোন দিতে পারে ৷ এই ভেবে সে ব্যাগ থেকে ফোন বের করতেই দেখলো, রাফসান ৩৩বার ফোন দিয়েছে ।
এতোবার ফোন করেছে রাফসান! আর সে কিনা শুনতেই পেলোনা । ব্যাগের ভেতরে থাকার কারণে এমনটা হয়েছে । কিন্তু এতোবার ফোন দেয়ার কারণ কি? কোনো বিপদ হয়নিতো রাফসানের?
আর না ভেবে নয়নতারা কল ব্যাক করলো । সাথে সাথেই রাফসান রিসিভ করে বললো-
এতোক্ষণ কই ছিলে?
-ব্যাগে ফোন ছিলো তাই শুনতে পারিনি ।
-ব্যাগে ফোন থাকলে না শোনার কি আছে?
-আসলে ব্যস্ত ছিলাম, ধ্যান ছিলোনা । কোনো সমস্যা?
-সমস্যা না হলে নিশ্চয় এতোবার ফোন দিতাম না?
-কি হয়েছে?
-ছোঁয়া কোথায়? ওর ফোন বন্ধ কেনো?
-আছে ছোঁয়া । ফোন কেনো বন্ধ তো জানিনা ।
-কি জানোটা কি তুমি? নিজের ফোন বাজছে তাও জানোনা, ছোঁয়ার ফোন বন্ধ এটাও জানোনা…
-আমরা বাসা বদল করেছি । তাই ব্যস্ত ছিলাম রাফসান । এতো উত্তেজিত হবার কিছু নেই ।
-বাসা বদল করেছো মানে? কোথায় গিয়েছো?
-হামজারবাগ ।
-তোমরা ওই এলাকা ছেড়ে যাচ্ছো আমাকে বলার প্রয়োজন বলে মনে করলে না? তোমার অন্তত বলার দরকার ছিলো । এতো কেয়ারলেস কেনো?
-আসলে…
-কেনো বদল করতে হলো বাসা? আর আমাকে না জানিয়ে এলাকা কিভাবে ছাড়লে?
.
নয়নতারার রাগ হচ্ছে । প্রচুর রাগ হচ্ছে । রাফসান এভাবে কথা বলছে তার সাথে! পুরো ঘটনা না জেনে তাকে দোষারোপ করে চলেছে সে । নাহ, আর শুনতে পারছেনা সে ।
ছোঁয়াকে ডেকে বললো-
তোর ফোন এসেছে । এদিকে আয় ।
.
ছোঁয়া ভেতরে আসতেই নয়নতারা বেরিয়ে গেলো ।
রাফসানের নামটা মোবাইলের স্ক্রিনের উপরে দেখে ছোঁয়ার ইচ্ছে করছে মোবাইলটায় ছুঁড়ে মারতে । এই একটা লোককে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে সে ।
ওপাশ থেকে রাফসানের হ্যালো হ্যালো বলা শুনে ছোঁয়া বললো-
জ্বি বলুন?
-ছোঁয়া তোমরা বাসা বদলালে কেনো?
.
ছোঁয়া সবটা জানালো রাফসানকে । তবে পরশের কথাটা বললোনা । কেননা আফিয়া জান্নাত আগেই নিষেধ করেছেন, ছোঁয়া এখানে কাজ করে এটা যেনো সে না জানে ।
রাফসান বললো-
এতো দূরে গেলে কেনো? নিশ্চয় নয়নতারা দিয়েছে বুদ্ধি? ওর খাও বলে কি সব শুনতে হবে? আশেপাশেই বাসা নিতে । তাহলে আমার ফ্যামিলি তোমাদের খেয়াল রাখতে পারতো ।
-আপু কিছু করেনি । ওকে টানবেন না শুধুশুধু । আমার পরিচিত একজনের বাসায় এসেছি ।
.
শান্ত গলায় রাফসান বললো-
তুমি রাগ করলে? আমিতো ভালোর জন্যই বললাম ।
-যার তার সাথে ছোঁয়া রাগ করেনা ।
.
ছোঁয়ার এমন ব্যবহারের কারণ অজানা নয় রাফসানের । এর চেয়ে বেশি কিছু তার কাছে আশাও করেনা সে! তবুও মন এতো বেহায়া কেনো?
ছোঁয়া ফোনের লাইন কেটে বোনকে ডাকলো । নয়নতারা আসতেই ছোঁয়া বললো-
এই লোকটার এতো কথা শুনো কেনো আপু?
-কিছু বলেনি আমায় ।
-মিথ্যে বলোনা । আমি বুঝিনা কেনো তুমি উনার কোনো দোষই দেখতে পারোনা!
.
রাগে হনহনিয়ে ছোঁয়া বেরিয়ে যেতেই নয়নতারা বললো-
ভালোবাসি বলে…..
.
.
সাফিনা আহম্মেদকে দেখতে এসেছেন আফিয়া জান্নাত ।
তার পাশেই বসে আছেন তিনি । কথায় কথায় সাফিনা আহম্মেদ বললেন-
কোনো সংকোচ করার প্রয়োজন নেই । যেকোনো প্র‍য়োজনে আমাদের বলবেন । এই কয়েকদিনে ছোঁয়া আমার মনটা জিতে নিয়েছে । একটা মেয়ে নেই বলে অনেক আফসোস ছিলো । এখন থেকে সেটাও নেই । ভীষণ ভালো মেয়ে সে ।
.
সাফিনা আহম্মেদ কথা বলেই যাচ্ছেন । তার কথা শুনে আফিয়া জান্নাতের চোখের কোণে পানি চলে এলো । এই কয়েকদিনে তার মেয়েকে কতোটা আপন করে নিলো এরা!
.
সবেমাত্র ঘর গোছানো শেষে বসলো ছোঁয়া ও নয়নতারা । পরশও বেরিয়ে গেলো । আফিয়া জান্নাত এসে বললেন-
ভালোই হলো ওই বাসা থেকে চলে এসেছি । আমার সামর্থ্য থাকলে চার মাসের ভাড়া দিয়ে দিতাম ।
-আমি কখনোই অন্যায় প্রশ্রয় দিতাম না মা । কিন্তু উনি যেভাবে কথা শোনাচ্ছিলেন তোমাকে, তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি । তবে উনাকে টাকা বেশি দেয়া হয়নি । এই মাসের টা এমনিতেও দিতে হতো । বাসা ছাড়ার এক মাস আগে তাকে বলতে হবে, আমাদের বলেছিলেন শুরুতেই । তাই বের হবার আগে আগামী মাসের টাকাটাও উনার প্রাপ্য । আমরা তো উনার মতো বেইমান নয় । তাই কোনো ঝামেলা ছাড়া বেরিয়ে পড়েছি । নাহলে যেভাবে আচরণ তিনি করেছিলেন…
.
ছোঁয়াকে থামিয়ে আফিয়া জান্নাত বললেন-
সব ঠিক আছে । কিন্তু এই বাসার ভাড়া কতো? মনেতো হয় অনেক হবে ।
-আমি ডাক্তার পরশের সাথে কথা বলবো ।
.
.
ছোঁয়া খুঁজতে লাগলো পরশকে । শফিউল আহম্মেদ জানালেন সে ছাদে আছে । ছোঁয়া ছাদে এসে দেখলো, রেলিং এর পাশে দাঁড়িয়ে আছে পরশ ।
ছোঁয়া বললো-
আসবো?
.
এই সময়ে ছোঁয়াকে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে পরশ বললো-
তুমি?
-এতো চমকানোর কি আছে?
আসতে পারিনা?
-কেনো নয়!
.
পরশের দিকে ধীরেধীরে ছোঁয়া এগিয়ে এসে বললো-
শুনেছি ছেলেরা ছাদে আসে সিগারেট খাওয়ার জন্য?
-আমি খাইনা ।
.
ড্যাবডেবে চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে ছোঁয়া । পরশ বললো-
মিথ্যে বলছিনা! ছেলে বলেই যে সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে হবে এমন কথা নেই ।
-হুম ।
-কোনো দরকারে এসেছো?
-হ্যাঁ । আসলে বাড়ি ভাড়া নিয়ে কোনো কথা হয়নি ।
.
পরশ জানতো এমন কিছুই ছোঁয়া বলবে । এটার প্রস্তুতি সে আগে থেকে নিয়ে রেখেছিলো । পরশ বললো-
ভাবছি তোমার বেতন থেকে কেটে রাখবো ।
.
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো ছোঁয়া । পরশ বললো-
আমার একটা অনুরোধ ছিলো ।
-বলুন?
-এখন যেহেতু একই বাসায় আমরা আছি তাহলে মায়ের সাথে আরো বেশি সময় তুমি কাটাও । আমি বেতন বাড়িয়ে দিবো ।
.
আপত্তি জানালোনা ছোঁয়া । সাফিনা আহম্মেদের সঙ্গ তার ভালোই লাগে ।
ছোঁয়া চলে যেতে চায়লে পরশ বললো-
আজকের চাঁদটা কিন্তু অনেক সুন্দর ।
-চাঁদের সৌন্দর্য্য কিভাবে উপভোগ করা যায়?
-এক ধ্যানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ।
.
পরশের কথামতো চাঁদের দিকে তাকালো ছোঁয়া । আর তারদিকে পরশ! তার মনেহচ্ছে, আজ চাঁদের সৌন্দর্য্যও হার মানছে ছোঁয়ার কাছে ! ছোঁয়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি । এই যেনো মন মাতানো, নয়নজুড়ানো অভূতপূর্ব এক দৃশ্য! পরশের মনেহয় সে যেনো আর লৌকিক জগতে নেই । সে এখন বিচরণ করছে অচেনা, অজানা এক জগতে । যে জগতে শুধুমাত্র ছোঁয়াকেই চেনে সে!
পরশের দিকে চোখ পড়তেই ছোঁয়া বললো-
আসলেই এভাবে সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায় ।
.
পরশ কিছু বললোনা । ছোঁয়া মৃদুস্বরে তাকে ডাকলো । পরশ কোনো সাড়া দেয়না । ছোঁয়া আবার ডাকলো-
এই যে শুনছেন?
.
পরশ এতোক্ষণে নড়েচড়ে উঠলো । সে ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এসে বললো-
হ্যাঁ বলো?
-আমি যাচ্ছি ।
-যাবে?
-হু ।
-আচ্ছা ।
.
ছোঁয়া চলে যেতেই পরশের মোবাইলে তোহার ফোন আসলো । তোহাকে আজকের ঘটনা সবকিছু বললো সে । তোহা বললো-
সব করছিস কিন্তু তার বফ আছে কিনা জানতে পারলিনা । এই সময়ে ওই বয়সী মেয়ে সিঙ্গেল থাকার কথা না । বফ থাকলে এতো কষ্ট সব বৃথা যাবে ।
-মোটেও না । ওর বফ থাকলেও আমি ওকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে আসতে পারিনা! কেননা আমি ওকে ভালোবাসি ।
-তবুও পরশ! তবুও তোর জানতে হবে ছোঁয়ার জীবনে স্পেশাল কেউ আছে কিনা?
-কিন্তু কিভাবে?
-যেভাবেই হোক । এটা না জেনে এই ব্যাপারে আর অগ্রসর হওয়া ঠিক হবেনা পরশ ।
.
তোহার কথায় যুক্তি আছে । পরশের খুব তাড়াতাড়ি জানতে হবে, ছোঁয়ার জীবনে প্রেমিক নামক কোনো পুরুষ আছে কিনা!
.
.
সকালে বাগানে হাঁটছিলো পরশ । ছোঁয়াকে কিভাবে নিজের করে পাওয়া যায়, এটাই তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । কিন্তু এখনো পর্যন্ত জানতে পারলোনা তার কোনো প্রেমিক আছে কিনা । ভাবতে ভাবতেই রুপালির দেখা পেলো সে । রুপালি সালাম জানিয়ে বললো-
ছোঁয়ার সাথে দেখা করতে এসেছি ।
.
রুপালিকে দেখে পরশের মাথায় একটা বুদ্ধি চলে এলো । রুপালির মাধ্যমেই জানতে পারবে, ছোঁয়ার সম্পর্কে ।
পরশ বললো-
আচ্ছা রুপালি একটা কথা বলুন তো?
-কি?
-এভাবে সারাক্ষণ যে ছোঁয়াকে কাজে ব্যস্ত রাখছি, ওর প্রেমিকের সাথে কথা বলতে ও দেখা করতে সমস্যা হচ্ছে তাইনা?
-ছোঁয়ার বফ আছে আপনি কিভাবে জানেন?
.
রুপালির কথা শুনে হতাশ হলো পরশ । তার মানে তোহার কথায় সত্য!
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here