অনেক সাধনার পরে পর্ব -৪৭+৪৮

#অনেক_সাধনার_পরে
#মাইশাতুল_মিহির

[৪৭]

বিয়ের দিনটা আনন্দদায়ক হলেও বিদায়ের মুহূর্তটা বেদনাদায়ক। প্রত্যেকের মনে ছুঁয়ে আছে বিদায়ের বিষণ্ণতা। মন ভালো নেই কারোর। আদরের মেয়েটার বিদায়কাল ক্ষীণ। সবার চোখে পানি জম পরিপূর্ণ। এই বুঝি বাধ ভেঙ্গে গড়িয়ে পরবে গালে।

দিন গড়িয়ে রাত নামলো। চারপাশ নিঝুম অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো। দূর আকাশের চাঁদটা আজ থালার ন্যায় পরিপূরক। মিটমিট তারার জ্বলছে। আকাশটা ভীষণ স্বচ্ছ। তবে মন বিষন্ন। মিতালীর চোখ দুটো অসম্ভব লাল হয়ে আছে। ঠোঁট ভেঙ্গে আসছে বারবার। জুলফিকার কে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে উঠলো। জুলফিকার কাঁদলেন। চোখের পানি বাধা মানছে না তার। শব্দহীন কান্না গুলো ভীষণ ব্যাথার হয়। বড় মেয়ে চলে যাবে তবুও যেন অদ্ভুত ভাবে নিজেকে শক্ত রেখেছেন। মিতালীর মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝালেন কিছু সময়।

মিতালীর থেকে সামান্য একটু দূরে অংকুর দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা তার স্বাভাবিক। না দুঃখিত, না আনন্দিত। মনে মনে অনেক কষ্ট হচ্ছে তার। মিতালীকে এভাবে কাঁদতে দেখে অনেক কষ্ট লাগছে। ইচ্ছে করছে মেয়েটার মাথা বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত্বনা দিতে। কিন্তু এতো মানুষের সামনে এমন কিছুই সম্ভব না। যতোই সে স্বামী হোক না কেন। মিতালীর এতো কান্নায় কিছু করতে না পেরে নিরবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

মিতালী জুলফিকার কে ছাড়িয়ে আমেনার কাছে আসলো। আমেনা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। আমেনা নিজেও শব্দ করে কাঁদছে। মেয়েটাকে বিদায় দিতে হচ্ছে। এখুনি চলে যাবে। এর থেকে বড় কষ্ট আর কি হতে পারে?ছোট ছোট পায়ে ‘ হাটি হাটি পাপা ‘করা মেয়েটা কত্ত বড় হয়ে গেলো। জুলেখা কাঁদলেন। মিতালীকে জড়িয়ে ধরে মাফ চাইলেন।

‘মুখে মুখে অনেক কথা শুনিয়েছি তোকে। কি থেকে কি বলেছি পরে বড্ড আফসোস করেছি। এই বুড়ো দাদীটাকে মাফ করে দিস ময়না। আর কতোদিন বাঁচবো জানা নেই। আমার আওলাদের সুখ দেখে যেতে পারলেই শান্তি। মাফ করে দিস দাদীকে।’ দুই হাত সামনে এনে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন জুলেখা। মিতালীকে জড়িয়ে ধরলো দাদীকে।

তাদের থেকে ঠিক অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে শেফালী। বিষন্ন তার মন। চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করে আছে। মিতালী তাকালো ছোট বোনের দিকে। ধীর পায়ে শেফালীর দিকে এগিয়ে আসলো। শেফালী নিরবে খুব শান্ত ভাবে তার বুবু কে জড়িয়ে ধরলো। নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো শেফালী। মিতালী শেফালীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। কান্না থামানোর দিক নির্দেশনা দিলো। কিন্তু শেফালীর কান্না থামলো না। প্রথমের ন্যায় শব্দ করে কেঁদে চলছে। অপরদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে। বড়রা তাড়া দিলো বের হওয়ার জন্য। এতো রাত করে নতুন বউকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু শেফালী মিতালীকে ছাড়লো না। জড়িয়ে ধরে রইলো।

শেফালীকে ধরেই মিতালী গাড়ির কাছে আসলো। তবুও শেফালী ছাড়লো না। আরো কিছুসময় কান্নাকাটির পর মিতালী গাড়িতে উঠার জন্য অগ্রসর হয়ে উঠলো। শেফালী এখনো শব্দ করে কেঁদে চলছে। শেফালীর এমন কান্না একদম নিতে পারছে না রাকিব। তার প্রচুর খারাপ লাগছে মেয়েটাকে এভাবে কাঁদতে দেখে। প্রথমে ভাবলো শেফালীর কাছে এসে তার কাধে হাত রেখে শান্ত্বনা দিবে। কিন্তু এই ভাবনা তার মাঝেই রইলো। এগিয়ে যাওয়ার আগেই রায়াজ এসে ধরলো শেফালীকে। শেফালী কান্নার বেগ সামলাতে না পেরে রায়াজের বাহু জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। দাঁড়িয়ে পরলো অংকুর। এখানেও রায়াজের আদিক্ষেতা দেখে রাগ উঠলো তার। চোয়াল শক্ত করে সবার আগে চুপচাপ গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।

মিতালী সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলে শু-শু শব্দ তৈরি করে গাড়ি সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো। এতোক্ষণ ফুঁপিয়ে কাঁদার কারণে এখন থেমে থেমে কান্নার খিচঁকি উঠছে। চোখের পানি কমেনি। অংকুর মলিন চোখে তাকালো মিতালীর দিকে। তারপর নিজের দুই হাতের মাঝে মিতালীর একটা হাত ধরলো। মিতালী তার দিকে চোখ তুলে তাকালে অংকুর চোখের ইশারায় শান্ত হতে বললো। কন্ঠ নিচু করে বললো,

‘প্লিজ শান্ত হও। আর কান্নাকাটি করতে হবে না। কালকেই তো সবার সাথে দেখা হবে। এভাবে কাঁদলে পরে মাথা ব্যাথা করবে। প্লিজ আমার কষ্ট হচ্ছে। কান্না থামাও এবার।’

জড়তাহীন চোখে অংকুরের দিকে তাকিয়ে রইলো মিতালী। এই মানুষটা তার স্বামী। এমন একজন মানুষকে জীবনে পেয়ে সে কতো বড় ভাগ্যবতী। এতো ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা সে রাখে, সেটা অংকুর কে না দেখলে বুঝতে পারতো না। সে বিন্দুমাত্র দুঃখি নয়। সে খুশি। এমন একজন মানুষকে সারাজীবনের জন্য পেয়ে অতিরিক্ত খুশি। মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো মিতালী।
.

দুই বাড়ির মধ্যখানের দূরত্ব অতিক্রম করে কাঙ্ক্ষিত বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো। অংকুর গাড়ি থেকে নেমে অপর পাশের দরজা খুললো। তারপর এক হাত বাড়িয়ে দিলো মিতালীর দিকে। মিতালী মুচকি হেসে অংকুরের হাত ধরে গাড়ি থেকে নামলো। চারপাশে বেশ কিছু মানুষের ভীড় জমেছে নতুন বউ দেখবার আশায়। অংকুর মিতালীর হাত ধরে নিজেদের ফ্ল্যাটের সামনে আসলো। সুপ্তি বেগম বরণ থালা হাতে নিয়ে আগে থেকেই পুত্রবধূ বরণ করার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলো। অংকুর মিতালীকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো। খুবই আন্তরিকতার সাথে মিতালীকে বরণ করে ভিতরে নিয়ে গেলো। বাসার ভিতরে মেহমান বলতে অংকুরের নিকটাত্মীয় দের উপস্থিতি কেবল। মিতালীকে সোফায় বসিয়ে সুপ্তি ও অংকুরের ফুপি, খালারা ব্যস্ত হয়ে পরলেন। অংকুরের কাজিনরা মিতালীকে চারপাশ থেকে ঘিরে বসে পরিচিত হতে লাগলো। মিতালীও সাবলীল ভাবে সবার সাথে ভাব জমাতে ব্যস্ত হলো।

অংকুর ভীষণ ক্লান্ত। তাই বাসায় এসেই নিজের রুমে চলে গেছে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গোসল করে বের হলো। ভেজা চুল মুছে কালো টি-শার্ট পরে নিলো। রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাতেই দেখলো মিতালী সবার সাথে বেশ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে খিলখিলিয়ে হাসছে। এই শব্দ তৈরি করা হাসিটা অংকুরের কাছে মুক্ত ঝরা হাসি মনে হচ্ছে। ভালো লাগা কাজ করছে মনে।

অংকুরকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাফিয়ে উঠলো অংকুরের সকল কাজিনরা। ডৌড়ে এসে ঘিরে ধরলো তাকে। আকর্স্মিক ঘটনায় অংকুর ভ্যাবাচ্যাকা খেলো প্রায়। অংকুরের কাজিনরা তাকে রুমে যেতে নিষেধ দিয়েছে। নিজের রুমে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা পেয়ে ক্ষেপে গেলো অংকুর। কাজিনদের কথার উপেক্ষা করে রুমে ঢুকার প্রয়াস করলো। হুমড়ি খেয়ে পরলো অন্যরা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অংকুর কে বাধা দিতে লাগলো। অংকুরের এক কাজিন। নাম তানভীর বললো, ‘ভাই, তিন ঘন্টার লাগি রুমটা ছাড়েন।’

তখন রাকিব অংকুরের ঘাড়ে চাপড় দিলো একটা। ব্যাথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো অংকুর। পিছু ফিরে তাকাতেই রাকিব তার দিকে হালকা ঝুকে নিচু গলায় বললো, ‘গাধা হইছোস? তোর রুম খাইতে যাবে না। তোর বাসর সাজাবে ইডিয়ট।’

অংকুর এক হাতে মাথা চুলকালো। বেকুব বেকুব লাগলো নিজেকে। কিছুটা ইতস্ততবোধ করে বললো, ‘ঠিক আছে। যা করার কর। কিন্তু বেশি ঘাটাঘাটি করবি না।’

রুমের যাওয়ার অনুমতি পেতেই উল্লাসিত হয়ে উঠলো সবাই। অংকুর চুপচাপ বাসার বাহিরে গেলো তারই সমবয়সী কাজিনকে নিয়ে। মিতালী নিরবে বসে বসে ভাই বোনদের ঝগড়া দেখে উপভোগ করছিলো।
.

ঘড়ির কাটা রাত্রীর সাড়ে বারোটা ছুঁই ছুঁই। খাওয়াদাওয়া শেষে মিতালীকে অংকুরের রুমে দিয়ে গেলেন সুপ্তি বেগম। মিতালীকে যেন অন্যরা এখন বিরক্ত না করে সে ব্যাপারে কড়া ভাবে নিষেধ দিয়ে গেলেন। অন্যরাও চুপচাপ মেনে নিলো। সকালে আলাপ করা যাবে নাহয়। সুপ্তি বেগম মিতালীর হাতে গোলাপি কালারের পাতলা সুতি শাড়ি দিয়ে ফ্রেশ হতে বলে চলে গেলেন রুম থেকে। সবাই যেতেই মিতালী রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখলো। ইয়া বড় একটা রুম। যাবতীয় সব আসবাবপত্র উপস্থিত। মিতালী খেয়াল করলো রুমে কোনো বুকশেলফ নেই। একটা স্টাডি টেবিল আছে, সেটাতে অফিসিয়ালি কিছু ফাইল, কাগজপত্র সাজানো। চুপচাপ ভ্রুঁ উঁচিয়ে বিজ্ঞব্যক্তিদের মতো রুমটা ভালো করে দেখলো। মনে মনে একটা জায়গা ঠিক করে নিলো। এখানে একটা বুকশেলফ রাখা যাবে। হাসলো মিতালী। আজ থেকে এই ঘর তার। এই ঘরটা মিতালী আর অংকুরের। দুজনার!
#অনেক_সাধনার_পরে
#মাইশাতুল_মিহির

[৪৮]

চোখের স্নিগ্ধ পানি শুনিয়ে এখন পানিশূন্য হয়ে গেছে চোখ দুটো। মায়াবী মুখশ্রী এখন ফ্যাকাশে, মলিন। বিষণ্ণবদন হৃদয়। বারান্দার কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে শেফালী। বুকে দুই হাত গুঁজে তাকিয়ে আছে দূর আকাশের দিকে। পরিবেশটা অন্ধকার। একদম নিরব নিস্তর। গোমট বাধানো এই নিঝুম রাত্রীতে মন ভালো নেই শেফালীর। বুবুকে বিদায় দেওয়ার পর থেকে কিছুই ভালো লাগছে না। বাসাটা একদম খালি পরেছে। বুবুর রুমটা। আর এইযে বারান্দাটা। এটাও একদম ফাঁকা। এখন এখানেই দাঁড়িয়ে অতীতের স্মৃতিচারণ করছে শেফালী। বুবুর সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত ভীষণ ভাবে মিস করছে। বুবুর বিদায়ের পর এতোটাই কেঁদেছে যে এখন চোখেতে পানি নেই বললেই চলে। আচ্ছা! সে বুবুকে ছাড়া থাকবে কিভাবে? ভাবতেই বুকের বা পাশে চিনচিন ব্যাথা অনুভব হচ্ছে শেফালীর।

হঠাৎ-ই কাধে কারোর হাতের স্পর্শ পেয়ে পিছু ফিরে তাকালো শেফালী। জুলফিকার কে দেখে আলতো করে স্মিতি হাসি দিলো একটা। তারপর জুলফিকারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। জুলফিকার স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি? মন খারাপ?’

শেফালীর ঠোঁটে এখন মিহি হাসি। মৃদু গলায় বলে উঠলো, ‘জানো আব্বু? এই বারান্দায় আমি আর বুবু অনেক সময় কাটিয়েছি। আমি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাই। কিন্তু যেদিন বুবুর সাথে রাতে বারান্দায় আড্ডা দিতাম সেদিন কিভাবে যেন অনেক দেরি হয়ে যেতো। তবুও ঘুম আসতো না। কতো কতো সমস্যার কথা বুবুকে বলেছি। হোক সেটা প্রয়োজনীয় কিংবা অপ্রয়োজনীয়।। বুবু বিরক্ত হয়নি। মিষ্টি করে হাসি দিয়ে সমাধান করে দিতো। মন খারাপের সময় যখন বুবুকে পাশে পেতাম তখন কতো ভালো লাগতো। আর আজ দেখো? এইযে এখন আমার এতো কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বুবুকে বলতে পারছি না। বারান্দায় আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। বুবু পাশে নেই। আব্বু? আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। বুবুকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না। আমি বুবুর কাছে যাবো।’

শেফালীর প্রথম কথা গুলো স্বাভাবিক থাকলেও শেষের কথা গুলোতে কান্নায় জর্জরিত হয়ে এলো। নিজেকে সামলাতে পারলো না আর। ঠোঁট জোড়া ভেঙ্গে কেঁদে উঠলো শেফালী। জুলফিকার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। বুঝালেন, ‘মেয়েদের জীবন এমন-ই হয়। মিতালীর জন্মস্থান এই বাড়ি। কিন্তু তার নিজের বাড়ি, নিজের সংসার হবে অংকুরের বাড়ি। সেখানেই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে হবে তাকে। এই নিয়ম প্রত্যেক মেয়ের জন্য-ই প্রযোজ্য। তুমি এভাবে কাঁদলে আমাদের সামলাবে কে? আমি তো জানি। আমার ছোট রাজকন্যা সব পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে নিতে জানে।’

কিছুটা শান্ত হলো শেফালী। বেশ কিছুসময় নিরব রইলো দুজন। অতঃপর শেফালী বাচ্চাদের মতো করে জুলফিকারের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, ‘আমি তো কখনো-ই বিয়ে করবো না। এই বাড়ি ছেড়ে, তোমাদের ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।’

শব্দ করে হেসে উঠলেন জুলফিকার। হাসতে হাসতে বললেন, ‘পরে দেখা যাবে।’
.

রুমের বিশাল বড় থাইগ্লাসটা খোলা। বাহির থেকে ভেসে আসছে শীতল প্রভঞ্জন। অন্ধকারাবৃত পরিবেশে ঝিঁ ঝিঁ পোকাদের সুর। থাইগ্লাসের এক পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিতালী। বিয়ের ব্রাইডাল সাজ মুছে এখন নরমাল বেশে আছে। পরনে শাশুড়ির দেওয়া গোলাপি কালার সুতি শাড়িটা। মনটা ভালো নেই। ভুলবশত মোবাইলটাও আনতে ভুলে গেছে। নাহলে বাড়িতে একবার কল দিয়ে কথা বলতে পারতো। মনটাও একটু হালকা হতো। অংকুরের মোবাইল দিয়ে কল দেওয়ারও ব্যবস্থা নেই। লোকটা কোথায় গেছে কে জানে। এখনো আসেনি।

বেশকিছু সময় একা অতিবাহিত করার পর দরজা খোলার শব্দ কানে আসতেই পিছু ফিরে তাকালো মিতালী। কালো টি-শার্ট পরিহিত অংকুর কে দেখে অসাড় হলো মিতালী। ধাতস্থ হলো মন। অংকুর মিতালীর দিকে এক পলক তাকিয়ে নিরবে রুমের দরজা লাগিয়ে দিলো। তারপর এগিয়ে আয়নার সামনে এসে পকেট থেকে মোবাইল ওয়ালেট বের করে রাখলো। হাত ঘড়ি খুলে মিতালীর দিকে ফিরে তাকালো। স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘ওযু আছে?

মিতালী এপাশ থেকে ওপাশ মাথা নাড়িয়ে ‘ না ‘ বুঝালো। অংকুর বললো, ‘তাহলে ওযু করে আসো। নামাজ পরবো।’

মিতালী অংকুরের কথা মতো তাই করলো। ওয়াশরুম থেকে ওযু করে এসে দেখলো রুমের মাঝখানে জায়নামাজ বিছিয়ে অংকুর তার অপেক্ষায় বসে আছে। মিতালী মাথায় নামাজের হিজাব পরে অংকুরের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ পরে নিলো। অংকুর মোনাজাত শেষ করলেও মিতালী দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে মোনাজাত করতে লাগলো।

মোনাজাত করতে থাকা মিতালীর দিকে গালে এক হাত দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অংকুর। মুগ্ধ তার চোখ দুটো। তার পাশে নামাজরত অবস্থায় বসা মেয়েটি তার স্ত্রী। তার অর্ধাঙ্গিনী! তার প্রেয়সী! ভাবতেই ঠোঁটে সন্তুষ্টি, প্রাপ্তি ও প্রশান্তিময় হাসি ফুটে উঠলো।

অনেকটা সময় নিয়ে মোনাজাত শেষ করার পর অংকুর হঠাৎ-ই মিতালীর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পরলো। আকর্স্মিক ঘটনায় হকচকিয়ে গেলো মিতালী। চোখ বড় বড় করে তাকালো অংকুরের দিকে। অংকুর পাত্তা দিলো না। নিজের মর্জি অনুযায়ী মিতালীর এক হাত টেনে বুকের মাঝে রাখলো। মিতালীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সত্যি কি আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে?’

অংকুরের এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললো মিতালী। তার হাসি দেখে কপাল কুঁচকালো অংকুর। প্রশ্ন করলো, ‘হাসছো কেন?’

মিতালী মুখে হাসি রেখেই বললো, ‘এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করলে হাসবো না?’

অংকুর চটজলদি উঠে বসলো। মিতালীর একদম কাছাকাছি বসে বুকে হাত গুঁজলো। তারপর জড়তাহীন গলায় বললো, ‘তুমি আমার বউ। আমরা এখন একই রুমে আছি। আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব নেই। মোবাইলের টাকা খরচ করে রাতে কথা বলতে হবে না। বাসায় এসেই তোমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে যেতে পারবো। যখন ইচ্ছে তোমার গুলুমুলু গালে চুমু খেতে পারবো। মানে ব্যাপারটা বুঝছো? বিয়ে করলে কতো লাভ হয় দেখেছো?’

অংকুরের এমন কথা শুনে হাসি থামিয়ে রাখতে পারলো না মিতালী। শব্দ করে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। হাসি থামাতে না পারছে কোনো মতে। অংকুর কপালে পরপর কয়েকটা সূক্ষ্ম ভাজ ফেলে তাকিয়ে রইলো মিতালীর দিকে। মিতালী কোনো মতে হাসি খানা থামিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার প্রয়াস করলো। তবুও হাসি থামলো না। ঠোঁটে আলতো হাসি থেকেই গেলো। অংকুর আবারো বললো, ‘হায় রাব্বা! এতো লাভ জানলে আরো আগেই বিয়ে করে ফেলতাম। এই দেখো, এখন তুমি মন খুলে হাসছো। যদি বিয়ে না হতো তাহলে তোমার হাসির শব্দ শুনতাম শুধু। কিন্তু এখন সরাসরি দেখছি। ভালো লাগছে। আর এখন ইচ্ছে করছে তোমাকে চুমু খাওয়ার। এই দেখো, টুকুশ করে চুমু খেয়ে নিলাম।’

মিতালী কিছু বুঝার আগেই অংকুর টুশ করে গালে একটা চুমু দিলো। চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেলো মিতালী। রসগোল্লা সমান চোখে অংকুরের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটিত কন্ঠে বলে উঠলো, ‘অসভ্য!’

অংকুর ত্যাঁছড়া ভাবে বললো, ‘এক্সকিউজ মি? অসভ্যের কি দেখলে? এখনো তো কিছুই করলাম না। তাছাড়া আমার বউ। যখন ইচ্ছে চুমু খাবো। তাতে তোমার কি? এই যে এখন আবারো খেতে ইচ্ছে করছে। তাই আবারো চুমু খেলাম।’

বলতে দেরি। অথচ মিতালীর গালে চুমু খেতে দেরি নেই। মিতালী এবারো যার-পর-নাই অবাক। অংকুরের এমন কর্মকান্ডে প্রচন্ড লজ্জাভূতি হলো সে। গাল লাল হয়ে এলো লজ্জায়। অংকুরের সামনে বসে থাকার মতো স্বস্তি আর পেলো না। চটজলদি উঠে দাঁড়াল। কোনো রকমে আমতা আমতা করে বললো, ‘আব্ আমার ঘুম পেয়েছে। আমি ঘুমাই। অনেক রাত হয়েছে। আপনিও ঘুমিয়ে যান।’

বিলম্ব করলো না এক মুহূর্তও। দ্রুত পা চালিয়ে বিছানার কাছাকাছি আসলো। পুরো বিছানা জুড়ে গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে ছিটানো। রজনীগন্ধা ফুলের সৌরভে চারপাশ মুখরিত। গোলাপ ফুল ও রজনীগন্ধা ফুল দিয়ে সাজানো রুমের সাজসজ্জা পছন্দ হলো মিতালীর। এতোক্ষণ মোণোটা বিষন্ন থাকায় রুমটা খেয়াল করেনি। এখন মুগ্ধ চোখেমুখে রুমের চারপাশ তাকিয়ে দেখতে লাগল। অংকুর জায়নামাজ টা গুছিয়ে আলমারি তে রেখে দিলো। মিতালীর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো, ‘বাসর রাত ফেলে কোন পাগলে ঘুমায়?’
.

রিসিপশনের ডেকুরেশনের রঙটা সিলেক্ট করা হয়েছে আকাশী রঙের। চারপাশ সাদা ও আকাশী রঙের ফুল দিয়ে সাজানো। চলছে মেহমানদের আপ্যায়ন। মিতালী স্টেজের মাঝে বসে আছে। তার দুই পাশে চার বোন তাকে ঘিরে আছে। তাহমিনাহ, জারা, মুনিয়া ও শেফালী। সবাই প্রফুল্লিত। আচ্ছাদিত ভাবে কথার ঝুলি নিয়ে বসেছে। তাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে অংকুর তার অফিসের লোকদের সাথে কথা বলছে। ব্যস্ত রাকিব। এদিক সেদিক খুব সাবলীল ভাবে সামলাচ্ছে। কোনো প্রকার ত্রুটি তার পছন্দ নয়। ব্যস্ততার মাঝেও আড় চোখে তার শ্রেয়সী কে দেখে ভুলে নি। আজ মেয়েটকে অন্য দিনের তুলনায় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। হালকা নীল রঙের লেহেঙ্গায় প্রচুর কিউট লাগছে। ইশ! বুকের বা পাশে গিয়ে লাগে একদম। শেফালীর জন্য মনে তৈরিকৃত লুকানো অনুভূতি গুলো শেফালীর কাছে প্রকাশ করার ইচ্ছাপোষন করলো তার মন। কিন্তু এটা কি আদৌ সম্ভব? শেফালী মানবে? নাকি ভুল বুঝে দূরে তাড়িয়ে দিবে? শেফালীর মনেও কি তার জন্য অনুভূতি রয়েছে? তাহলে ওই রায়াজ ছেলেটা? রায়াজের কথা মনে পরতেই ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। অংকুরের সাথে দাঁড়িয়ে বেশ ভালো জমিয়ে কথা বলছে। এই ছেলের মুখের হাসি রাকিবের স’হ্য হচ্ছে না। মানলাম তুই শেফালীর কাজিন। তাই বলে এতো ক্লোজ হতে যাবি কেন? কোথায়, রাকিব তো তার কাজিন সিস্টারদের সাথে এতো ক্লোজ না। এই রায়াজ আর শেফালীকে নিয়ে যতোই ভাবছে, ততোই রাগ আকাশ চুম্বী হচ্ছে তার। নিরবে রাগের তপ্ত শ্বাস ফেললো একটা। রায়াজের দিকে সকলের অগোচরে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বাড়ালো খাবারের দিকটা দেখতে।
.

স্টেজ এখন খালি। মিতালী একা একা বসে আছে। শেফালীরা নিচে নেমে একে অপরের সাথে কথা বলছে। অংকুর মিতালীকে একা বসে থাকতে দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলো। মিতালীর পাশে বসে মোবাইল ঘাটতে লাগলো। ভাব খানা এমন যে মোবাইলে অনেক বড় ইম্পরট্যান্ট কাজ করছে। অবশ্য মিতালী এইদিকে তেমন ধ্যান দিলো না। স্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে রইলো সামনে। অংকুর কিছুসময় পর কন্ঠস্বর নিচু করে বললো, ‘তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।’

মিতালী দৃষ্টি সামনের দিকে রেখেই মুচকি হাসলো। অংকুর আরো কিছুসময় মোবাইল টিপে পকেটে রাখলো। তারপর মিতালীর দিকে পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টি মেলে তাকালো। মিতালী ঘাড় ঘুরাতেই অংকুরের চোখে চোখ পরলো তার। তখুনি অংকুর প্রাপ্তির হাসি দিয়ে বলে উঠলো, ‘আমি জিতে গেছি।’

মিতালী মাথা নিচু করে লাজুক হাসলো। লজ্জা পেলো ভীষণ। কাল রাতের পর থেকে অংকুরের সামনে যেতে ভীষণ লজ্জা লাগছে তার। অংকুর মিতালীর লজ্জা মিশ্রিত লাজুক মুখ খানি দেখে মিষ্টি করে হাসি দিলো একটা। সেখানে উপস্থিত হলো তাহমিনাহ। দুজনকে হাসতে দেখে টিটকারি মা’র’লো, ‘বাহ্ বাহ্, সারারাত প্রম করার পরেও এখনো এতো প্রেম বাকি? বলি মানুষের সামনে প্রেমটা একটু কমিয়ে করেন জিজু।’

অংকুর ফিচেল গলায় উত্তর দিলো, ‘এতো বছর সিঙ্গেল থাকার পর বউ পেলাম। তাও যদি বলো প্রেম কমিয়ে করতে। তাহলে কি মানা যায় বলো?’

তাহমিনাহ মাথা দুলিয়ে বললো, ‘তাও ঠিক। কিন্তু এখন যান। মামা আপনাকে ডাকছে।’

‘কোন মামা?’

‘আরেহ্ আপনার শ্বশুর আব্বা। আমার মামা। তাড়াতাড়ি যান। জরুরি কথা বলবে মনে হয়।’

‘আচ্ছা।’ বলে উঠে চলে গেলো অংকুর। তাহমিনাহ উল্লাসিত হয়ে হেসে মিতালীর পাশে বসে বললো, ‘বোইন, কাল রাতের কাহিনী বল।’

মিতালী চোখ পাকিয়ে তাকালো। কিড়মিড় করে বললো, ‘বেহায়া মেয়ে।’ উচ্চস্বরে হেসে উঠলো তাহমিনাহ। মিতালীও মিহি হাসি দিলো একটা।
.

রায়াজ, আবির, জারা, মুনিয়া ও শেফালী এক সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ফাঁকে ফাঁকে শব্দ করে হাসছে। শেফালী ইতস্ততবোধ করছে। মূলত এখন তাকে এমন একটা কাজ দেওয়া হয়েছে যা করার সা’হস শেফালী পাচ্ছে না। জারা শেফালীর বাহুতে মৃদু ধা’ক্কা দিয়ে বললো, ‘ভীতুর ডিম। যাচ্ছিস না কেন?’

শেফালী বিরক্তির চোখে তাকিয়ে বললো, ‘আশ্চর্য। আমাকে বলতেছো কেন তোমরা? নিজেরা গিয়ে আব্বুকে বলতে পারো না?’

আবির বললো, ‘তোকে তো আঙ্কেল বেশি ভালোবাসে। তাই তোর কথায় রাজি হবে। যা প্লিজ।’

জারাও অনুনয় স্বরে বললো, ‘হ্যাঁ প্লিজ বোইন। যা।’

ব্যাপার গুলো রায়াজের অহেতুক লাগলো। রিসিপশন শেষে সবাই বাসায় ফিরবে। কিন্তু ওরা বাসায় না ফিরে ডিরেক্ট সিনেমা হলে যাবে। তাও মিতালী আর অংকুরকে সাথে নিয়ে। যা আদৌ সম্ভব না। রায়াজ প্রথম থেকেই বুঝাচ্ছে তাদের। তবুও মানছে না তার কথা। তাই এবার রায়াজ ধমকে উঠলো, ‘সমস্যা কি তোদের? কোন আক্কেলে এইসব কথা বলছিস? রিসিপশন শেষে মিতালী অংকুর বাসায় না গিয়ে কি তোদের সাথে সিমেনা দেখতে যাবে? আর ফুফা তোদের কথায় রাজি হবে? এতো আহাম্মক কেন তোরা? এখন এই টপিক বাদ দে। অন্য কিছু করার প্ল্যান কর। নয়তো কান বরাবর থা’প্প’ড় খাবি সব গুলা।’

রায়াজের ধমক শুনে জারা ও মুনিয়ার অবস্থা কাচুমুচু হলো। শেফালী মাথা দুলিয়ে রায়াজের কথার শায় জানালো। আবির বললো, ‘ভাই? আবার কবে না কবে এক হবো আমরা। পরশু আমার মিডটার্ম। কাল আমি চলে গেলে জারাও আমার সাথে যাবে। তাহলে আর এই সুযোগ পাবো বলো?’

তারপর শেফালীর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘বোইন যাস না কেন? তুই এখুনি যা। গিয়ে সব বল। যা চাইবি তাই পাইবি। যা প্লিজ।’

বিরক্তি নিয়ে শেফালী যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রায়াজ শেফালীর হাত ধরে বাধা দিলো। দাঁড়িয়ে পরলো শেফালী। রায়াজ আবির কে বললো, ‘হুদাই ফুফার ধমক খাবি তোরা। এমন কিছুই বলবি না। অন্য কিছু প্ল্যান কর। চুপচাপ দাঁড়া এখানে।’
.
দূর থেকে শেফালীকে মুগ্ধ চোখে দেখছিলো রাকিব। দূরে অবস্থান করায় তাদের কথোপকথনের কিছুই শুনে নি সে। জানার আগ্রহ-ও নেই তার। শুধু শেফালীকে দেখতে পারলেই চলে। এতোক্ষণ মুগ্ধ হয়ে দেখলেও রায়াজ শেফালীর হাত ধরাতে ক্ষুব্ধ হলো ভীষণ। নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। দ্রুত বেগে এগিয়ে আসলো তাদের দিকে। এসেই রায়াজের হাত থেকে শেফালীর হাত ছাড়িয়ে নিলো রাকিব। আকর্স্মিক ঘটনায় সবাই অবাক হলো। রাকিবের এমন কান্ডে বিস্মিত হলো শেফালী। রায়াজ একটা ভ্রুজোড়া বাকিয়ে রাকিয়ে রইলো রাকিবের দিকে। রাকিব কারোর নজরের পাত্তা দিলো না। এগিয়ে রায়াজের মুখামুখি দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে বললো, ‘ডোন্ট ট্রাই টু টাচ হার এগেইন।’

তীক্ষ্ণ চোখে রায়াজের দিকে তাকিয়ে শেফালীর হাত ধরে চলে গেলো সেখান থেকে। রায়াজ এখনো প্রথমের ন্যায় ভ্রুঁ বাকিয়ে তাকিয়ে রইলো রাকিবের দিকে। তার নিরবতা দেখে বাকি সবাই শুকনো ঢুক গিললো। নতুন কিছু ঘটতে চলেছে।

চলমান….
চলমান…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here